ডিসেম্বরের রাজনীতির উত্তাপ ও শীতের কাঁপুনি

প্রকাশিত: ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০২২

ডিসেম্বরের রাজনীতির উত্তাপ ও শীতের কাঁপুনি

 

 

লুৎফুল্লাহ হীল মুনীর চৌধুরী

 

বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলোর মানুষজন সকালে ও সন্ধ্যা থেকে শরীরে গরম কাপড় পড়তে শুরু করে দিয়েছেন। অনেক জেলায় বেশ বেলা পর্যন্ত কুয়াশায় আবৃত থাকে চারপাশ। শীতের আমেজ রাজধানী ঢাকাতে কিছুটা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনেও খুব ঠান্ডা পরেছিল। আত্মসমর্পণের সেই মুহূর্ত ছিল বাঙালীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জন করেছিল। বিজয় অর্জিত হলেও বিজয়ের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তখনও ছিলেন পাকিস্তানের মিয়াওয়ালী কারাগারে বন্দি। পুরো ডিসেম্বর মাস অতিবাহিত হলেও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির কোনও খবর ঢাকায় আসেনি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর কোনও খবরও জানা ছিল না কারও। তিনি বেঁচে আছেন কিনা সেটাও জানা ছিল না কারও। অন্যদিকে ১৯৭২ সালে ৫ জানুয়ারির জন্মদিন নিয়ে ভুট্টো সাহেব তখন ব্যাস্ত। শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর বয়সের ব্যবধান মাত্র আট বছর। বয়সে আট বছরের ছোট হলেও ধূর্ত বুদ্ধির দিক থেকে ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানের থেকে অনেক এগিয়ে ছিলেন। তিনি জানতেন শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে অনেক মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের রেডিওটি কারাগার কর্তৃপক্ষ নিয়ে গিয়েছিল যেনো তিনি বাইরের খবর জানতে না পারেন। তাকে যে পত্রিকা পড়তে দেয়া হয়েছিল কারাগারে কিছুদিন সে সকল পত্রিকা দেয়াও বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ভুট্টোর ১৬ ডিসেম্বরের পর হঠাৎই মনে হয়েছিল কারাগারে বন্দি মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করার। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে জুলফিকার আলী ভুট্টো মিয়াওয়ালী কারাগারে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করলেন। সেদিন থেকে আবার বঙ্গবন্ধুকে আবার পত্রিকা ও রেডিও দেয়া হয়েছিল। কারাগারে গিয়ে ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বললেন তার জন্মদিনের পরপরই তাকে পাকিস্তান সরকার কারাগার থেকে মুক্ত করবে। পাকিস্তানের ডিসেম্বরের এই রাজনীতিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট ছিল সেদিন। ভুট্টো শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে কনফেডারেশন স্টেটের প্রস্তাব করেছিলেন তখন। কিন্ত বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন তিনি আগে দেশে ফিরে যাবেন এবং বিষয়টি নিয়ে ভুট্টোকে বঙ্গবন্ধুর মতামত জানাবেন। ভুট্টোকে সরাসরি না করার জন্য ভুট্টোর মনে কিছুটা আশা জন্ম নিয়েছিল আবার। বঙ্গবন্ধুর মনে হয়েছিল তিনি ভুট্টোকে না বললে তার মুক্তির বিষয়টি বিলম্বিত হবে। এসব কথা বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসে পরবর্তীতে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাংবাদিককে বলেছিলেন বত্রিশ নম্বর বাড়িতে। গোটা ডিসেম্বর মাস বঙ্গবন্ধু বন্দি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল কিন্ত বঙ্গবন্ধু ছাড়া কারও সাধ্য ছিল না সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়ার। এভাবেই ডিসেম্বর অতিবাহিত হলো ১৯৭১ সালে। যথারীতি ভুট্টোর জন্মদিনের তিন দিন পর বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আদেশ আসে মিয়াওয়ালী কারাগারে। বঙ্গবন্ধু ৮ জানুয়ারি মুক্ত হলেন। ভুট্টোর ডিসেম্বরের রাজনীতির পেছনে মূল পরিকল্পনা ছিল শেখ মুজিবুর রহমানকে দিয়ে এমন কিছু করানো যাতে শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে গেলেও আওয়ামী লীগ ও মুজিব বাহিনীর সাথে বঙ্গবন্ধুর দ্বিমত সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ভুট্টোর ডিসেম্বর কৌশলে পা দেননি। আর লন্ডন ও ভারত হয়ে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় নামলেন তখন বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসায় তিনি সিক্ত হয়েছিলেে। মৃত্যুর মুখে দাড়িয়েও বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের সাথে কোনদিন বেঈমানী করেননি। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে ভুট্টোর ডিসেম্বর রাজনীতি পরাস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটা অনেক বড় একটি রাজনৈতিক উদাহরন। যুদ্ধে পরাজিত হয়েও পাকিস্তান ষড়যন্ত্রের ছক করেছিল ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে। এই ডিসেম্বর ষড়যন্ত্রকে আমাদের স্বরণ রাখতে হবে।

২. আর মাত্র কয়েকদিন পর ডিসেম্বর মাস। ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। গত ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর উদযাপন করেছিল। তবে আসছে ডিসেম্বর মাস নিয়ে বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যে উত্তাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেটা একটি সুনির্দিষ্ট ইস্যু নিয়ে সৃষ্ট। আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দল একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়ে চলছে। বাংলাদেশের অনেক রাজনৈতিক দল বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় না। কিন্ত সংবিধান তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল বাতিল করছে অনেক আগেই। সরকার ও বিরোধীদের এই ইস্যুতে অবস্থান ডেড-এন্ডে পৌঁছে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। বাংলাদেশের এই ডিসেম্বর রাজনীতি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য আদৌ কি হুমকি হয়ে পরছে কিনা সে বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র ক্ষমতায় রয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের মানষকে একটি ম্যাসেজ দিতে পেরেছেন বিগত এক দশক ধরে সেটা হলো আওয়ামী লীগ উন্নয়নের রাজনীতির চর্চা করে। গনতন্ত্রের একমাত্র ভাষা উন্নয়ন। উন্নয়নের মধ্য দিয়েই গনতন্ত্র মজবুত হয়। উন্নয়নের মধ্য দিয়েই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জিত হয়। কিন্ত বাংলাদেশের চলমান ডিসেম্বর রাজনীতি যেভাবে দিনে দিনে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে ফেলছে সেখান থেকে বের হয়ে আসার এক্সিটওয়ে তেমন ভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কি ঘটবে ডিসেম্বর মাসে এবং কেনো বিরোধীদের ডিসেম্বর মাসকে বেছে নিতে হলো সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বৃহৎ দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ ও বিপক্ষের শক্তির মধ্যে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। মূলত এই বিরোধের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে এই ডিসেম্বর রাজনীতি নতুন রুপে, নতুন এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষে, নতুন ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাস্তবায়নের বিষয়টিকে ডিসেম্বর রাজনীতির অগ্রভাগে রাখা হলো এবার। ১০ ডিসেম্বর বিএনপি ঢাকাতে মহাসমাবেশ করবে। সমাবেশ করার অনুমোদন এখনও চূড়ান্ত করেনি সরকার। তবে বিএনপির দাবি তাদের রাজনৈতিক কার্যালয় পল্টনে

তাদের সমাবেশ করতে দিতে হবে। সরকার দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করে চলেছে বারবার। কিন্ত বিএনপি আন্দোলনের মধ্য দিয়েই শাসন ব্যাবস্থার পরিবর্তনের কথা বলছে। বিএনপির ধারণা জনগন এই আন্দোলনে তাদের সমর্থন দিবে। তারা ভাবছে জনগন দীর্ঘ আওয়ামী শাসনামলের পরিবর্তন চায়। কিন্ত বিএনপির এই ধারণার নেপথ্যে তেমন জোড়ালো কি কারন রয়েছে। বিএনপি এর ব্যাখ্যা দিয়েছে মানুষের ভোটাধিকার এর অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের আন্দোলনের বিকল্প পথ রাখা নেই আর।

৩. ডিসেম্বর রাজনীতির কারনে বাংলাদেশের উপর বেশ কিছু প্রভাব পরতে চলেছে আগামী বছর। করোনা মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে গত তিন বছর বিশ্ব অর্থনীতির উপর নতুন নতুন চাপ রয়েছে এখনও। বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈপ্লবিক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলেও বাংলাদেশ এখনও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মধ্য দিয়েই অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন চলমান রয়েছে দীর্ঘ দিন। রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে বাংলাদেশের উন্নয়ন আগামীতে ব্যাহত হবার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ও আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এর মূল কারন হিসেবে এখনও বিবেচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর সহিংসতার মধ্য দিয়ে চলমান অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ডিসেম্বর রাজনীতির এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতেই মীমাংসিত হতে পারে গণতান্ত্রিক সদিচ্ছার মধ্য দিয়ে।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক