জ্বালানি তেল খালাসের নতুন যুগে বাংলাদেশ, সাশ্রয় হবে ৮০০ কোটি টাকা

প্রকাশিত: ১১:২১ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০২৪

জ্বালানি তেল খালাসের নতুন যুগে বাংলাদেশ, সাশ্রয় হবে ৮০০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আমদানি করা জ্বালানি তেল জাহাজ থেকে দ্রুত ও সাশ্রয়ী খরচে খালাস করার জন্য গভীর সমুদ্রে ডাবল পাইপলাইনের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে এসপিএম প্রকল্পের আওতায় এবার কক্সবাজারের মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংক থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় পরিবহনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মহেশখালী থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) তেল আসতে সময় লেগেছে ৩০ ঘণ্টা। গত বছরে ১৪ নভেম্বর গণভবন থেকে এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রকল্পটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ১১ দিনে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল খালাস করা যায়, সেটির সময় কমে আসবে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায়। প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়নের পর লাইটার জাহাজে তেল পরিবহনের প্রয়োজন হবে না। ফলে পরিবহন খরচের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। গত বৃহস্পতিবার (২৯ ফেব্রুয়ারি) পাইপলাইনের মাধ্যমে সকাল ৮টায় মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংক টার্মিনাল থেকে পাম্প শুরু হয়। গতকাল শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টায় ইস্টার্ন রিফাইনারির ৪০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার ট্যাংক টার্মিনালে তেল পৌঁছায়।
এ প্রকল্পের অংশ হিসেবে গত বছরের ডিসেম্বরের শুরুতে গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংকে ৬০ হাজার টন ডিজেল নেওয়া হয়েছিল।
ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. লোকমান বলেন, বৃহস্পতিবার থেকে এসপিএম ব্যবহার করে জ্বালানি তেল আমাদের রিফাইনারিতে নেওয়া শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সাগরের তলদেশ দিয়ে দুটি পাইপলাইন বসানো হয়েছে। এই পাইপ দুটির মাধ্যমে মহেশখালীর কুতুবদিয়া চ্যানেলে অবস্থানকারী বড় বড় জাহাজ থেকে তেল সরাসরি রিফাইনারিতে আনা হবে।
মো. লোকমান বলেন, এখন থেকে মাদার ওয়েল ট্যাংকার থেকে লাইটারেজ জাহাজে করে রিফাইনারিতে আনতে হবে না। ফলে জ্বালানি রিফাইনারিতে আনতে সময় অনেক কমে আসবে, খরচও কমবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছে, গত বছরের ২৬ জুন মহেশখালীর অদূরে গভীর সাগরে স্থাপিত এসপিএম ব্যবহার করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাহাজ থেকে তেল খালাসের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর কথা থাকলেও বিরূপ আবহাওয়ার কারণে তা পিছিয়ে যায়।
এরপর গত ৩ জুলাই এমটি হোরে নামক জাহাজ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর কালারমার ছড়ায় স্থাপিত ট্যাংকে তেল পরিবহনের পরীক্ষামূলক কাজ শুরু হয়। এর পাঁচ দিনের মাথায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে পাইপলাইনে সরাসরি তেল পরিবহন কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।
ত্রুটি সারানোর পর বিশেষায়িত বয়া ব্যবহার করে গত ৩ ডিসেম্বর জাহাজ থেকে ৮৩ হাজার টন ক্রুড অয়েল এবং ৭ ডিসেম্বর ৬০ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে মহেশখালীর স্টোরেজ ট্যাংকে নেওয়া হয়।
জ্বালানি বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি তেলের চাহিদা পূরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানীকৃত ক্রুড অয়েল ও ফিনিশড প্রডাক্ট স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে এবং নিরাপদে খালাস করার জন্য ‘ইনস্টলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) উইথ ডাবল পাইপলাইন’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও চীন সরকারের মধ্যে জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীনস্থ কোম্পানি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। প্রায় সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংক ঋণ দিচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা।
গভীর সাগরে নোঙর করা মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ না করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য সরকার ৫ হাজার কোটিরও বেশি টাকা ব্যয়ে ‘ ইন্সটলেশন অব সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং উইথ ডাবল পাইপলাইন’ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার অদূরে গভীর সমুদ্রে নির্মাণ করা হয় ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং’। সেখান থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারি পর্যন্ত অব শোর এবং অন শোর মিলে মোট ২২০ কিলোমিটার ডাবল পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ১৪৬ কিলোমিটার অফ শোর পাইপলাইন এবং ৭৪ কিলোমিটার অন শোর পাইপলাইন রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় পাইপলাইন ছাড়াও মহেশখালীতে এক লাখ ২৫ হাজার টন ক্রুড অয়েল ৮৩ হাজার টন ডিজেল সংরক্ষণের ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা হয়েছে। বিদেশ থেকে আমদানি করা ক্রুড অয়েল ও ডিজেল ওই দুটি ট্যাঙ্কে সংরক্ষণ করে সেখান থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী দুটি পাইপলাইনের একটি দিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল পাঠানো হবে। আরেকটি পাইপলাইন দিয়ে ডিজেল পাঠানো হবে পদ্মা অয়েল কোম্পানি, যমুনা অয়েল কোম্পানি ও মেঘনা পেট্রোলিয়ামের পতেঙ্গা গুপ্তখালের প্রধান ডিপোতে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি)কর্মকর্তারা জানান, পাইপলাইন চালু হলে অবিশ্বাস্য কম সময়ে কুতুবদিয়া থেকে পতেঙ্গায় জ্বালানি তেল পৌঁছে যাবে। এতে সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হবে। বছরে অন্তত ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
তিনি বলেন, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জ্বালানি তেল পরিবহনের সেকেলে ধারণা পাল্টে বিশ্বমানে উন্নীত হবে। বছরের পর বছর বহির্নোঙরে নোঙর করা মাদার ভ্যাসেল থেকে লাইটারেজ করে তেল পরিবহন করা হয়েছে। এখন সেই খরচটি পুরোপুরি বেঁচে যাবে। অন্যদিকে একটি জাহাজ থেকে তেল খালাস করতে আগে ১৫ দিন সময় লাগত, তা এখন ৩৬ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নেমে আসবে।