চিরকাল এমনই থেকো

প্রকাশিত: ৭:২২ অপরাহ্ণ, জুন ৭, ২০১৮

চিরকাল এমনই থেকো

আব্দুল্লাহ আল ইমরান

প্রথম দেখার দিনটার কথা মনে আছে?
প্রথম দেখা বলতে নিত্য ক্লাস, পিয়ারুর সামনে একটু দেখা, ফজিলাতুন্নেসা হল গেটে ক্লাস পার্টির তোড়জোরের গড়-পরতা দিন নয়।
প্রথম দেখা বলতে সেই পৌষের সন্ধ্যাটার কথাটা বলছি, যে সন্ধ্যাটা আজো অমলিন হয়ে আছে। খোলা চুলের ডগায় রঙিণ একটা ক্লিপ আর হলুদ ড্রেসের অবাক চাহনির তুমি যখন এলে, আমার বুকের মধ্যে কেমন যে করল! সবকিছু হঠাৎ দুলে উঠল যেন। ভারসাম্যহীনতায় ভূগতে ভূগতে ভেতরে কেমন কুকড়ে যাচ্ছিলাম অমি।
কী বলব, কোন কথাটা দিয়ে শুরু করব অথবা আদৌ খুব বেশি কথা বলার কোন দরকার আছে কিনা- এমত দ্বন্দ্বে আমার সহজাত চঞ্চলতা কোথায় যে কর্পূরের মতো উড়ে গিয়েছিল, এখনও অবাক লাগে জানো!
সেই সন্ধ্যায় তুমি কী এসবের কোন কিছু টের পেয়েছিলে? নাকি তোমার ভেতরেও তখোন অচেনা ভাংচুর?
সেই সন্ধ্যাটা কিন্তু মোটেই পরিকল্পিত ছিল না। এমন না যে, তোমার ভাবনার আকাশের পুরোটা দখল তখনও নিতে পেরেছি। শুধু একুটু বুঝতে পারছিলাম, ‘তুমি বিষয়ক’ ভাবনাটা ক্রমেই তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত করছে পরানের গহীন ভেতর।
তোমার ঝলমলে আগমনে শাহবাগের মামুলি সেই সন্ধ্যাটা কী বিপুল ঐশ্বর্যমন্ডিতই না হয়ে উঠেছিল! মনে আছে রিকশা থেকে নেমে তুমি টিএসসিতে আমার বরাবর যখন হেটে এলে, মনে হলো যেন হলুদ এক প্রজাপতি বহুরঙা ডানা ঝাপটে উড়ছে। আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে ঠিকঠাক অভিবাদনটুকুও জানাতে পারিনি তোমায়!
এরপর আমরা হেটে হেটে আজিজ মার্কেটের দিকে গেলাম। নিত্য উপহার থেকে কিনলাম সাদা-কালো শাল। প্রথম দেখায় এমন এক উপহার পেয়ে তুমি অবাকদৃষ্ঠিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলে।
আজো ভেবে পাইনা, কাউকে আস্ত একটা শাল উপহার দেয়ার মতো যে প্রিয় সম্পর্কটুকু লাগে, ভাবনার যে আদান-প্রদানের দরকার হয়, ততোদিনে কী আমাদের তা হয়েছিল? আমরা কী কিছুটা দূর্বল হয়ে পড়তে শুরু করেছিলাম একে-অপরের? হবে হয় তো!
ফেরার পথেও শাহবাগ থেকে টিএসসি পর্যন্ত হেটেই গেলাম আমরা। তিন-চার বছরে এই সড়ক ধরে কতো-শতো বার যে হেটে গেছি আমি, কতে-শতো বার যে রিকশায় চড়েই ক্যাম্পাসের শীতল ঝাপটায় শিউরে উঠেছি – তার হিসেব নেই। কিন্তু সেদিনের সন্ধ্যার মতো শাহবাগ টু টিএসসির এই নাতিদীর্ঘ সড়কপথটুকু অতোটা মোহনীয়, অতোটা আনন্দ উদ্রেককারি মনে হয়নি কোনোকালে!
যাপিত-জীবনের নানা অনুসঙ্গ ভাগাভাগি আর কুশলাদি জানতে চাইবার উছিলায় সড়কবাতির আবছা আলোয় তোমাকে লুকিয়ে দেখার সেই মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যাটার কথা আমি ভুলতে পারিনা!
কী করেই বা ভুলব সেই মহিমান্নিত সন্ধ্যায় আমার বেদনাহত কর্কশ হাতের পিঠে অতর্কিত দু-একবার তোমার শুভ্র হাতের ঠোকাঠুকি?
বন্ধুত্ব থেকে ভালোবাসা, তারপর জীবন সঙ্গী হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে দিতে আমাদের বহু স্মৃতি, বহু আনন্দ-বেদনার গল্প তৈরি হয়েছে ইতোমধ্যে, পরিচয় হয়েছে নানা রঙের অসংখ্য উজ্জ্বল সন্ধ্যার সঙ্গেও। কিন্তু কয়েক বছর আগের সেই পৌষের হিম হিম সন্ধ্যার প্রথম দেখা মুহুর্তটুকু ভিন্ন এক মহিমা নিয়ে থেকে গেছে হৃদয়ে।
সময়ের ব্যবধানে বদলেছে অনেক কিছুই, হয়তো যাচ্ছে, কিন্তু তোমাকে প্রথম দেখার সেই সন্ধ্যায় বুকের গহীনে যে ধাক্কাটুকু লেগেছিল, এখনও সেই ধাক্কা টের পাই আমি। এখনও হুট হাট ঘুম ভেঙে গেলে, তোমার ঘুমন্ত নিষ্পাপ মুখায়বের দিকে তাকালে আমার বুকের ভেতরটা কেমন হু হু করে ওঠে, মনে হয় নিত্যদিন জীবন সংগ্রামে ক্লান্তিকর টানাটানির মধ্যেও এই বেঁচে থাকা নেহাত মন্দ নয়!

শুভ জন্মদিন প্রিয় বন্ধু, অভিমানি বউ আমার।
চিরকাল এমনই থেকো, এভাবেই প্রতিনিয়ত হৃদয়ে ধাক্কা দিয়ে স্বাভাবিক রেখো নি:শ্বাসের গতি!

এইসব ভালোবাসা মিছে নয় ।