দক্ষ শ্রমিকের অভাবে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ছে না

প্রকাশিত: ১২:৩১ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১, ২০১৫

জনশক্তি রপ্তানিতে দক্ষ শ্রমিককের অভাবে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের শ্রমিক সরবরাহে আশাব্যঞ্জক গতির সঞ্চার হচ্ছে না। বর্তমানে ১৬০টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি হচ্ছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের ২০টি দেশে বছরে যে পরিমাণ জনশক্তি পাঠানো হচ্ছে, তার ২০ ভাগের এক ভাগ শ্রমিকও যাচ্ছে না বাকি ১৪০ দেশে। চাহিদা থাকার পরও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ কর্মী না থাকায় এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোর বেশিরভাগই মানসম্মত নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এজন্য আন্তর্জাতিক মানে প্রশিক্ষণ সেন্টার তৈরি করে ও দক্ষ শিক্ষকদ্বারা কর্মীদের সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, ভাষা ও চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করে পাঠানোর পরামর্শ দিয়েছেন।জনশক্তি রপ্তানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনশক্তি রপ্তনিতে এখনও মধ্যপ্রাচ্যের নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারছে না বাংলাদেশ। বর্তমানে পুরনো শ্রমবাজারগুলোতে কর্মী নেয়ার পরিমাণ কমেছে। এর ওপর নতুন শ্রমবাজারের বিষয়েও খুব বেশি সফলতা চোখে পড়ছে না। কাগজে-কলমে ১৬০টি দেশে জনশক্তি পাঠানোর কথা বলা হলেও এখন ১৪০টি দেশে যে পরিমাণ কর্মী যাচ্ছে, সে সংখ্যা হাতেগোনা। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমের অন্য বড় বাজারগুলোতে প্রকৃত অর্থে সেভাবে জনশক্তি রপ্তানি হচ্ছে না। সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ইরাক, লিবিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো বড় বাজারগুলোতে জনশক্তি পাঠানোর হার খুবই ধীরগতির। জনশক্তি রপ্তানির গতি বাড়াতে সরকার ও বেসরকারিভাবে যৌথ পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের উচিত রিক্রুটিং এজেন্সির সহযোগিতায় নতুন নতুন শ্রমবাজারে প্রবেশ করা, যেন সেই বাজারে সত্যিকার অর্থেই কর্মী পাঠানো যায়।এছাড়া অন্যান্য জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকরা আমাদের দেশের শ্রমিকদের থেকে অনেক বেশি প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন ও দক্ষ। তাই চাহিদামতো শ্রমিক দিতে না পারায় তারা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে দক্ষ শ্রমিক নিচ্ছে। এজন্য কর্মীদের পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, ভাষা ও চাহিদা অনুযায়ী কারিগরিশিক্ষায় দক্ষ করে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে তবে তা মানসম্মত নয়। দেশের প্রশিক্ষণ সেন্টারগুলো আধুনিক প্রযুক্তিসহ মানসম্মনত শিক্ষকদের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয় বারবার নতুন বাজার খোঁজার কথা বললেও সেই অর্থে নতুন কোনো বড় বাজার চালু করতে পারেনি। সে কারণেই জনশক্তি রপ্তানিতে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) ওয়েবসাইট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১৬০টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৯৫ জন। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ ২০টি দেশেই গেছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪১ জন। মাত্র ১৮ হাজার ৪৫৪ জন গেছে বাকি ১৪০ দেশে। এর মধ্যে ওমানে গেছে ৮৭ হাজার ৬৫৯, কাতারে গেছে ৮৫ হাজার ৮৫৫ এবং সিঙ্গাপুরে গেছে ৪০ হাজার ৭৮৬ জন। মোট ২ লাখ ১৪ হাজার ৩০০ জন। ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার কর্মী বিদেশে গেছে। ২০০৯ সালে জনশক্তি রপ্তানি নেমে আসে অর্ধেকে, সেবার গিয়েছিল ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৮ জন। ২০১০ সালে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২ জন শ্রমিক বিদেশে যায়। ২০১১ সাল থেকে জনশক্তি রপ্তানির হার আবার বাড়তে থাকে। সে বছর যায় ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন। ২০১২ সালে যায় ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৯৮ জন। ২০১৩ সালে ফের হার কমতে থাকে। সে বছর ৪ লাখ ৯ হাজার ২৫৩ জন বিদেশে যায়। ২০১৪ সালে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন।এ প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি সংবাদকে বলেন, আমাদের জনশক্তি রপ্তানি ধীরগতি হলেও দিন দিন বাড়ছে এবং নতুন নতুন বাজার সৃষ্টি হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের চাহিদার ভিত্তিতে আমরা জনশক্তি রপ্তানি করে থাকি। তবে এবার আমরা প্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিচ্ছি। কারণ অদক্ষ শ্রমিকরা বিদেশে গিয়ে অন্য দেশের তুলনায় কম মজুরিতে কাজ করছে। ফলে অভিবাসন ব্যয় তুলতে অনেক সময় লেগে যায়।তিনি বলেন, আমরা পুরনো বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজারে কর্মী পাঠানোর চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে কানাডা, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য কথাবার্তা চলছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আগামী নভেম্বরের মধ্যে একটি জি টু জি প্লাস চুক্তি হবে। এরফলে মালয়েশিয়াতে জনশক্তি রপ্তানি অনেক বেড়ে যাবে। অন্যান্য দেশেও কর্মী পাঠানো হবে। সৌদি আরবে আমাদের নারী কর্মীর বেশ চাহিদা রয়েছে। তবে দেশে নারীদের আগ্রহ কম থাকায় আশানুরূপ সুফল পাচ্ছি না। এ দুই দেশেও পুরোদমে কর্মী পাঠানোর জন্য আমাদের মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে।প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার মো. ইফতেখার হায়দার সংবাদকে বলেন, বর্তমানে আমরা ১৬০টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি করলেও মধ্যপ্রাচ্যদেশগুলোতে বেশি কর্মী যাচ্ছে। অন্য দেশগুলোতেও বন্ধ হয়ে যায়নি তবে তুলনামূলক কম যাচ্ছে। কারণ চাহিদার ভিত্তিতে আমরা কর্মী প্রেরণ করে থাকি। নতুন চাহিদার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এজন্য বিভিন্ন দেশে আমাদের যে মিশন ও লেবার উইং রয়েছে তাদের দক্ষতা ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে নতুন বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে।তিনি বলেন, যে দেশ আমাদের কাছে চাহিদা পাঠায় তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা জনশক্তি রপ্তানি করি। এখন জনশক্তি আমদানিকারক দেশগুলোতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেশি। তাই আমরা শ্রমিকদের দক্ষ করে বিভিন্ন দেশের চাহিদা অনুযায়ী পাঠিয়ে থাকি। এজন্য ৭০টি প্রশিক্ষণ সেন্টার রয়েছে। সরকারি অর্থায়নে আগামীতে দেশের ৪৩৬টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ সেন্টার তৈরি করা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবে বিশ্বের অনেক দেশই আমাদের সার্টিফিকেট গ্রহণ করে না। সেজন্য প্রশিক্ষণ সেন্টার ও শিক্ষকদের মান উন্নয়নে আন্তর্জাতিক ট্রেনিং সার্টিফিকেট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘সিটি অ্যান্ড গিল্ডস’ এর সহায়তায় প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেট প্রদান করা হবে যা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য।নাম প্রকাশে না করার শর্তে বিএমইটি এক কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে আমাদের প্রায় এক কোটি শ্রমিক বিদেশে কর্মরত আছেন। নতুন করে যারা যাবেন, তারা যেন কম খরচে দক্ষতা নিয়ে বেশি বেতনে চাকরি নিয়ে যেতে পারেন, তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। তবে এখন আমরা সংখ্যার দিকে নয়, মানের দিকে নজর দিচ্ছি। তাই দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শ্রমিক পাঠাচ্ছি। এ বছর ৫ লাখ জনশক্তি রপ্তানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তা আমরা পূরণ করতে পারব বলে আশা করছি।জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার সংবাদকে বলেন, জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়ার মূল কারণ চাহিদামতো প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ শ্রমিক তৈরি করতে না পারা। একই সঙ্গে আমাদের দেশের কর্মীরা বিদেশে গিয়ে অপরাধমূলক কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে। আর সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত ও মালয়েশিয়ার মতো প্রচলিত বাজারগুলো আবার পুরোদমে চালু না হওয়ার কারণেই জনশক্তি রপ্তানির গতি ধীর হয়ে গেছে। আরব আমিরাতের বাজারে কর্মী যাচ্ছে খুবই কম। যুদ্ধের কারণে লিবিয়া থেকে অনেক শ্রমিক ফেরত এসেছে। অনেকে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে।তিনি বলেন, সৌদি আরব নারী শ্রমিক নেয়ার চুক্তি করলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী নারী কর্মী যেতে পারছে না। আমাদের দেশের নারীরা সে দেশে যেতে ইচ্ছুক না থাকায় এখানেও সফলতা আসছে না। তবে অন্য খাতে নেয়ার কথা থাকলেও নারী শ্রমিক না দেয়ায় সেটাও বন্ধ রয়েছে। মালয়েশিয়া লাখ লাখ কর্মী নেবে শোনা গেলেও সেখানে গত দুই বছরে জি টু জি পদ্ধতিতে মাত্র ২৪ হাজার ২৯৫ জন কর্মী গেছে। সমপ্রতি মালয়েশিয়া বিজনেস টু বিজনেস (বিটুবি) পদ্ধতিতে কর্মী নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বর্তমানে তারা জি টু জি প্লাস এর মাধ্যমে আবার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এখন এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় আলোচনা করছে।প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও দালালের অতি লোভের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি বড় শ্রমবাজার এবং মালয়েশিয়ায় জনশক্তির বাজার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কোনো দেশে ১ লাখ শ্রমিকের চাহিদা থাকলে ব্যবসায়ীরা বেশি মুনাফার জন্য সেখানে দ্বিগুণ শ্রমিক পাঠিয়ে নিজেরা লাভবান হচ্ছেন। অনেক সময় অভিবাসন ব্যয় তুলতে গিয়ে শ্রমিকদের অনেকেই নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। প্রবাসীদের অপরাধ কর্মকা-ের কারণেও কয়েকটি দেশে কর্মী পাঠানো বন্ধ আছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত আছে। বড় শ্রমবাজারগুলোতে ফের পুরোদমে কর্মী পাঠানোর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

Calendar

January 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

http://jugapath.com