দেশপ্রেমের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে কভিড-১৯ মোকাবিলা করুন

প্রকাশিত: ৫:৪৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২০, ২০২০

দেশপ্রেমের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে কভিড-১৯  মোকাবিলা করুন


খছরু চৌধুরী

১৯ এপ্রিল পর্যন্ত ২৩৮২৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে রোগী সনাক্ত হয়েছে ২৪৫৬ জন, সুস্থ হয়েছেন ৭৫ জন এবং মারা গেছেন ৯১ জন। সরকারী তথ্যের বাইরেও কভিড-১৯ এর লক্ষণ নিয়ে মারা যাবার বেশকিছু সংখ্যা পত্রিকার খবরে আসছে। বৈশ্বিক আক্রান্ত ২৩ লাখ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু দেড় লাখের অধিক। কত আক্রান্ত হবেন আর কত মারা যাবেন – তা’ কেউ জানে না। দেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ইতিপূর্বে সারাদেশ করোনা ঝুঁকিতে থাকার ঘোষনা দেওয়া হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মীবাহিনী পরস্থিতি মোকাবেলায় ও কভিড-১৯ প্রতিরোধে কাজ করছেন। জনগণকে লকডাউনে, সন্দেহজনকদের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে এবং আইসোলেশনে রেখে কভিড-১৯ প্রতিরোধী কার্যক্রম সরকারীভাবে আরো বেশী জোরদার করা হয়েছে। আক্রান্তদের কভিড-১৯ চিকিৎসা কেন্দ্রে এনে অসুখ ছাড়ানোর প্রচেষ্টা চলছে। দেশে কভিড-১৯ আক্রান্তদের সনাক্ত করণে ১৯ জায়গায় পরীক্ষার ব্যবস্থাকরণ নিশ্চিত করা হয়েছে। বসুন্ধরার ৫ হাজার সীটের করোনা চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র তৈরী করা-সহ সরকারের অন্যান্য হাসপাতালের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি লক্ষ্যণীয়।

উপরের বর্ণনায় কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় সরকারের প্রস্তুতির একটা সাধারণ ধারণা মিলেছে। এই প্রস্তুতির সাথে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-মানসিক কাঠামোর সমন্বয় করে আরও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ সমীচীন বলে মনে করছি। যেগুলো হবে লাগসই ব্যবস্থাপনারই সহজলভ্য অংশ। তার আগে এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা বা স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করার চিকিৎসা সম্ভাবনা নিয়ে সম্যক ধারণা থাকার প্রয়োজন। আমরা জানি যে, সার্স-কভ-২ যে ভাইরাসটাকে কভিড-১৯ নামে ডাকা হচ্ছে, এর উপশমের কার্যকর কোনো ওষুধ নেই। কিন্তু বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা ওষুধ বের করার জন্য প্রাণান্ত গবেষনা চালিয়ে যাচ্ছেন। গার্ডিয়ানের খবরে জানা যায়, ইউকের ১৬৫-টি হাসপাতালে অক্সফোর্ডের প্রফেসর পিটার হার্বির নেতৃত্বে ৫ হাজার রোগীর উপর করোনা প্রতিষেধকের ট্রায়াল চলছে – একে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ট্রায়াল বলে মনে করা হচ্ছে।


পুরো মানব সভ্যতাকে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন-যাপনের স্বাভাবিকতাকে ওলোটপালোট করে দিয়েছে যে শত্রু, তাকে সেন্টার করে সকল-পর্যায়ে বিভ্রান্তিরও শেষ নেই। একদিকে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ডাক্তাররা উপযুক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি ছাড়াই কিছু ওষুধ কাজে আসতে পারে ভেবে ব্যবহার করছেন। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ ইমিউনিটি বাড়ে এমন সব জিনিসকে ওষুধ ভেবে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় যুক্ত করছেন – যার ফায়দা নিচ্ছেন অসৎ ব্যবসায়ীরা। আমাদের দেশে ত কেউ কেউ স্বপ্নে পেয়ে করোনার ওষুধ আবিস্কার করছেন, নবী-রসুলের উদ্বৃতি দিয়ে কালোজিরা বিতরণ করছেন। কিন্তু পিটার হার্বি মনে করছেন, আগামী জুনের ভেতরেই একটা ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। যদি কোনো সুস্পষ্ট উপকার লক্ষ্য করা যায় তাহলে হয়ত একটা সমাধানও পাওয়া যেতে পারে। তবে, কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রে কোনো ধরণের ম্যাজিক বুলেট আশা না-করার কথাও বলেছেন তিনি। অনেকে কোনো ড্যাটা ছাড়াই অমুক-তমুক ওষুধের প্রয়োগে অসুখ নিরাময়ের সাফল্য দাবি করলেও হার্বি বলছেন, এগুলোকে বিশ্বাস করা যায় না। কারণ – তাদের একমাত্র প্রমাণ হচ্ছে এগুলো সেবন করে কিছু মানুষের করোনা সেরে গেছে। হার্বি বলছেন, এগুলো কোনো প্রমাণ নয়; কিছু মানুষের করোনাভাইরাস কিছু সেবন না-করলেও সারবে। প্রয়োজন হচ্ছে ক্লিনিক্যাল ড্যাটা-সহ প্রমাণ দাখিল করা – যা তারা করবার চেষ্টা করছেন। তাহলে হার্বির আলোচনা এইটাই প্রমাণ করে যে, চোঁখ-কান খোলা রেখে জানা-বুঝার বিকল্প নেই।
ভাইরাস বিষয়ে পৃথিবীর নামকরা বিশেষজ্ঞের একজন ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কভিড-১৯-বিষয়ক দূত ডেভিড নবারো গত সপ্তাহে গার্ডিয়ান পত্রিকায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “মানুষকে করোনা ভাইরাসের ঝুঁকির সাথে মানিয়ে নিয়েই বেঁচে থাকা শিখতে হবে। কারণ খুব শিগগির সাফল্যের সাথে এর ভ্যাকসিন বের করা যাবে বলে নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। জনগণ যেন ধরে না নেয় যে অতি দ্রুত নিশ্চয়ই ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। বরং তাদেরকে এই চলমান ঝুঁকির সাথে মানিয়ে নিয়েই চলা শিখতে হবে। সব ভাইরাস রোধ করার জন্য নিরাপদ এবং কার্যকর ভ্যাকসিন তৈরি করা যাবেই-যাবে তা কিন্তু নয়। কিছু কিছু ভাইরাস খুব বেয়ারা, এদের ভ্যাকসিন বের করা আসলেই কঠিন।” তার মানে দাঁড়ায় – আমাদেরকে কভিড-১৯ প্রতিরোধের সম্ভাব্য সবধরণের আয়োজন নিয়ে প্রস্তত থাকতে হবে। এর মধ্যে অতি শৃংখলার সাথে সন্দেহজন ভাইরাস বহনকারীদের চিহ্নিত করা ও তাদের নমুনা পরীক্ষণের ব্যবস্থাপন করা হবে প্রথম কর্তব্য। দ্বিতীয় প্রধান কর্তব্য হবে, চিকিৎসা প্রস্তুতির তুলনায় রোগী বেশী হলে তার জন্য রোগী ব্যবস্থাপনের একটা সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য পন্থা অবলম্বনে পদ্ধতি গ্রহণ ও স্বাস্থ্যবিভাগীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারের সহযোগিতার মাধ্যমে ইহা বাস্তবায়ন করা। এই বিবেচ্য বিষয়গুলো আমলাতান্ত্রিক চিঠি চালা-চালির গতিতে সম্পন্ন করলে হবে না। করতে হবে ডিজিটাল গতিতে, উপরের নির্দেশ নীচের স্তরে পৌঁছে দিতে হবে টেলিফোনে ও মাস-মিডিয়ার মাধ্যমে। নীতি-নির্ধাকদের সকল-স্তরে সবসময় স্মরণ রাখতে হবে, শুধু আমরা নয়, সারা বিশ্ব-ই একটা জরুরী দুঃসময় পার করছে। এখানে প্রয়োজনে ২৪ ঘন্টা সার্ভিসের মন-মানসিতা নিয়ে কয়েকটা দিন কাজ করতে হবে। আক্রান্ত রোগী-সংখ্যা প্রস্তত ক্যাপাসিটির তুলনায় বেশী হলে – বয়স, রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে হাসপাতালে বা নির্ধারীত কভিড-১৯ নিরাময় কেন্দ্রে প্রেরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা বাড়ীতে থাকার মত তাদেরকে এবং তাদের পরিবারের মধ্যে কভিড-১৯-বিষয়ক স্বাস্থ্যবিধি পালনের ব্যবস্থা করতে হবে। জনগোষ্ঠীতে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে এমন সব খাবারের ধারণা দিতে হবে এবং এগুলো গ্রহণেও অভ্যস্থ করতে হবে।
উপরোক্ত ধরণের ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নে দু’টো জিনিস চাই – একটা কর্মীদের ধৈর্য্য ও সাহস; অন্যটা মানবপ্রেম ও দেশপ্রেমের জাগ্রত চেতনা। এমনও শুনা যাচ্ছে যে, কভিড-১৯ নিরাময়ের কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসকেরা, স্বাস্থ্য-কর্মীরা ভয়ে-ভয়ে কাজ করছেন। আবার কোন কোন মহল এই নিয়ে ব্যবসার ফন্দিও আটছেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণার পর, এগুলো মোটেই গ্রহণ যোগ্য নয়। গ্রহণ যোগ্য পন্থা হলো:- নিকট অতীতে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ডেঙ্গু-নিয়ন্ত্রণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে, দ্রুততর সময়ে উপরোক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মীর নেতৃত্বে কমিউনিটিতে, গ্রামে-গ্রামে, শহরে-শহরে নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসংখ্যায়/গ্রাম/পাড়া/ওয়ার্ডে ২৪ ঘন্টা দেখভালের আয়োজন সম্পন্ন করা। একদল স্বাস্থ্যকর্মী যেভাবে কাজ করবেন হাসপাতালে, তার সমান্তরালে অন্যদল স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করবেন কমিউনিটিতে। মাঠে বা কমিউনিটিতে নিরন্তর কাজের জন্য প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা অতি-অপ্রতুল থাকায় (কারণ- জাতির জনক বঙ্গবন্ধু সরকার আমলের পর প্রয়োজন থাকা-সত্ত্বেও প্রিভেন্টিভ স্বাস্থ্যকর্মীর একটি পদও বাড়ানো হয়নি) দেড় থেকে ২ লাখ স্বেচ্ছা-স্বেবীর প্রয়োজন হবে। এরকম জনস্বাস্থ্য সংরক্ষণের কাজে স্বেচ্ছা সেবকের দায়িত্ব পালন করার মত দক্ষ-জনবলও আমাদের আছে। এরা হচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশিক্ষিত ১ লাখ ৪০ হাজার পল্লী চিকিৎসক ও গ্রাম-শহরের শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে। এদেরকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তালিকাভূক্ত করে কাজে নিয়োজিত কাজে লাগানোর এখন-ই উপযুক্ত সময়। ৩ থেকে ৫ সদস্যের সমন্বিত কভিড-১৯ প্রতিরোধ টিম গঠন করে দেশের সর্বত্র (গ্রামে ও শহরে) ছড়িয়ে দিয়ে পুরো বাংলাদেশটাকেই কভিড-১৯ প্রতিরোধী নেটওয়ার্কের আওতাধীন করা সম্ভব এবং এতে ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ সীমিত থাকবে। (২০.৪.২০)

লেখক: স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ, জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কলামিস্ট এবং স্বাধীনতা সেনিটারিয়ান পরিষদের সাংগঠনিক উপদেষ্টা।

ছড়িয়ে দিন