ছাত্রজীবনে বইমেলায় ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত: ২:০৭ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২০

ছাত্রজীবনে বইমেলায় ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, অমর একুশে বইমেলার মধ্য দিয়ে আমাদের শিল্প-সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছাতে চাই। আজ বিকেলে রাজধানীর বাংলা একাডেমী প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করতে গিয়ে তিনি একথা বলেন ।
সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।
এছাড়া সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশনা ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।
এবছর বাংলা একাডেমীর অমর বইমেলা ‘বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ‘ পালন উপলক্ষে তার প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে দাড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বি মিয়া, মন্ত্রীবর্গ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্ঠাগন, সংসদ সদস্যগণ, বিদেশী কূটনীতিবিদ, বাংলা একাডেমীর সদস্যগণ, সিনিয়র সাংবাদিকগন, লেখক, কবি, প্রকাশকগন এবং সিনিয়র সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিগত ২০১৯ সালের বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরষ্কার দশ কবি ও সাহিত্যিকের নিকট হস্তান্তর করেন।
পুরষ্কারপ্রাপ্তগন হলেন, কবিতায় মাকিদ হায়দার, উপন্যাসে ওয়াসি আহমদ, প্রবন্ধ ও গবেষনায় স্বরচিস সরকার, অনুবাদে খায়রুল আলম সবুজ, নাটকে রতন সিদ্দিকী, কিশোর সাহিত্যে রহিম শাহ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সাহিত্যে রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম, বিজ্ঞান উপন্যাসে নাদিরা মজুমদার, ভ্রমন সাহিত্যে ফারুক মইনউদ্দিন এবং লোকসাহিত্যে সাইমন জাকারিয়া।
অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু কর্তৃক রচিত ৩য় বই ‘আমার দেখা নয়া চীন‘ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।
বইমেলা উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বইমেলা এখন কেবল বই কেনা- বেচার কেন্দ্র নয়,এটি বাঙালির প্রাণের মেলাও।
তিনি বলেন, ‘বই মেলা উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত বাঙালিরা দেশে আসেন। বিদেশী নাগরিকরাও বইয়ের প্রতি বাঙালির নজিরবীহিন ভালবাসা প্রত্যক্ষ করতে বাংলাদেশ সফর আসেন।’
শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন, তিনি ছাত্রজীবনে বইমেলায় ঘণ্টার পর ঘন্টা কাটিয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, ‘তবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকায় এখন আমার সেই স্বাধীনতা নেই।’
প্রধানমন্ত্রী বইমেলা উপলক্ষে এখানে আসার সুযোগ দেয়ার জন্য বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশের দ্রুত উন্নয়নের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন : ‘আমরা দ্রুত এগিয়ে চলেছি এবং আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই এবং বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে সম্মান অর্জন করতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন কেউই আর বাংলাদেশকে অবহেলার চোখে দেখতে পাবে না কারণ তার সরকার গত ১০ বছর ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, ‘এটা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় যে, রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করা বাংলাদেশকে কেউ খাটো করে দেখবে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা একটি বিজয়ী জাতি এবং আমরা মাথা উঁচু করে ও বিজয়ের চেতনা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান এবং বিশ্ব মঞ্চে বাংলা ভাষাকে উপস্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, ১৯৫৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে এবং বাংলাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনার নির্মাণ করে।শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলন, বাংলার ক্ষুধার্ত মানুষের খাদ্যের দাবির আন্দোলন এবং ভাষা আন্দোলনে অংশ নেয়ায় বঙ্গবন্ধুকে কারাভোগ করতে হয়েছিল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আতাউর রহমান, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস প্রমুখ পাকিস্তানের একটি প্রতিনিধি দল ১৯৫২ সালে এক শান্তি সম্মেলনে অংশ নিতে চীন সফর করেছিলেন।
‘আমার দেখা নয়া চীন’ শিরোনামের বঙ্গবন্ধুর বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সম্মেলনে জাতির পিতা প্রথমবারের মতো বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন।
বইটিতে জাতির পিতা, নতুন চীনের কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এমনকি শিশুসহ জনগণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কথাও বর্ণনা করেছেন।
বঙ্গবন্ধু শুধু চীনে পর্যটক হিসেবেই সফর করেন নি বরং তিনি বিভিন্ন বিষয় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। বইটিতে আমরা তাঁকে পর্যটক, পর্যবেক্ষক এবং একজন সমালোচক হিসেবে পেয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি শাসকরা বঙ্গবন্ধুকে আড়াই বছর কারান্তরীণে রাখার পরে তিনি চীন সফরে গিয়েছিলেন।
এদিকে বাংলা একাডেমির মহা-পরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী অনুষ্ঠানে বলেছেন, বাংলা একাডেমি বঙ্গবন্ধুর সবক’টি বই নিয়ে একটি রচনা সামগ্রী বের করবে।

শেখ হাসিনা বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধু চীনের বিকাশের চালচিত্র ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তিনি পূর্ববাংলার মানুষের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি শাসকদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরেই জাতির পিতা চীন গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তবে তিনি এ (নির্যাতন) সম্পর্কে কাউকে কিছু বলেননি, বরং তিনি বলেছিলেন দেশে যা কিছু ঘটছে, ঘটছে। কিন্তু বিদেশে এসে আমরা দেশের সমালোচনা করতে পারি না।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তবে আজ আমরা দেখতে পাই, আমাদের দেশে অনেকে বিদেশিদের কাছে অভিযোগ করতে গিয়ে অতি উৎসাহিত হয়ে যা ঘটেনি তাও বেশি করে বলে।… আমরা এই প্রবণতাটি দেখি (কিছু লোকের মধ্যে)।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার দেখা নয়া চীন’ বইটি পড়লে মানুষ নতুন চীন সম্পর্কে অনেক কিছু উপলব্ধি করতে পারবে এবং জানতে পারবে। তিনি বলেন, চীন সফরের পরে বঙ্গবন্ধু চীন সম্পর্কে যা কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, আজকের চীন ধীরে ধীরে সেই অবস্থানে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শান্তি সম্মেলনের ছবি, মনোগ্রাম এবং তথ্য সংগ্রহ করে বইটি প্রকাশে সহায়তার জন্য কবি তারিক সুজাতকে ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি অর্জনের ক্ষেত্রে তার সরকার এবং কানাডা প্রবাসী কিছু বাংলাদেশীর প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।
কানাডা প্রবাসী প্রয়াত রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালামের প্রচেষ্টা এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আন্তরিক চেষ্টার কারণে ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১ নভেম্বর ২১ শে ফেব্রুয়রিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।
প্রধানমন্ত্রী ‘আমার একুশে গ্রন্থমেলা’ আয়োজনে জড়িত বাংলা একাডেমি এবং দেশি-বিদেশি প্রকাশকসহ সকলকে শুভেচ্ছা জানান। শেখ হাসিনা বলেন, ভাষা আন্দোলনের পথ অনুসরণ করে ১৯৫৫ সালে ৩ রা ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। একুশে গ্রন্থমেলাটি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে।
বাংলা একাডেমি সূত্র জানায়, এ বছর মেলার জন্য নির্ধারিত জমিটি ৮,০০,০০০ বর্গফুটে সম্প্রসারিত করা হয়েছে। মোট ৮৭৩ টি ইউনিট ৫৬০ সংস্থাকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ১২৬ টি প্রতিষ্ঠানকে বাংলা একাডেমি মাঠে ১৭৯টি ইউনিট এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬৯৪ টি ইউনিট ৪৩৪ সংস্থাকে বরাদ্দ এবং মোট ৩৪ টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ করা হয়েছে।
মেলা রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টা থেকে রাত ৯ টা পর্যন্ত খোলা থাকবে; এবং শুক্র ও শনিবার সকাল ১১ টা থেকে ৯ টা পর্যন্ত। ২১ ফেব্রুয়ারি, মেলা সকাল ৮ টা থেকে ৮ টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।

ছড়িয়ে দিন

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

November 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930