দুর্বৃত্তের ছদ্মবেশে হারিয়ে যায় অপরাধীর পরিচয়

প্রকাশিত: ৯:৫১ অপরাহ্ণ, মে ১৯, ২০২০

দুর্বৃত্তের ছদ্মবেশে হারিয়ে যায় অপরাধীর পরিচয়

সুমনা সোমা

নগর পুড়লে দেবালয় এড়ায় না। আর আগুন যদি দেবালয় থেকেই ধরে তবে আর রক্ষা কী ! পৃথিবী ব্যাপী ভীষণ সংকট যাচ্ছে। আমরা কে বাঁচবো কে মরবো কেউ জানি না । অথচ এই করোনা ক্রান্তির সময়ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়া হয় শিল্পের শুভ্রতা । এর চেয়ে দুঃখের আর কী হতে পারে ! বলছি রণেশ ঠাকুরের কথা। তিনি বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের শিষ্য । রণেশ বাউলের উজান ধলের বাড়ির বাউল আসর ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে । বলা হচ্ছে দুর্বৃত্তরা ! এই দূর….বৃত্ত কারা ? ঘোচানো যায় না তাদের দূরত্ব ? ভাঙা যায় না তাদের বৃত্ত ? তাদের চিহ্নিত করা যায় না ?
ওস্তাদ শাহ্ আব্দুল করিম ও বড় ভাই রুহী ঠাকুর মারা যাবার পর ভাটী অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে যে কজন বাউল জনপ্রিয়, এরমধ্যে অন্যতম রণেশ ঠাকুর। বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিমের বাড়ি’র লাগোয়া রণেশ ঠাকুরের বাড়িতে করোনা কালের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই বাউল আসর বসতো। রণেশ ঠাকুরের বসত ঘরের উল্টোদিকে তার বাউল আসর ঘর। ওখানেই তার নিজের ও শিষ্যগণের যন্ত্রপাতি থাকতো। রোববার রাত ১১ টায় পরিবারের সকলে ঘুমোতে যান। রাত ১ টার পর রণেশ ঠাকুরের বড় ভাইয়ের স্ত্রী সকলকে চিৎকার করে ডাকতে থাকেন। অন্যরা ঘুম থেকে ওঠে দেখেন আসর ঘর পুড়ে যাচ্ছে। পরে আশপাশের লোকজন চেষ্টা করে আগুন নেভালেও পুরো ঘরই পুড়ে ছাই হয়ে যায়।রণেশ ঠাকুরের প্রায় চল্লিশ বছরের সাধনার সকল যন্ত্রপাতি, গানের বই-পত্র পুড়ে ছাই হয়েছে।

দেশে ওয়াজ মাহফিলের সিজনে অনেক হুজুরদের বয়ানে শুনেছি নারী,অন্য ধর্ম আর বাউলদের বিরুদ্ধে বিষবাষ্প ছড়াতে। তখন সামনে বসা হাজার হাজার মানুষের সমর্থনও তারা আদায় করে এসব ব্যাপারে। তাদের কিচ্ছুটি বলা হয় না কখনো । এমন কি তাদের উস্কানিতে যে সাম্প্রদায়িক শক্তি চোখের সামনেই দ্রুত বেড়ে ওঠে তা প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করে থাকে । আর সেকারণেই এসব ঘটনার পর দোষীদের একটাই পরিচয় হয় । তা হলো দুর্বৃত্ত । দুর্বৃত্তের ছদ্মবেশে হারিয়ে যায় অপরাধীর পরিচয় । বরং প্রশাসনে এসব ব্যাপারে নীরব ভূমিকাই পালন করতে দেখেছি। কখনো কখনো দেখেছি প্রতিক্রিয়াশীল আচরণও । শরিয়ত বয়াতি গান নিয়ে যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল তা গ্রহণ না করে উল্টো তার বিরুদ্ধে মামলা করে জেলে ঢুকানো হলো। কোন প্রতিষ্ঠান কখনও কাউকে স্বশিক্ষিত বানাতে পারেনা । স্বশিক্ষিত হতে হয় আত্মোপলব্ধি থেকে । বাউলরা সেই আত্মোপলব্ধির চর্চাই করে । আমরা বইয়ের পাতায় যে সরল মানুষ খুঁজি তারাই হচ্ছে বাউল। তাদের ঘর পোড়ে আবার তারাই জেলে যায় । অথচ সেই হুজুরদের কিছুই হয় না যারা ধর্মকে পুঁজি করে মিথ্যে বয়ান দিয়ে দিয়ে সমাজকে পিছিয়ে দিচ্ছে যোজন যোজন দূরে । মূর্খ আল আজহারি যখন ধর্মের নাম করে বলে, ভালোবাসা দিবসে গণধর্ষণ হবে, সেটাও রাষ্ট্রের কাছে ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য হয় না !
এই করোনা কালে ভেতরের আগুন আর বাহিরের আগুন থেকে কীভাবে রক্ষা পাবে মানুষ আমি জানি না । আমার ভীষণ কষ্ট হয় এসব দেখে দেখে ।

সুমনা সোমা ঃ অভিনয় শিল্পী