চাকা

প্রকাশিত: ৫:৪৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৭

চাকা


নাসরিন আক্তার

অনেকগুলো টাকা খরচ করে রমিজ মিঞা তার পুরানো রিক্সায় নতুন ব্যাটরি লাগিয়েছে। রিক্সার বাইরে কোন বদল নেই, শুধু ভেতরে ভেতরে অভিজাত হয়ে উঠেছে। সমাজের নিম্নশ্রেণীর ব্যাটারিহীন রিক্সাগুলো থেকে তার মর্যাদা এখন অনেক বেশি। রমিজ নতুন রূপে পুরোনো রিক্সার গায়ে আলতো আদরের একটা ধাক্কা লাগায়।
—যা ব্যাটা তোরে উড়োজাহাজ বানাইয়া দিলাম , আইজ থাইক্কা তুই হইলি পঙ্খিরাজ ঘোড়া ।
বুকচিরে একটা গোপন দীর্ঘশ্বাস বের হয় রমিজের । রিক্সাকে নতুন সাজ দিতে গিয়ে কদমতলি গ্রামের পৈত্রিক ভিটার ষোলআনাই বন্ধক রাখতে হয়েছে ,সাথে বউয়ের দু,আনা কানের দুল বেঁচতে হয়েছে ,যেটা কিনা বিয়ের সময় বউয়ের এক বড়লোক চাচা উপহার দিয়েছিলো ,বউ যক্ষের ধনের মত আগলে রাখতো ।ছেলে- মেয়ে দু,টার স্কুলের বেতন দেয়নি গত চার মাস । যাক আজ আর এসব ভাবনা নয় , নতুন রিক্সায় করে বিকালটা বউ আর বাচ্চাদের নিয়ে একটু ঘুরবে ।ভেবে সুখ কল্পনায় রমিজের চোখ চক চক করে উঠে।লুঙ্গির গিটে গুঁজা শেষ সম্বল দশ টাকা দিয়ে মোড়ের দোকান থেকে জর্দা দিয়ে একখিলি পান খায় , ছেলে – মেয়ের জন্য চকলেট কিনে বস্তির পথ ধরে । পানের রস আর মনের আনন্দে রমিজের মুখ, চোখ, ঠোট আরও রঙা হয়ে উঠে। কণ্ঠে বেজে উঠে বেসুরে বাংলা ছায়াছবির গানের সুর ।মনের ভেতর বাজতে থাকে এই তিন চাকাই বদলে দিবে তার তিন পুরুষের ভাগ্য ।
বস্তিতে ঢোকার মুখেই জোরে একটা হাঁক দেয় ছেলে মেয়ের নাম ধরে , পরম মমতায় ওদের হাতে তুলে দেয় চকলেট , খুপরি ঘরে ঢোকে বউকে বলে
-বউ রান্দুন হইছে নি ? ভাত দে, খুব খিদা লাগছে ।
– রিক্সার খবর কি ,কামকাইজ শেষ হইছে ? আর কত দূর ?
– রিক্সা তো কমপিলিট ।খাওন শেষ কর ,আমার রিক্সার পর্থম পেসেন্জার আমার বউ পোলাপান । চল ঘুরাইয়া আনি, পরে বনি করুম ।বউরে ,অনেক কষ্ট করছি ,অহন মনে হয় কষ্টের দিন শেষ হইবো । তোগোরে একটু সুখে রাখতে পারুম । পোলা-মাইয়া দুইডারে ভালো স্কুলে পড়ামু। ওরাই তো আমাগো ভবিষ্যৎ।বউ থালাতে ভাত নিতে নিতে আহ্লাদের সুরে বলে
– পোলাডার মাথা ভালো , ওরে আমি ডাক্তার বানামু।
দুজনারই সুখ স্বপ্নে চোখের তারা চিক চিক করে উঠে।
বউ বাচ্চাকে রিক্সায় তুলে প্যাডেলে চাপ দিয়ে নিজের মনেই হেসে উঠে রমিজ ।কোন পরিশ্রমই হয় না শুধু ব্রেকটা ধরে রাখা ছাড়া।রিক্সা তরতর করে সামনে আগায় তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠে রমিজের চোখে মুখে । পিছন ফিরে তাকিয়ে বউকে বলে
– বউরে , আইজ থাইক্যা পাউ দুইখানের আর দরকার নাই মনে হয় ,রিক্সাতো প্যান্ডেল মারার আগেই ছুইট্টা চলে ।
মনে একটা সুখ অনুভূতি কাজ করে,এই প্যাডেল ঘুরাতে পা’দুখানার কত কষ্ট করতে হয়েছে। আজ থেকে তার দু’খানা পায়ের প্রোয়োজন ফুরিয়েছে।এমনি এমনি চাকা ঘুরবে প্যাডেল দিতে হবে না , চাকা ঘুরবে পা ঘুরবে না। এই অপ্রয়োজনীয় অঙ্গটার দিকে তাকিয়ে হাসি পায় রমিজের যদিও তা খুব অল্প সময়ের জন্য।
প্রথম দিনের রোজগার দিয়ে অনেক দিন পর ঘরে ইলিশ মাছ আসে , আসে ছেলেমেয়েদের নতুন জামা জুতো। রোজগার ভালোই হয়, খরচ বাদে দিন শেষে হাতে কিছু টাকাও থাকে যা দিয়ে বাচ্চাদের আহ্বলাদি বায়না মিটাতে পারে রমিজ মিঞা।
মানুষ স্বপ্ন দেখে, স্বপ্নের নায়ে সওয়ার হয়ে ভেসে যায় সুখরাজ্যে। তবে সবার ভাগ্যে সুখ কি সয় ?
মানুষ ভাবে এক আর হয় আরএক। সকাল বেলা খেয়ে দেয়ে রিক্সা নিয়ে বেড়হয় রমিজ । একের পর এক খ্যাপ মারে কষ্ট কম সময় কম অল্প সময়ে বেশি টাকা ,হঠাৎ পিছন থেকে এক ধাক্কা তার পর আর কিছু মনে থাকেনা রমিজের। জ্ঞান ফিরে দেখে ঢাকা মেডিক্যালে ভর্তি, শুনেছে তার পেসেন্জার বেঁচে নেই , ভাগ্য ভালো তাই ও জানে বেঁচে আছে ।তবে হারাতে হয়েছে পা দু,খানা – আর রিক্সাটা দুমড়ে মুচড়ে শেষ।
রমিজের চিৎকারে হাসপাতালের দেয়াল গুলোও কেঁপে উঠে-
– আল্লারে আমারে ক্যান বাঁচায়া রাখলা। অনেক কষ্টে রমিজ কে শান্ত করা যায় ।
-ঢাকার রাস্তায় একটা ছেলে দুই পা কাটা এক ভিক্ষুককে চাকা ওয়ালা কাঠের বাক্সে করে টেনে টেনে ভিক্ষা করে। সাবাই ওকে পা কাটা রমিজ বলেই জানে। শুনা যায় সেই দুমড়ানো রিক্সাটা মহাজনের কাছে বিক্রি করে এই কাঠের বাক্সটা বানিয়েছে।
ভাগ্যহত রমিজের অপ্রয়োজনীয় পা’দুখানার সাথে সাথে কাঁটা পরে রমিজের তিন পুরুষের ভাগ্য।

ছড়িয়ে দিন