ছেলে এবং মেয়ে উভয়ে উভয়কে যেন মর্যাদার চোখে দেখে

প্রকাশিত: ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২, ২০১৭

ছেলে এবং মেয়ে উভয়ে উভয়কে যেন মর্যাদার চোখে দেখে

শিরিন ওসমান

নারীকে সম্মান দেওয়া পুরুষের দায়িত্ব শুধু নয়, মর্যাদাও।নারীকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়ার যে সৌজন্যতা বোধ ছিল, সেটি নেই। বিষোদগার প্রতিশোধের জন্ম দেয়।আমাদের গবেষনা করে বের করা উচিত সমাজে নারী পুরুষের শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থান প্রতিষ্ঠা কিভাবে সম্ভব করে তোলা যায়।

বাড়ীর পর স্কুল থেকে প্রতিটি মানুষের সত্যিকার প্রায়োগিক শিক্ষার শুরু হয়। শুরুতেই গলদ থেকে গেলে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং তাদের শিক্ষার মানের প্রতি সবচেয়ে বেশী নজর দেয়া প্রয়োজন।শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সাধারন জনগনের মনোভাব পরিবর্তন আবশ্যক। একটি ভাল পরিবারের নারী বা পুরুষ যেন গর্বের সাথে শিক্ষকতা পেশা গ্রহন করতে পারেন।

স্কুলে পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়, যেমন খেলাধুলা,শরীরচর্চা, বিভিন্ন হাতের কাজ, সঙ্গীত, ছবি আঁকা এগুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ আবশ্যক।সিলেবাস কমানো উচিত।রচনা লেখা, শিক্ষক এবং ছাত্রদের কথপোকথন জরুরী। এতে করে ছাত্রদের মাঝে একটি সুসম্পর্ক তৈরী হয় এবং ছাত্ররাও সপ্রতিভ হয়ে উঠে।

শিশুকাল থেকে স্কুলে শিক্ষা দিতে হবে ছেলে এবং মেয়ে উভয়ে উভয়কে যেন মর্যাদার চোখে দেখে। সবার পারিবারিক পরিবেশ সমান নয়। স্কুল ই পারে ধীরে ধীরে একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করতে।শিক্ষকদের এক্ষেত্রে স্বজাগ থাকতে হবে এবং ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে।সেক্স একটি স্বাভাবিক বিষয়। সিলেবাসে বিষয়টি আনতে হবে। বাস্তবতা যে হাসি ঠাট্টা বা লজ্জার বিষয় নয় এই কথাটি দায়িত্বশীলতার সাথে ছাত্রদের বোঝানোর ক্ষমতা শিক্ষকদের মাঝে থাকা চাই। সমাজে অনেক গলদ আছে। কেউ যেন কোন পরিবারের বাজে কাজ নিয়ে তার সহপাঠীদের উত্তক্ত না করে, বিষয়টি ছাত্রদের বুঝাতে হবে।আসলে স্কুল শুধু পাঠশালা নয়, মানুষ হবার কারখানাও বটে।

ছাত্ররা যাতে স্কুলে যাবার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে, তেমন পরিবেশ স্কুল যেন তৈরী করে।নিয়মিত শিক্ষকদের ট্রেনিং হওয়া দরকার। যেসব ছাত্ররা যে বিষয়ে দুর্বল, তাদের স্কুল পরবর্তী বাড়তি ক্লাস নেয়ার ব্যবস্থা রাখা বাঞ্ছনীয় ।একটি স্কুল মানুষকে গড়ে তুলবে। প্রাইভেট কোচিং একেবারে উঠিয়ে দেয়া জরুরী হয়ে পড়েছে।শিক্ষকদের বেতন তেমন হওয়া উচিত, যাতে শিক্ষক মর্যাদার সাথে জীবন কাটাতে পারে।
নিয়মিত টিউটোরিয়াল পরীক্ষা আবশ্যকীয়। ক্লাস ফোর পর্যন্ত এভাবেই নিবিড় পর্যবেক্ষনে ছাত্রদের পরিচালনা করা উচিত বলে মনে করি। ক্লাস ফাইভ থেকে পড়াশোনার দায়িত্ব ছাত্রদের নিজেদের কাঁধে নেয়ার অভ্যাস তৈরী করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। যে, যে বিষয়ে পারদর্শী তাকে সে বিষয়ে মনোযোগি করে গড়ে নিতে হবে।বাংলা ইংরেজী, অংক, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজপাঠ ইত্যাদি বিষয়গুলো ক্লাস এইট পর্যন্ত বাধ্যতামূলেক ।

এইট থেকে কোন বিভাগে কে পড়তে চায় তা নির্নয় করার প্রকৃয়া নির্ধারণ করে নিতে হবে। স্কুল সার্টিফিকেট এবং বোর্ড সার্টিফিকেট দুটোর ব্যবস্থা রাখা উচিত।স্কুলে বারো বছর ধরে যে শিক্ষা দিলো সেটার গুরুত্ব অপরিসীম।

সবাই যে কলেজে পড়বে এমন তো নয়। জীবনে চলার পথে যেসব বিষয় জরুরী সেই বাস্তব শিক্ষা স্কুল দিয়ে থাকে।বাংলাদেশে কেন যে এত কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরী করার পারমিশন পায়, আমার মাথায় ঢুকে না। এদের বেশীর ভাগ বিষয় ভিত্তিক কোন লেখা লিখতে দিলে পারে না।বছরের পর বছর চাকরীর জন্য ঘুরে ঘুরে হতাশায় ভোগে। ডিগ্রি না থাকলে পরিবার সমাজ কোথাও সম্মান নাই, এই মানসিকতা বদ্ধমূল হয়ে বাঙ্গালীর মনোজগতে জগদ্দল পাথরের মত বসে আছে। এর থেকে যতদিন নিষ্কৃতি না মেলে ততোদিন বাঙ্গালীর মুক্তি নাই।

প্রায়োগিক শিক্ষাই আসল শিক্ষা।যে শিক্ষা মানুষকে উদ্ভাবনি শক্তি যোগায় না, উদ্যাক্তা হবার স্বপ্ন দেখায় না, সেই শিক্ষা নিরর্থক মনে করি।প্রকৃতির যেমন সৌন্দর্য আছে সুশিক্ষারও তেমন স্বাভাবিক সৌন্দর্য আছে। শিক্ষার সৌন্দর্য তখনি চোখে পড়ে, যখন সমাজে, স্বস্তি, শান্তি, সংস্কৃতি ছডিয়ে পড়ে পরতে পরতে। মানুষের বিবেক,মর্যাদা,সম্মান প্রতিষ্ঠা পায়। সমাজে বৈষম্য দূর হয়। সব কাজ মানুষের জন্য জরুরী। কাজকে কাজ মনে করতে হবে। কাজ নিয়ে বৈষম্য আমাদের সমাজে যেভাবে বসে আছে, মানব জাতীর মানবিক মূল্যবোধ সেভাবে ভাটা পড়ছে। জীবনের মানবিক আনন্দটুকু কেড়ে নেয় এই কাজের বৈষম্য।প্রতিভা মননশীলতার বিকাশ সেই সমাজে হয় যে সমাজে এসব প্রতিকূল পরিবেশ অতিক্রম করতে শিখে যায়।

নারীর মর্যাদার প্রসংগ ধরে লেখা শুরু করেছিলাম। পুরুষতন্ত্র বা পুরুষের প্রতি বিদ্বেষ ঢেলে কখনো নারীমুক্তি আসবে না।পুরুষকে এগিয়ে আসতে হবে নারী মুক্তির জন্য। নারী মুক্তি শুধু নারীর মুক্তি নয়, পুরুষেরও মুক্তি।এই পৃথিবী এগিয়ে নিয়ে গেছে নারী পুরুষেরাই। পুরুষের পাশবিকতা কেন দিন দিন বেড়েই চলছে বিষয়টি নিয়ে গবেষনার প্রয়োজন।

নিউক্লিয়ার, প্রযুক্তির গবেষনা থেকে মানবিক উন্নয়নে গবেষনা অধিক প্রয়োজন। যুদ্ধের চেয়ে শান্তির অন্বেষণ বেশী মূল্যবান।হিংসায় হিংসা বৃদ্ধি করে, আর কিছু না।এখন সময় এসেছে মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে ভাবার। মানুষে মানুষে সুসম্পর্ক না প্রতিষ্ঠা পেলে আমাদের গর্ব কী নিয়ে? নতুন নক্ষত্র আবিষ্কার কিংবা পারমানবিক গবেষনার চেয়ে মানব উন্নয়নের গবেষণা আজকের দিনের অধিক চাহিদা। অন্তত আমি মনে করি।