চট্টগ্রামে নির্মিত হতে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স

প্রকাশিত: ১২:৫৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ৬, ২০১৮

চট্টগ্রামে নির্মিত হতে যাচ্ছে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স

চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মীদের দাবির মুখে সেখানে একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মিত হতে যাচ্ছে । সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালইয়ের উদ্যোগে জরাজীর্ণ সরকারি গণগ্রন্থাগার ও চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট ভেঙে নির্মিত হবে এটি ।

প্রায় ২৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে গত ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পটিকে চট্টগ্রামবাসীর শিক্ষা, গবেষণা ও সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা হবে বলে জানিয়েছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সুবিধা সৃষ্টির পাশাপাশি এতে শহীদ মিনার এবং বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

২০০৯ সালের ১৮ জুলাই থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশের জন্য গঠিত ‘চট্টগ্রাম সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সমন্বয় কার্যকরী পরিষদ’এর কার্যক্রম তুলে ধরতে গিয়ে মুসলিম মুসলিম হল সংস্কারের দাবি তুলেন।

২০১৪ সালে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর গিয়ে পরিদর্শনের পর ২০১৫ সালের মার্চে গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রতিনিধিদের মুসলিম হলের সংস্কারের লক্ষ্যে নকশা প্রণয়ন শুরু হয়। ২০১৬ অগাস্টে সে নকশা চূড়ান্ত করা হয়।

২০১৭ সালের মে মাসে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আর্থ-সামাজিক বিভাগের এক সভার কার্যবিবরণী পত্রে বলা হয়েছে,মেয়াদোত্তীর্ণ ভবনটি ভেঙে ফেলতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। মাস্টার প্ল্যানের আওতায় ১৫ তলা বিশিষ্ট ১টি গণগ্রন্থাগার, ১টি মাল্টিপারপাস হল নির্মাণ করা হবে, অন্যদিকে এই সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে নির্মাণ করা হবে একটি শহীদ মিনার, যে চত্বরে আয়োজন করা যাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

পরে নকশা চূড়ান্ত করে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর সেই নকশা একনেকে উত্থাপন করা হলে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তা পাস হয়।

এতে বলা হয়, চট্টগ্রাম এই হল নির্মাণের জন্য ২৩২ কোটি ৮৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করা হবে। চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২০ সালের জুন মাস।

চূড়ান্ত নকশা অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারের জন্য ১৫২১২.২৮ বর্গফুট জায়গা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে ১৪৪৯৩.২২ বর্গফুট আয়তনের মিলনায়তন ও সেমিনার হলের পাশাপাশি ৭৪১৩.৬০ বর্গফুট আয়তনের জনসমাগম স্থান নির্ধারণ করা হবে।

গণগ্রন্থাগার ভবনের নিচতলায় থাকবে সার্ভিস সেকশন, যেখানে বই বাছাই, ফিউমিগেশন হবে। গ্রাউন্ড ও প্রথম ফ্লোরে থাকবে অফিস, ২ য় ফ্লোরে সেমিনার ও মিটিং রুম, প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে তৃতীয় ফ্লোর। চতুর্থ ও পঞ্চম ফ্লোরে জেনারেল লাইব্রেরি,

ষষ্ঠ ফ্লোরে চিলড্রেন লাইব্রেরি, সপ্তম ফ্লোরে পেপার লাইব্রেরি, অষ্টম ফ্লোরে রেফারেন্স লাইব্রেরি, নবম ও দশম ফ্লোরে সায়েন্স লাইব্রেরি, এগারোতম ফ্লোরে ট্রেনিং ইউনিট, বারোতম ফ্লোরে আইসিটি ইউনিট, তেরতম ফ্লোরে স্পেস ফর ফিউচার প্রোভিশন, চৌদ্দতম ফ্লোরে গেস্ট হাউজ নির্মাণ করা হবে।

গ্রন্থাগার অংশে সাধারণ পাঠাগারে ২৫০ জন, বিজ্ঞান পাঠাগারে ১৫০ জন, রেফারেন্স পাঠাগারে ১০০ জন, পত্রিকা/সাময়িকী পাঠাগারে ১০০ জন, প্রতিবন্ধী পাঠাগারে ৫০ জন, উন্মুক্ত পাঠাগারে ১৫০জন, শিশুকিশোর পাঠাগারে ১০০ জন , উন্মুক্ত পাঠাগারে ১৫০জন, শিশু-কিশোর পাঠাগারে ১০০ জন পাঠক একসঙ্গে বসে বই পড়তে পারবে।

এছাড়া এখানে ৪০ থেকে ৫০ আসন বিশিষ্ট সভাকক্ষ ও সেমিনার কক্ষ, ১৫০ আসন বিশিষ্ট একটি বড় সেমিনার কক্ষ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে নকশায় । এখানে আইসিটি লাইব্রেরিতে থাকবে ৩০টি কম্পিউটার থাকবে। এখানে থাকবে ১টি রেস্ট হাউজ, এখানে ২টি ভিআইপি কক্ষ ছাড়াও থাকবে সাধারণ ডরমেটরি কক্ষ।

চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউটের মাল্টিপারপাস হলগুলো নির্মাণ করা হবে এর পাশেই । প্রথম ও দ্বিতীয় ফ্লোরে সেমিনার ও এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হল, তৃতীয় ফ্লোরে ক্যাফেটারিয়া ও প্রজেকশন হল, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় মিলনায়তন থাকবে।

গ্রন্থাগারের পাশে চট্টগ্রামের মুসলিম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রেখে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা হবে।

মুসলিম ইনস্টিটিউট অংশে ৭৫০ আসন বিশিষ্ট মিলনায়তন, ৩০০ থেকে ৩৫০ আসনবিশিষ্ট মিনি অডিটরিয়াম থাকবে। এখানে ২০০ ও ১০০ আসন বিশিষ্ট দুটি সেমিনার কক্ষ, ১টি আর্ট গ্যালারি ও স্যুভেনির শপ থাকবে।

সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে নির্মিত শহীদ মিনারের পাশে নির্মাণ করা হবে একটি উন্মুক্ত মঞ্চ। এখানে সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি সভা, সেমিনার আয়োজনের বন্দোবস্ত থাকবে।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এক পরিপত্রে বলেছে, “প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের তথ্য চাহিদা পূরণ করবে। শিক্ষার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝিমিয়ে পড়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রাণের সঞ্চার ঘটবে “

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ৪৫টি নতুন কর্মক্ষেত্র সৃজন করা হবে বলেও বলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পত্রে বলা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নাকারী প্রতিষ্ঠান জাতীয় গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশীষ কুমার সরকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন এই চট্টগ্রাম সরকারি গণগ্রন্থাগার ও চ্ট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সবার কথা বিবেচনা করে মুসলিম হলের সংস্কার ও আধুনিকায়ন ভীষণ দরকার ছিল।”

এদিকে চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহমেদ ইকবাল হায়দার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, নকশা চূড়ান্ত করার আগে গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মতামতকে ‘প্রাধান্য দেয়নি’।

তবে সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণ প্রক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, “এই কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি আমাদের বহুদিনের। এটি বাস্তবায়িত হলে আমাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে পারব।”

১৯২৫ সালে চট্টগ্রামের কিছু সংস্কৃতি এবং সমাজসেবীর উদ্যোগে চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে চট্টগ্রাম মুসলিম ইনস্টিটিউট নামে প্রতিষ্ঠানটি নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে সরকার মুসলিম ইনস্টিটিউট অধ্যাদেশের মাধ্যমে হলটি অধিগ্রহণ করে। অতঃপর প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য মুসলিম ইনস্টিটিউট বিধিমালা প্রবর্তিত হয়। ওই বিধিমালার আলোকে চট্টগ্রামের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সভাপতিত্বে বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়।

১৯৯৫ সালে বিধিমালাটি সংশোধন করে গণগ্রন্থাগারের পরিচালক, বিভাগীয় সরকারি গণগ্রন্থাগারের সভাপতি এবং লাইব্রেরিয়ান, চট্টগ্রামকে সদস্য সচিব করে ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন করা হয়।

পরে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে মুসলিম হল ইনস্টিটিউট ক্রমেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ছাড়া এখানে সাংস্কৃতিক আয়োজনের যথাযথ পরিবেশ না থাকায় পরে সরকার একে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে।