চালের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে : খাদ্যমন্ত্রী

প্রকাশিত: ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৫, ২০১৯

চালের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে : খাদ্যমন্ত্রী


খাদ্য নিরাপত্তার জন্য সামাজিক নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি থাকা সত্ত্বেও দেশের মোট জনসংখ্যার ১২.৯ শতাংশ অতিদরিদ্র ২ কোটি এবং দরিদ্র ২ কোটিসহ মোট ৪ কোটি মানুষ (২০১৬ সালের বিবিএস-এর তথ্যানুযায়ী), যার অর্ধেক বেশি কম ও অপর অর্ধেক অল্প কম খেতে পায় এছাড়াও নদীভাঙ্গন, চরাঞ্চাল ও হাওরের কোন কোন এলাকা এবং রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন মহানগরে বস্তিতে বসবাসকারী অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠী মানবেতর জীবনযাপন করে। অপরদিকে, সমাজে আয়-বৈষম্যের কারণে শীর্ষ ১০ ভাগ ধনী পরিবারের আয় মোট জাতীয় আয়ের ৩৮ শতাংশ এবং নিম্নে অবস্থানকারী ১০ ভাগ অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠী মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ১ শতাংশের মালিক । এ পরিস্থিতি দেশে সকল মানুষের মৌলিক অধিকার খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, বস্ত্র ও বাসস্থান প্রতিষ্ঠার বিষয়কে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন । এই প্রেক্ষাপটে অবিলম্বে ‘খাদ্য অধিকার আইন’ প্রণয়নে উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে অতিদরিদ্র ও দরিদ্র ৪ কোটি মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার যেমন নিশ্চিত হবে। ২৪ এপ্রিল ২০১৯ ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আইসিসিও কোআপারেশন-এর সহায়তায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্য: খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার প্রসঙ্গ’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ ও ‘পিকেএসএফ’-এর চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে সরকারের খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপি উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ-এর মহাপরিচালক ড. মোঃ শাহ্ নেওয়াজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট-এর অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ এতে সম্মানীয় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর সাধারণ সম্পাদক ও ওয়েভ ফাউন্ডেশন-এর নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী।
সেমিনারে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার এমপি খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সুপারিশগুলোর সাথে একমত হয়ে বলেন, দীর্ঘদিন প্রান্তিক মানুষের সাথে থেকে রাজনীতি করার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, ওইসব মানুষের অবস্থার আজ অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। সংবিধানে জনগণের খাদ্য নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। সরকার ইতিমধ্যে স্কুলে মিড-ডে মিল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধান খাদ্য চালের বাজারে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে। খাদ্য অধিকার আইনের অবয়ব কী হবে সেটা সুনির্দিষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমরা যাব, আমি জীবন দিয়ে এ আইন করার চেষ্টা করবো।
ড. মোঃ শাহ্ নেওয়াজ বলেন, খাদ্যের সাথে পুষ্টির সম্পর্ক আছে। জীবনযাপনে সঠিক খাদ্যাভ্যাসের চর্চা, মাতৃগর্ভ থেকেই শিশুর পুষ্টির নিশ্চয়তার জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে। অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম শিশুদের পুষ্টির উপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, পুষ্টিসম্মত স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালু করা দরকার। ফাস্টফুডের উপরে করারোপ করে সরকার একে নিরুৎসাহিত করতে পারে। খাদ্যে মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট নিশ্চিত করার জন্য শুধু আইন করলে হবে না, সচেতনতা বাড়াতে হবে। প্রতিদিন অন্তত চারশো গ্রাম শাক-সবজি বা ফলমূল খাওয়া উচিত। বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর, শাক-সবজি, দেশিয় ফলমূলও সহজলভ্য, কিন্তু আমরা পঞ্চাশ গ্রাম শাক-সবজি বা ফলমূল খাই না। ফলে আমরা নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হই, অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হই। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনই আমাদেরকে স্বাস্থ্যকর জীবন দেবে। ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ইতিমধ্যে ১৯টি দেশে খাদ্য অধিকার আইনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, ৯টি দেশে এ উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন আছে। আইনে কী থাকবে তা নিয়ে ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’সহ সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। জিডিপির প্রায় আড়াই শতাংশ আসে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি আসে, যে কর্মসূচি খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। সেখানেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনসনের অংশটুকু বাদ দিলে জিডিপিতে এর পরিমাণ পৌণে দুই শতাংশের বেশি নয়। তিনি অনুষ্ঠানের খাদ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান, যাতে প্রক্রিয়াজাত চালের বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, বাংলাদেশ এখন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে, এজন্য প্রত্যেকের জন্য ন্যূনতম খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে, খাদ্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। খাদ্য অধিকার আইন নিয়ে এ যাবৎ সরকার ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে, আশা করি নতুন খাদ্যমন্ত্রী মহোদয় এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেবেন। খাদ্যের সঙ্গে পরিবারের আয়ের সম্পর্ক আছে। সুতরাং কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।
প্রবন্ধ উপস্থাপনে মহসিন আলী খাদ্য অধিকার আইনের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বলেন, আমাদের সংবিধানে খাদ্যপ্রাপ্তির বিষয়টিকে মৌলিক চাহিদা হিসেবে স্বীকার করলেও খাদ্য নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপগুলো সাধারণত দান বা সেবামূলক। ১৯৪৮ সালে গৃহীত জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুযায়ী, খাদ্য অধিকার মানবাধিকার। এবং সে অনুসারেই পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (ওঈঊঝঈজ) ১১ অনুচ্ছেদের মাধ্যমে খাদ্য অধিকারকে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। উভয় ঘোষণাতেই বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষর প্রদান করেছে। আমাদের সংবিধানের আলোকে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং ইতিপূর্বে বর্ণিত উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। এ প্রেক্ষাপটে খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়নে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ-এর পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে যেসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়, তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য: আসন্ন জাতীয় বাজেটে প্রধান প্রধান দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকা ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রয়োজনীয় খাদ্য নিশ্চিত করা; ‘সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি’র বাজেট বৃদ্ধির মাধ্যমে সকল কর্মসূচির ভাতার পরিমাণ ও উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা; সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং বরাদ্দ অনুযায়ী খাদ্য সামগ্রী ও নগদ অর্থ প্রদান করা; সমতলে বসবাসকারী নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক নীতি কাঠামো ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি অধিকার নিশ্চিতকরণে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘আইনি কাঠামো’ প্রণয়নে একটি কমিটি গঠন করা।