দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ

প্রকাশিত: ১১:১৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১, ২০২১

দুর্নীতি দমনে প্রয়োজন সরকার ও জনগণের সমন্বিত পদক্ষেপ

ইমদাদ ইসলাম

দিনাজপুর তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারী খলিলুর রহমান ২০১২ সালে অবসরে যান এবং ২০১৬ সালে মারা যান।জনাব খলিলুর রহমান অবসরে থাকা অবস্থায় তার আনুতোষিক এর টাকা সংশ্লিষ্ট হিসাব রক্ষণ অফিস থেকে তুলতে গিয়ে সমস্যায় পড়েন।হিসাব রক্ষণ অফিসের কর্মকর্তা- কর্মচারীদের চাহিদা মোতাবেক অর্থ না দেওয়ায় তিনি এক লাখ বিশ হাজার টাকা কম পান। পরবর্তীতে জনাব খলিলুর রহমানের মৃত্যুর পরে তার ছেলে ফরহাদ হোসেন হিসাব রক্ষণ অফিসের অডিটর জনাব আনোয়ার হোসেন এর সাথে এক বছর ধরে দেনদরবার করে তার বাবার আনুতোষিক এর টাকা পাওয়ার ব্যবস্হা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

আনোয়ার হোসেন এ বিষয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ক্যসিয়ার জনাব ফেরদৌস হোসেনের সাথে কথা বলতে বলেন। ফেরদৌস হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি এ টাকার জন্য ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন।ঘুষ না দিলে আনুতোষিকের বকেয়া টাকা পাওয়া যাবে না মর্মে ফরহাদ হোসেনকে জানিয়ে দেন।ফরহাদ হোসেন নিরুপায় হয়ে হিসাব রক্ষণ অফিসের অডিটর জনাব আনোয়ার এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ক্যসিয়ার জনাব ফেরদৌসকে ৫ হাজার টাকা করে মোট ১০ হাজার টাকা দেন। বাকি ৩০ হাজার টাকাও পরে দিবেন বলে জানান।কিন্তু অডিটর আনোয়ার ও ক্যসিয়ার ফেরদৌসের অসহযোগিতার কারণে ফরহাদ হোসেন সমগ্র বিষয়টি লিখিতভাবে স্হানীয় দুদক-কে জানান এবং প্রতিকার চান।তথ্য পাওয়ার সাথে সাথে দুদকের একটি বিশেষ টিম হিসাব রক্ষণ অফিসে ফাঁদ পাতেন। হিসাব রক্ষণ অফিস বসে অডিটর আনোয়ার এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের ক্যসিয়ার ফেরদৌস ঘুষের ৩০ হাজার টাকা জনাব ফরহাদের থেকে নেওয়ার সময় দুদক টিম তাদের হাতেনাতে গ্রেফতার করে বিধি মোতাবেক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এ সংবাদটি গণমাধ্যমে গত ৮ অক্টোবর ২০১৯ তারিখে ছাপা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে একটি টোল ফ্রি হটলাইন ১০৬ চালু করে। দেশের সন্মানিত নাগরিকগণ দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে দুদক অভিযোগ কেন্দ্রের হটলাইন ১০৬ এ ফোন করে তাৎক্ষণিক অভিযোগ করতে পারবেন। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত ১০৬ হটলাইনের মাধ্যমে প্রায় ৪০ হাজার কল এসেছে। কমিশনের প্রশিক্ষত পাঁচজন কর্মকর্তা পালাক্রমে প্রতি ২ ঘন্টা অন্তর সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রতি কর্মদিবসে এসব ফোন কল রিসিভ করে থাকেন। অভিযোগ কেন্দ্রের সকল কার্যক্রম কমিশন থেকে ডিজিটালি পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রতি কার্যদিবসে গড়ে ৬ হাজার ৫ শত ফোন কল আসে। দুদক ফাঁদপেতে ঘুষ নেওয়ার সময় হাতেনাতে অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিতভাবে আটক করছেন। এগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলাও হচ্ছে।

২০১৯ সালে দুদক অভিযোগ কেন্দ্র ১০৬ হটলাইনের মাধ্যমে ৪ হাজার ৭৬০ টি অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে। এ সকল অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুদকের মাধ্যমে ১ হাজার ১টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এসকল অভিযানের ফলে অসংখ দুর্নীর ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়াও সংশ্লষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তায় বিতর্কিত নিয়োগ বন্ধ করা, নিম্নমানের নির্মাণ কাজ বন্ধ করা, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছন্ন করা, নদী-খাল ও সড়কের অবৈধ স্হাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। দুদকের তফসিলভুক্ত অপরাধ না হলেও অভিযোগগুলো দুদকের বিবেচনায় তদন্ত করে ব্যবস্হা গ্রহণ প্রয়োজন সে প্রেক্ষিতে দুদক থেকে বিভিন্ন দপ্তরে ব্যবস্হা গ্রহণের জন্য ৯ শত ৫৩টি পত্র প্রেরণ করা হয়েছে। দুদক অভিযোগ পাওয়ার পর সকল আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করে ৭টি ফাঁদ মামলা পরিচালনা করে ঘুষের টাকাসহ হাতেনাতে অপরাধীদের গ্রেফতার করেছে। প্রাপ্ত অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক অভিযান পরিচালনা করে পাওয়া প্রাথমিক তথ্যে সত্যতা থাকায় ১২৬টি অভিযোগের ব্যাপারে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান শুরু করেছে। এনফোর্সমেন্ট টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১১টি মামলা রজু করেছে। এখানে উল্লেখ দুদক হটলাইনের মাধ্যমে প্রতি কার্যদিবসে প্রায় ৬ হাজার ৫ শতটির মত অভিযোগ আসলেও সকল অভিযোগ দুদকের তফসিলভুক্ত না হওয়ায় দুদকের পক্ষে সেগুলো লিপিবদ্ধ করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্হা গ্রহণ সম্ভব হয় না।

দুদক তার আওতাধীন তফসিলভুক্ত বিভিন্ন অপরাধে ২০১৯ সালে ৭৮০ টি ফৌজদারি মামলা, ১১৩ টি রিট আবেদন, ১৭১ টি ফৌজদারি আপিল এবং ১৭২ টি ফৌজদারি পুনবিবেচনার জন্য বিভিন্ন আদালতে মামলা দায়ের  করেছে। ২০১৯ সালে দুদকের ১৯১ টি মামলায় ৩৭৪ জনের সাজা হয়েছে,জরিমানার পরিমাণ ৩ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকারও বেশি এবং বাজেয়াপ্ত টাকার পরিমাণ ৪ শত ৩৬ কোটি টাকার ও বেশি। দুদক শুধু অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে না, সমাজের সকল ক্ষেত্রে দুর্নীতি বন্ধের জন্য সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে সততা ও নিষ্ঠাবোধকে বিকশিত করার চেষ্টা করে। দুর্নীতি সভ্যতার প্রাচীনতম অপরাধের একটি এবং এটি বৈশ্বিক অপরাধও। দেশের দুর্নীতিবিরোধী গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে তথ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচার করে থাকে। গণযোগাযোগ অধিদপ্তর তাদের জেলা তথ্য অফিসগুলোর মাধ্যমে শাস্তি, সত্যের জয়, ভালো থাকব, ভালো রাখব, ভুল, সততার জয় নামক স্বল্প দৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র জনসমাগম হয় এমন স্হানে নিয়মিত প্রচার করে থাকে। তথ্য অধিদফতর দুর্নীতির বিষয়টি গুরুত্ব সাথে বিবেচনা করে জনগণকে তথ্য দিয়ে সচেতন করার লক্ষ্যে দুর্নীতি বিষয়ক ফিচার, তথ্য বিবরণী, কার্টুন, ইত্যাদি নিয়মিত প্রচার করে থাকে। এছাড়াও দুর্নীতি বিষয়ক গণমাধ্যমের সংবাদ সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অবহিত করে থাকে।

দুদকের পক্ষ থেকে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও মহানগর দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি করে আলোচনা সভা, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা, মানব বন্ধন, রালি, সেমিনার, নাটক, বিশিষ্টজনের বক্তৃতা ইত্যাদির আয়োজন করে থাকে। দুদকের গণসচেতনতা বিষয়ক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ সকল অনুষ্ঠানে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি, সততা সংঘ ও স্হানীয় প্রশাসন সম্পৃক্ত থাকে। ২০১৬ সাল থেকে তরুণ প্রজন্মকে বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে উত্তম চর্চা বিকাশের জন্য বিভিন্ন স্কুলে সততা স্টোর গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৯ পর্যন্ত সারাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চার হাজারেরও বেশি সততা স্টোর স্হাপন করা হয়েছে। এ সকল স্টোরে শিক্ষা উপকরণের পাশাপাশি বিস্কুট, চিপস,চকলেট ইত্যাদি পাওয়া যায়। প্রতিটি পণ্যের মূল্য তালিকা, পণ্য মূল্য পরিশোধের জন্য ক্যাশ বাক্স ইত্যাদি রয়েছে- নেই শুধু বিক্রেতা। শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ক্যাশ বাক্সে পণ্য মূল্য পরিশোধ করছে। সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ হলো এ সকল স্টোর পরিচালনায় কোনো অনৈতিকতার অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

দুদকের উদ্যোগে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সরকারি অফিসে গণশুনানির আয়োজন করা হয়ে থাকে। এসব গণশুনানির মাধ্যমে সরকারি অফিসের সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অনিয়ম, দুর্নীতি, সেবা প্রদানে দীর্ঘসূত্রতার উৎসমূল চিহ্নিত করা,সম্মানিত নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি শ্রবণের মাধ্যমে সেগুলো সেবা প্রদানকারী দপ্তর কর্তৃক নিষ্পত্তির ব্যবস্হা করা হয়। এছাড়াও এসব গণশুনানির মাধ্যমে নাগরিক অধিকার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা হয়ে থাকে। দুদকের পরিচালনায় ২০১৯ সালে ৩৮ টি গণশুনানির মাধ্যমে ১ হাজার ২৯৮টি অভিযোগ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৯৭৫টি অভিযোগ নিস্পত্তি করা হয়েছে। এখন প্রতিটি সরকারি দপ্তরে নিয়মিত গণশুনানির আয়োজন করা হয়ে থাকে। এতে সেবা প্রত্যাশী ও সেবা প্রদানকারীর মধ্যে সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেবার মান উন্নয়ন হচ্ছে।

 

দুদক ২০১৬ সালে বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও, উন্নয়ন সহযোগীসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে পাঁচ বছর মেয়াদি (২০১৭-২০২১) কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে তার ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দুদকের কার্যক্রম দিনদিন মানুষের কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে। তবে একথা ঠিক দুদকের কাছে মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। চাইলেই দুদকের পক্ষে মানুষের এই চাহিদা পূরন করা সম্ভব নয়, কারণ দুদকে আইন অনুযায়ী চলতে হয়। জনাকাঙ্ক্ষা আইনের ধার ধারে না। দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয়। দুর্নীতি মুক্ত সমাজ বিনির্মাণে মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যদি আমরা মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারি তাহলে সহজেই দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই আমাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দুদকের চলমান যুদ্ধে দুদকের পাশে থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জয়ী হতে হবে। আমারা কোনোভাবেই ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্তের সাথে বেঈমানি করে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে কতিপয় দুর্বৃত্তের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।

 

Calendar

April 2021
S M T W T F S
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930  

http://jugapath.com