দেবী দুর্গা কালান্তরে ঘরের মেয়ে

প্রকাশিত: ৯:৪০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৩, ২০২১

দেবী দুর্গা কালান্তরে ঘরের মেয়ে

শেলী সেনগুপ্তা
শরতের মনপ্রাণ মাতানো কাশবন, আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা এবং শিউলি ফুলের শুভ্রতা দেবী দুর্গার আগমনী সংবাদ জানান দেয়। শরতের শুভক্ষণে মা দুর্গা আসেন অফুরাণ আনন্দের বার্তা নিয়ে। কখনোই এর ব্যতিক্রম হয় না।
সর্বস্তরের শ্রেণি, পেশার মানুষের সুখ, শান্তি, আনন্দ ও ভালোবাসার সমন্বয়ে বর্ণিল আবহে চলে মায়ের পুজার আয়োজন।
বলা হয়ে থাকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় শ্রী দুর্গা পূজা। পাঁচদিন ব্যাপি দুর্গোৎসবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দশভুজার রাঙা চরণে মনবাসনা পুরণের আকুল প্রার্থনা নিবেদন করে, চায় সুখ,শান্তি,সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু।
শারদীয় দুর্গোৎসব শুধু উৎসব নয়, মহোৎসব। ধর্মচেতনা, আধ্যাত্মিক অনুভূতি, সংস্কৃতি চর্চা, সামাজিক সম্প্রীতির বন্ধন এবং হাজার বছরের বাঙ্গালির ঐতিহ্যকে সমন্বিত করে এই শারদ উৎসব।
শারদোৎসব বাঙ্গালির উৎসব। ‘ধর্ম যার যার , উৎসব সবার’, তাই জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সবাই এ আয়োজনে অংশ নেয়। তাই দুর্গাপূজাকে বলা হয় সার্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব।
দেবী পূজার মূল উৎস সনাতন ধর্মের আদি শাস্ত্র বেদ। যেখানে দেবীকে শক্তি রুপে বর্ণনা করা হয়েছে।
এ শক্তির দু’টি রুপ, একটি আধ্যাত্মিক রুপ অর্থাৎ মাতৃসাধকগণ আদ্যাশক্তির আরাধনা করে অন্তরের কাম, ক্রোধ, রিপু ও ইন্দ্রিয় জয় করে মুক্তি লাভ করে।
অন্যটি আধিভৌতিক রুপ, যাঁর পূজা বন্দনা করে দেশ ও সমাজকে আলোর পথ দেখান, দেশকে শত্রুমুক্ত করার শক্তি অর্জন করেন। এটি শুধু শারীরিক অর্জন নয়, মানসিকও। এতে মনের জগত আলোকিত হয়।
বর্তমানে যে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হয়,এই উৎসবকে সবাই রামায়ণে বর্ণিত দুর্গা পূজার রূপ বলে মনে করেন। অযোধ্যাপতি রাম ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার। চৌদ্দ বছর বনবাসকালে তাঁর স্ত্রী সীতাকে দৈত্যরাজ রাবণ অপহরণ করেন। রাবণের কবল থেকে সীতাকে মুক্ত করার জন্য রাম দৈত্যরাজ বধ করার সিদ্ধান্ত নেন। ভগবান রামচন্দ্র রাবণের প্রাণনাশে সাফল্য অর্জন করার জন্য দেবী দুর্গার কৃপা কামনা করেন ও সেজন্য তিনি আদ্যাশক্তি দেবী দুর্গার আরাধনা করেন। ঐতিহ্যগতভাবে দেবী দুর্গা বসন্ত ঋতুতে পূজা হতো। কিন্তু যুদ্ধ বিজয়ী হওয়ার জন্য রামচন্দ্র শরৎ ঋতুতে দেবীর পূজা করে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।
তারপর থেকেই বাঙ্গালি সম্প্রদায়ের মধ্যে শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজা প্রচলিত হয়। শরৎকালীন দুর্গাপূজা শারদোৎসব নামে পরিচিত হয় এবং সমস্ত বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে বৃহদাকারে পালিত হয়। বসন্তকালের দুর্গাপূজার আর শরৎকালের দুর্গাপূজার মন্ত্র এবং উপাচারে কোনো তফাৎ নেই। তবে বসন্তকালের পূজায় কোনো বোধনের বিধান না থাকলেও শরৎকালের দুর্গাপূজায় বোধনের প্রয়োজন হয়। বসন্তকালীন দুর্গাপূজা বাসন্তী পূজা নামে পরিচিত যা ঐতিহ্যগতভাবে মূল দুর্গাপূজা হলেও শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপনের উন্মাদনায় তার প্রচলন সীমিত হয়ে এসেছে।
তবে একথাও ঠিক যে, পৌরানিক কাহিনি থেকে দুর্গাপূজার শুরু হলেও দুর্গা ক্রমশ আমাদের ঘরের মেয়ে হয়ে উঠেছে। মেয়েটি খুবই সাধারণ, খুবই ঘরোয়া কিন্তু দাপুটেও। দাপুটে মেয়েটির একই অঙ্গে কতই না রুপ, কতই না নাম তার। যার যা মন চায় সে নামে ডাকে। তাতে একটুও আপত্তি নেই মেয়েটির। কেউ ডাকে উমা, কেউ ডাকে ভবতারিণী, কেউ গৌরী। নিজের কাজের সাথে নামের সামঞ্জস্য রেখেই নামকরণের সার্থকতা খুঁজে নিয়েছে মেয়েটি। সতী, কল্যাণী, অদ্রিজা, অম্বিকা, চন্ডী নামের আমাদের ঘরের মেয়েটিকে দেবতারা অস্ত্র দিয়ে সাজিয়েছিলো। তার কাছে সাহায্য চেয়েছিলো অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটানোর জন্য। বাঙ্গালি মনের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার উপাচারে সৃষ্ট দুর্গা নামের মেয়েটি বধ করেছিলো অসুর নামের সামাজিক অপশক্তির। সমাজের জন্য ক্ষতিকারক শক্তির প্রতীক অসুর, যার বিনাশ হয়েছিলো আমাদের কাছের মানুষ, আমাদের ঘরের মেয়ে দুর্গার হাতে, যার দশ হাতে দশ রকমের অস্ত্র। তার ডান হাতে ত্রিশূল, খড়গ ও চক্র; বাম হাতে শঙ্খ, ঢাল, কুঠার, ঘন্টা।
দেবী দুর্গাকে শিব দিলেন ত্রিশূল, বিষ্ণু দিলেন চক্র, ইন্দ্র দিলেন তীর ধনুক, তরবারি, ঢাল, বিষধর সর্প, তীক্ষ্ন কাঁটাওয়ালা শঙ্খ, বিদ্যুৎবাহী বজ্র শক্তি এবং একটি পদ্মফুল। দেবতাদের দেয়া অস্ত্র দিয়ে অসুরের মৃত্যুর মাধ্যমে স্বর্গ, মর্ত্য, পাতালে শান্তি ফিরে এলো। স্বর্গের দেবতারা দেবী দুর্গার নামে জয়ধ্বনি করিলেন। এভাবেই যুগে যুগে বিজয়ী হলো নারী শক্তি কিংবা মাতৃশক্তি।
দুর্গাপূজার মাধ্যমেই বাংলা সংস্কৃতিতে নারীর ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, দুর্গাকে মাতৃরূপে বর্ণনার মাধ্যমে প্রধানত নারীর চিরন্তন মাতৃরূপকে মূল্যায়ন করা হয়েছে, দুর্গা কর্তৃক অসুর বধের মাধ্যমে নারীকে মহাশক্তির আধার রূপে চিত্রিত করা হয়েছে।
দুর্গাকে বলা হয়েছে সৃষ্টির প্রতীক, সমৃদ্ধির প্রতীক, সুরক্ষার প্রতীক, হিন্দু মিথলজিতে দুর্গার আদলেই নারীকে চিত্রিত করা হয়েছে।
নারী সৃষ্টির প্রতীক, নারী সন্তান জন্ম দেয়, সন্তানের মুখে আহার তুলে দেয়, সন্তানকে প্রতিকূলতা থেকে সুরক্ষা করে, ফসল ফলায়, নারী সংসার গড়ে, সমাজ গড়ে, সমাজ-সংসারকে সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষাও করে, নারী বিপন্নকে আশ্রয় দেয়, নিরন্নকে অন্ন দান করে, এভাবেই নারী হয়ে ওঠে দুর্গার প্রতিমূর্তি।
দেবী দুর্গার ৯ টি রূপ। নবম রূপটি হল পতিতা বা ব্রাত্য রূপ। যেমন ১) নর্তকী ২) কাপালিক ৩) ধোপানী ৪) নাপিতানী ৫) ব্রাহ্মনী ৬) শূদ্রানী ৭) গোয়ালিনী 8) মালিনী ও ৯) পতিতা।
দুর্গাপূজায় সবাইকে সামিল করতে হয়। এখানেই সমাজের সাম্যতার বিকাশ ঘটে।
তাছাড়া দুর্গাপূজার মূল উদ্দেশ্য সমগ্র নারীজাতিকে সম্মান প্রদর্শন। সেক্ষেত্রে পতিতাও নারী, যে নিজের মধ্যে সমাজের বিষ ধারণ করে। তাই তাকেও সম্মান দেখানোর রীতি প্রচলিত আছে।
পুরুষ পতিতার বাড়ি গিয়ে অবৈধ যৌনাচার করে নিজের জীবনের সব পূণ্য পতিতার বাড়িতে রেখে আসে। এভাবে বহু পুরুষের পূন্য ত্যাগে পতিতার বাড়ি হয়ে ওঠে পূণ্যময়। তাই পতিতার বাড়ির মাটিও লাগে দুর্গাপূজাতে।
এর দ্বারা মানুষকে দু’টি শিক্ষা দেয়া হয়-
প্রথমতঃ নারী কখনো অপবিত্র হয় না। নারী মায়ের জাতি। নারীর গর্ভে পুরুষের জন্ম। নারীকে পতিতা বানায় পুরুষরাই। তাই ঐ পুরুষরাই অপবিত্র। মায়ের প্রতিমা তৈরীতে পতিতালয়ের মাটি দেওয়ার মাধ্যমে এটাই বোঝানো হয়েছে যে তাঁরা পরিস্থিতির শিকার তাঁদের সন্মান করতে হবে। বিশেষ করে যারা ধূপের মত পুড়ে পুড়ে সমাজকে রক্ষা করে চলছে। বোঝানো হয়েছে, নারী কখনো অপবিত্র হতে পারে না।

দ্বিতীয়তঃ যে সব পুরুষ ঐ নারীদের পতিতা হতে বাধ্য করেছে , সেই সব পুরুষরাই অপবিত্র। পতিতার ঘরে গিয়ে অবৈধ যৌনাচার করে নিজের জীবনের সমস্ত পূণ্য বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। জীবনে সব ক্ষেত্রে সংযম প্রয়োজন।

নারী শক্তিরই প্রতীক। পতিতাও সমগ্র নারীজাতিরই প্রতিভূ। তাই দুর্গাপুজোয় অষ্টকন্যার ঘরের মাটি নেবার প্রথা আছে। তবে আমরা জানি, নবম কন্যা হিসেবে পতিতালয়ের মাটিও মূর্তি তৈরির সময় ব্যবহার করা হয়। শুধু তাই নয়, দুর্গার মহাস্নানে পতিতালয়ের মাটি লাগে।
সেই নব-কন্যার সন্নিবেশে যে দেবীর আগমন ঘটে তার পূজা হয় পাঁচদিন, তারমধ্যে-
ষষ্ঠী পূজার দিনে নারীরুপ দেবী দুর্গা চার ছেলেমেয়ে গণেশ, লক্ষ্মী, কার্তিক ও সরস্বতীকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। এই পৃথিবীই দেবীর পিত্রালয়।
এদিন সন্ধ্যায় কুমোর তুলির টানে দেবীর চোখ আঁকেন। এ অনুষ্ঠানকে বলে হয় ‘দৃষ্টিদান’। তারপর ‘কল্পারম্ভ’, ‘ বোধন’, ‘আমন্ত্রণ’ ও ‘অধিবাস’।
সপ্তমীদিনের সকালে নয় ধরনের বৃক্ষচারা পূজার মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতীকী পূজা করা হয়। দেবী দুর্গার সাথে প্রকৃতির নিবিড় যোগসূত্র রয়েছে। এ পূজা এটাই প্রমাণ করে।
অষ্টমীদিনের পূজাতে কুমারী পুজা করা হয়। দেবী দুর্গা এক কুমারী কন্যারূপেই দেবতাদের সামনে আবির্ভূতা হয়েছিলেন, তাই তিনি কুমারীরূপেই আখ্যায়িত। কুমারী পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয় । তাকে সাজানো হয় ফুলের গহনা ও নানাবিধ অলঙ্কারে। পায়ে আলতা, কপালে সিঁদুরের তিলক, হাতে ফুলের বাজুবন্ধ, কুমারী মেয়েটি যেন সত্যিই দেবীর প্রতিরূপ। মন্ডপে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তার পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানাবিধ উপাচার।
অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে ১০৮টি পদ্মফুল এবং ১০৮টি প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধিপূজা করা হয়। কথিত আছে এই ক্ষনেই দেবী দুর্গা কালীমূর্তির রুপ ধারণ করেছিলেন এবং অসুর বধ করেছিলেন।
সন্ধিপূজা শেষ হলেই শুরু করতে হয় নবমীপূজা। নবমীপূজাতে দেবীকে অন্নভোগ দেয়া হয়। তারপর সন্তানেরা পঙক্তিভোজে বসে। এ ভোজনে সমাজের সবার জন্য একই খাবার নির্ধারিত থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো মায়ের দৃষ্টিতে সব সন্তানের সম অবস্থান। আবার এর মাধ্যমে দেবী দুর্গার নারীরুপ, মাতৃরুপ এবং কন্যারুপের প্রকাশ ঘটে।
নবমী পূজার শেষে বাঙালীর হৃদয়ে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। উমা আজ চলে যাবে পতিগৃহে। উমা এখন আর শুধু মেনকা-কন্যা নন, সমস্ত বাঙালী পরিবারের কন্যা। তাই তাঁর চলে যাবার মুহূর্তে সবারই মন ভারাক্রান্ত। মেয়ের সঙ্গে দেখা হবে সেই এক বছর পরে। এয়োস্ত্রীরা অশ্রুসজল নয়নে দেবী বরণের সাথে সাথে মাকে বিদায় জানায়। তাদের আকুল মিনতি মা আবার আগামী বছর এসো।
পাশাপাশি দেখা যায় দশমী তিথিতে ‘বিজয়া দশমী’ পালিত হতে। এদিন থাকে না জাত-পাতের বাছবিছার, থাকে না কোনো শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ। পরস্পর পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানায়। একে অপরকে মিষ্টিমুখ করায়।
দশমী তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় স্ত্রী লোকাচার ‘দেবী বরণ’। মা-দুর্গা চলে যাচ্ছেন। মেয়ে উমা চলে যাচ্ছেন পতিগৃহে। চির আয়ুষ্মতী উমাকে বিদায় জানাতে পাড়ার সধবা রমণীরা আসেন পূজা-প্রাঙ্গনে। একে একে তাঁরা উমাজ্ঞানে মা-দুর্গার সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন এবং সেই অক্ষয় সিঁদুর নিজেদের সিঁথিতে ধারণ করেন। মা-দুর্গার মুখে তুলে দেওয়া হয় মিষ্টি আর পান। এরপর এয়ো-স্ত্রীরা নিজেদের মধ্যে একে অপরের সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেন। এই সিঁদুর পরিয়ে দেওয়াকে বলা হয় ‘সিঁদুর খেলা’। দেবী বরণের সঙ্গে শেষ হয় বাঙালীর দুর্গোৎসব।
যুগে যুগে দেবী দূর্গা পৃথিবীতে এসেছেন, নানা রুপে নানা কারণে। যখনই দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের ব্যাপার আসে তখনই আগমন ঘটে দেবী দুর্গার।
প্রকৃতপক্ষে ন্যায়-অন্যায় ,সত্য-মিথ্যা সবই মানুষের মনে। যখনই দরকার হয় তখন মানুষ আপন পছন্দে তাকে আরোপ করে। বিজয়ী হয় জাগ্রত বিবেক। এই বিবেকই মা দুর্গা।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

October 2021
S M T W T F S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31