ঘুরে এলাম সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটে

প্রকাশিত: ৬:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০২১

ঘুরে এলাম সত্যজিৎ রায়ের পৈতৃক ভিটে

সুমন বনিক 
প্রাজ্ঞকৃতি যে-কজন বাঙালি গোটা বাঙালিজাতিকে আলোকময়-উজ্জ্বল করেছেন তাঁদের একজন—সত্যজিৎ রায় । তাঁর মননশীল সৃষ্টিকর্ম তাঁকে অমরত্ব দান করেছে, সেইসঙ্গে বাঙালি জাতিসত্তার মর্ম মূলে ঢেলেছে সঞ্জীবনীসুধা ।

 

 

সত্যজিৎ রায় একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক এবং লেখক যিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন । তিনি  চলচ্চিত্রে নোবেল পুরস্কার  হিসেবে বিবেচিত অস্কার পুরস্কার লাভ করেছেন ।  ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৮৪) এবং ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ভারত রত্ন (১৯৯২) সহ অনেক পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হন। তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক পদক ন্যাশনাল অর্ডার অব দ্য লেজিওঁ অফ অনারের (১৯৮৭) কমান্ডার সম্মাননা এবং ৬৪তম একাডেমি পুরস্কারে একটি সম্মানসূচক পুরস্কারে ভূষিত হন।চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে সত্যজিৎ ছিলেন বহুমুখী এবং তার কাজের পরিমাণ বিপুল।

 

 

তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনীচিত্র, প্রামাণ্যচিত্র ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালী (১৯৫৫) আস্কার সহ ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করে, এর মধ্যে অন্যতম ১৯৫৬ কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাওয়া “শ্রেষ্ঠ মানব দলিল” (Best Human Documentary) পুরস্কার। শিল্পকলায় উৎকর্ষ অর্জনে তাঁর সৃজনশীল প্রতিভার দ্যুতিময়কর্ম বাঙালিকে বিশ্বে অনন্য উচচতায় আসীন করেছে।

 

 

তাই সৃষ্টিক্ষমপ্রজ্ঞাবান সত্যজিৎ রায়ের শেকড় সন্ধানে, তাঁর পূর্বপুরুষের জন্মভিটার ধুলোকণা মাড়াতে যাই।
কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলা, ধন-ধান্যে সমৃদ্ধ একটি জনপদ। সোনালীআঁশ পাটের আঁতুড়ঘর বলা চলে। কটিয়াদী থেকে সাত কিলোমিটার দূরে কিশোরগঞ্জ যাবার পথে মসূয়া ইউনিয়ন, যাকে স্থানীয় ভাষায় মউস্যা বলে।

 

 

 

মসূয়া’র প্রতি অতো টান কেনো আমার! বিষয়টি খুলে-ই বলি,ছেলেবেলায় সত্যজিৎ রায়ের “হীরক রাজার দেশে’ ফিল্মটি দেখে তাঁর প্রতি ভালোলাগা, তারপর সেই ভালোলাগা ভালোবাসায় প্রগাঢ় হতে থাকে। সত্যজিতের গণশত্রু, আগন্তুক, চারুলতা, কাঞ্চনজঙ্ঘা ইত্যাদি চলচ্চিত্র মনে গেঁথে আছে । তাঁর অনন্য সাধারণ সৃষ্টিকর্ম “পথের পাঁচালী” চলচ্চিত্রে অপু- দুর্গার দুরন্ত শৈশব আমার মনের উঠোনে আজো জীবন্ত। কাশবন পেরিয়ে-ধোঁয়া উড়িয়ে-সিঁটি বাজিয়ে ট্রেনের ছুটে চলার দৃশ্য দেখে অপু- দুর্গার অবাক চোখ যেনো এখনো জ্বলজ্বল করে, দুর্গার চুরি করা পুঁতিরমালা খুঁজে পাওয়া, হরিহর-সর্বজয়া পরিবারের দারিদ্র্যের টানাপোড়েন, ইন্দির ঠাকুরণ-সর্বজয়ার অন্তর্কলহ পথের পাঁচালী’র এসব খণ্ডচিত্র আজো মনের জানালায় উঁকিঝুঁকি দেয়।

 

 

 

তাই আবেগমাখা ভালোবাসা নিয়ে মসূয়া ছুটি চলি। কালোএলিয়ন গাড়িটি যখন ভন ভন করে ছুটে চলে তখন সকাল এগারোটা। যদিও গাড়ির ভেতরে কাশ্মীরি হিম কিন্তু বাইরে গনগনে আগুনের কুন্ডু! কার্তিক মাসের শেষ সপ্তাহে এতো গরম পড়ে,এ কথা যদি মা- মাসি শুনতো, নিশ্চয়ই বলতো—এটা ঘোরকলিকালের লক্ষণ। ওঁরা স্বর্গবাসী,নচেৎ এই বৈরী জলবায়ুর কুফল তাঁদেরও পোহাতে হতো! আমরা যাত্রা পথে বেতাল বাজারে এসে থামলাম, এক টমটমের চালককে মসূয়া কতদূর জিজ্ঞেস করতেই তিনি বেশ ভাবগম্ভীর গলায় বললেন সামনে গিয়ে ডানের রাস্তায়। তার মুড দেখে, কতটুকু সামনে– তা জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। কিছুদূর এসে একজন পাকাদাড়িওলা লোককে জিজ্ঞেস করলাম মসূয়া সত্যজিত রায়ের বাড়ির রাস্তা কি এটা? লোকটি একগাল হাসি দিয়ে বললেন, “আফনারা তাইনর বাড়িত যাইবাইন? হোজা যাইন, এরপরদা ডাইনে যাইবাইন” বয়স্ক ভদ্রলোকের হাসিমুখের কথাশুনে খুব ভালো লাগলো। গাড়িতে সহযাত্রী সকলের মনে সেই হাসির ঢেউ এসে যেনো দোলা দিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সেই কাঙ্খিত গন্তব্যে এসে পৌঁছলাম।

 

 

 

শস্যদানার মতো তিলে তিলে এতোদিন যে স্বপ্নের ঢোলা আমি টইটম্বুর করেছে,আজ দেখছি স্বপ্নের সোনালি ধান নয়- দুঃস্বপ্নের চিটায় পূর্ণ স্বপ্নের ঢোলা । সে কী দৈন্যদশা! স্মৃতিঘেরা এই বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কালের সাক্ষী সেই প্রাসাদোপম বাড়ি আজ বিধ্বস্ত, নীরব-নিথর মরার মতো। নিভে গেছে বালোয়ারিঝাড়বাতি, শব্দহীন বোবার মত দাঁড়িয়ে আছে । মনের ভেতরে যে রঙিন ক্যানভাস সেঁটে এসেছিলাম, সেই রং ক্রমশ ধূসর হয়ে গেল। অযত্ন অবহেলার ছাপ সর্বত্র। সংশ্লিষ্ট কারো এতটুকু দায়িত্ববোধের ছোঁয়া চোখে পড়েনি। অথচ এখানে যদি সত্যজিৎ রায় গবেষণা কেন্দ্র, ফিল্ম আর্কাইভ, ফিল্ম ইনস্টিটিউট গড়ে উঠতো, যদি প্রত্নতত্ত্ব রক্ষার্থে এই বাড়িটি পুনর্নির্মাণ সংরক্ষণ করা হতো, তাহলে আমার মনের ভাঁজে ভাঁজে জমে ওঠা স্বপ্নগুলো দৃশ্যমান হতো। আমার অনুভূতিগুলো সোনালিডানার চিল হয়ে নিঃসীম আকাশে উড়তো।

 

 

 

 

বিদগ্ধ পাঠক আপনাদের নিশ্চয়ই কৃর্তিমান ক্ষণজন্মা সত্যজিৎ রায়ের শেকড়ের আদ্যপান্ত জানা আছে। তথাপি আমার না-জানা বিষয়াদির খুঁটিনাটি শেয়ার করছি:  এই বাড়িতে ১৮৬০ সালের ১২ মে জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন বিখ্যাত শিশু কিশোর পত্রিকা ‘সন্দেশের’ (১৯১৩) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। তাঁর বাবার নাম ছিল কালীনাথ রায়। পাঁচ বছর বয়সে নিঃসন্তান চাচা হরি কিশোর রায় চৌধুরী তাঁকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন।পিতার দেয়া কামদারঞ্জন রায় নাম বদলিয়ে রাখেন উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী। কিন্তু দত্তক পুত্র গ্রহণের বেশ ক‘বছর পর হরি কিশোর রায় চৌধুরী ঔরসে নরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী জন্মগ্রহণ করায় দত্তক পুত্র উপেন্দ্র কিশোরের গুরুত্ব কমতে থাকে। হরি কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন জমিদার। তাঁর স্নেহে লালিত উপেন্দ্র কিশোর ময়মনসিংহ জেলা স্কুল থেকে ১৮৮০ সালে প্রবেশিকা এবং কলকাতা মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউট থেকে বি এ পাস করেন।এদিকে হরি কিশোর রায় চৌধুরী ভবিষ্যতে সম্পদের উত্তরাধিকার নিয়ে ঔরসজাত পুত্র ও দত্তক পুত্রের মাঝে যাতে কোন সংঘাত না বাধে সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এজন্য বাড়ির চার দেয়ালের বাইরে নকশা করে লোহার খুঁটি দিয়ে দত্তক পুত্রের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা বাড়ীর সীমানা নির্ধারণ করে নেন।সীমানা নির্ধারিত বাড়িতে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর উরসে ১৮৮৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন জ্যেষ্ঠ পুত্র সত্যজিৎ রায়ের পিতা শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায়। জন্মের পরই সুকুমার রায়সহ উপেন্দ্র কিশোর চলে যান কলকাতায়। মাঝে মাঝে নিজ বাড়িতে ছেলে মেয়েদের নিয়ে বেড়াতে আসতেন তিনি। তাঁর মেজো মেয়ে পুণ্যলতার অনেক সাহিত্যকর্মের মধ্যে ছোট বেলার দিনগুলোতে সেকালের মসুয়ার বর্ণাঢ্য রায় চৌধুরী পরিবারের বিবরণী রয়েছে।হরি কিশোর রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী মসুয়ায় জমিদারী লাভ করেন। উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী হয়ে পড়েন কলকাতা কেন্দ্রিক। নাতি সত্যজিৎ রায়ের জন্ম কলকাতাতেই এবং বেড়ে ওঠা সবই হয়েছে কলকাতায়।

 

 

 

 

মসুয়া গ্রামের ভাঙ্গা-চোরা সত্যজিৎ রায়ের এই পৈতৃক বাড়িটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে-হতে এখন নিশ্চিহ্ন হবার প্রক্রিয়ায় আছে। এই বাড়িতে ঢুকার মুখেই ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান , বাড়িটি ঘেষে পূর্বদিকে মসূয়া ভৃমি অফিস। সবচেয়ে আশ্চর্য হলাম বাড়ির চৌহদ্দিতে জনৈক লেংটাবাবা পীরের এক ভক্তের মাজার। শান বাঁধানো ঘাটটি ভাঙ্গা নোংরা , অবহেলা উপেক্ষার গ্লানি বুকে নিয়ে পুকুরের জলও ঘোলা হয়ে গেছে। হতাশা বিষন্নতা এসে গ্রাস করলো আমাকে। মনে ভেতর হাজারো প্রশ্ন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মতো ফুঁসতে লাগলো। যিনি বাঙালি জাতিসত্তার গর্ব , যিনি বাঙালি জাতিকে আত্মমর্যাদা এনে দিয়েছেন, সেই কীর্তিমানের স্মৃতিটুকুও আমরা ধরে রাখতে পারছি না! কী দুর্ভাগা আমরা!! রোদে ঝলমলে সুনীল আকাশটা মনে হলো গাঢ়কালো মেঘে ঢাকা। শরবিদ্ধ আহত পাখির মতো ছটফট করতে করতে ফিরে আসি, মসূয়া থেকে।
আমার বৃক্ষপ্রেমি স্ত্রী;সত্যজিৎ রায়ের ধ্বংসপ্রাপ্ত দালানবাড়িতে গজিয়ে ওঠা গাছ-গাছরা থেকে কতিপয় ফার্ণ, অচেনা গাছ তুলে এনেছিলেন। অতিযত্নে সেগুলো বাড়ির ছাদবাগানে, ব্যালকনিতে রোপন করেছেন। আমি গাছগুলোর সবুজ সতেজপাতা দেখে দেখে সেই মহান মানুষ সত্যজিৎ রায়কে স্মরণ করি–পরম ভালোবাসায়, শ্রদ্ধায়—তাঁর সৃষ্টিকর্মকে সতেজ চিরসবুজ করে রাখি মনের এলবামে-মননে।

ছড়িয়ে দিন