দূরে যাওয়া মানেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি

প্রকাশিত: ১২:৫৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১৪, ২০১৮

দূরে যাওয়া মানেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি

জেসমিন চৌধুরী

অপুকে এয়ারপোর্ট ছেড়ে এলাম একটু আগে। বেঁচে থাকলে আবার সাত সপ্তাহ পরে দেখা হবে। পার্কিং নিয়ে ঝামেলার কারণে খুব তাড়াহুড়ো করে বিদায় দিলাম, ফেরার পথে মোটরওয়েতে উঠেই চোখে পানি এলো। বড় দেরিতে পেয়েছি বলে একটা দিনও দূরে থাকতে চাই না, তবু জীবনের প্রয়োজনে দূরে যেতে দিতে হয়।

অপু থাকলে সারাক্ষণই দু’জন মিলে কিছু একটা বাড়তি কাজে মেতে থাকি। অন্তত আমার নিজের জরুরী কাজগুলো ঠিক মত করা হয় না। এই দীর্ঘ বিরহ সেগুলো সেরে নেয়ার সুবর্ণ সুযোগ। অথচ বাসায় ফিরেই মনে হলো, এখন আমি কী করব? সবকিছু ফাঁকা লাগছে, মনে হচ্ছে আমার কিছছু করার নেই।

এমন একটা দিনে কি হান্ড্রেড হ্যাপি ডেইজ লেখা যায়? হ্যাঁ যায়। কেন, পরে বলছি।

কাল রাতে অপুকে বলছিলাম,
‘অনেক দিন দূরে থাকবে। অন্য কাউকে তো মনে ধরতেও পারে। ধরলে জানিয়ে দিও কিন্তু’।
‘সেই সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। মানুষের সম্ভাবনা অসীম’। সাথে ঘর ফাটানো স্বভাবসুলভ হাসি।
‘তা তো বটেই। সাত সপ্তাহ অনেক লম্বা সময়’।
‘তা ঠিক। তবে সাত বছর তার চেয়েও অনেক লম্বা সময়’।

ক’দিন পরেই আমাদের প্রথম পরিচয়ের সাত বছর পূর্ণ হবে। পরিচয়ের শুরু থেকেই অপু কখনো আমাকে কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। চিরদিন পাশে থাকব, এই দেব, সেই করব- এমন কিছুই বলেনি। যখনই আমি সম্পর্কের স্থায়ীত্ব নিয়ে কোনো আশংকা প্রকাশ করেছি, সে বরং তাতে সায়ই দিয়েছে- ‘হতেই পারে, এমন তো হয়, মানুষের মন খুবই বিচিত্র’।

আরো বলেছে, ‘আমি over promise and under delivery অপছন্দ করি। প্রমিস না করলে ডেলিভারির ঝামেলা নেই’।

তো, কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়নি বলেই আজ পর্যন্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কষ্টও পেতে হয়নি। অবশ্য প্রথম পরিচয়ের পর আমি বলেছিলাম
‘মনের মত একটা মানুষকে নিয়ে ঘুরব বলে টাকা জমিয়ে রেখেছি’।
‘তাই নাকি? আমারও ইচ্ছা ছিল তেমন কাউকে পেলে তাজমহল দেখতে যাব। ভালোই হলো, তোমার টাকায় ঘুরে আসা যাবে’।

গত সাত বছরে টুকটাক ঘোরাঘুরি আমাদের কম হয়নি। কিন্তু অসম্ভব দায়িত্ববান এই মানুষটা সব সময় কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে বলে ইন্ডিয়া যাওয়ার মত লম্বা সময় এখনো বের করতে পারিনি আমরা। এ নিয়ে কম খোটা দেইনি অবশ্য। আমার জমিয়ে রাখা টাকাটাও এতোদিনে এদিক সেদিক খরচ হয়ে গেছে।

আজ যাওয়ার বেলা এই প্রথম প্রমিস করেছে অপু। তাও একটা নয়, তিন তিনটা শক্ত প্রমিস এক সাথে। প্রমিসগুলো কী তা বলছি না কারণ যদি না রাখতে পারে! ডেলিভারির পরই শেয়ার করব।

সাত সপ্তাহে এক হাজার এক শত ছিয়াত্তর ঘন্টা হয়। এখন আমি ঘন্টা গুনতে বসব। জীবনে যদি এমন একটা মানুষ থাকে, যার জন্য ঘন্টা মিনিট মূহুর্ত গোনা যায়, সেই মানুষটার দূরে যাওয়াও অনেক আনন্দের। এক্ষেত্রে দূরে যাওয়া মানেই ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি।

(বিঃদ্রঃ এতো ভালো ভালো কথা শুনে আমার জীবনকে ফুলের বিছানা মনে করার কোনো কারণ নেই। রঙ বেরঙের হাজারো ফুল ফুটে আছে বটে, তবে সেগুলো ফোটাতে কম কাঁটার আঘাত সইতে হয়নি, সেটা মনে রাখতে হবে। এখনো যে কাঁটা নেই তা নয়, তবে আমি শুধু ফুলের কথাই বলতে চাই।)