ধর্ম অথবা বিজ্ঞান একে অন্যের সাথে যুদ্ধ করে না

প্রকাশিত: ৭:৫৭ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২০

ধর্ম অথবা বিজ্ঞান একে অন্যের সাথে যুদ্ধ করে না

জান্নাতুন নঈম প্রীতি

সেই আসানসোলের ইমামকে মনে আছে? ত্রিশূলের আঘাতে যার ছেলের কলিজা বের করে নিলেও যে দাঙ্গা এড়াতে ক্ষমা করে দিয়েছিল হত্যাকারীদের? রোজা মানে হচ্ছে সংযম। অথচ প্রতিটা রোজায় যৌন সুড়সুড়ির মতো ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিতে আগেই আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়- তুমি রোজা আছো?

আমি ব্যক্তিগতভাবে ধর্ম পালন করি না। কিন্তু আমার বাবা-মা করে। আমি রোজা উপলক্ষে না খেয়ে থাকি। এটার নাম সহনশীলতা, আমি তাদের গিয়ে ডিস্টার্ব করি না, তারাও আমাকে না। ধর্ম এতোটাই ব্যক্তিগত ব্যাপার যে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করাও একটা চূড়ান্ত মাত্রার আহাম্মকি! আমার ধর্ম পালন দিয়ে কার কী?

জুয়ার আরেক নাম পাশা খেলা। ইসলাম ধর্মে জুয়া নিষিদ্ধ। অথচ লেখক হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিলো লাসভেগাসে গিয়ে জুয়া খেলা। পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ যাকে বলা হয় সেই বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটা বাণী আছে- গড ডাজ নট প্লে ডাইস(ঈশ্বর পাশা খেলেন না)। আপনার মনে হতে পারে- ঈশ্বর তাহলে কী নিয়ে খেলেন?

মানুষ মঙ্গলে বসতি স্থাপনের চিন্তা করছে অনেক আগে থেকেই। ধরুন মঙ্গলগ্রহে চাঁদ দুইটা- ডিমোস এবং ফিবোস। আকাশের রঙ গাঢ় গোলাপি। এখন চাঁদ ওঠার সাথে হিসাব করলে মঙ্গলগ্রহে রোজার হিসাব কেমন করে হবে? মানুষ যখন মঙ্গলে বসতি স্থাপন করবে তখন রোজা হবে কোন চাঁদের হিসাবে? ডিমোস না ফিবোস?

জ্বি হ্যাঁ, কাউকে দুম করে নাস্তিক বা আস্তিক বলার আগে বুঝতে শেখেন তার কথায় কী কী লজিক আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম বিজ্ঞানী যাকে বলা হয় সেই ইবনে সিনা স্কুলে যাবার পরে প্রথম শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিলেন- মহাবিশ্ব সৃষ্টির আগে সৃষ্টিকর্তা কী করতেন?

ইবনে সিনার কয়েক মাস থাকা লেগেছে জেলখানায় নাস্তিকতার অপরাধে। আল রাজি থেকে শুরু করে মুসা আল খারিজমী নামক মুসলিম বলে অবহিত প্রায় প্রতিটি বিজ্ঞানীই নাস্তিকতার অভিযোগ মাথা পেতে নিয়েছেন।

ইসলামে গান-বাজনা হারাম অথচ এই মুহূর্তে ভারতবর্ষের সবচেয়ে বিখ্যাত সুরকার এ আর রহমান নিজেই নিজের নাম রেখেছিলেন AR মানে আল্লারাখা রহমান, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ থেকে শুরু করে হালের রাহাত ফতেহ আলী খান সবাই আইডেন্টিটিক্যালভাবে মুসলিম। ইসলামে কবিদের নিয়ে ভয়াবহ সব সূরা আছে, অথচ প্রত্যেকটা সূরাই একেকটা কবিতা! এর থেকে ভয়াবহ আয়রনি কী আছে?

ইসলামে নারী নেতৃত্ব হারাম। শফি হুজুররা নারীদের তেঁতুল বলে ডাকে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে আয়েশা বা ফাতেমারা নানানভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কখনো হাদিসের তর্জমা করে, কখনো সাহাবীদের যুদ্ধে অস্ত্র চালনার ট্রেনিং দিয়ে।

ইসলামের ইতিহাস নিয়ে নাদিয়া এবোট, আলী দস্তি তামীম আনসারী আর ক্যারেন আর্মস্ট্রংয়ের গবেষণাপত্র আর গ্রন্থগুলিতে দেখা যাচ্ছে- ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি হাদিসের তর্জমা করেছেন একজন নারী, যাকে ডাকা হতো ‘জুয়েল অব মদিনা’ সেই আয়েশা।

ধর্ম অথবা বিজ্ঞান একে অন্যের সাথে যুদ্ধ করে না। যুদ্ধ করে মানুষ। ধর্ম, জাতীয়তাবাদ, বিজ্ঞান, সেক্স প্রতিটা বিষয় নিয়ে যুদ্ধ করে মানুষ। কখনো ধর্মের কথা বলে অভিজিৎ রায়দের মেরে ফেলা হয়, কখনো বিজ্ঞান গবেষণার নাম করে হিটলারের কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে একজনের মাথা কেটে অন্যের মাথায় বসিয়ে দেয়া যায় কিনা- এই জাতীয় অমানবিক নিষ্ঠুরতা চলে।

কখনো জাতীয়তাবাদের নামে ভুট্টোর মতো পিশাচ পাকিস্তানি সেনাদের নির্দেশ দেয়- পূর্ব পাকিস্তানের নারীদের বেশি করে ধর্ষণ করতে, তাহলে এই জাতির জন্ম পরিচয় বদলে দেয়া যাবে! যেটা আসাম বা কাশ্মীরে দেখা যায় একইভাবে, জয় শ্রীরাম বলে কাউকে মেরে ফেলে জাস্টিফাই করা!

মুক্তিযুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি মেজর সিদ্দিক সালিক ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে লিখেছেন- এক মুক্তিযোদ্ধা পানি চেয়েছিল। তাকে বলা হয়েছিল- একবার পানি পিনেকে লিয়ে সাচ্চা মুসলমানকি তারহা বোল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ! অর্থাৎ যুদ্ধ হচ্ছে জাতীয়তাবাদ নিয়ে আর সেই জাতীয়তাবাদের অস্ত্র হচ্ছে ধর্ম!

বিজ্ঞান, ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদ ছাড়াও আরও আছে সাদাকালোর পার্থক্য। ইউরোপ আমেরিকা থেকে আফ্রিকার কালো মানুষকে দাস বানিয়ে রাখার দাসপ্রথা উঠেছে পাঁচশো বছরও হয়নি।

একজন দাসকে মানুষের সম্মান দেয়ায় খোদ আমেরিকায় মার্ক টোয়েনের লেখা ‘হাকলবেরিফিন’ নিষিদ্ধ ছিলো অনেক বছর।ভারতবর্ষ থেকে দাসপ্রথা যাওয়ার দুইশো বছরও হয়নি! অথচ খোদ আমেরিকা দুই মেয়াদে শাসন করে গেছেন বারাক ওবামা নামের কালো মানুষটি!

বিবিসি হিউম্যান ট্রাফিকিং নিয়ে যেসব তথ্য দিচ্ছে সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে- স্বয়ং ফেসবুকই সেক্স স্লেভ আর হিউম্যান ট্রাফিকিংয়ের সবচেয়ে বড়ো মার্কেটপ্লেস! ২০১৮ সালের শান্তিতে নোবেল জয়ী নাদিয়া মুরাদ ছিলেন আইএস-এর ডেরা থেকে পালিয়ে আসা একজন সেক্স স্লেভ! প্রতিদিন তাকে নামাজ পড়ে রেপ করা হতো!

জ্বি হ্যাঁ, ধর্ম, বিজ্ঞান, জাতীয়তাবাদ কোনোটাই কোনোটার পরিপূরক না। একমাত্র পরিপূরকের নাম- মানবতা। ধর্ম দিয়ে বিজ্ঞানকে, বিজ্ঞান দিয়ে ধর্মকে, জাতীয়তাবাদ দিয়ে ধর্ম বিজ্ঞান দুইটাকেই ব্যবহার করা যায়। কেবল একটামাত্র জিনিস দিয়ে কাউকেই ভেঙে ফেলা যায় না, সেটা হচ্ছে- মানবতা!

হয়তো আর কয়মাস পরে করোনা ভাইরাসের ভ্যাকসিন বের হবে। ভাবেনতো বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে যদি বলে- ধর্মে বিশ্বাসী কাউকে এই জিনিস দিবো না, কেমন লাগবে? বিজ্ঞান বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ধার ধারে না, ধর্মও বিজ্ঞানের ধার ধারে না! কেবল যার ধার ধারে সেই প্রাণীটার নাম- মানুষ!

কে শুয়োর খায় আর কে গরু খায় এটা গুরুত্বপূর্ণ না৷ গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে- কে খাবার পায় না।
আর কয়টা রোজা, আর কয়টা ঈদ এবং আর কয়টা মহামারী গেলে এইটা আমাদের মাথায় ঢুকবে?

জান্নাতুন নঈম প্রীতি : লেখক ও ব্র্যান্ড এম্ব্যাসেডর ,মাইক্রোসফট


ছড়িয়ে দিন