ঠাকুরগাঁওয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে ত্বিন ফল

প্রকাশিত: ১১:০৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৪, ২০২১

ঠাকুরগাঁওয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন হচ্ছে ত্বিন ফল

 

গৌতম চন্দ্র বর্মন,ঠাকুরগাঁও 

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে ঠাকুরগাঁওয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে চাষ শুরু হয়েছে ত্বীন ফলের।পবিত্র কোরআনে বর্ণিত এ ফলটি ওষুধি গুণ সম্পন্ন এবং স্বাদে মিষ্টি। এ ছাড়া ব্রেস্ট ক্যান্সার রোধ ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগের প্রতিকারও পাওয়া যায় এ ফল থেকে।ইএসডিও নামে বেসরকারি একটি উন্নয়ন সংস্থার পরিচালক (প্রশাসন) সেলিমা আক্তার নামে এক নারী উদ্যোক্তা সদর উপজেলার মুন্সিরহাট এলাকায় এ বছর এক একর জমিতে মরুভূমির ত্বীন ফল চাষ করে সফল হয়েছে। পরীক্ষামূলক চাষে সফল হওয়ার পর এখন কৃষক পর্যায়ে বাণিজ্যিক চাষ ছড়িয়ে দিতে কাজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাগানে কর্মরত শ্রমিক আলমগীর হোসেন। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো ডুমুর আকৃতির ত্বীন গাছে ফল আসতে শুরু হওয়ায় দৃষ্টি কেড়েছে স্থানীয়দের।বাগান দেখতে আসা শহরের হাজিপাড়া মহল্লার রুবেল রানা ও শাহিন আলম নামে দুই ব্যবসায়ী বলেন, আরব দেশ মরুভ‚মির ফল এখন নিজ এলাকায় চাষাবাদ হচ্ছে। তাই ফলটি দেখার আগ্রহ নিয়ে ছুটে এসেছি। যেই ফলটির কথা পবিত্র কোরআনের আছে সুরা ত্বীন-এ। এই মূল্যবান ফলটি বাগানে এসে দেখতে পেয়ে আমাদের অনেক ভালো লাগল গোবিন্দনগর এলাকার স্কুল শিক্ষক এন্তাজ উদ্দিন বলেন, এলাকায় এই প্রথম চাষ হওয়া এই ফল তরুণ উদ্যোক্তাদের অনেকের আগ্রহ বাড়িয়েছেন। তিনি নিজেও এই ফল চাষাবাদের কথা ভাবছেন। একই এলাকার সাদেকুল ও শফিকুল নামে দুই যুবকও জানালেন এমন আগ্রহের কথা।তারা বলেন, ওষুধি গুণ সম্পন্ন এই ফলের বাগান করার ইচ্ছা তাঁদেরও। বাগান দেখার পাশাপাশি বাগানে কর্মরত আলমগীর কাছ থেকে এই ফল চাষের নিয়ম ও পদ্ধতিও শিখে নিচ্ছেন।ইএসডিও প্রকল্প সমন্বয়ক আইনুল হক বলেন, গত বছরের শেষের দিকে ভারত থেকে মিশরীয় জাতের ত্বীন ফলটির গাছ নিয়ে আসা হয়েছে। ওই বছর এক একর জমিতে এই গাছ গুলো রোপন করা হয়েছে। চারা রোপনের কয়েকমাসের মধ্যে ফল আসতে শুরু করে। প্রতিটি গাছে এখন ৭০-৮০টি করে ফল ধরেছে। তবে গাছটির বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ফলও অনেক বেশি ধরবে বলে জানান তিনি।
প্রকল্প সম্বয়ক আরও বলেন, ত্বীন শুষ্ক ও শীত প্রধান দেশে চাষ হলেও আমরা এই জেলাতে প্রথম প্রমাণ করেছি নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুতেও এ ফল উৎপাদন সম্ভব। ত্বীন ফলটির প্রসার বৃদ্ধিতে ইএসডিও কৃষি ইউনিটের একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক ভাবে এটি আরও ব্যাপক ভাবে সম্প্রসারিত করে এ গাছের কলম তৈরির মাধ্যমে যেনো সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারি সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে।বাগানের কর্মরত শ্রমিক শফিকুল জানান, ত্বীন গাছটিতে কোন রকম রাসায়নিক সার দেওয়া হয়নি। জৈব ও কম্পোজড সার মিশিয়ে গোড়ায় দিয়েছি। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কাও পরিচর্যার মাধ্যমে গাছ গুলো বড় হয়ে উঠেছে। এ সময়ে তেমন কোন রোগবালাই দেখা যায়নি। রোপনকৃত গাছ গুলোর মাটি বেলে ও দোআঁশ মাটির সংমিশ্রন হলেও এই আবহাওয়ার সঙ্গে এখন মানিয়ে নিয়েছে ত্বীন।ইএসডিও পরিচালক (প্রশাসন) সেলিমা আক্তার জানান, শখের বসে এই পবিত্র ফলের চারা রোপন করা হয়েছিলও। প্রথম বছরে আশানুরুপ ফলন হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক ভাবে চারা উৎপাদন ও মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কাজ করা হচ্ছে। তবে ত্বীন গাছটির বীজ থেকে চারা উৎপাদনের হার কম হওয়ায় নির্ভরতা করতে হচ্ছে কাটিং বা কলম চারায়।যার কারণ হচ্ছে বীজের চারায় ফলন আসে কয়েক বছর পর। অন্যদিকে কলম চারায় ফল আসে মাত্র ৬ মাসে। এই উদ্যোক্তা আরও বলেন, দেশে ছাড়াও বিদেশে এ ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সম্ভবনাময় এই ফলটি বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা গেলে দেশে বেকারাত্ব হার কমে আসবে। একই সঙ্গে রপ্তানীর মাধ্যমে পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।এ বিষয়ে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসক ডা: জিপি সাহা বলেন, ডুমুর বা ত্বীন জাতীয় এ ফলটিতে রয়েছে ৭০ প্রকারের ভেজষ গুণ। তবে মুলত এই ফলের প্রধান উপকারিতা হচ্ছে এটি ডায়বেটিকস রোগীদের জন্য এক মহা ঔষধ।ডুমুরের ফল সবজি হিসেবে খেতে আমরা রোগীদের পরামর্শ দিয়ে থাকি। এ ছাড়াও কোষ্ঠকাঠিন্য, শরীরে মেদ কমানো, উচ্চ রক্তচাপ, ব্রেস্ট ক্যান্সার, শরীরে হিমোগ্লোবিন ঠিক রাখা, মানসিক ক্লান্তি দুর করা সহ অনেক রোগ নিরাময়ে এই ফলটি সহায়তা করে।ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো: আবু হোসেন বলেন, বেসরকারি ভাবে ঠাকুরগাঁওয়ে এই প্রথমবার ত্বীন চাষ করা হচ্ছে। ত্বীন বা ডুমুর ফলের বাগানটিতে মাঠ পর্যায়ে কৃষি উপ-সহকারীগণ নিয়মিত পরিদর্শন করে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন।কোন রকম রাসায়নিক কীটনাশক সার ছাড়াই এই ফলটি চাষ করা সম্ভব। ডুমুর ফলটি সবজি হিসেবে খাওয়া যায়। এর পাতা গো খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে দুগ্ধ জাতীয় গাভি থেকে অনেক বেশি পরিমাণ দুধ পাওয়া যাবে। এ ছাড়াও এর পাতা পুকুরে গুড়ো করে ছিঁটিয়ে দিলে পানি বিশুদ্ধ থাকে।তবে দেশের বাজারে এই গাছ গুলোর অনেক বেশি দাম হওয়ায় কৃষকদের অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে। তাই সরকারি ভাবে এই গাছের চারা বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে দেওয়ার বিষয়ে আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাবো। বাণিজ্যিকভাবে সম্ভবনাময় এই ফলের চাষ কৃষকরে মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারলে এক সময় বিদেশেও রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষিবিভাগের এই কর্মকর্তা।

ছড়িয়ে দিন