চা বাগানে শ্রমিক অসন্তোষ; করোনা ঝুঁকি নিয়ে কাজে যেতে চাইছেন না শ্রমিকরা!

প্রকাশিত: ৭:৩২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২, ২০২০

চা বাগানে শ্রমিক অসন্তোষ; করোনা ঝুঁকি নিয়ে কাজে যেতে চাইছেন না শ্রমিকরা!

পংকজ কুমার নাগ শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি: করোনা ঝুঁকি নিয়েও মৌলভীবাজার জেলার প্রায় বেশিরভাগ চা বাগানেই কাজ করে যাচ্ছেন প্রায় লক্ষাধিক চা শ্রমিক। সরকারি নির্দেশে সকলে ছুটি পেলেও বাগান কর্তৃপক্ষের নির্দেশে চা শ্রমিকদের ছুটির বাইরে রাখায় প্রচন্ড ক্ষুদ্ধ চা শ্রমিকরা। এতে চা বাগানে দিনেদিনে বাড়ছে শ্রমিক অসন্তোষ।  
করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে টানা দুই দিন কর্মবিরতির পর গত মঙ্গলবার বিকেলে সাতগাঁও চা বাগান ফ্যাক্টরির সামনে ছুটির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষুভ কর্মসূচি পালন করেছেন সাতগাঁও চা বাগানে কর্মরত চা শ্রমিকরা। 
বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। আই ই ডি সি আর এর তথ্য মতে বাংলাদেশে এই মরণঘাতী ভাইরাসে এ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৫৪ জন মৃত্যু হয়েছে ৬ জনের তবে আক্রান্তদের মাঝ থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫ জন। ইতোমধ্যে সরকার আরো ৭ দিন ছুটি বাড়িয়ে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছেন।

প্রয়োজনবোধে এই ছুটি আরো দীর্ঘ হতে পারে বলেও জানিয়েছেন সরকার। 
করোনায় সংক্রমণ ঠেকাতে জনসমাগম এড়িয়ে চলতে বলেছে সরকার। ঘর থেকে বের না হতে বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানের প্রায় বেশিরভাগ বাগানেই মানা হচ্ছেনা এ নির্দেশনা। প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়েই প্রতিদিন চা বাগানে কাজ করে যাচ্ছেন লক্ষাধিক চা শ্রমিক। গত মঙ্গলবার দুপুরে ছুটির দাবিতে বিক্ষোভ করেন শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও চা বাগানের চা শ্রমিকরা।

মৌলভীবাজার জেলায় মোট চা বাগান ৯২ টি। এসব চা বাগানে করোনা ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে কাজ করছেন প্রায় লক্ষাধিক চা শ্রমিক। তাদের পাশে এগিয়ে আসছেনা না কোন সামাজিক সংগঠন। তাছাড়া চা বাগানের মালিক পক্ষ থেকেও নেয়া হচ্ছে না তেমন কোন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা। 

দেশের সব কিছু বন্ধ ঘোষণা করা হলেও এখনো ছুটি পাচ্ছেননা চা শ্রমিকরা। ফলে এসকল বাগান ও চা শ্রমিকদের মাঝে বাড়ছে করোনার ঝুঁকি। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের ৯২টি চা বাগানসহ দেশে মোট ১৬৬টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে নিবন্ধিত অনিবন্ধিত মিলে প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিক কাজ করেন। এই সব শ্রমিকদের পরিবারের সংখ্যা মিলিয়ে যা প্রায় ৬ লাখের কাছাকাছি।

জানা গেছে, গত ২৫ মার্চ করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে বাগানগুলোতে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চিঠি দেয় বাংলাদেশ চা বোর্ড। চিঠিতে চা বোর্ডের দেয়া আট নির্দেশনায় বাগানের কার্যক্রম বন্ধ রাখা ও শ্রমিকদের ছুটি প্রদানের বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। এই চিঠি পাওয়ার পর কিছু বাগান মালিক ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ বেশকিছু কর্মসূচি পালন করলেও তার ঠিক উল্টো চিত্র শ্রমিকদের বেলায়। এখনও দল বেধে কাজ করছেন চা শ্রমিকরা, হঠাৎ কারো মুখে মাস্কের দেখা মিললেও তারা জানেন না এর ব্যবহারবিধি। নেই পর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থা।
চা শ্রমিক সন্তান অঞ্জন ভৌমিক জানান, “সমস্ত কর্মচারী কর্মকর্তাদের সরকার ছুটি দিয়েছেন বাড়িতে থাকার জন্য মরণঘাতী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের শিকার থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু আমরা চা শ্রমিকরাও বাংলাদেশের নাগরিক। আমরাও মানুষ, আমাদের সাথে এ অসম আচরণ কেন করা হচ্ছে”।
এদিকে সাতগাঁও চা বাগান বস্তির পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুদীপ কৈরী বলেন, “বাগানের সাহেবরা লকডাউনে আর আমরা চা শ্রমিকরা বাগানে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন করোনা কি শুধু সাহেবদের সংক্রমণ করে?আমরা যদি সংক্রমিত হই তাহলে এটাতো দেশের জন্যই ক্ষতি সেই সাথে আমাদের থেকে অন্যরা সংক্রমিত হবে”।

চা শ্রমিক নিয়তি বাউরি জানান দেয় , “করোনায় কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেনা কিন্তু আমাদের ঠিকই বের হতে হয়। বাগানে কাজ করতে হয়। তিনি জানান সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ধরণের সহযোগিতা আমরা পাইনি।নিরাপদ থাকার জন্য মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে কোনো সহযোগিতা আমরা পাইনা। নেই কোথাও কোন হাত ধোওয়ার ব্যবস্থা। 
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভারতের আসাম রাজ্যের ৮৬০টি চা বাগানের কাজ বন্ধ ঘোষণার খবর এলে তারাও এই দাবি তোলেন বলে জানান সাতগাঁও পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি কাজল কালিন্দী।
এদিকে সাতগাঁও চা বাগান ব্যাবস্থাপক মো রফিকুল ইসলাম জানান, “এতে আমাদের কিছু করার নাই। সরকারই চা শ্রমিকদের সাধারণ ছুটির বাইরে রেখেছে । আমরা কি করবো বলেন”। যদিও তিনি এমন কোন সরকারি পরিপত্র দেখাতে পারেননি, যাতে স্পষ্টভাবে লেখা রয়েছে “চা শ্রমিকরা সাধারণ ছুটির বাইরে”। 

বাংলাদেশ টি স্টাফ এসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোঃ জাকারিয়া আহমেদ জানান, “দেশের বিভিন্ন স্থানে মিল কলকারখানা খোলা রয়েছে, সেজন্যই বাগান খোলা রাখার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন বাগান মালিকরা। ইতিমধ্যে কিছুকিছু বাগানে মালিকদের পক্ষথেকে মাস্ক বিতরণ করা হয়েছে, হাত ধওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে চা শ্রমিক ও স্টাফদের সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবুও আমি চা বাগান বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি, কারন চা বাগানে শ্রমিকরা একত্রিত হয়ে কমিউনিটির ভিত্তিতে বসবাস করে। এখানে করোনা ভাইরাসের সংক্রামন একবার ছড়িয়ে পরলে একে সামাল দেওয়া খুবই কষ্টকর হবে। তাই আমি আবারো চা বাগান বন্ধের জোর দাবি জানাচ্ছি”। 

ছড়িয়ে দিন