ডিজিটাল বাংলাদেশ ও নাগরিক সেবা

প্রকাশিত: ১১:১৪ অপরাহ্ণ, জুন ১৭, ২০২১

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও নাগরিক সেবা

 

আশরোফা ইমদাদ

 

জ্ঞানভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশের গড়ে তোলার লক্ষ্যে iƒপকল্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ ডিসেম্বর, ২০১৮ iƒপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেন । তখন থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা শুরু। এখন দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল ভোগ করছেন। ডিজিটাল বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য হলো- সমাজের শ্রেণি, বর্ণ, পেশা ও গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সকল মানুষের দোরগোড়ায় সহজে এবং দ্রুততার সাথে সরকারি সেবা পৌঁছে দেয়া। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত সর্বত্র সমন্বিত ই-সেবা কাঠামো গড়ে তুলেছে। এ লক্ষ্যে এটুআই এর সহযোগিতায় বর্তমানে প্রায় সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বৃহৎ পরিসরে ই-সেবা প্রদান করে আসছে।

 

ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে এটুআই এর উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোর বাতায়ন, ডিজিটাল সেন্টার, জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ই-নথি, একশপ, এক পে, জাতীয় হেল্পলাইন-৩৩৩, মুক্তপাঠ, শিক্ষক বাতয়ন, এসডিজি ট্র্যাকার, ই-মিউটেশন, উত্তরাধিকার বাংলা, ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড রুম, মাইগভ অ্যাপ, ডিজিটাল সার্ভিস ডিজাইন ল্যাব ও আই ল্যাব এবং ইনোভেশন ল্যাব ইত্যাদি।

 

জনগণের তথ্য প্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সরকারি দপ্তর থেকে প্রদেয় সেবাসমূহ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা বিধানের লক্ষ্যে দেশের সকল ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ, অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়সহ ৫১ হাজারেরও অধিক সরকারি দপ্তরে ওয়েবসাইটের একটি সমন্বিত রূপ বা ওয়েব পোর্টাল হলো জাতীয় তথ্য বাতায়ন। এখানে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের এ পর্যন্ত ৬৫৭ টি ই-সেবা এবং ৮৬ লাখ ৪৪ হাজারেরও বেশি বিষয়ভিত্তিক কনটেন্ট যুক্ত করা হয়েছে। এই বাতায়নে প্রতিদিন গড়ে এক লাখেরও  বেশি নাগরিক তথ্য সেবা গ্রহণ করছে।

 

বাংলাদেশের জাতীয় তথ্য বাতায়ন এর জনপ্রিয় সেবা এর মধ্যে রয়েছে-অর্থ ও বাণিজ্য সেবা, অনলাইন আবেদন, শিক্ষা বিষয়ক সেবা, অনলাইন নিবন্ধন, পাসপোর্ট, ভিসা ও ইমিগ্রেশন, নিয়োগ সংক্রান্ত সেবা, পরীক্ষার ফলাফল, কৃষি, ইউটিলিটি বিল, টিকিট বুকিং ও ক্রয়, তথ্য ভান্ডার, ভর্তির আবেদন, আয়কর, যানবাহন সেবা, প্রশিক্ষণ এ স্বাস্থ্য বিষয়ক পোর্টাল কুরিয়ার, ফরমস, ট্রেজারি চালানসহ ডিজিটাল সেন্টার। এখানে রয়েছে ৬শ’ এরও বেশি ই-সেবা, ১ হাজার ৬০০ এরও বেশি বিভিন্ন সরকারি ফরম অর্থাৎ সকল সেবার ফরম এক ঠিকানায়। রয়েছে কিশোর বাতায়ন-কানেক্ট, ইমাম বাতায়ন, মুক্তপাঠ, সকল সেবা এক ঠিকানায়-সেবাকুঞ্জ, জাতীয় ই-তথ্যকোষ যে কোনো স্থানে, যে কোনো সময় পাঠ্যপুস্তকের সহজলভ্যতার জন্য তৈরী করা হয়েছে ই-বুক।

 

জাতীয় তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে জনগণ ঘরে বসে অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করেতে পারেন। করোনা মহামারীর সময় মানুষ তাঁর প্রয়োজনীয় কাজ ঘরে বসেই ঝুঁকিমুক্তভাবে করে ফেলতে পারছেন। যে কোনো পাবলিক পরীক্ষা যেমন: প্রাথমিক সমাপনী, এসএসসি, দাখিল ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে মুঠোফোনের মাধ্যমে জানতে পারছে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য এখন আর নির্বাচন কমিশনের অফিসে ঘোরাঘুরি করতে হয় না। জাতীয় তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে সকল তথ্য হালনাগাদ করা যায়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন এবং নতুন ভোটার নিবন্ধনের মত কাজও এই তথ্য বাতায়ন থেকে করা সম্ভব। দেশব্যাপী কৃষকের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজলভ্য কার্যকারী ই-কৃষি সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম “কৃষি বাতায়ন” এর মাধ্যমে কৃষিবিষয়ক যে কোনো পরামর্শ ও সেবা সহজলভ্য করা হয়েছে। বর্তমানে কৃষি বাতায়নে ৮১ লাখ কৃষকের তথ্য মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ১৮ হাজার কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এবং ৫১টি উপজেলার কৃষি বিষয়ক তথ্য এই বাতায়নে সংযুক্ত রয়েছে।

 

ইমাম বাতায়নের মাধ্যমে দেশের ৩ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনদের মধ্যে ধর্মীয় সচেতনতা তৈরীর পাশাপাশি তাদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইমাম বাতায়নে বর্তমানে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬১  জন সদস্য ও ১৩ হাজার ৭২৪ কন্টেন্ট রয়েছে।

 

কিশোর বাতায়ন কিশোর-কিশোরীদের  জন্য নির্মিত একটি শিক্ষামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে প্রায় ৩৫ লাখের বেশি  শিক্ষার্থী যুক্ত হয়েছে এবং ৩১ হাজার ৩৮৩ টিরও বেশি মানসম্মত কনটেন্ট রয়েছে।  এর মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জ্ঞানার্জনের সুযোগ পাচ্ছে।

 

 

-২-

 

শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষক বাতায়ন একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন বিষয়ে অডিও, ভিডিও, অ্যানিমেশন, চিত্র, ডকুমেন্ট, প্রকাশনা ইত্যাদি কনটেন্ট সংরক্ষিত রয়েছে। এসব কনটেন্ট ব্যবহার করে শিক্ষকগণ মাল্টিমিডিয়ায় ক্লাসরুমে শিক্ষা প্রদান করতে পারেন। শিক্ষক বাতায়নের নিবন্ধিত সদস্য প্রায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার জন।

 

দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে উচ্চ ও নিম্ন আদালতসহ বিচার বিভাগের তথ্য নিয়ে চালু আছে বিচার বিভাগীয় তথ্য বাতায়ন। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং আদালত ও নাগরিকের মধ্যকার দূরত্ব কমানোর লক্ষ্যে এ উদ্যোগের যাত্রা। বর্তমানে ৬৪টি জেলা আদালত, ৫টি দায়রা আদালত এবং ৮টি ট্রাইব্যুনালে বিচার বিভাগীয় বাতায়ন সক্রিয় রয়েছে।

 

উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর একটি স্বয়ংক্রিয় ক্যালকুলেটর। এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি উত্তরাধিকারদের মধ্যে প্রাপ্যতা হিসাব করা যায়। মৃত ব্যক্তির সম্পদ বন্টন ব্যবস্থার জটিলতা থেকে সহজে মুক্তি পাওয়ার চিন্তা থেকেই উত্তরাধিকার বাতায়ন এবং অ্যাপের যাত্রা। এখন পর্যন্ত ১ লাখের বেশি নাগরিক উত্তরাধিকার ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছেন।

 

প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে ব্যাপক জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেন্টার থেকে অ্যাকাউন্ট খোলা, টাকা পাঠানো, সঞ্চয় করা, ঋণ গ্রহণ, বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স উত্তোলন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির টাকা উত্তোলন, বিভিন্ন ধরনের ফি প্রদান ইত্যাদি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছে।

 

জিটুপি সিস্টেমের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক একক আইডি ব্যবহার করে ডিজিটাল সেবা প্রদান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় বয়স্ক, স্বামী পরিত্যক্তা, বিধবা ও ল্যাকটেটিং মাদার ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

 

ই-অফিসে কার্যক্রম অংশ হিসেবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/সরকারি দপ্তরে কাজের গতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি আনয়নে ই-নথি বাস্তবায়ন চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ৮ হাজারেরও বেশি অফিসের প্রায় ১ লাখের অধিক কর্মকর্তা এর সাথে যুক্ত রয়েছে। এ পর্যন্ত দেড় কোটির বেশি ফাইল ই-নথি সিস্টেমের মাধ্যমে নিস্পত্তি হয়েছে।

 

সকল সেবা একটিমাত্র প্ল্যাটফর্ম সংযুক্ত করার লক্ষ্যে একসেবা প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ৮ হাজার ১৫১ টি দপ্তরকে একসেবার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে এবং ৩৩৪টি সেবা সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে একসেবায় নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৪ হাজারের বেশি।

 

সরকারি সব সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার অঙ্গীকার নিয়ে ‘আমার সরকার বা মাই গভ’ প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। কেউ বিপদে পড়লে অ্যাপটি খুলে মোবাইল ফোন ঝাঁকালে সরাসরি ৯৯৯ নম্বরে চলে যাবে ফোন। একই সঙ্গে ব্যবহারকারীরা ৩৩৩ নম্বরে কল করেও নানা ধরনের তথ্য ও সেবা নিতে পারবেন ।  প্রয়োজনীয় তথ্যের মাধ্যমে আবেদন, কাগজপত্র দাখিল, আবেদনের ফি পরিশোধ এবং আবেদন-পরবর্তী আপডেটসহ অন্যান্য বিষয় জানা যাবে। আর আবেদনকারীর পরিচয় নিশ্চিত করা হবে জাতীয় পরিচয়পত্রের সাহায্যে। প্ল্যাটফর্মটিতে বর্তমানে ৩৩৪টি সেবা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ওই প্ল্যাটফর্মটি রেপিড ডিজিটাইজেশনের আওতায় প্রায় ৬৪১টি সেবা ডিজিটাইজেশন করা হয়েছে।

 

সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণের ঘোষণা এখন এটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বাঙ্গালি জাতির অগ্রগতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি কেড়েছে। নাগরিক সেবায় মানোন্নয়নে বর্তমানে সরকার গৃহিত সামগ্রিক সেবাদান প্রক্রিয়া গতি এনেছে। সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশ সত্যিকারের ডিজিটাল রাষ্ট্র হিসেবে উন্নয়নশীল দেশের কাতার থেকে একধাপ এগিয়ে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে, আমরা হবো সেই গর্বিত রাষ্ট্রের নাগরিক।

#

(পিআইডি-এটুআই ফিচার)

লেখক: তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা।

ছড়িয়ে দিন