ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক….

প্রকাশিত: ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০২১

ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক….

মীরা মেহেরুন

ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
এক দরিদ্র কৃষক খাজনা দিতে না পারায় রাজা মশাই তাকে ডেকে পাঠালেন। কৃষক রাজদরবারে এসে হাতজোড় করে কাকুতি মিনতি করা সত্ত্বেও রাজা মশাই খাজনা অনাদায়ে তাকে নিজের পায়ের জুতো খুলে পেটাতে শুরু করলেন। পেটাতে পেটাতে একসময় তার জুতা গেল ছিঁড়ে। ক্লান্ত রাজা গরীব কৃষককে লাত্থি দিয়ে প্রাসাদের বাইরে বের করে দিলেন।
কৃষক বাড়িতে ফিরে ভাত খেতে বসে বউকে রাজা মশাইয়ের সম্পর্কে অনেক প্রশংসা সূচক স্তুতি করতে করতে বলছে, “জানো গো বউ, রাজা মশাই এত ভালো মানুষ যে আমাকে মারতে মারতে তার চটি জোড়া ছিঁড়ে গেল তবু তার দাম চাইলো না।”
কৃষকের বউ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে স্বামীর মুখের দিকে।
আমিও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকি সেইসব নারীদের মুখের দিকে , যখন তাদের মুখ থেকে পুরুষতন্ত্রের বাণী নিঃসৃত হয়। আসলে নারীকে দোষ দিয়ে কি হবে!! আমাদের সমাজের পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর অবস্থা জুতাপেটা খাওয়া ওই গরীব কৃষকের মতোই। পুরুষতন্ত্রের সবকিছুই নিস্পেষিত বঞ্চিত নারী গোষ্ঠীর নিকট শিরোধার্য্য, গ্ৰহনীয়, প্রশংসনীয়। কারণ এরা নিজেরাই জানেনা যে তারা মানুষ কিনা!
শোনো গো নারী আজকে যে তুমি নারীর বিরুদ্ধে কলম ধরো সে কলম ধরা শিখেছো একজন নারীর কল্যাণে। আর তিনি হলেন বেগম রোকেয়া। তোমার তুচ্ছ ও সামান্য ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যে তুমি গোটা নারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গলা তুলছো, অন্যান্য নারীর উর্বর মগজে যে অন্ধকারের বীজ রোপণ করে ফিরছো ঘরে ঘরে তা কেবল একটি প্রজন্মকে নয় আগামী শত শত নারী প্রজন্মকে মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে নর্দমা জীবনের দিকে, পশ্চাদপদ জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছো। একবার ভাবো তো যে কুকুর জীবন তুমি যাপন করছো অন্যদের সে জীবনের দিকে নিপতিত করার অধিকার তোমার আছে কি না?
কাউকে আলোকিত জীবনের দিকনির্দেশনা না দিতে পারো চুপ করে থাকো। মিসগাইড করার অধিকার তোমাকে কে দিয়েছে? এই পুরুষতন্ত্রের কাছে তুমি বীনা পয়সায় পাচার হয়ে গেছো, যখন যেখানে যেভাবে খুশি ব্যবহৃত হতে হতে লজ্জায় মুখ ঢাকো। ঢাকবেই তো, কারণ পুরুষতন্ত্র তোমাকে বলে দিয়েছে লজ্জা তোমার জন্য, সুতরাং ওটা তোমার ভূষণ। পুরুষতন্ত্র তোমাকে যা যা বলে দিয়েছে তোমার জন্য অসুবিধাজনক হলেও তা তোমার নিকট ঐশী বাণী। কারণ পুরুষতন্ত্র এর পুরস্কার স্বরূপ মৃত্যুর পর (বাকীতে) তোমার জন্য তুলে রেখেছে জান্নাতুল ফেরদৌস। যেখানে তুমি হবে তোমার স্বামীর অবাধ যৌনতার আইউইটনেস যদিও এখানেও একই বিষয়গুলো তা ঘটে তোমার চোখের অন্তরালে। সেগুলো তুমি বেশ ভালোভাবেই টের পাও কিন্তু মুখ বুজে থাকো একটু খাওয়া পরাসহ টুকটাক সুযোগ সুবিধা পাওয়ার বিনিময়ে। আরে বোকা নারী তার বিনিময়ে তুমি যে সম্পূর্ণ রূপে নিজেকে সম্প্রদান কারকের শুন্য বিভক্তিতে পরিণত হয়েছো তা বোধহয় তোমার স্থুল মস্তিস্কে প্রবেশ করার প্রয়াস পায় নি। কারণ মস্তিষ্ক তো আগে থেকেই লুট হয়েছে।
সুতরাং রাজামশাইয়ের গুণকীর্তন ছাড়ো এবার। নারী তুমি স্ত্রী হও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পর যেভাবে একটি ছেলে চাকরি বা ব্যবসা গুছিয়ে তারপর বিয়ের কথা ভাবে। নারী তুমি মা হও মাতৃত্বের প্রবল বাসনা থেকে কারো বংশরক্ষার তাগিদে নয়।
এবার একটু নিজেকে নিয়ে ভাবো! পরের ভাবনা ভাবতে ভাবতে, পরের গুন গাইতে গাইতে বেলা যে বয়ে যায় হেলায় ফেলায়।আহা!
লজ্জা আসলে কার ভূষণ ? ওই বোধহীন গরুশ্রণী মগজে প্রশ্ন জেগেছে কখনো?
লজ্জা হলো ধর্ষক, ঘুষখোর, সুদখোর, দালাল, চিট, বাটপার, লুইচ্চা, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, খুনী, মধ্যস্বত্বভোগী, অর্থপাচার কারী, নারী নির্যাতন কারী, নারী পীড়নকারী এদের ভূষণ।
তোমার শরীর মন এগুলোর কোনোটির সঙ্গে জড়িত নয়। সুতরাং তোমার ভূষণ কি তা তোমাকেই বুঝে নিতে হবে।
তার মানে এইও নয় যে শরীর খুলে অর্ধ নগ্ন হয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলে স্বাধীন নারী হওয়ার অভিনয় করতে হবে। মনে রেখো নগ্নতা মানে স্বাধীনতা নয়।
মনে রেখো নারী তোমার অধিকার চাওয়া মানে ঘর ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসা নয়। অযথা যেখানে সেখানে ঘুরেফিরে নিজের এবং অন্যের বাবা মা’র কষ্টার্জিত অর্থ অপচয় করা নয়, সিগারেট, মদ, নেশাজাতীয় দ্রব্য খেয়ে শারীরিক মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করা নয়, অর্ধ উলঙ্গ হয়ে পুরুষ আকর্ষণ করে নিজেকে যৌনবস্তু করে তোলা নয়, আড্ডাবাজি করে নিজের পড়াশুনা নষ্ট করে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার ধ্বংস করা নয়।
এবার তুমি ভাবো “মানুষ” হিসেবে তুমি কি মানুষের সারিতে দাঁড়িয়ে আছো নাকি সোনার খাঁচায় অথবা গোয়ালে-খোয়াড়ে-আস্তাবলে-মাঠে-ময়দানে? তোমার স্থান তোমাকেই নির্বাচন করে নিতে হবে। একটু সরে দাঁড়িয়ে কেউ এক ইঞ্চি স্পেসও তোমাকে দেবেনা।