টুকে রাখা কথামালা

প্রকাশিত: ৩:১৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৮

টুকে রাখা কথামালা

 

স্বকৃত নোমান

কবি সৈয়দ তারিক,
মহাত্মন, জগতে আস্তিক থাকলে নাস্তিকও থাকবে। এই থাকাটা অনিবার্য। জগতে কোনো একটা কিছুর বিপরীতে অন্য একটা কিছু থাকতে হয়। নইলে দ্বন্দ্বটা থাকে না। জানেনই তো, দ্বন্দ্ব না থাকলে জগত কার্যত অচল হয়ে পড়বে। মহামতি হেগেল যে বলেছিলেন ‘সৃষ্টির সবকিছুর পেছনেই রয়েছে দ্বন্দ্ব’―কথাটা খুবই সত্যি। অবশ্য তারও আগে এই বাংলার লোকদার্শনিকরা একই কথা ব্যক্ত করেছেন তাদের গানের মাধ্যমে। যেমন একটি গানে :
পাপ না থাকলে পুণ্যির কি মান্য হত?
যমের অধিকার উঠে যেত।
যদি দৈত্য দুশমন না থাকত
কামক্রোধ না হ’ত
মারামারি খুনখারাপি জঞ্জাল ঘুচিত
সবাই যদি সাধু হ’ত
তবে ফৌজদারি উঠে যেত ॥

কিংবা অন্য একটি গানে :
দোষগুণ দুইয়েতে এক রয়
কর্মক্ষেত্রে পৃথক হয়।
পৃথক পৃথক না থাকিলে
দোষগুণ কেবা কয়।
যদি অমাবস্যা না থাকিত
পূর্ণিমা কে বলিত?

এই যে পাপ-পুণ্য, দৈত্য-দুশমন, কাম-ক্রোধ, দোষ-গুণ, অমাবস্যা-পূর্ণিমা―একটির বিপরীতে আরেকটি আছে, তেমনি আস্তিকের বিপরীতেও নাস্তিক আছে। কথাটা এভাবেও বলা যেতে পারে : ‘নাস্তিকের বিপরীতে আস্তিক।’ কারণ জগত বদলে গেছে। এখন নাস্তিক বা অজ্ঞেয়বাদীর সংখ্যা শত কোটির বেশি। এই হার বাড়বে বৈ কমবে না। দ্বান্দ্বিকতার জন্য উভয় শ্রেণির প্রয়োজন রয়েছে।

আমার কী মনে হয় জানেন, নাস্তিকরা হচ্ছে বিদ্রোহী। বিদ্রোহ না করলে কোনো কিছু সৃষ্টি করা যায় না। অস্বীকারটা কিন্তু জরুরি। এই যে আপনি কবিতা লেখেন, কেন লেখেন? হোমার তো লিখেছেন। দান্তে লিখেছেন। এলিয়ট, টেড হিউজ, এজরা পাউন্ড, নেরুদা লিখেছেন। কালীদাস, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ লিখেছেন। তবু আপনি কেন লিখছেন? লিখছেন অতৃপ্তির কারণে। আপনি মনে করছেন আপনার পূর্বজ কবিগণ যথেষ্ট লেখেননি। আরও যোগ করা প্রয়োজন। তাই আরও যোগ করতে চাইছেন আপনি। বলা বাহুল্য, আপনি কবিতা লিখতে পারতেন না, যদি না আপনি আপনার পূর্বজদের অস্বীকার করতেন। ঐ যে অতৃপ্তি, ওটাই হচ্ছে অস্বীকার।

একইভাবে, এই বিশ্বভূমণ্ডলে মানুষই হচ্ছে বিপুল মেধাসম্পন্ন প্রাণি। আপাতত মানুষের চেয়ে মেধাবী প্রাণি নেই। থাকতে পারে। কিন্তু তা এখনো মানুষের অজানা। মানুষ প্রতিনিয়ত তার সৃষ্টি দিয়ে জগতকে নান্দনিক করে তুলছে। এই সৃষ্টি কখনোই মানুষের পক্ষে সম্ভব হতো না, যদি না সে প্রচলিত স্রষ্টাকে অস্বীকার করত। যদি সে এই বলে চুপটি করে বসে থাকত―দরকার কি? স্রষ্টা তো একজন আছেন, তিনিই সব সৃষ্টি করবেন, তিনিই কম্পিউটার তৈরি করে দেবেন, তিনিই রকেট-হেলিকপ্টার-বিমান তৈরি করে দেবেন; মানুষের জন্য কল্যাণকর যা কিছু আছে সবই সেই বনী ইসরাইলদের প্রভুর মতো তিনিই সৃষ্টি করে আকাশ থেকে পাঠিয়ে দেবেন―তাহলে কোনোকালেই মানুষ কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারত না। সুতরাং সৃষ্টির প্রথম শর্ত হচ্ছে অস্বীকার, বিদ্রোহ।

কিন্তু এই যে অস্বীকার, নাস্তিকরা যা করে থাকেন, তা কিন্তু প্রচারের বিষয় নয়। কোনো নাস্তিক বলে বেড়ায় না যে তিনি নাস্তিক। কোনো নাস্তিকই চায় না জগতটা নাস্তিকে ভরে উঠুক, সবাই তার মতো নাস্তিক হয়ে যাক। কোনো নাস্তিক যদি তার মতবাদ প্রচার করে বেড়ায়, তবে তার মধ্যে আর একজন আস্তিকের মধ্যে কোনো ফারাক থাকে না। আস্তিক বলে আছে, নাস্তিক বলে নাই। অর্থাৎ মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কেউ ‘আছে’কে প্রমাণ করতে পারবে না, আবার কেউ ‘নাই’কেও প্রমাণ করতে পারবে না। আসলে নাস্তিকের কাছে থাকা ও না থাকার কোনো গুরুত্ব নেই।

বিপরীতে আস্তিকরা চায় জগতের সব মানুষ তাদের মতো আস্তিক হয়ে উঠুক। তারা আস্তিক্যবাদ প্রচার করে বেড়ায়। তাদের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার জন্য খড়গ হাতে দাঁড়িয়ে যেতেও দ্বিধা করে না। পৃথিবীর বড় বড় ক্রুসেডগুলো কিন্তু আস্তিকরাই করেছিল। আর নাস্তিক? তার মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য কাউকে জবরদস্তি করে না, খড়গ হাতে নেয় না। একজন নাস্তিকের কাছে একজন আস্তিক প্রশ্নহীনভাবে নিরাপদ। কিন্তু একজন আস্তিকের কাছে? নাহ্, প্রশ্ন থাকে। তাকে আগে যাচাই করে নিতে হয় সে কেমনতর আস্তিক। বুঝে নিতে হয় সে কি আপনার মতো আস্তিক, নাকি মুফতি হান্নানের মতো আস্তিক।

নাস্তিক তার চোখের সামনে যে বর্তমানকে দেখে সেটিই তার কাছে প্রধান। যেমন মানুষ। মানুষের অস্তিত্ব জগতজুড়ে বর্তমান। তাই মানুষই তার কাছে প্রধান। মানুষকেই সে সর্বোচ্চ আসনটি দেয়। আমাদের লোক-দার্শনিকরা যেমন বলেন, ‘মানুষ হয়ে মানুষ মানো/ মানুষ হয়ে মানুষ চেনো/ মানুষ রতনধন/ করো সেই মানুষের অন্বেষণ।’ নাস্তিকরা এই মানুষেরই অন্বেষণ করে বেড়ায়। মানুষের অমিত সম্ভাবনার অন্বেষণ করে বেড়ায়। নাস্তিকরা মানুষকে অপমান করে না।

আপনি ‘নাস্তিক্যধর্ম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ বলতে চাইছেন, নাস্তিক্যবাদও প্রচলিত ধর্মগুলোর মতো একটি ধর্ম। আপনার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত রইল। নাস্তিকদের তো কোনো মসজিদ নেই, মন্দির নেই, গীর্জা নেই। এমনকি তার মতবাদকে সে বিশ্বাসেও রূপান্তর করে না। সুতরাং আপনি বলতে পারেন না নাস্তিক্যবাদ একটি ধর্ম। যার কোনো প্রতীকই নেই, যার কোনো উপাসনা নেই, যার কোনো বিশ্বাস নেই, তা আবার ধর্ম হয় কেমন করে?

আপনি লিখেছেন, ‘নাস্তিক্যধর্মের অনুসারীরা জীবন ও জগতের সৌন্দর্য ও বিরাটত্বে মুগ্ধ বা কৃতজ্ঞ বোধ করলেও ধন্যবাদ দেবার মতো কাউকে পায় না।’ আচ্ছা ধন্যবাদটা কাকে দেবে? আমি তো আমাকেই দেখছি। আমি তো আমারই সৌন্দর্য দেখছি, আমারই বিরাটত্ব দেখছি। আমিই তো জীবন। আমিই তো জগত। আমি তো এই জগত, এই প্রকৃতিরই অংশ। আমাকে বিযুক্ত করে এই জগতের তো কোনো মূল্য নেই, সৌন্দর্য নেই। সাধককবি কবীর যেমন বলেছেন, ‘আমার দেহের মধ্যে চন্দ্র দীপ্যমান…আমার মধ্যেই চন্দ্র প্রকাশিত, আমার মধ্যেই সূর্য্য, আমার মধ্যেই অসীমের তূরী বাজিতেছে, আমার মধ্যেই পণব মৃদঙ্গের তাল পড়িতেছে…আমার মধ্যেই সপ্ত সমুদ্র, আমার মধ্যেই সকল নদী উপনদী, আমারই মধ্যে কাশী দ্বরকা, আমারই মধ্যে সকল দেব-মন্দির…আমারি মধ্যে নবলক্ষ তারা। শুন ভাই সাধু, আমরি মধ্যে সত্য স্বামী।’ সুতরাং আমি তো আমাকেই দেখছি। ধন্যবাদ যদি দিতেই হয়, ধন্যবাদ তো আমিই আমাকে দেব। অদৃশ্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দেওয়ার তো কোনো প্রয়োজন নেই।

যাই হোক, মন চাইল নাস্তিক বিষয়ক আপনার মন্তব্যের বিপরীতে আমিও একটা মন্তব্য করি। তাই করলাম। এটা হেগেল-কথিত সেই দ্বন্দ্বেরই অংশ বলতে পারেন। আপনি মন্তব্যটা করেছেন বলেই তো আমি লিখলাম। নইলে তো লিখতাম না। অর্থাৎ আমার লেখার জন্য আপনার লেখার প্রয়োজন। কিংবা বলা যায়, আপনার লেখার জন্য আমার লেখার প্রয়োজন। এটাই দ্বন্দ্ব। জগতের সকল কিছু এই দ্বন্দ্ব থেকেই উৎসারিত।

লাইভ রেডিও

Calendar

April 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930