জয়তু মেহেদী হাসান খান

প্রকাশিত: ১:২৩ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৪

জয়তু মেহেদী হাসান খান

কুলদা রায়

১.
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সবচেয়ে বড়ো উপকারটি করেছেন মেহেদী হাসান খান। তিনি অভ্র নামে বাংলা একটি কীবোর্ড উদ্ভব করেন। এই কীবোর্ড ব্যবহার করে কম্পিউটারে, ফোনে, ট্যাবে খুব সহজেই বাংলা লেখা যায়। ইন্টারনেটে লেখার জন্য এই অভ্র কীবোর্ড ইউনিকোড সাপোর্টেড। ছাপাখানায়ও এই কীবোর্ড ব্যবহার করা যায়। এজন্য দৃষ্টি নন্দন বেশ কিছু ফন্ট বা অক্ষরও তারা ডিজাইন করেছেন।
মেহেদী হাসান খান অভ্র কীবোর্ড উদ্ভব করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি এই কীবোর্ডের সফটওয়্যারটি বিনামূল্যে সবাইকে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছেন। একটি পয়সাও ব্যয় করতে হয় না কাউকে।
আমি এই অভ্র ব্যবহার করে লেখালেখি শিখেছি। গোটা পাঁচেক বই লিখেছি। গল্পপাঠ নামে একটি ওয়েব ম্যাগাজিন করতে পেরেছি। অভ্র না হলে এটা পারা যেতো না।
২.
সেদিন খালাম্মাকে হিলসাইড এভিনিউয়ে পৌঁছে দিচ্ছিলাম। খালাম্মার সঙ্গে সালমা নামে একজন ভদ্রমহিলা উঠেছেন। তিনি আনডকুমেন্টেড। তার কোনো বৈধ কাগজপত্র নেই। গেল বছর বাংলাদেশ থেকে এসেছিলেন একটি এনজিওর ক্ষুদ্রঋণের প্রতিনিধি হিসেবে। মাসখানেক পরে দেশে ফেরা কথা থাকলেও ফেরেননি। নিউ ইয়র্কে থেকে গেছেন। মাঝে মাঝে দুএকটা রেস্টুরেন্টের কিচেনে কাজ করেন। আবার একটি বাসায় বেবিসিটিং করেন। বেশ চালু এই মধ্য বয়স্কা সালমা বেগম।
সালমা বেগম লেখাপড়া বিশেষ জানেন না। ফোর কি ফাইভ পর্যন্ত পড়েছেন। দেশে তার তিনটি ছেলেমেয়ে আছে। তাদের সঙ্গে ফেসবুক মেসেঞ্জারে কথাবার্তা বলেন। তিনি আমার সামনেই মেসেঞ্জারে গড়গড় করে একটি মেসেজ লিখে পাঠালেন তার বড় মেয়েকে। তারা এ সময় ঘুমুচ্ছিল। ঘুম থেকে উঠে মায়ের মেসেজটি পড়বে।
আমি বিস্মিত। সালমা বেগম ইংরেজি অক্ষরগুলো শুধু চেনেন। এটা দিয়েই অভ্রতে বাংলা লেখেন। শুধালাম, পারলেন কীভাবে?
হেসে বললেন, জলের মতো সোজা। k টিপলে ক। KH লিখলে খ।
সালমা বেগমের মুখে এই হাসিটি এনে দিয়েছে মেহেদী হাসান খান। অভ্র কীবোর্ড। এই অভ্র কীবোর্ডের কারণেই সারা পৃথিবীতে বাংলা ভাষাভাষী মানুষজন এখন জলের মতো করে বাংলায় লেখালেখি করছেন। কবি হতে পারছেন। হতে পারছেন গল্পকার, ঔপন্যাসিক , প্রবন্ধার–ব্লগার/ ফেসবুকের স্ট্যাটাস।
মাতৃভাষায় লেখার মতো আনন্দ খুব কমই আছে।
৩.
অভ্রর সৃষ্টিকর্তা মেহেদী হাসান খান ব্যক্তিগত জীবনে ডাক্তার। তিনি অভ্র দিয়ে দেশে বিদেশের বাংলা ভাষাভাষিদের লেখন-জীবনকে সহজ করে দিয়েছেন। নিজে কিছুই চাননি। ইচ্ছে করলে এই অভ্র থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করতে পারতেন। সেটা করেননি। সবার জন্য ফ্রি করে দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেছেন– ভাষা হোক উন্মুক্ত। এই অভ্র নিয়ে তিনি কোনো সভাসমিতিতেও যান না। নীরব থাকেন। কোনো গর্ব বা অহংকারও শোনা যায় না তার মুখ থেকে। কোনো পুরস্কারও প্রত্যাশা করেননি।
তাকেও আমরা কিছু দেইনি। বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পুরস্কার পদক অভ্রর জনক মেহেদী হাসান খানের অবশ্য প্রাপ্ত। তিনি পাননি। পাবেনও না। কারণ মোস্তফা জব্বার তার বাঁধা হয়ে আছেন।
মোস্তফা জব্বার কিছু তরুণকে দিয়ে বিজয় কী বোর্ড বানিয়েছিলেন। বিজয় ইউনিকোড সাপোর্টেড নয়। লেখন পদ্ধতিও জটিল। সালমা বেগমের মতো লেখাপড়া কম জানা লোকজন বিজয় ব্যবহারে অক্ষম। সর্বোপরি বিজয় ফ্রি নয়– টাকা দিয়ে কিনতে হয়। মোস্তফা জব্বার এই বিজয় বেঁচে কোটি কোটি আয় আয় করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন দুই টার্মে। ক্ষমতার জোরে অভ্রকে সরকারী অফিস থেকে বিদায় করেছেন। আর অভ্রর মেহেদী হাসান খানকে পুরস্কার পদক সম্মাননার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে রেখেছেন। এটা অন্যায়।
এই অন্যায়কে মেনে নেওয়া যায় না।
৪.
অভ্রর জনক মেহেদী হাসান খানকে অবিলম্বে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পুরস্কার দেওয়ার দাবী তুলছি।