জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চিকিৎসাটাও জরুরী

প্রকাশিত: ১:২১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১১, ২০২১

জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার চিকিৎসাটাও জরুরী

— খছরু চৌধুরী

দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার কর্মপদ্ধতি ও স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি এখন একাকার। কোনটা অব্যবস্থাপনা আর কোনটা দুর্নীতি তা ঠাহুর করতে অনেক বিজ্ঞজনও ভুল করছেন। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করেন, চিকিৎসক সমাজের নেতৃত্ব দিয়ে বিস্তর জ্ঞানের অধিকারী ডাঃ রশীদ-ই মাহবুব এর ভাষ্য মতে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ না করলে স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র হয়তো অনেকটা অন্ধকারেই থেকে যেত। মাননীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্য হলো – করোনারভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে পুরো ঢাকা শহর হাসপাতাল বানিয়েও মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সম্ভব হবেনা।

দু’জন বিজ্ঞ মানুষ – যার একজন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির চীফ-লিডার হিসেবে স্বাস্থ্য কর্মীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের এই সব মন্তব্যে আমার মত ক্ষুদ্র নাগরিকের মনে আশার আলো জাগে না। হতাশা বাড়ে! কিন্তু হতাশা নিয়ে হাত-পা গুটিয়ে রাখলেও তো বৈশ্বিক অতিমারীর অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ রোধ হবে না। বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য নিরাপদ রাখতে হলে দুর্যোগ-দুর্বিপাকের ধ্বংস স্তুপের মাঝে দাঁড়িয়েও আসল কর্তব্য নিরূপণ করতে হবে। কি করলে ক্ষতির পরিমাণ সীমিত রাখা যায় সেই কর্মপন্থা উদ্ভাবন করতে হবে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ – চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করাই তো নীতি-নির্ধারক মহলের আসল কাজ। যুদ্ধের সেনাপতির কর্তব্য!

যাঁরা নীতিমালা ও কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেন তাঁরা তো জানেনই, দেশের স্বাস্থ্য-সচেতন মহলও জানেন, জনস্বাস্থ্যের ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার অনুমোদিত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটা সুনির্দিষ্ট পরামর্শ রয়েছে। পরামর্শ হলো কর্মসূচি বাস্তবায়নে ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য জনবল দিয়ে কাজ করা। ১ জন স্বাস্থ্য কর্মী চিকিৎসকের বিপরীতে ৩ জন নার্স ও ৫ জন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা ও রোগের প্রতিরোধ-কর্মে নিযুক্ত রাখা। বাংলাদেশের সরকারি স্বাস্থ্য সেবায় স্বাস্থ্য জনবল নিয়োজিতকরণের এই রেশিওটা উল্টে দেয়া হয়েছে। এখানে ৯৩ হাজার চিকিৎসকের বিপরীতে কাজ করেন ৫৬ হাজার নার্স এবং ১৩ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট! জনবলের এই চরম ভারসাম্যহীন অবস্থা দীর্ঘ কয়েকযুগে তৈরি করা হয়েছে বেসরকারি চিকিৎসা বাণিজ্যের স্বার্থকে বিবেচনায় নিয়ে। ভারসাম্যপূর্ণ জনবলের অভাবে সরকারি সেবাদানের মান নিম্নগামী হলে, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি অচল ও অকেজো থাকলে এর সুবিধা নেয় বেসরকারি চিকিৎসার বাজার। এই যে জনবলের ভারসাম্যহীনতা – এর নাম হলো অব্যবস্থাপনা! এটা ইচ্ছা ও অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে থাকে ব’লে সরকার চায় দক্ষ-ব্যবস্থাপনায় উত্তরণ ঘটাতে। এটা যখন ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয় – তখন এটা হয়ে যায় একটা অমার্জনীয় অপরাধ – যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দুর্নীতির চেয়েও মারাত্মক!

সম্মানীত ডাঃ রশীদ-ই মাহবুব এঁর স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির ধারণা এবং মন্ত্রী মহোদয়ের হাসপাতাল গড়ার ধারণা যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের বিজ্ঞান সম্মত কোনো ধারণা নয়, সেই আলোচনাটাই বাস্তবতার নিরিখে করতে চাচ্ছি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মৌল কর্মপদ্ধতির জ্ঞান হলো রোগের প্রতিরোধে মনোযোগ বাড়িয়ে দেয়া, গোড়ায় আঘাত করে সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এই নীতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজ করলে একটা ঢাকা শহর কেন – পুরো বাংলাদেশ-ই তো একটা হাসপাতাল ধারণার আওতাধীন করা যায়। যে ধারণা নিয়ে কাজ করছে নরওয়ে, ভিয়েতনাম ও কিউবার সরকার এবং করোনা প্রতিরোধে তাদের সফলতা আকাশ ছোঁয়া। এই ধারণায় কাজ করতে অর্থের চেয়ে দেশপ্রেম, মানবপ্রেম ও গণমুখী কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়নে দৃঢ়তার প্রয়োজন বেশী হয়। বিগত এক বছর সময় কি খুব কম ছিল? এই সময়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষিত রোগপ্রতিরোধের ২৬২০ জন দক্ষ স্বাস্থ্য-জনবলকে কর্ম-এলাকা বিভাজন করে একযোগে কমিউনিটিতে (গ্রামে এবং শহরে) কাজে লাগানো কি সম্ভব ছিলনা? হাসপাতাল গুলোর জনবল ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সরকারি চাকুরির প্রত্যাশায় থাকা জরুরি প্রয়োজনীয় সংখ্যার নার্স ও মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট নিয়োগ দেওয়া কি সম্ভব ছিলনা? এই অল্প কাজটুকু করা গেলে – শুধু করোনা রোগী কেন – বাংলার কোনো মানুষ-ই সরকারি স্বাস্থ্য কর্মীর সেবা না পেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা সম্ভব ছিল না। এখন যেভাবে হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে রাস্তা-ঘাটে মৃত্যু বরণ করছে – এই পরিস্থিতি কক্ষণো তৈরী হতনা।

বাংলার জনস্বাস্থ্যের কর্মপন্থা নির্ধারণের নীতি নির্ধারক মহল জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালায় এবং জনগণকে নিরাপদ রাখার কর্মপন্থা নির্ধারণের যে কোনো ধরণের সভা-সেমিনারে রোগের প্রতিরোধ-কর্মের উপর সুন্দর কথা বলেন ঠিকই কিন্তু মনের ভেতর লালন করেন চিকিৎসা বাণিজ্যের বাজার সম্প্রসারণের কর্মকৌশল। ব্যবস্থাপকেরা এবং করোনাভাইরাস প্রতিরোধের বিশেষজ্ঞরা প্রতিরোধের কার্যকর কর্মকৌশল জেনে-বুঝে যদি সজাগ ঘুমিয়ে থাকেন – এই কোভিড-১৯ প্রতিরোধে কমিউনিটিতে নিরন্তর কাজ করার জন্য সরকারের টাকায় প্রশিক্ষিত জনবল (২৬২০ জন স্যানিটারী ইন্সপেক্টরশীপ) যদি কাজে না লাগান; তাহলে তো দাবি করা যেতেই পারে যে, এই ব্যবস্থাপনা পদ্ধতিরও চিকিৎসা দরকার।

এই মহামারীর উপদ্রব কতদিন থাকবে বা এর সাথে এডজাষ্ট হয়েই কি মানব জীবন চলতে হবে – এর সুনির্দিষ্ট প্রেডিক্শন আমাদের জানা নেই। আমাদের উচিত হবে চিকিৎসা সংস্থান বৃদ্ধির আয়োজন বর্ধিতকরণের পাশাপাশি রোগের প্রতিরোধ-কর্মের জনবল বাড়িয়ে নেওয়া এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্মত কর্মপন্থার ভিত্তিতে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। ০৯.৪.২০২১ খ্রিস্টাব্দ।

লেখকঃ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট mkmchowdhury@gmail.com