দলবাজি

প্রকাশিত: ১২:৩১ অপরাহ্ণ, মে ৪, ২০১৮

দলবাজি

 

তারিক সামিন

 

উকিল জব্বার আলী খুব ঝানু উকিল। এর আগে বহু খুনের আসামিকে খালাস করিয়েছেন। তবে টাকা নেয় খুব বেশি। কিন্তু তবুও জব্বার আলীকেই বেছে নিলো মিজু মণ্ডল। তার কেস যেমন তেমন না, খুন আর ধর্ষণের মামলা এক সাথে। ফাঁসি হবার সম্ভাবনা খুব বেশি।

উকিল জব্বার আলী খুব রসিক মানুষ। হেসে প্রশ্ন করে, ‘ও মিজু ভাই, তা মাইয়াডারে মারলা কিভাবে?’ উত্তর দেয় না মিজু। শক্ত হয়ে থাকে।

ফের ফিক ফিক করে হাসে উকিল, জব্বার আলী বলে, ‘খুব সুন্দরী, মাত্র ১৯ বৎসর। ফর্সা, লম্বা। ইস্ গলার নিচে কত বড় ছুরির ঘা। হাত-পা গুলোও কাটা।

শুনে চমকে মিজু মণ্ডল। বলে ‘ভাই আমার মা-বাপ, এসব জানলেন কেমনে?’

‘পুলিশ এর কাছ থেকে ছবি দেখছি। লাশ পড়েছিল বাড়ীর পাশের ধানক্ষেতে। সে ছবিও  দেখেছি। পোস্ট মর্টামের ছবিও দেখছি। মেয়েটার সারা শরীর ক্ষত-বিক্ষত। তোমার তো ফাঁসি না, ডাবল ফাঁসি  হওয়া দরকার।’ দাঁতের ফাঁকে চিকন কাঠি দিয়ে খোঁচাতে বলছিল উকিল জব্বার মিয়া।

-ভাই এটা কি কন? আপনি আসামি পক্ষের লোক নাকি?

-আমার কোন পক্ষ-টক্ষ নাই। যে টাকা দিব তারেই জিতাই। কাজে গ্যারান্টি, খালাস হলে দশ লাখ দিবা, না হলে সব টাকা ফেরত, দৃঢ় ভাবে বললো উকিল জব্বার মিয়া। তার এই দৃঢ়তা খুব পছন্দ হয়েছিল মিজু মণ্ডলের।

হেসে উকিল সাহেবকে মিজু মণ্ডল বলেছিল:

– হে! হে! একটু ফুর্তি করতে চাইছিলাম ভাই। মাইয়া বাধা দিল। খুব জেদি। তাও কাম সারছি ঠিকই। তবে পড়ে দেখি মুখ জ্বলতেছে। নখের খামচি। মাথাটা গরম হয়ে গেল। ইচ্ছা মত  কোপাইছি। কখন যে মইরা গেল টেরও পাই নাই। এর মধ্যে দেখি ধানক্ষেতের দিকে টর্চ নিয়া মানুষ আইতাছে, তাই দৌড়াইয়া পালাইলাম।

-খামচি দিছে, আহা! খুব খারাপ কাম করছে মেয়েটা। তোমার মতো ভালমানুষের সাথে এটা করা ঠিক হয় নাই। কিন্তু পালানোর সময় তোমার মোবাইল ফোনটা পইড়া গেছিল পাশেই, টের পাও নাই?

– না ভাই!

– ইন্সপেক্টর ইদ্রিস আলী খুব সৎ আর মেধাবী পুলিশ। ঠিকই ধরে ফেললো তোমারে।

-হ, ভাই। ওই শালা ইন্সপেক্টর এর জন্যই ধরা খাইলাম। পাঁচ লাখ সাধলাম নিলো না।

প্রায় ৬ বৎসর হলো জেলে আছে মিজু মণ্ডল। এরই মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে তার জীবনে। যখন প্রথম এখানে আসে। কতই বা বয়স ছিল তার মাত্র ৩৪ বৎসর। সব চুল কাঁচা, কালো চকচকে। সুন্দর স্বাস্থ্য, ক্লিন সেভ করতো প্রতিদিন। মাত্র ছয় বছর এরই মধ্যে মাথার সব চুল পেকে সাদা ধবধবে। সেই সাথে, তার  সাদা চুল, দীর্ঘ দাড়ি। মাথায় টুপি পড়ে সবসময়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে। জেলখানার অমসৃণ মেঝেতে ঘষা খেয়ে খেয়ে কপালে কালো দাগ ফেলে দিয়েছেন মিজু মণ্ডল। আজ সেইক্ষণ, রায় ঘোষণা হবে তার মামলার। সাড়া দিন নামাজ কালাম দোয়া দরুদ পড়ে কাটালেন তিনি। খুব গরম আজ। ডান্ডাবেরি পড়ানো তার হাতে-পায়ে। তার মধ্যেও কষ্ট করে সিগারেটে ফু দিলে কয়েকটা।

মিজু মণ্ডলের কেসের রায় হবে। চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায় শুনতে, আস্তে আস্তে কোর্ট লোকে ভরে গেল মানুষে।  আসামি পক্ষের দুই উকিল ও পুলিশ এর মধ্যে খুব তৎপরতা আজ। দুই পক্ষই খুব খেটেছে। উকিল জব্বার আলী একবারও এলো না মিজু মণ্ডলের কাছে। সেদিকে খেয়াল নেই তার। জজ সাহেব রায় পড়ছে। আমৃত্যু ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ। শুনে হু হু করে কেঁদে ফেললো মিজু মণ্ডল।

ফের প্রিজন ভ্যানে তোলা হচ্ছে মজু মণ্ডলকে। এখন মনটা হালকা লাগছে তার; সব কিছু  শেষ, কোন টেনশন নাই। এমন সময় থমথমে মুখে তার দিকে এগিয়ে এলো উকিল জব্বার মিয়া। তাকে দেখে মাথা গরম হয়ে এলো মিজু মণ্ডলের।

-আমার দশ লাখ টাকার ফেরত দেন। খালাস হয় নাই। ফাঁসি হইছে। রাগান্বিত স্বরে বললো মিজু মিয়া।

– তো ফাঁসির কাজ করছো ফাঁসি হইছে। খালাসের কাজ করলে খালাস করাইতাম। এই নাও তোমার সব টাকা হাসতে হাসতে ফেরত দিল উকিল সাহেব। আর শুনে রাখ আমি নিজ পকেট থেকে টাকা দিছি ভিকটেমের উকিলকে। মেয়েটার বাবা গরিব, টাকা নাই। কেসে হেরে যেতো সে। আর তোমার মামলা আমি না নিলে আরো বড় উকিল ধরতা, তাই চালাকিটা করতে হলো আমাকে।

সব কিছু শুনে একটুও ঘাবড়ালো না মিজু মণ্ডল। তার ফাঁসি হইছে সে জন্য কোন দুঃখ নাই তার। তার মাথায় নতুন পরিকল্পনা এসেছে। সে জন্য খুব উজ্জীবিত সে।

 

এক বছর পর:

দেশে নতুন সরকার নির্বাচিত হয়েছে এক বছর। গত একটা বছর তার জীবনের সব চাইতে ভাল সময় সেটাই মনে করে মিজু মণ্ডল। জেলখানায় বসেই সরকারি দলে যোগ দিলে সে। নতুন সরকার আসার পর থেকেই তার এলাকা জুড়ে ব্যাপক পোষ্টারিং শুরু করে মিজু মণ্ডল। ‘বিগত সরকারের আতংক। সংগ্রামী কারাবন্দী নেতা মিজু মণ্ডলের নিঃশর্ত মুক্তি চাই।’ জেলায় মন্ত্রী বা এম.পি এলেই তোরণ নির্মাণ করে সে। আস্তে আস্তে এমন ত্যাগী নেতার কারাবরণের দুঃখের কাহিনী চলে গেল সরকারের হাই কমান্ডে।

ফোনে একটার পর একটা নির্দেশ আসে দল থেকে। জেলখানায় কাজ করার লোকের  অভাব নাই। কাউকে শাস্তি কমিয়ে ছাড়া পাবার ব্যবস্থা করে দিলেই সে বিশ্বস্ত হয়ে যায়। এমন বিশ্বস্ত লোকই চায় রাজনৈতিক দলগুলো। গত এক বছরে কত খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, চাঁদাবাজি করিয়েছে গুণে শেষ করতে পারবে না মিজু মণ্ডল। শুধু উকিল জব্বার আলী খুনের ঘটনাটা মনে আছে তার। মোবাইল ফোনে পুরো হত্যা দৃশ্যটা ভিডিও করে এনেছিল বিল্লু ডাকাত।

হাইকোর্টেও শাস্তি বহাল ছিল মিজু মণ্ডলের। । তবুও সব কোর্টের বড় কোর্ট সরকার। রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় আগামীকাল মুক্তি পাচ্ছে মিজু মণ্ডল। তাকে শুভেচ্ছা জানাতে গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় তোরণ নির্মাণ করেছে তার অনুসারীরা।

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com