টেকসই আবাসনের পথে ঢাকা

প্রকাশিত: ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২৫, ২০২১

টেকসই আবাসনের পথে ঢাকা

টেকসই আবাসনের পথে ঢাকা
রেজাউল করিম সিদ্দিকী

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তির মহাপরিকল্পনা ব্যক্ত করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেই পরিকল্পনায় তিনি নাগরিকদের জন্য বাসস্থান সমস্যার সমাধান ও টেকসই আবাসন নিশ্চিতকরণে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বাংলাদেশের মহান সংবিধানের ১৬ অনুচ্ছেদে নগর-গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগত দূর করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে আবাসন সমস্যা দূরীকরণে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সে লক্ষ্যে তিনি সমগ্র দেশের উন্নয়নে ৫ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন গৃহহীন ও দরিদ্রদের আবাসনের ব্যবস্থা করতে না পারলে সোনার বাংলা কখনোই গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। তিনি ভূমিহীন ও দরিদ্রদের জন্য গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি চালু করেন। এছাড়া ১৯৭৪ সালের নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য তিনি Low-Cost Housing Program চালু করেন।

জাতির পিতা এদেশের মানুষের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, আর তার সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে চলেছেন। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার সবার জন্য আবাসন নিশ্চিতকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ২০১৮ সালের নির্বাচনি ইশতিহারে তিনি সবার জন্য আবাসন নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। এ নির্বাচনি অঙ্গীকার পূরণের লক্ষ্যে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে।

বর্তমান সরকার আবাসন খাতের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় এবং সুপরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য জাতীয় আবাসন নীতি-২০১৭ এবং হাউজিং এন্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট আইন-২০১৮ প্রণয়ন করেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে “আমার গ্রাম আমার শহর” কর্মসূচি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গ্রামে শহরের সুযোগ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়ন, গ্রামে পাকা সড়ক নির্মাণ, রেলসংযোগ বৃদ্ধি, ভূমির পরিকল্পিত ও সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করণে Dogital Land Zoning, কৃষি ও আবাসনের জমির মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার উদ্দেশ্যে শহরগুলোতে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নসহ বহুমাত্রিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-১১ অর্জনে সকলের জন্য পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও মূল্য সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। স্বল্প ও মধ্যম আয়ের নাগরিকদের জন্য জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নিশ্চিত করতে অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কোনো নাগরিককে যেন বস্তিতে বসবাস করতে না হয় সেজন্য সরকার বস্তিবাসীদের জন্য ১৬ হাজারের বেশি ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এর মাধ্যমে পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ষাটের দশকে গুলশান, বারিধারা, বনানী, নিকুঞ্জ, বাড্ডা এলাকায় উচ্চ-মধ্য নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে। এছাড়া উত্তরা আদর্শ শহর ও পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পগুলোতে আধুনিক নগরের অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। প্রকল্প এলাকার খাল, জলাধার সংরক্ষণ ও লেক উন্নয়নসহ পরিবেশ সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ ও আবাসন সমস্যা লাঘব ও এর পাশাপাশি সংলগ্ন এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে একটি আধুনিক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ আদর্শ আবাসিক শহর গড়ে তোলার লক্ষ্যে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরে “পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের” জন্য ৬২২৭.৩৬ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে।

 

 

প্রকল্পটির ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় সুপরিকল্পিত প্লট বিন্যাস, পরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা রাস্তা, ব্রিজ ও লেক উন্নয়ন এবং সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহের উন্নয়নের বিষয় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এ প্রকল্পে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বনভূমি সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানসমূহ সম্পৃক্ত করে পরিকল্পিত উন্নয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। প্রকল্পটি ডিসেম্বর ২০২১ এর মধ্যে সমাপ্ত হবে বলে আশা করা যায়। এখানে প্রায় ২৬ একর জমিতে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে Bangladesh-China Friendship Exhibition Center নির্মিত হয়েছে যেখানে প্রতিবছর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলা অনুষ্ঠিত হবে। প্রকল্পের ১৯ নম্বর সেক্টরে ১০০ একর জমির উপর আইকনিক টাওয়ার নির্মাণ করা হবে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাহাদত বরণ করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা প্রবাসে থাকয় প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে বিভিন্ন অগণতান্ত্রিক সরকার ও সামরিক শাসক দেশ শাসন করেছে। এ সময় দেশে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য চরম আকার ধারণ করে।

১৯৯৬ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান। এই নির্বাচনের মাধ্যমেই মূলত দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আরোহণ এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এই স্মৃতি স্মরণীয় করে রাখতে পূর্বাচল নতুন শহরে নির্মাণ করা হবে একটি ৯৬ তলা ভবন। একই সাথে “৫২র ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে স্মরণীয় করে রাখতে যথাক্রমে ৫২ ও ৭১ তলা আরও দুটি ভবন নির্মাণ করা হবে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেই ভাষণের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পূর্বাচলের ১৫ নম্বর সেক্টরে নির্মাণ করা হবে জাতির পিতার উত্থিত তর্জনীর প্রতিকৃতি সংবলিত বঙ্গবন্ধু স্কয়ার। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিভিন্ন প্রতীকী ভাস্কর্যের আদলে এখানে তুলে ধরা হবে।

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পটি ২০১৯ সালের Asian Townscape Jury”s Award অর্জনের মাধ্যমে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে।

যাদের জমি অধিগ্রহণ করে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে তাদের যথাযোগ্য পুনর্বাসন করা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতঃপূর্বে ৬৪২৪ জন স্থানীয় অধিবাসী ও সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে প্লট প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এমপি অবশিষ্ট ১৪৪০ জন মূল অধিবাসী সাধারণ ক্ষতিগ্রস্তকে প্লটের বরাদ্দপত্র প্রদান করেন। এর মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলো যা দেশের মানুষের টেকসই আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করণে আরেকটি বড়ো মাইলফলক।

 

 

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930