তেলিয়াপাড়াযুদ্ধ ও শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত: আশাজাগানিয়া পদ্মাসেতু

প্রকাশিত: ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ৯, ২০২২

তেলিয়াপাড়াযুদ্ধ ও শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত: আশাজাগানিয়া পদ্মাসেতু
মোস্তফা মোহাম্মদ
সাতছড়ি বন পেরিয়ে, অবিভক্ত ভারতবর্ষের কুমিল্লা তথা ত্রিপুরা তথা আজকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সংলগ্ন-হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বৃষ্টিমুখর দুপুর। শচীন দেব বর্মনের অমর গীত-সঙ্গীত ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে’র মূর্চ্ছনায় মন ভরিয়ে তেলিয়াপাড়া চা-বাগান চোখে পড়তেই ড্রাইভার রিপন বলে উঠলো, ‘স্যার পদ্মাসেতুর জমকাইলো উদ্বোধন-অনুষ্ঠান বাতিল কইরে তার পরিবর্তে চারটি ফায়ার ফাইটিং হেলিকপ্টার কেনার সিদ্ধান্ত নিইয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাইরে ধইন্যবাদ।’
রিপনের কথায় চেতনায় ফিরে যাই। ভেসে ওঠে আমার চেনা-অচেনা-নামজানা অনেক মুখ। ফিরে পাই চেতনার মুক্তিযুদ্ধ, আমার অধীত ইতিহাস: হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চোট্ট একটি গ্রাম তেলিয়াপাড়া। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল আলোড়িত হয়ে উঠলো ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী খাল-বেষ্টিত চা-বাগানখ্যাত এই শান্তস্নিগ্ধ গ্রামীণ জনপদ, গঠিত হলো ‘মুক্তিফৌজ’।
আর আজ ২০২২ সালের ৭ জুন, স্বাধীনতার ৫১ বছর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা-যুদ্ধখ্যাত তেলিয়াপাড়া অতিক্রমকালে ড্রাইভার রিপনের কথায় মুক্তিযুদ্ধকালীন রণাঙ্গনের চিত্রসহ আমার চোখে ভেসে উঠলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলার মানুষের মুক্তি ও কল্যাণে তাঁর ধীরোদাত্ত-বীরত্বব্যাঞ্জক অঙ্গুলিনির্দেশ, আশাজাগানিয়া স্বপ্নসাধনার যোগসূত্র। এবং তাঁর যোগ্যকন্যা, বিনির্মাণের স্বত্বাধিকারী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদ্মাসেতুকেন্দ্রিক আস্থা-বিশ্বাস-ভালোবাসা মিশ্রিত উজ্জ্বল মুখ। আর বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়নকল্পে অমিত-তেজোদ্দীপ্ত-কমিটমেন্ট।
দুর্গত মানুষের রক্ষাকল্পে ফায়ার ফাইটিং হেলিকপ্টার ক্রয়-সংক্রান্ত শেখ হাসিনার এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের রেশের সাথে একাত্তরের রণাঙ্গনের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ত এবং আত্মত্যাগ আমার মস্তিষ্কে ঘোট পাকায়। তার সাথে যুক্ত হয় গত-পরশু চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বি.এম কার্গোডিপোতে রাখা অপ্রত্যাশিত দাহ্যবস্তুর জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় প্রাণদানকারী দেশপ্রেমিক কর্মীদের ত্যাগের মহিমা–ঘটনাপ্রবাহ একাকার হয়ে চোখে জল গড়িয়ে দিলো। এই হলো শিক্ষা, এই হলো মানবপ্রেম–মুক্তিযুদ্ধের শিক্ষা।
ব্যক্তিগত কাজে এবং কয়েকদিনের দুঃসহ কষ্ট থেকে মানসিক প্রশান্তির তাগিদে মৌলভীবাজার গিয়েছিলাম গতকাল। জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খোদেজা খাতুন জয়া আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ছোটবোন। জয়ার মুগ্ধমুখিন আতিথ্য এবং সুরম্যখচিত ডাকবাংলোর আশ্রয়ে চায়ের দেশ সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে যন্ত্রণা থেকে কিছুটা মুক্তি দিলেও উপভোগ করতে ব্যর্থ হচ্ছিলাম বারবার। তবে তেলিয়াপাড়া যুদ্ধের আগুন আমাকে তেজোদ্দীপ্ত করছিলো এবং এগিয়ে যেতে প্রণোদনাসহ দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করছিলো; সেই সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে স্বস্তি ও শান্তি খুঁজে পেলাম।
সকাল ৯টায় জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর ভিভিআইপি রুমের কড়া নড়ে উঠলো। দরোজা খুলতেই রেডটাইমস বিডি ডট-এর স্টাফ রিপোর্টার কপিল দেব ক্রেস্ট ও ফুল নিয়ে হাজির। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বললেন, স্যার রেডটাইমস-এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা; আপনার প্রতি সম্পাদক সৌমিত্র দেব-এর ভালোবাসা–বন্ধুর প্রতি পিতৃভূমির শুভেচ্ছা। বৃষ্টিস্নাত সকাল, মন ভালো করে দিলো প্রকৃতি, সেই সাথে উপহার।
গতকাল কাজের ফাঁকে বিকেল ও সন্ধ্যায় শ্রীমঙ্গল চা-বাগান-সংলগ্ন-জনপদ আমাকে স্বস্তির শ্বাস দিয়েছিলো খুব; চা-গবেষণা-কেন্দ্র দর্শন, সেই সাথে বিমলের সাতরঙ-চা সেবন আমাকে কিছুটা শক্তি যোগানোয় জুনের আম-কাঁঠাল-পাকা গরমের গুমোট বাতাবরণটা কেটে গেলো; উপরন্তু ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ির’ সবুজ-বিন্যাস বনলতার চুলকে ছাড়িয়ে জীবনানন্দীয় রহস্যোক্তিতে আচ্ছন্ন করে নিলো আমাকে। মেঘের সাথে পীড়িতপ্রাণা মেঘালয়ের ঘনায়ন্ধকার-সন্ধ্যা কিম্বা জাফলংয়ের ডাউখি-পিয়াইন খরস্রোতাকে আমার বাংলার হারানো প্রেয়সী মনে হয়। ভেসে ওঠে র্যাডক্লিফকৃত, নেহরু প্রলোভিত, কমলা নেহরু-প্ররোচিত লাঠবাহাদুরের ভারত-বিভক্তির ব্যথা।
ময়মনসিংহের গারোপাহাড়সহ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব জনপদ বিশেষত, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলার হাওরের নাতিদীর্ঘ ভূগোল আমাকে আনন্দ-বিষাদে আলোড়িত করে। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি, কী নাই আমাদের? আর কীই-বা কম আছে! আর কী-না হতে পারতো সেভেন সিস্টার আমাদের হলে।
আমি ভারতীয় রাজনৈতিক অশিষ্টাচারের আলাপে বসি নাই, দেশভাগের কষ্টবিদীর্ণ মানচিত্রের জিওগ্রাফি-বায়োলজিক্যাল অসাম্য দেখে কষ্ট পাই। কষ্ট পেয়ে ফিরে আসি জীবনে। তন্দ্রাচ্ছন ভাব কেটে যায়। চোখ মেলে দেখি আমার সামনে আমুর চা-বাগান। কিছুদূর এগিয়ে ছবি তুলি, আরেকটু গিয়ে মাজার-সংলগ্ন চায়ের দোকানে থামি।
চুনারুঘাটের আমুর চা-বাগান এলাকার সবুজাভ নিরবতা, পাহাড়ি-খালবাহিত চিকচিকে উন্নত বালুকণায় বিকেলের সোনারোদ প্রভা ছড়ায়। পাহাড়ি-কলা, জাম খেয়ে, বাসার জন্য কিনে দুধচায়ের আমেজে উৎফুল্লচিত্তে যাত্রা করি, ঢাকার পথ ধরি।
সাতছড়ি সংরক্ষিত বনভূমির সুনসান নিরবতা, বুনোপাখি, হরিয়াল, ঘুঘু, টিয়েদের ওড়াউড়ি আর বানরের লাফালাফি দেখতে দেখতে চলে আসি তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের সীমাহীন সৌন্দর্য্যের লীলাভূমে। ড্রাইভার রিপনের পদ্মাসেতুর উদ্বোধনীব্যয়-সংকোচনজনিত প্রধানমন্ত্রির তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন আমাকে আলোড়িত করে। ভাবি রিপনের মতো অর্ধশিক্ষিত একজন গাড়ির ড্রাইভার দেশের জন্য ভাবে–উন্নয়নের জন্য উল্লসিত হয়, কিন্তু ব্যয়বাহুল্য দেখে কষ্ট পায়। কষ্ট পেতে পেতে প্রতিবাদী হয়; যেমনটি হয়েছিলো ৫২’র ভাষা-আন্দোলনে, ৬৬’র ছয়-দফায়, ৬৯’র ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে, জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে গিয়ে বাংলার দামাল ছেলেরা সংগঠিত শক্তিশালী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছে। আজকের পদ্মাসেতু মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের ফসল। নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পৃথিবীর দীর্ঘতম এই সেতু নির্মাণের সাফল্য একদিনে আসেনি, এসেছে শেখ হাসিনার অমিত দেশপ্রেম ও দুঃসাহস থেকে। এই সাফল্য বিচারে একথা প্রমাণিত সত্য যে, বিশ্বব্যাংকের অসহযোগিতা, দুর্নীতির মিথ্যা অভিযোগসহ জাতিক এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ছিলো ব্যাপক।
বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির অদূরদর্শী রাজনৈতিক অপলাপ এবং নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ ইউনূস উন্নয়ন-সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এবং বিশ্বমোড়লদের দরবারে পদ্মাসেতুতে অর্থ-সহযোগিতা বন্ধের দেনদরবার করেন। অথচ নব্বই দশক-পরবর্তীতে আমার দেখা গ্রামীণ ব্যাংকের দেউলিয়াপনা ঠেকাতে শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ ছিলো তার প্রার্থিত ও একান্তভাবে কাম্য। তিনি সেই সহায়তা পেয়েই ঘুরে দাঁড়ান এবং গ্রামের নিরীহ কৃষকদের মাঝে ৩৮% সুদে ঋণ বিতরণ করে, কৃষকদের ঘরবাড়ি-গরুছাগল ছাড়া করেও নোবেল পান। আমার বক্তব্য সেইখানে নয়, আমি বলতে চাই যে, দেশের উন্নয়নে আমরা কেন দলমতের উর্ধ্বে উঠতে পারি না! ব্যক্তিগত স্বার্থের বাইরে আমরা কেন সর্বজনীন ও সর্বমানবীয় আকাঙ্ক্ষা ধারণ করতে ব্যর্থ হই? আমরা কেন ড্রাইভার রিপনের মতো ভালো কাজের জন্য সকলেই ধন্যবাদ দিতে জানি না। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীন না হলে আমরা পদ্মাসেতু বানানোর স্বপ্ন দেখা তো দূরের কথা, হয়তোবা বাংলায় ‘মা’ ডাকতেই ভুলে যেতাম বাধ্য হয়ে। আর ড. মুহম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা ছিলো স্বপ্নেরও অধিক–নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো বাতুলতা মাত্র। সেদিক বিচারে, পদ্মাসেতু মুক্তিযুদ্ধের অর্জন, ষড়যন্ত্রের জবাব, অপমানের প্রতিশোধ।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমার ব্যক্তিগত অনুরোধ, আপনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকন্যা; ক্ষমার অবতার শেখ মুজিবের মতো এই সকল ষড়যন্ত্রকারী শিক্ষিত ইউনূসদের পদ্মাসেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিয়ে উচিত শিক্ষা দিন। সারা দুনিয়ার মানুষ দেখুক আপনি কতটা মহান। আপনার জন্য প্রার্থনা, ‘তোমার পতাকা যারে দাও,
তারে বহিবারে দাও শকতি’।