দুর্ভাবনা ও কষ্টের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন তাজরীনের শ্রমিকেরা

প্রকাশিত: ৭:৩৩ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২৪, ২০১৭

দুর্ভাবনা ও কষ্টের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন তাজরীনের শ্রমিকেরা

তাজরীন ফ্যাশনসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পাঁচ বছর পূর্তি আজ। আশুলিয়ার নরসিংহপুরে ২০১২ সালের আজকের এই দিনে নির্মম পরিহাসের শিকার হয়েছিলেন ওই পোশাক কারখানার কয়েকশ’ শ্রমিক। পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও দুর্ভাবনা ও কষ্টের স্মৃতি যেন কিছুতেই পিছু ছাড়তে চেইছে না অসহায় মানুষগুলোর। সেদিন শ্রমিকদের বাঁচার আর্তনাদ নাড়া দিয়েছিলো বিশ্ব বিবেককে। তাজরীন ফ্যাশনসের উতপ্ত আগুন কেড়ে নেয় ১১২ তাজা প্রাণ। পরে অসুস্থ হয়ে মারা যায় আরও একজন।

সেই রাতে কয়েকশ’ শ্রমিক বেঁচে ফিরলেও গুরুতর আহত হন সবাই। কেউ হারান কর্মক্ষমতা, কেউ সারা জীবনের জন্য হয়ে যান পঙ্গু। কেউ আবার হারিয়েছেন চোখের দৃষ্টি। দীর্ঘ সময় আর জীবনের কষ্টকর বাধা পেরিয়ে বেঁচে থাকার নতুন লড়াইয়ে নেমেছেন তারা। দুঃসহ স্মৃতি পাড়ি দিয়ে আহত শ্রমিকরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন প্রতিনিয়ত। ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালানো শ্রমিকদের দাবী, বিভিন্ন কারখানার মালিকদের আন্তরিকতার ঘাটতিতে তাদের এই চেষ্টায় ভাটা পড়ছে।

তাজরীনের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের যেন পথে পথে বাধা। রয়েছে শরীরের অক্ষমতায় চাকরিতে প্রতিবন্ধকতা। কারও আবার সার্মথ্য থাকলেও তাজরীনের কর্মী বলে চাকরি হয় না। পরিচয় আড়াল করে চাকরি নিলেও ভয় থাকে সব সময়। কারণ জানতে পারলে এই শ্রমিকদের নানান কৌশলে চাকুরিচ্যুত করেন কারখানা কর্তৃপক্ষ।

তাজরীনের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে বেঁচে ফিরেছেন মুন্সীগঞ্জের দম্পতি খোরশেদ আলম রবিন ও ফাতেমা বেগম। কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফটোকপি ও কম্পোজের দোকান দিয়ে ব্যবসা করছেন এই দম্পতি। তবে প্রাণে বাঁচতে পঞ্চম তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে গেলেও কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে সারা জীবনের কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন রবিন। অন্যদিকে তিন তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে যান পাঁচ মাসের অন্তঃস্বত্ত্বা ফাতেমা বেগম। মাথায় লোহার আঘাত নিয়ে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় জীবন যাপন করছেন ফাতেমা।

এত কিছুর মধ্যেও এই দম্পতির পরম পাওয়া তাদের শিশু সন্তান জান্নাতুল বেগম। দম্পতিটি জানান, ক্ষতিপূরণ যা পেয়েছি চিকিৎসার জন্য সব খরচ হয়ে গেছে। বাঁচার তাগিদে তাজরীনের পাশের এলাকায় কম্পোজ ও ফটোকপির দোকান করে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করছেন তারা। তবে যা আয় তা দিয়ে সংসার চলে না। কখনো ঘরে খাবার থাকে, কখনো থাকে না।

কথা হয় তাজরীন থেকে বেঁচে ফেরা আহত আরেক শ্রমিক বিলকিস বেগমের সঙ্গে। দীর্ঘ চিকিৎসার জন্য কোথাও কাজ করতে পারেননি। শরীর এখনো সুস্থ হয়নি। তবু বেঁচে থাকার তাড়নায় কাজের জন্য বিভিন্ন কারখানার গেটে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কাজও পেয়েছিলেন। কিন্তু কাজে অসামর্থ্যের দোহাই দিয়ে চাকরি থেকে বের করে দিয়েছে একাধিক কারখানা কর্তৃপক্ষ। বিলকিসের মতো তাজরীনের আহত অনেক শ্রমিক এখনো চাকরি পাবার আশায় ভীড় করছেন অন্যান্য কারখানার ফটকে।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক (সাভার, আশুলিয়া ও ধামরাই) ইব্রাহীম জানান, তাজরীনের শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন কারখানার মালিকের একটা ধারনা, তারা অনেক সচেতন ও শ্রমিক ফেডারেশনের সঙ্গে জানা শোনা আছে। এমনকি তারা অন্যন্য শ্রমিকদের মতো কাজ করতে পারবে না। এই জন্য তাজরীনের শ্রমিকদের কাজে নিতে চায় কারখানা মালিকরা। ভুল ধারনা থেকে কারখানা মালিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাজরীনের আহত শ্রমিকদের সমস্যা সমাধান করতে হবে।

তিনি আরও জানান, যতটুকু সার্মথ্য আছে সে অনুযায়ী কাজ বা পারিশ্রমিক দিতে পারে কারখানা কর্তৃপক্ষ।

তাজরীনের আশেপাশে মেডিকেল ক্যাম্প করে আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান এই শ্রমিক নেতা।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান জানান, তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডে আহত শ্রমিকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে সবাইকে। বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ সামর্থ্য অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারে।