চট্টগ্রামে শেষ হলো বঙ্গদেশে খ্রিস্টধর্মের প্রচলনের ৫০০ বছর পূর্তির আয়োজন

প্রকাশিত: ১১:১২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৯

চট্টগ্রামে শেষ হলো বঙ্গদেশে খ্রিস্টধর্মের প্রচলনের ৫০০ বছর পূর্তির আয়োজন

প্রিন্স গোমেজ

সবধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে শেষ হয়েছে বঙ্গদেশে খ্রিস্টধর্মের প্রচলনের ৫০০ বছর পূর্তির আয়োজন। শেষদিনের আয়োজনে আন্তঃধর্মীয় সভায় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিশিষ্টজনরা পরস্পরের সঙ্গে সৌহার্দ্য বিনিময় করেন। আয়োজনের মধ্যে ছিল গান-নাচও।

শুক্রবার (০৮ ফেব্রুয়ারি) মৃদু শীতের সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটায় রাণী জপমালা গির্জা-সংলগ্ন বিশপ হাউজের আঙিনায় বসেছিল এই মিলনমেলা। চট্টগ্রাম আর্চডায়োসিসের মেট্রোপলিটন আর্চবিশপ মজেস কস্তা’র আমন্ত্রণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা হাজির হয়েছিলেন সেখানে।

বাংলাদেশে নিযুক্ত ভ্যাটিকানের রাষ্ট্রদূত জর্জ কোচারিও এবং আর্চবিশপ মজেস কস্তা আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।

সমাপনী আয়োজনের বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত জর্জ কোচারিও বলেন, ‘শান্তি এবং সম্প্রীতি হচ্ছে সবধর্মের মূলকথা। শুধু এই চট্টগ্রাম কিংবা বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বে আমরা যেন এই শান্তি আর সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে সবসময় সচেষ্ট থাকি। শুধু খ্রিস্টধর্ম নয়, সবধর্মের মানুষ মিলেমিশে আমরা একসঙ্গে থাকি। এই শান্তি ও সম্প্রীতি যেন শুধু উপরের তলার মানুষদের জন্য না হয়, এটা যেন সমাজের সকল স্তরের, একেবারে নিচের পর্যায়েও সঞ্চারিত হয়। ধর্মের মর্মবাণী যেন মানুষ উপলব্ধি করতে পারে।’

আর্চবিশপ মজেস কস্তা বলেন, ‘৫০০ বছর আগে এই চট্টগ্রাম দিয়ে খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসীরা পূর্ববঙ্গে আগমন করেছিলেন। গতবছর আমরা পুরো সময় বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এটা উদযাপন করেছি। আমরা প্রার্থনা করেছি, আমাদের মধ্যে যেন ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। আমরা প্রার্থনা করেছি, আমরা যারা প্রতিবেশী, যিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন, আমাদের মধ্যে সম্প্রীতি যেন চলমান থাকে।’

‘এই সম্প্রীতি যেন কথার কথা না হয়। আমরা যেন পরস্পর একত্রিত সমাজে বৈষম্যের শিকার মানুষের জন্য কাজ করতে পারি। এই সমাজে এখনও ধনী আর গরীবের মধ্যে বৈষম্য প্রকট। এই বৈষম্য ঘোচাতে আমরা যেন একসঙ্গে কাজ করতে পারি- এটাই আমাদের ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা।’ বলেন মজেস কস্তা।

আন্তঃধর্মীয় সভায় বিশিষ্টজনদের মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড.ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী, পালি বিভাগের অধ্যাপক ড.জীনবোধি ভিক্ষু, রামকৃঞ্চ মিশনের অধ্যক্ষ শক্তিনাথানন্দ মহারাজ, শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি মাওলানা আমজাদ হোসেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লব ও ইসমাইল হোসেন বালি, স্থপতি আশিক ইমরান চৌধুরী, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক চৌধুরী ফরিদ, আইনজীবী নিতাই প্রসাদ ঘোষ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা তাপস হোড়সহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকরা উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়া সারাদেশ থেকে আসা খ্রিস্টধর্মীয় বিশপ, খ্রিস্টান মিশনারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এতে উপস্থিত ছিলেন।

সভার শেষ পর্যায়ে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রার্থনা সঙ্গীতে দলীয় নৃত্য পরিবেশিত হয়। মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা ছিল ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর একদল নৃত্যশিল্পীর। তারা তাদের চিরায়ত সংস্কৃতিকে নৃত্যের ছন্দে তুলে ধরেন।

বঙ্গদেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচলন করতে এসে আরাকান রাজার সৈন্যদের হাতে প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণে পরিবেশন করা হয় গান, ‘মুক্তির মন্দিরে সোপান তলে…’। এছাড়া দেশমাতৃকার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সুর উঠে আসে একদল শিল্পীর কণ্ঠে, ‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা…।’

৫০০ বছর পূর্তি আয়োজনের মিডিয়া উপ-কমিটির আহ্বায়ক ও কারিতাস চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক জেমস গোমেজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার বিকেলে দিয়াং পাহাড়ে খ্রিস্টশহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে দুইদিনের সমাপনী আয়োজন শুরু হয়েছিল। আন্তঃধর্মীয় সভার মধ্য দিয়ে সেটা শেষ হয়েছে। একইসঙ্গে বছরব্যাপী আমরা ধারাবাহিক যেসব অনুষ্ঠান করে আসছিলাম, সেগুলোরও সমাপ্তি হয়েছে।’