ডিপ্রেশন জেনেটিক না কি পরিবেশগত ?

প্রকাশিত: ৫:৪৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০২১

ডিপ্রেশন জেনেটিক না কি  পরিবেশগত ?

এইচ বি রিতা

একজন মানুষ যখন আত্মঘাতী হয়ে উঠেন, পোকা মেরে ঘর পরিস্কারের মতই নিপুন হাতে মেরে ফেলেন পরিবারের সদস্যদের এবং হত্যা করেন নিজেকেও, তখন আমরা হতবাক হয়ে যাই। আমরা নির্মম ঘটনা এবং অপরাধ নিয়ে ভাবি। কিন্তু এমন ঘটনার পিছনের উৎস কি, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন অনুভব করিনা।

এ বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ঘটে যাওয়া বাঙ্গালি পরিবারে ছয় সদস্যের হত্যা আমাদের মনে নানান প্রশ্নেরই জন্ম দিয়েছে। । দীর্ঘ সময় ডিপ্রেশনে ভোগা ফারহান তৌহিদ(১৯) এবং তানভীর তৌহিদ(২১) খুব নিপুন পরিকল্পনায় তাদের বাবা-মা, বোন, নানীকে গুলিবিদ্ধ করে হত্যা করেন এবং অবশেষে নিজেরাও আত্মহত্যা করেন। এমন ঘটনা শুধু টেক্সাসে নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলোতেও ঘটছে।

কিন্তু কেন এই হত্যা-আত্মহত্যার প্রবণতা?

মনেবিজ্ঞানীদের মতে, হত্যা-আত্মহত্যার ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলির মধ্যে রয়েছে অপরাধী এবং ভুক্তভোগীদের মধ্যে সম্পর্ক, পারিবারিক সহিংসতার, মাদকের ব্যবহার, অপরাধীর বয়স, বিবাহবিচ্ছেদ, সম্পর্ক পৃথকীকরণ, অস্ত্রের ব্যবহার, জেনেটিক, পরিবারে মানসিক অসুস্থ্যতার ইতিহাস এবং হতাশা বা ডিপ্রেশন।

হত্যা-আত্মহত্যার বহুবিদ কারণগুলোর মধ্যে আজ আমাদের আলোচনা ডিপ্রেশন নিয়ে।

ডিপ্রেশন কি?

কোন ব্যক্তির দীর্ঘ সময় ধরে অবসন্ন মন, শক্তিহীনতা, এবং উৎসাহহীনতাকে ডিপ্রেশনের আওতায় ফেলা হয়।

অর্থাৎ ডিপ্রেশন মনের এমন একটি মানবিক অনুভূতি যার মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি কোন ব্যক্তির স্বাভাবিক ক্রিয়াকলাপকে বন্ধকরে দেয়। সাধারণত ডিপ্রেশন একক কোন ঘটনা থেকে আসে না, এখানে ঘটনা এবং একাধিক কারণগুলির মিশ্রণ থাকে। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী অ্যারন বেক-এর তত্ত্ব অনুযায়ী, নিজের, পরিবেশের এবং ভবিষ্যত সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার সম্মিলিত প্রকাশই হল ডিপ্রেশন, যা রোজকার জীবনেও প্রভাব বিস্তার করে।

ডিপ্রেশনের লক্ষণগুলো কি কি?

একজন ব্যক্তি ডিপ্রেশনে পড়ে গেলে সেটার প্রাথমিক কিছু লক্ষন স্পষ্টতর হয়ে উঠে। যেমন, ক্রমাগত দুঃখবোধ করা, উদ্বিগ্ন হওয়া, অহেতুক মেজাজ, শক্তি হ্রাস, মনোযোগের অভাব, অসহায়ত্ব বোধ করা, অপরাধবোধ বৃদ্ধি পাওয়া, নিজেকে অযোগ্য ভাবা, উত্তেজিত বা বিরক্তিকর অনুভূতি, ক্ষুধা এবং ঘুমের পরিবর্তন – বৃদ্ধি বা হ্রাস, পূর্বে উপভোগযোগ্য কার্যক্রমে আগ্রহের অভাব, আত্মহত্যার চিন্তা করা বা আত্মঘাতী আচরণ করা ইত্যাদি…!

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ডিপ্রেশন বা ডিপ্রেশিভ এপিসোডকে সাধারণত দুইভাগে ভাগ করা হয় – ইউনিপোলার ডিপ্রেশন আরবাইপোলার ডিপ্রেশন। ডিপ্রেশনের গভীরতারও প্রকারভাগ রয়েছে। যেমন-মাইল্ড ডিপ্রেশন, মডারেট ডিপ্রেশন, এবং সিভিয়ারডিপ্রেশন। এর সাথে এসে জুড়ে বসতে পারে বিভিন্ন শারীরিক উপসর্গগুলোও।

 

ডিপ্রেশনের কারণগুলো কি কি? 

বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, গবেষক, মনোবিজ্ঞানীদের ধারাবাহিকভাবে অধ্যয়নগুলি দেখায় যে, ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোর সাথে জড়িত এবং এর প্রভাবটি ক্রমবর্ধমান সময়ের সাথে ব্যক্তির মাত্রাতিরিক্ত মানসিক চাপের উপর আরোবেশী ঝুঁকিপূর্ণ হয়। সেটি হতে পারে, নিঃসঙ্গতা, একাকীত্ব, সম্পর্কের ভাঙ্গন, প্রকৃত বন্ধু না থাকা, বেকারত্ব, পারিবারিক সহিংসতা, প্রিয় জনের মৃত্যু, বিদ্যালয়ে বুলিং, পড়াশুনার চাপ, ভুল পেরেন্টিং, চাইল্ড এবিউজ, প্রসংশা না পাওয়া, এবং জেনেটিক…. ইত্যাদি।

আমরা জানি যে, কিশোর বছরগুলি মূলত একটি মানসিক চাপের সময়। এ সময় তাদের দেহের পরিবর্তন, চিন্তার পরিবর্তন এবং অনুভূতির পরিবর্তন হয়। এ সময়টাতে পরিবার, বন্ধুমহল, স্কুল, বা স্বজনদের কাছ থেকে যে কোন ধরণের মানসিক চাপ, কলহ, সম্পর্ক ভঙ্গন, তিরস্কার, বিভ্রান্তি, ভয় এবং সন্দেহমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতি, যে কোন কিশোর-কিশোরীর মানসিক চাপ বৃদ্ধিকরতে পারে।

অর্থাৎ যে কোন উদ্বেগ ও মানসিক চাপ, যে কোন বয়সের ব্যক্তিকেই ডিপ্রেশনে ফেলতে পারে।

আবার অনেক সময় পরিবার ও সমাজের সুখী ও সফল ব্যক্তিরাও ডিপ্রেশনে এড়াতে পারেন না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছেও তারা পূর্বের লড়াইয়ের কথা ভেবে কিংবা কেউ তাদের প্রাপ্তির প্রসংশা করছেন না ভেবেও ডিপ্রেশনে ভোগতে পারেন। এবং সেক্ষেত্রে তারা নিজেদের ডিপ্রেশনটা লজ্জাজনক ভেবে লুকিয়ে যান।

 

ডিপ্রেশন নিয়ে আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল-ডিপ্রেশন কি জেনেটিক?

‘স্ট্যানফোর্ড স্কুল অফ মেডিসিন’ অনুমান করে যে, ১০ শতাংশ আমেরিকান তাদের জীবনের কোনও না কোন সময় মেজর ডিপ্রেশনে ভোগে থাকেন। এবং এ ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনে থাকা ব্যক্তিরা তাদের পরিবারে সন্তান এবং ভাই বোনদের মধ্যে এটা ছড়াতে পারেন। এবং কোন ব্যক্তির পরিবারে যদি ডিপ্রেশনে আক্রান্ত কোন সদস্য থাকেন, তবে সে ব্যক্তি, একটি স্বাভাবিক পরিবারের ব্যক্তির চাইতে পাঁচগুন বেশী ডিপ্রেশনে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা রাখেন।

ডিপ্রেশন নেটওয়ার্ক স্টাডিতে ‘ক্রোমোসোম থ্রি-তে তীব্র হতাশার জন্য জিনোম একটি উল্লেখযোগ্য যোগসূত্র’ আর্টিক্যালটিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, একটি ব্রিটিশ গবেষণা দল এমন একটি জিনকে বিচ্ছিন্ন করেছেন যা ডিপ্রেশনে থাকা একাধীক পরিবারের সদস্যদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। ক্রমোসোম থ্রিপি ২৫-২৬ প্রায় ৮০০ টিরও বেশি ডিপ্রেশনে থাকা পরিবারে পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন যে, হতাশায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই এটি জেনেটিকেলি ছড়াতে পারে। বাকি ৬০ শতাংশ পরিবেশগত এবং অন্যান্য কারণগুলি তৈরি করতে পারে। বলা হয়, যে ব্যক্তি ডিপ্রেশনে থাকা ব্যক্তির সাথে একই পরিবারে বেড়ে ওঠে, সে উক্ত ব্যক্তির আচরণকে ‌অনুসরণ করবে এটাই স্বাভাবিক। উদাহরণস্বরূপ, যে শিশুটি পিতামাতাকে বিছানায় দিন কাটাতে দেখে, সে শিশুটি এই দৃশ্যটাকে কখনোই অস্বাভাবিক মনে করবে না।

ডিপ্রেশনে ভুক্তভোগীরা অনেক সময় নিজেও বুঝতে পারেন না যে তারা এই সমস্যাটিতে ভোগছেন। তখন পরিবার, আত্বীয় ও বন্ধুমহলকে সচেতন হতে হবে। সাধারণ লক্ষনগুলো নজরে পড়া মাত্রই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতেহবে।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে শুরুতে পরিবার থেকে কথা বলে নেয়া অতন্ত জরুরী। এ ক্ষেত্রে পরীক্ষা করার আগেই কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সাধারণত ডাক্তাররা ইতিবাচক আলোচনা দিয়ে চিকিৎসা শুরু করেন। দীর্ঘ সময় তারা রোগীর সাথে কথা বলে কৌশলে ভিতরের কথা বের করার চেষ্টা করেন। তবে কোন ব্যক্তি মেজর ডিপ্রেশনে থাকলে পরীক্ষা করার জন্য অপেক্ষা করা হয় না। কাউন্সেলিং করে, ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা শুরু করা হয়। ডিপ্রেশনের ওষুধ সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়। এবংনিয়মিত ডোজ নিতে হয়। নির্ভর করে রোগীর মানসিক অবস্থার উপর ডাক্তাররা কিভাবে চিকিৎসা দিবেন।

তবে, ডিপ্রেশন থেকে সেরে উঠতে চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের ইতিবাচক ভূমিকার উপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন চিকিৎসকরা। একজন ডিপ্রেশনে আক্রান্ত রোগীর সেরে উঠায় তার পরিবারে, সুন্দর, স্বাচ্ছন্দময়, নিরাপদ একটি পরিবেশ থাকা, ঔষদের মতই কাজ করে।

 

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন অনুসারে, ডিপ্রেশন হ’ল বিশ্বব্যাপী অক্ষমতার প্রধান একটি কারণ। বিশ্বব্যাপী, সমস্ত বয়সেরমানুষদের মধ্যে ৩০০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ এই ব্যাধিতে আক্রান্ত।

ডিপ্রেশনের জন্য কে দায়ী? এটা জটিল এক প্রশ্ন। ডিপ্রেশন যে কোন বয়সে যে কোন ছোট-খাটো কারণেও হামলা দিতে পারে। তবেসেটা যদি সামান্য মন খারাপের বিষয় পর্যন্তই থাকে, সেক্ষেত্রে পরিবার, বন্ধুমহল এবং নিজে নিজেই

আমরা সেরে উঠতে পারি। দীর্ঘমেয়াদী হলেই চিতিৎসার প্রয়োজন হয়।

ডিপ্রেশন যেহেতু মানসিক একটি সমস্যা, তাই সমস্যাটি নির্ণয় হওয়ার পর, মেডিক্যাল চিকিৎসার পাশাপাশি আমাদের পারিবারিক যত্নটির দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

কেননা, যখন একজন ব্যক্তি ডিপ্রেশনে ভোগেন, তখন সে নিজেকে গুটিয়ে নেন ভিন্ন একটি জগতে। বাহ্যিক জগত তার কাছেঅনিরাপদ মনে হয়। সেক্ষেত্রে ইতিবাচক পেরেন্টিং অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে পরে। পিতা-মাতা, পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে সাহায্য ও সহযোগীতা ব্যক্তিটিকে দিতে পারে একটি নিরাপদ আশ্রয় এবং বিশ্বাস, যা তার সেরে উঠার আরো একটি ঔষদ। এসময় পরিবারের অবহেলা, অযত্ন বা নেতিবাচক আচরণ ডিপ্রেশনে থাকা ব্যক্তিটির মানসিক স্বাস্থ্যকে আরো ক্ষতিকর করেতুলতে পারে।

 

 

 

লেখক পরিচিতিঃ
এইচ বি রিতা। কবি, প্রাবন্ধিক,কলামিস্ট, সাংবাদিক ও শিক্ষক। জন্ম বাংলাদেশ। বর্তমান নিবাস কুইন্স, নিউইয়র্ক

ছড়িয়ে দিন