ডারউইন এবং বেঁচে থাকার লড়াই

প্রকাশিত: ১:১৫ পূর্বাহ্ণ, জুন ২, ২০২০

ডারউইন এবং বেঁচে থাকার লড়াই

শিবব্রত নন্দী

পটভূমিঃ তুফান, কিশোরগঞ্জে আমার বাল্যকালের বন্ধু। স্বামী পরিত্যাক্তা মংগলী চাচি ভয়াবহ অনিশ্চিয়তার মধ্য দিয়ে একমাত্র সন্তানকে বড় করেছিলেন। তিনি বাড়িবাড়ি বাসন ধোয়ামুছার কাজ করতেন। গিরস্তের দেয়া নিজ খাবার মায়ে-পুতে ভাগাভাগি করেই তাঁদের দিন কাটতো। তুফান রোদে পুড়েছে, বৃস্টিতে স্নাত হয়েছে, লেপ-জামা-কাপড় ছাড়াই শীতের ঝাপ্টা সহ্য করেছে। আমার শৈশবে কোনদিন শুনিনি তুফানের অসুখ হয়েছে। বিষয়টি ঘটেছে তার প্রাকৃতিক জেনেটিক গড়ন, কষ্টেও বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা এবং হার্ড ইম্যুনিটির কারনে। এটি ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচনে ‘সামর্থবানদের টিকে থাকার’ শর্ত। আজকে করোনা ভাইরাস এবং মানুষের নিরন্তর টিকে থাকার যুদ্ধ চলছে। এ যুদ্ধে কে জিতবে, কখন জিতবে, কিভাবে জিতবে – এসব ভয়ঙ্কর অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর শুধুমাত্র বিজ্ঞান এবং সচেতন মানুষই দিতে পারে।

আলোকিত মানুষঃ পাকিস্থানে ডারউইনের নাম ও বিবর্তনবাদের তত্বকে অবজ্ঞা করা একটি চর্চা। খ্রিস্টান-ইহুদী-হিন্দুরা তাঁকে নিন্দা করে। অথচ ২০০ বছর আগের প্রাকৃতিক নির্বাচনের তত্ব আজো অভ্রান্ত। প্রাকৃতিক নির্বাচন বলেছে “প্রাণ, প্রাক কাঠামো হিসেবে আসেনি। মানুষ অথবা অণুজীবেরা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েই টিকে থাকে। তা নাহলে মৃত্যু অনিবার্য। করোনা ভাইরাস এমন এক অণুজীব, যে মানব দেহে সুযোগ নিচ্ছে একটি অনুকুল পরিবেশ খুঁজে নিতে। একটি শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের নীচে আপনি নিজেই দেখতে পারেন কোষগুলোর পুনরুৎপাদন শৃঙ্খলা। এদের দুর্বলগুলো মারা যাচ্ছে, শক্তগুলো টিকে থাকছে। অণুজীব বিজ্ঞানী হারমিত মালিক বলেন “প্রাকৃতিক বিবর্তন হচ্ছে ইদুর-বিড়ালের খেলা। ভাইরাস সংখ্যায় বাড়ে, আমাদের দেহ সেটি গ্রহন করে, প্রোটিন বদলায়, ভাইরাস তা এড়িয়ে চলে। এ খেলা চলছে অবিরাম।
নিউটনের মাধ্যাকর্ষন সুত্রের মতোই জীববিজ্ঞানে ডারউইন অভ্রান্ত। মাধ্যাকর্ষনকে যেমন অস্বীকার করা যায় না, তেমনি বিবর্তনবাদকে উপেক্ষা করার কোন উপায় নাই। কারণ বিবর্তনবাদের ব্যাখ্যা থেকেই করোনা ভাইরাসের উত্থান।

ডারউইনের তত্ব যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছে অনুজীবের সাথে তার হোস্টের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা। তাই আজ শিক্ষিত, রক্ষণশীল, ভুইফোরেরাও তা মেনে নেয়ার চেষ্টা করছে। তাই করোনা থেকে বাঁচতে তারাও আজ বিজ্ঞানের দ্বারস্ত। ফলে (১) ভারতে গোমূত্র পানের ভাটা এসেছে; (২) পাকিস্থানে সৌদি আজওয়া খেজুর আমদানী বন্ধ হয়েছে (এক ধর্ম প্রচারক বলেছিলেন এ সর্বরোগের ঔষধ), (৩) ৩০০ বছর আগে ভ্যাটিকান চার্চের “প্লেগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সৃস্টিকর্তার শাস্তি”- তত্ব মানুষ বিশ্বাস করছে না; (৪) ইরান স্বীকার করেছে কোওম ও মাশহাদের তীর্থযাত্রিরা ইরানে কোভিড১৯ মহামারির অন্যতম কারন; (৫) সৌদিরা ওমরাহ্‌ স্থগিত করেছে। ধন্যবাদ চার্লস। আজ সারা বিশ্ব অপেক্ষা করছে একটি কার্যকর ভ্যাকসিন আবিস্কার এবং সামাজিক সচেতনতার জন্য। কারন শুধু এ দুটি বিষয় মানুষকে বাঁচাতে পারে; অন্যকোন অলৈকিক শক্তি নয়, একেবারেই নয়।

ঝড়ের মধ্যেও ডারউইনঃ ঝড়ের নাম আমপান। ২০০০ সন থেকে বিশ্বে ঝড়ের নামাকরন সংস্কৃতি চালু হয়েছে। ভারত মহাসাগরের ঝড়ের নামাকরন করতে পারবে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্থান, মায়ানমার, ইরান, ওমান, থাইল্যান্ড এবং মালদ্বীপ। যেমন “ফণি” নাম এসেছে বাংলাদেশ, আইলা এসেছে মালদ্বীপ থেকে। ভারত মহাসাগরের ঝড়কে বলে সাইক্লোন, আটলান্টিকের ঝড়কে বলে টর্ণেডো, প্রশান্ত মহাসাগরের ঝড়কে বলে টাইফুন। গত ২০০ বছরে বিশ্বের ৪২% ক্রান্তিয় ঘুর্ণিঝড় আঘাত করেছে বাংলাদেশকেই। এতে মারা গেছেন প্রায় ২০ লক্ষাধিক মানুষ। বঙ্গোপসাগরের ত্রিভূজাকৃতি, অগভীরতা, আর্দ্রতা এবং তাপমাত্রা এর মূল কারন। তাই তা ঠেকানোর পথ নেই। এক মাত্র যথার্থ প্রস্থুতি দিয়েই মানুষ মৃত্যু ও সম্পদের ক্ষতি কমাতে পারে।

গুএলফ আঙ্গিনার কৃষিঃ করোনার অভিঘাতে ঘড়বন্দি মানুষ। অসংখ্য কারণে আজ বাজারে খাদ্য শস্যের মূল্যের উর্ধগতি। তাই কানাডার আপামর বাঙ্গালি সহ সবাই এখন ঝাঁপিয়ে পরেছেন আঙ্গিনার কৃষিতে। সঙ্কট দেখা দিয়েছে চারার। গুয়েলফ ও আশেপাশের বিশাল নার্সারিগুলো প্রায় ফাঁকা। এর মাঝেই গুএলফ আঙ্গিনার কৃষি গ্রীণ হাইজে উৎপাদন করেছে নানা ১৮ এশিয় জাতের প্রায় ২০০০ চারা। আগামী ৩০-৩১ মে সামাজিক দুরত্ব ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে আমরা নামমাত্র মূল্যে চারা বিতরণ করবো। আশা করছি খাদ্য নিরাপত্তা, পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা, পারিবারিক বিনোদনে গুএলফ আঙ্গিনার কৃষি মুল্যবান অবদান রাখবে।

অন্তিমেঃ আজ ভোরে নোম চমস্কির করোনা নিয়ে স্পষ্ট বলেছেন “আমেরিকা আজ ত্রিমূখী ঝড়ে আক্রান্ত; ১। পুজিতান্ত্রিক যুক্তি, ২। নয়া উদারবাদী বর্বরতা এবং ৩। একটি ভাবনাহীন গোয়ার্তুমি সরকার। এ সময়ে আমি আবার বলছি এ গানটি শুনতে “সকাতরে ঐ কাঁদিছে সকলে শোন শোন পিতা/ কহ কানে কানে শোন প্রাণে প্রাণে মঙ্গল বারতা”। (25 May. 2020, Guelph, Canada)।

কৃতজ্ঞতাঃ ডারউইনের কাছে আমাদের ঋণ, পারভেজ হুদভয়, দৈনিক ডন, করাচি, পাকিস্থান, মে ১৮, ২০২০।

ছড়িয়ে দিন