জীবন পরিব্রাজক সৈয়দ মুজতবা আলী

প্রকাশিত: ১:৪১ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০২১

জীবন পরিব্রাজক সৈয়দ মুজতবা আলী

 

শেলী সেনগুপ্তা
১৯০৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর যিনি সিলেটের করিমগঞ্জে জম্মগ্রহণ করেছিলেন তাঁর পড়াশুনার একটি বিশেষ অংশ কাটে শান্তিনিকেতনে, খুব সমৃদ্ধ ও আনন্দময় সময়ে কাটিয়েছিলেন সেখানে, তারপর তিনি আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে দর্শন শাস্ত্র পড়ার জন্য জার্মানির বার্লিন ও বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। শুধু তা ই নয়, তিনি মিশরের কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। বলছি সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা যিনি অনেকগুলো ভাষা জানতেন, কিন্তু ভাষার পাণ্ডিত্য দেখানো ছিল তাঁর প্রবৃত্তির বাইরে। ভাষা শিখে তিনি ওই সব ভাষার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বয়ানগুলো অভিনিবেশ নিয়ে পড়েছেন। এক ভাষার লেখা সাহিত্যের সঙ্গে অন্য ভাষার সাহিত্যের তুলনা করেছেন; ভাষার প্রাণ ও ভাষার অন্তর্গত গান খুঁজে বেড়িয়েছেন; ভাষার মানুষি আদলটি পরম যত্নে উন্মোচিত করেছেন। চিহ্নিত করেছেন ভাষার ভেতরের শক্তিকে, ভাষার প্রতিরোধ-প্রতিবাদের ক্ষমতাকে।
বিশ্বভারতীতেও তিনি বহু ভাষা শেখার সুযোগ পান। সংস্কৃত,সাংখ্য,বেদান্ত, ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, ফারসি, আরবি, রুশ, ইতালিয়ান, উর্দু, হিন্দি ও গুজরাটি ভাষায় দখন ছিলো তাঁর। গীতা তাঁর সম্পূর্ণ মুখস্থ ছিলো। কোন এক সভায় তিনি গীতা থেকে সংস্কৃতভাষায় রেফারেন্স দিয়েছিলেন, তাতে সভার সমস্ত দর্শক হতবাক হয়ে গিয়েছিলো।
যিনি গীতায় পারদর্শী, রবীন্দ্রনাথের গীতবিতানও তাঁর ঠোঁটস্থ ছিলো।
শান্তিনিকেতনে অধ্যয়নকালেই হস্তলিখিত বিশ্বভারতী পত্রিকায় তাঁর কয়েকটি লেখা প্রকাশিত হয়। তিনি সত্যপীর, রায়পিথোরা, ওমর খৈয়াম, টেকচাঁদ, প্রিয়দর্শী ইত্যাদি ছদ্মনামে আনন্দবাজার, দেশ, সত্যযুগ, শনিবারের চিঠি, বসুমতী, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড প্রভৃতি পত্র পত্রিকায় কলাম লিখতেন।
সৈয়দ মুজতবা আলী বহুদেশ ভ্রমণ করেছেন, বহুজনের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তাই তাঁর লেখায় সে প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। তাঁর রম্যবিষয়ক ছোট ছোট রচনা পাঠকদের চিত্তবিনোদন ও অনাবিল আনন্দদানে তুলনাহীন। বিশেষ করে উপন্যাস ও ছোটগল্পে মানবজীবনের অন্তহীন দুঃখ-বেদনা ও অপূর্ণতার কথা তিনি সহানুভূতির সঙ্গে চিত্রিত করেছেন।
শিক্ষা-পরিব্রাজক জ্ঞানরত্নটির নাম সৈয়দ মুজতবা আলী। বহুপথ পরিভ্রমণকারী মহান মানুষটির কর্মজীবনও বিচিত্র। তিনি প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন কাবুলের একটি কলেজে, সেখানে তিনি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষার শিক্ষক ছিলেন। অতপর বরোদার মহারাজার আমন্ত্রণে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের পড়ান, সেখান থেকে যোগ দেন দিল্লির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এভাবে তিনি অনেক পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। সব পথ কিন্তু কুসুমাচ্ছাদিত ছিলো না, কখনো কখনো কন্টকিত পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
স্বাধীনচেতা মুজতবা আলী আজীবন এক ভবঘুরে জীবনযাপন করেছিলেন। কোথাও স্থায়ীভাবে থাকলেন না। স্বাভাবিক জীবনযাপনও করলেন না। পাকিস্তানের কট্টরপন্থীরা তাঁকে ‘ভারতের দালাল’ অপবাদ দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল। কলকাতায় জনপ্রিয়তা, সুনাম ও পুরস্কার সবই পেলেন। তবে কলকাতার রক্ষণশীল লেখক সমাজ তাঁকে ঈর্ষা করত ও বলে বেড়াত যে, ‘মুজতবা আলীর ধর্ম নিরপেক্ষ উদার দৃষ্টিভঙ্গি একটা আইওয়াশ, আসলে আলী একজন ধুরন্ধর পাকিস্তানি এজেন্ট।’ এক দুর্বল মুহূর্তে তিনি দুঃখ করে তার গুণগ্রাহী বিখ্যাত লেখক শংকরকে বলেছিলেন, ‘এক একটা লোক থাকে যে সব জায়গায় ছন্দপতন ঘটায়, আমি বোধহয় সেই রকম লোক।’ অথচ এই লোকটিই কত অনায়াসে বলতে পারেন ‘ বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’।
‘এক দোর বন্ধ হলে দশ দোর খুলে যায়; বোবার এক মুখ বন্ধ হলে দশ আঙুল তার ভাষা তর্জমা করে দেয়’।
‘জীবনই অভিজ্ঞতা, আর অভিজ্ঞতাই জীবন। অভিজ্ঞতাসমষ্টির নাম জীবন আর জীবনকে খণ্ড খণ্ড করে দেখলে এক-একটি অভিজ্ঞতা। এক-একটি অভিজ্ঞতা যেন এক এক ফোঁটা চোখের জলের রুদ্রাক্ষ। সব কটা গাঁথা হয়ে যে তসবি-মালা হয়- তারই নাম জীবন’।
‘পরিপূর্ণ আনন্দের সময় মানুষের মন ভিন্ন ভিন্ন দিকে ধায় না। একটা আনন্দ নিয়ে সে পড়ে থাকতে ভালোবাসে’।
তারপরও কঠিন পথে চলতে চলতে একমাত্র তিনিই পারেন জীবন নিয়ে আনন্দময় রসিকতা করতে। শান্তিনিকেতনের এক চায়ের দোকানে উপস্থিত একজন ছাত্রী যিনি জার্মান ভাষা নিয়ে সদ্য পাশ করেছেন। আলী সাহেবও তখন জার্মান পড়াতেন। বিশ্বভারতীর কোনও অধ্যাপক পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মেয়েটির সঙ্গে। তার পরেই আলী সাহেবের করাঘাত, ‘ইস, আমি জার্মান পড়াতে এলুম আর সুন্দরী তুমি বেরিয়ে গেলে। আচ্ছা দেখি কী রকম জার্মান শিখেছ। একটা খিস্তি করো তো জার্মান ভাষায়। ভয় নেই, কেউ এখানে বুঝবে না (!)’
আলী সাহেব এ রকমই ছিলেন। শোনা যায়, জার্মান ভাষায় মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার সময়েও ছাত্রীদের এই রকমই কান লাল করা প্রশ্ন করতেন।
শান্তিনিকেতনের অন্যান্য দর্শনীয় বস্তুর সঙ্গে সৈয়দ মুজতবা আলীও একজন দর্শনীয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন।’ একবার একটি ভ্রমণকারী দলের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘শান্তিনিকেতনে এসেছো কী কী দেখতে? ক্ষিতিমোহনবাবুকে দেখেছ?’
ওরা বললো, ‘দেখেছি।’
‘নন্দলাল বসুকে?’ —’হ্যা, দেখেছি।’
‘হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে?’
‘তাঁকেও দেখেছি।’
মুজতবা আলী সাথেসাথে উত্তর দিলেন, ‘ও, বাঘ সিংহ সব দেখে, এখন বুঝি খট্টাশটাকে দেখতে এসেছো!’
এমন রসিকতা একমাত্র সৈয়দ মুজতবা আলীই করতে পারেন। বাংলা সাহিত্যে মুজতবা আলীর পাকাপোক্ত স্থান রম্যলেখক হিসেবে। অবশ্য এটাই তার একমাত্র পরিচয় নয়। রম্যর বাইরেও আছে তাঁর বিশাল সাহিত্য সম্ভার।

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি নরসিংহ দাস পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে আনন্দ পুরস্কার প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ থেকে তাঁকে একুশে পদকেও ভূষিত করা হয়।
১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মুজতবা আলী মৃত্যুবরণ করেন।

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com