‘চিতার আগুনে’ উপন্যাস নিয়ে কিছু কথা

প্রকাশিত: ৯:২৪ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ৩০, ২০১৯

‘চিতার আগুনে’ উপন্যাস নিয়ে কিছু কথা


কামাল সিদ্দিকী

প্রাচ্যে যখন উপন্যাসের রমরমা বাজার, ড্রইংরুমে যখন উপন্যাসের চুলচেরা বিশ্লেষনে ব্যস্ততার বিস্তৃতি মধ্যগগনে । সাহিত্য রসিকরা এসময় উপন্যাস রসে সিক্ত হচ্ছেন তখনও আমাদের বাংলা সাহিত্যে এ শাখাটির জন্ম হয়নি। এরপর এক দমকা হাওয়ায় টেকচাঁদ ঠাকুর বা প্যারি চাঁদ দাসের হাত ধরে উপন্যাস নামক ভ্রুনটির এই সাহিত্য ভুবনে আবির্ভাব। প্যারিদাসের সেই নবজাতকটির নাম ছিল ‘আলালের ঘরের দুলাল’ তখন এ শাখাটির রূপ রস আকৃতি বাংলা সাহিত্যে এতটাই অপরিচিত ছিল যে, সে টি ঠিক পূর্ণাঙ্গ হিসাবে বিকশিত হতে পারেনি। বরং পরবর্তীতে তাকে প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এটি যে ছিল উপন্যাসের প্রথম জননী তা বিজ্ঞজনেরা স্বাকীর করে নিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে সৌভাগ্যের প্রদীপ জ¦ালিয়ে অনুমোদনও দিয়েছেন তাই পরবর্তীতে বনকিমের হাত ধরে শৈশব ছেড়ে কৈশর এমন কি যৌবনের মধ্য গগনে জ¦লজ¦লায়মান হয়েছে। এভাবেই আমরা বাংলা সাহিত্যে উপন্যাসের সাথে পরিচিত হলাম। কাব্য, কবিতা, গীতিকাব্য, নাট্যচর্চা, সঙ্গীত কলার পরে ময়দানে হাজির হয়েও উপন্যাস এখন বাংলা সাহিত্য আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল ধ্রবতারা। উপন্যাস পিছনে ফেলেছে সাহিত্যের অন্যান্য কলাকে। বাঙালি ভাষাভাষীদের কাছে উপন্যাসের আবেদন এখন ঈর্ষান্বিত পর্যায়ে। পরিসংখ্যানে হয়তো তা শীর্ষে। এবারের একুশে গ্রন্থমেলায় সাদত আল মাহমুদের উপন্যাস ‘ চিতার আগুনে’ প্রকাশিত হয়েছে। লেখকের এই লেখাটি পাঠক মহলে বেশ সাড়া ফেলেছে। কেন তা পাঠকরা লুফে নিয়েছেন তার বিস্তারিত আলোচনা করার মত বিস্তর পরিসর এ লেখায় নেই। তাই স্বল্পভাবে পাঠকদের তৃষ্ণা মেটানো হল। লেখক উপন্যাসের ক্যানভাস হিসাবে বেছে নিয়েছেন সমাজের নানামুখি অসঙ্গতি আর সামাজিক অবিচারকে যেখানে গ্রামের সহজ সরল এক মেয়ে যার নাম নন্দিনী। তার চরিত্র চিত্রনে লেখক বেশ মুন্সীয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। কাহিনীটির সূত্রপাত স্বাধীনতার আগে, যখন ভারতবর্ষ দ্বি-খন্ডিত হলো। একখন্ড মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান নামে বরাদ্ধ পেল। সেই নানাকিত এলাকার বিক্রমপুর মহকুমার লৌহজং থানার অশ্চাৎপদ গ্রাম পালগাঁও। গ্রামটিতে বসবাস করেন যারা তাদের বেশিরভাগই সনাতন ধর্মে বিশ^াসী। আবার গ্রামটির জোতদার এবং মালিকানার দাবিদার এক কথিত মুসলমান। যিনি নামেই মুসলমান যার বেশিরভাগ কারবারই ইসলাম বিরোধী শুরা আর সখা নিয়েই মানুষকে সহায়তার নামে সে নারীর ইজ্জত লুন্ঠনে সিদ্ধহস্ত। যার অপার ক্ষমতার ভয়ে নীপিড়ীতরা সদা তঠস্ত, যার নজরে পড়লে কন্যাসম মেয়েও লালসার শিকার হন সেই পাপাত্মাকে নিয়েই লেখক এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান সাজিয়েছেন।
তার লালসার শিকার হয়ে গ্রামের সরলা মেয়ে নন্দিনী একদিন অবৈধ সন্তানের মা হয়। আবার তার ষড়যন্ত্রের কারনে নন্দিনীর ভালবাসা হারিয়ে যায়। নন্দিনী তখন হয়ে উঠে সমাজের দুষ্টু গ্রহ। কিন্তু যার কারনে তার এই পরিনতি সে রয়ে যায় ধরা ছোয়ার বাহিরে। কেবল খেসারত দিতে হয় নন্দিনীকে। আমাদের সমাজে এমন ঘটনা বিরল নয়। আমাদের আশেপাশে প্রতিনিয়ত ঘটে চলেছে এমন অসঙ্গতি, যা আমরা দেখেও দেখি না। যেটি যখন ছাপার অক্ষরে আমরা দেখতে পাই তখনই ঘটনার জন্য মনদ্রোহী হয়ে ওঠে প্রতিবাদে ফেটে পড়ার ইচ্ছে হয়। কিন্তু ————-আমরা সুকৌশলে আমাদের দ্রোহিতাকে নির্মম হাতে হত্যা করি তাকে চালান করে দিয়ে নিজের মহত্বকে ফলাও করতে সত্যমিথ্যা জড়িয়ে দেবতা হয়ে ওঠার চেষ্টা করি। ‘ চিতার আগুনে’ উপন্যাসের কুশলীবর তেমনি প্রচেষ্টা আমরা দেখতে পেয়েছি। তবে সমরেশের শেষ উপলদ্ধি সব অসহ্যকে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়, তখন মনে হয় মনের গহীনে জমাট বাধা অন্ধকারকে ঠেলে কে যেন আলো জালিয়ে সমরেশের কন্ঠে জানিয়ে দিল, সতীত্ব দেহে নয় মনে।
কুসংস্কার অন্ধকার বিশ^াসের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে এবং ক্ষিপ্রতার সাথে লেখক অন্ত্রে শান দিয়েছেন। তিনি নতুন যুগের সূচনা করেছেন উপন্যাসের সাহিত্যে এমন দৃষ্টান্ত বিরলই বলতে হবে। সব যুগেই সত্যকে বরণ করে নেবার মত সাহসীদের সংকট ছিল এবং আছে। আর তা যদি হয় সংস্কার বিশেষ করে প্রচলিত বিশ^াসের উপর তাহলে সুবিধাভোগী শ্রেণী কতটা কুটিল হয়ে ওঠতে পারে তা লেখক বেশ দক্ষতার সাথেই চিত্রিত করেছেন। তালুকদার নামক সামাজিক কিটকে চিহ্নিত করা গেলেও তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ার মত দুঃসাহসী মানুষের সংকট আমাদের নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি দাড় করিয়েছে। সমাজ যে শক্তের ভক্ত আর নরমের যম এই মহা সত্যকে তিনি চাবুক মেরেই বুঝিয়ে দিয়েছেন। তার পরেও সময় সাহসীদের অনুকর যা সমরেশের চরিত্রে প্রকাশ পেয়েছে। লেখক তার কারিশমা দিয়ে ছোট দিঘিকে মহাসমুদ্রে পরিণত করেছেন। আর তাতে অবগাহন করেছে উপন্যাস প্রেমিকের দল। তার এই প্রচেষ্টা আগামীর জন্য মাইক ফলক হয়ে থাকবে। অ্যাডর্ণ পাবলিকেশন প্রকাশিত সেলিম রেজা সেন্টুর প্রচ্ছদে ঝকঝকে ছাপা এবং দামী মলাট ও কাগজে প্রকাশিত উপন্যাসটির দাম রাখা হয়েছে ২১০ টাকা। বইটির বহুল প্রচার মানেই সাহিত্যের ঝান্ডাটি আরো একবার সগ্রৌবে উড়বে এই প্রত্যাশা।

ছড়িয়ে দিন