ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা আদিম প্রকৃতি

প্রকাশিত: ২:৫১ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০২১

ধীরে বহে বুড়িগঙ্গা আদিম প্রকৃতি

 

কামরুল হাসান

করোনা কেড়ে নিয়েছে অনেক প্রাণ, এই অনুজীবের প্রধান শিকার হয়েছে বেশি বয়সী মানুষেরা; এমনিতেও মারা গেছেন অনেক বয়স্ক মানুষ, যারা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাননি, করোনাকালে মারা গেছেন। এমনি একজন হলেন আমার রাষ্ট্রদূত বন্ধু মসয়ূদ মান্নানের শাশুড়ি মিসেস মুনীরা হক। করোনার কারণে যে বছরটি মহাকালে বৃহত্তম মহামারীর কলঙ্ক ধারণ করল, সেই ২০২০ সালের একেবারে শেষ দিনটিতে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেলেন ৩৬ বছর ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজে শিক্ষকতা করা মানুষটি। তাঁর মেধাবী কন্যা ড. নুজহাত মান্নান মায়ের পেশাই বেছে নিয়েছিলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। মগবাজারের গাউস নগরে মায়ের বাড়িতেই তিনি বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন, শৈশব কৈশোর যৌবন তো বটেই, রাষ্ট্রদূত স্বামীর সাথে বাইরের দেশে মাঝে মাঝে থেকেছেন, কিন্তু দেশে ফিরলে মায়ের কাছেই তার আশ্রয় মিলেছে। সেই মা চলে গেছেন না-ফেরার দেশে, তাঁর স্মৃতিতে বিভিন্ন জনহিতকর সেবামূলক কাজ করছেন নুজহাত মান্নান। এরই একটি হলো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও কয়েকজন ব্যক্তিকে বারোটি হুইল চেয়ার সম্প্রদান। এই বারোটি হুইল চেয়ারের তিনটি প্রদান করা হয়েছে আহসানিয়া মিশনকে, তিনটি ফিরোজা বারী প্রতিবন্ধী শিশু হাসপাতালকে, চারটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে, আর দুটি নিজের পায়ে হাঁটতে অসমর্থ দুজন দরিদ্র মানুষকে।
এই অনুদানে কৃতজ্ঞ আহসানিয়া মিশন নুজহাত মান্নান ও তাঁর রাষ্ট্রদূত স্বামীকে আমন্ত্রণ জানায় তাদের মিশন পরিদর্শনে, বিশেষ করে মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার হাঁসারা ইউনিয়নের আলমপুর গ্রামে মিশন পরিচালিত হাসপাতালটি দেখতে। এই কদিন আগেই উজবেকিস্তান ছেড়ে তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন মসয়ূদ মান্নান, শাশুড়ির মৃত্যুর কারণেই তার এ সময়ে দেশে আসা। কিন্তু যেদিন প্রোগ্রাম শ্রীনগরে আহসানিয়া মিশনে যাওয়ার সেদিনই মা যেখানে পড়াতেন সেই ভিকারুননিসা নুন স্কুলে নুজহাত মান্নানের উপস্থিত থাকা অনিবার্য হয়ে ওঠায় মসয়ূদ তার পুরনো বন্ধু কামরুল হাসান আর সাংবাদিক মাহমুদ হাফিজকে আমন্ত্রণ জানায় তার সফরসঙ্গী হতে। রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণে শেষোক্ত দুজন ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিংয়ে পূর্ব নির্ধারিত ব্রেকফাস্ট আড্ডা বাতিল করে যোগ দেয় ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর যাত্রায়।
কথা ছিল আমাকে সৈনিক ক্লাবের উল্টো ফুটপাথ থেকে তুলে নিবেন মাহমুদ হাফিজ সকাল সোয়া আটটায়। মিরপুর দশ থেকে একবার রিকশা বদল করে, অর্থাৎ দুটি ভিন্ন রিকশায় চেপে আমি হাজির হয়েছি নির্ধারিত সময়ের ৩০ মিনিট আগেই। তৃতীয়বার রিকশায় চেপে যাই গুলশান দুই আর একের মাঝামাঝি মাহমুদ হাফিজের বাসায়, কেননা তার ড্রাইভার সাতসকালে ফোন ধরছে না। আমরা তখন উবার ডেকে রওয়ানা হই মগবাজার। গাউসনগরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর মনে হলো রাষ্ট্রদূত যেহেতু ফোন ধরছেন না, আমরা এ সুযোগে মগবাজারের মোড় থেকে ব্রেকফাস্ট খেয়ে আসি। খেতে বসবো এমনি সময়ে মসয়ূদ মান্নানের ফোন এলো, ‘এসো শীগগির’। তিনি ঘড়ি ধরে চলেন, দুই দুষ্ট বালকের দলছুট প্রবণতা তিনি সহ্য করবেন কেন? আমরা গরম তন্দুরিকে নরোম হওয়ার সুযোগ দিয়ে অতিদ্রুতই গাউসনগরে এসে রিপোর্টিং করি। দেখি মাইক্রোবাস উড্ডয়নের জন্য টেকঅফ পয়েন্টে প্রস্তুত, কোপাইলটের সিটে স্বয়ং মসয়ূদ মান্নান। চতুর্থজন হলেন মুহম্মদ আনিসুল কবির জাসির। লম্বা নাম, মানুষটি দৈর্ঘ্যে প্রস্থেও বেশ ভারি। তার প্রথম পরিচয় সে আহসানিয়া মিশনের নিউ ইয়র্কের উপদেষ্টা, দ্বিতীয় পরিচয় সে মসয়ূদের ছোটো ভাই ডাক্তার পার্থের ছোটোবেলা থেকে বড়োবেলা পর্যন্ত বন্ধু। বিনয়ী মানুষটি দ্বিতীয় পরিচয়টিই প্রথম দিয়েছিলেন, ফলে আমরা ভেবেছিলাম তিনিও আমাদের দুজনের মতো অতিথি, এখন দেখছি তিনি আজকের এই ভ্রমণ কর্মসূচীর একজন পরিকল্পক। আহসানিয়া মিশনের জন্য তহবিল সংগ্রহ তার একটি প্রধান মিশন। হুইল চেয়ার তো আছেই, মান্যবর রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানানোর মহৎ লক্ষ্য হলো ভ্রাতৃপ্রতীম রাষ্ট্র তুরস্ক থেকে আহসানিয়া মিশনের জন্য তহবিল আনায়ন।
মগবাজার থেকে ধানমন্ডি ৩১ নম্বর রোডে অবস্থিত আহসানিয়া মিশনের হেডকোয়ার্টারের দিকে যেতে যেতে জাসিরের গল্প শুনি। ছাত্রাবস্থা থেকেই সমাজসেবার ঝোঁক জাসির ও তার জানি দোস্ত পার্থের। নীলক্ষেত বস্তিতে তারা দুবন্ধু ছিন্নমূল শিশুদের জন্য একটি স্কুল চালাতো। সেই স্কুলের শিশুদের মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য বই আনতো আহসানিয়া মিশন থেকে। ১৯৮৫ সালে দেখা পান খন্দকার আহসানউল্লাহর পরবর্তীতে যিনি মিশনটির দায়িত্বভার নিজ কাঁধে তুলে নেন সেই কাজী রফিকুল আলমের। দীর্ঘদেহী, ফর্সা আর নূরানী চেহারার মানুষটি প্রথম দর্শনেই মুগ্ধ করেন, যতই দিন যায় ততই আবিস্কার করেন কাজী রফিকুল আলমের অন্তর সত্যিকার নূরে আলোকিত। কেবল ওই সততা ও সমাজসেবার দীপ্তি নয়, তিনি অসামান্য এক নেতা, যার কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বে আহসানিয়া মিশন বিপুল এক সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ বছর এর বাজেট সাড়ে তিনশ কোটি টাকা। জাসির ও পার্থ লিউ ক্লাব করতো, ১৯৮৯ সালে তারা মালয়েশিয়ায় বিশ্ব যুব সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। পরের বছর জাসির তার পরিবারের সাথে অভিবাসন নিয়ে আমেরিকায়।চলে যায়।
গাড়ি ততক্ষণে চলে এসেছে ৩১ নম্বর। সেখানে একটি হুইল চেয়ার নামিয়ে রেখে গাড়ি ছুটল মিরপুর ১ নম্বরে যেখানে দ্বিতীয় হুইল চেয়ারটি প্রদান করা হবে। শহীদ বুদ্ধিজীবি কবরস্থানের পাশেই এই নগর স্বাস্থ্য কেন্দ্র বা হাসপাতাল। আমরা গাড়ি থেকেই দেখলাম করোনার টিকাদান চলছে। এখান যুক্ত হলেন ডা. নায়লা পারভীন, যিনি গত ১৩ বছর ধরে আহসানিয়া মিশনের সঙ্গে কাজ করছেন, সপ্তাহের দুটি দিন শ্রীনগর যান সেন্টারটির তত্ত্বাবধানের জন্য। আহসানিয়া মিশনের অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান, সবগুলোই সমাজসেবামূলক। এর একটি হলো মাদক নিরোধী আন্দোলন আমিক।
খানবাহাদুর খন্দকার আহসানউল্লাহ আহসানিয়া মিশন প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৫ সালে সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উজেলায়। তাঁর দানকৃত সম্পদ থেকেই গড়ে ওঠে সংগঠনটি, এই মহতী উদযোগের সাথে যুক্ত হন কিছু মহৎ হৃদয় মানুষ, যেমন বিখ্যাত মনোচিকিৎসক নাজিমদ্দৌলা চৌধুরী, কাজী রফিকুল আলম, কবি জাহানারা আরজু ও তার বিচারপতি স্বামী নূরুল ইসলাম এবং প্রফেসর বশিরা মান্নান। শেষোক্তজন হলেন মসয়ূদ মান্নানের মা, যিনি তাঁর বাবার নামে বারী ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এই বারী ক্লাবের হাত ধরেই মসয়ূদ মান্নানের সমাজসেবা ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডের প্রতি ঝোঁক ও দক্ষতা গড়ে ওঠা। সেই বারী ক্লাবের দিনগুলো থেকেই আমি মসয়ূদের বন্ধু। মায়ের দেখানো পথ ধরে আহসানিয়া মিশনের সাথে যুক্ত হয় মসয়ূদ মান্নান নিজেও। আমিও জানতাম না বেশ কয়েক বছর সে আহসানিয়া মিশনের আমিক কর্মসূচির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে, ছুটে গেছে নীলফামারী থেকে চট্টগ্রাম, খুলনা থেকে হবিগঞ্জ, দেশব্যাপী মাদকবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির জন্য। তখন ৪০০ এর অধিক শাখা ছিল আমিকের।
গাড়ি এখন দক্ষিণাভিমুখী, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী পেরিয়ে সে চলে যাবে বিক্রমপুর। যে সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গি থেকে জয়দেবপুর হয়েছে গাজীপুর, সেই একই মনোভঙ্গি থেকে বিক্রমপুর হয়েছে মুন্সীগঞ্জ। শ্রীনগরকে অবশ্য মোল্লাপুর বানাতে পারেনি। আমরা যাচ্ছি সেই শ্রীনগরে। ডা. নায়লা পারভীন আমাদের আমিকের ইতিহাসটি বললেন। ২০১৪ সালে আহসানিয়া মিশনের আমিক প্রকল্পটি সরকারের প্রাথমিক নগর স্বাস্থ্য সেবা প্রকল্পের সাথে (Primary Urban Health Care) সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করে। প্রথম দুটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপিত হয় কুমিল্লা শহর ও ঢাকার উত্তরায়। ২০১৯ এ এসে সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে চারে। এই হাসপাতালগুলো চালাচ্ছে সরকার কিন্তু অর্থায়ন করেছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক।
মেয়র হানিফ উড়ালসেতু বাসটিকে তার কাঁধের উপরে তুলে নিয়ে, মতিঝিলের উঁচুভবনগুলোর একটি প্যানারমিক ভিউ উপহার দিল, তাদের দেখাল নগর চিড়িয়াখানায় বিচ্ছিন্ন ও জড়োবদ্ধ জিরাফের মতো। দেখলাম দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের অতিকায় ও দৃষ্টিনন্দন মেয়রভবনটিতে রঙের নতুন প্রলেপ লাগানোর সময় হয়ে এসেছে। নিচে যেখানেই চোখ গেছে পোকার মতো কিলবিল মানুষ চোখে পড়েছে। এরও আগে মসয়ূদ স্মৃতিভারাতুর চোখে দেখল বুয়েটের ক্যাম্পাস, আজ থেকে চল্লিশ বছর আগে সে যেখানে পড়তো। আমি দেখে নিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের হোস্টেল ডা. ফজলে রাব্বী হল, চল্লিশ বছর আগে আমি যেখানে থাকতাম। কখন যে জীবনের এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, বুঝতেই পারলাম না। তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাসের সেই চরিত্রের মতো আমাদের বুকের অলিন্দে ও মগজের কোষে বিদ্যুতায়িত হয়ে ফুটল কথটি, ‘জীবন এত ছোটো কেনে?’

পর্ব ২
বুড়িগঙ্গা অতিপুরাতন নদী, নইলে কী আর তার নাম বুড়িগঙ্গা হয়, তার উপর যে সেতু সেও পুরাতন, তবে বেশি দিনের নয়। কিন্তু নদী ও নদীর সেতু পেরিয়ে আমরা চার সহযাত্রী যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হই তা একেবারেই নতুন, অভাবিত। এমন বাংলাদেশ আমরা দেখিনি আগে, সড়কের দুপাশে ধানী জমিগুলো একই আছে, দূরের গ্রামগুলোও রাতারাতি বদলে যায়নি, কিন্তু এই সড়ক যা চলে গেছে দক্ষিণে পদ্মার মাওয়া ঘাটতক, এ সড়ক তো আমাদের অচেনা। কেউ বল্ল, মালয়েশিয়ার মতো, কারও মত আমেরিকা, মসয়ূদ বল্ল, ‘বিদেশের মতো কেন বলছো? এখন বাংলাদেশ হয়ে উঠছে উন্নয়নের রোল মডেল। তাই এ সড়ক বাংলাদেশের মতো।’ এর রূপ আর মসৃণতা, সৌকর্য আর আধুনিকতা দেখে আমরা বাকরুদ্ধ। জাসির আমেরিকায় থাকে, তাই সে দেশ সম্পর্কে তার জ্ঞান অধিক। জাসির বল্ল, আমেরিকায় এরকম রাস্তা হতে যদি সময় লেগে থাকে একশ বছর, বাংলাদেশে তা হচ্ছে দশ বছরে। এর কারণ আমরা বাস করছি উন্নত প্রযুক্তির যুগে। প্রযুক্তি উন্নয়নকে তরান্বিত করছে।
জানি না এটা উপমহাদেশীয় কি না, নাকি সকল মহাদেশেই আছে, মহাসড়কগুলো মফস্বল শহর, গ্রাম্য বাজার, হাঁট প্রভৃতির মধ্য দিয়ে যায়, নাকি ওই জনপদগুলোই এসে মহাসড়কের পাশে জড়ো হয়? বাংলাদেশে এই প্রবণতা অত্যন্ত বেশি। এর সুবিধা হলো জনপদের স্থায়ী ক্রেতাসমষ্টির সাথে যুক্ত হয় চলাচলরত অস্থায়ী ক্রেতাসমষ্টি। আর অসুবিধা হলো এসব জায়গা পার হতেই প্রচুর সময় চলে যায় যানবাহনের, মহাসড়কে যে গতি কাঙ্ক্ষিত, যে গতি প্রত্যাশিত, তা পাওয়া যায় না। অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে। এজন্যই তৈরি হয়েছে বাইপাস। এখন রাস্তাকে আর কত বাঁকানো যায়, ছোটো বাজারগুলিকে মহাসড়ক ডিঙ্গিয়ে যায় সেতুর মতো বাঁকানো পিঠ নিয়ে উপরে উঠে। এটা আমি দিল্লি থেকে চন্ডীগড় যেতে দেখেছি। ঢাকা মাওয়া সড়কেও তাই দেখলাম। গ্রাম্যবাজারকে নিচে রেখে দর্পিত শুড় তুলে চলে যায় মহাসড়ক, তার হাতি পিঠে গতি নিয়ে ওঠে গাড়িসকল।
এ গাড়ির কো-পাইলট এখানকার পথঘাট তেমন চেনেন না, যারা চেনেন সেই দুজন নেভিগেটর বসে আছেন মাঝের সারিতে। তারা ঠিক জায়গাটিতে মহাসড়ক থেকে গাড়ি নামিয়ে নিলেন পাশের নিচু রাস্তায়। সেখান থেকে মহাসড়কের নিচ দিয়ে, যেন হাতির ফুলে থাকা পেটের মধ্যে তৈরি টানেল, দিয়ে গিয়ে পড়ি ওপাশের সার্ভিস রোডে। তখন আমরা একটু দ্বিধাগ্রস্ত, উল্টোপথে যাচ্ছি কি না? মহাসড়কের পশ্চিমপার্শ্বে এর সমান্তরাল তৈরি হচ্ছে রেলপথ, সার্ভিস রোড তাকে কাছে নিয়ে এলো। পদ্মাসেতুর পিঠের উপরে সড়ক আর বুকের ভেতর রেলপথ, সেই রেলের রাস্তাটি মহাসড়ক থেকে উঁচু। সার্ভিস রোডটিও দু’লেনের, আমরা পূর্বপাশ ঘিরে প্রাণপন ছুটি, এরপরে ‘পশ্চিম হাঁসারা’ লেখা লম্বাটে সাইনবোর্ডটি দেখে স্বস্তির হাসি হেসে পশ্চিমে যাই হাঁস দেখতে। হাঁসারা বাজারটি নিকটেই, ঘিঞ্জি বাজার, পথটি কিছুক্ষণ পরপর বাঁক নিচ্ছে, ফলে কোনো সৌন্দর্য নেই বাজারটির, কেবল পুকুরের ওপাড়ে হাঁসাড়া স্কুলটি চোখের শুশ্রূষা হয়ে এলো। সেখানে একটি ছোটো খাল কিংবা নালা, তার সেতুর ওপাশে দুটি সাদারঙ কাঠের দোতালা বাড়ি এ অঞ্চলের প্রতিভূ হয়ে সৌন্দর্য জাগালো।
গ্রামের রাস্তাটির বাঁক মনে হয় সাপকেও হার মানাবে, হতে পারে নদীর উপমা, তবে নদীকে যা মানায়, সড়ককে তা মানায় না। কেন যে সড়ক এমন বিচিত্র ইংরেজি S অক্ষরকে উল্টাতে পাল্টাতে থাকে কে জানে, তবে শুনেছি প্রভাবশালীদের ঘরবাড়ি আর জমিজমা বাঁচাতে গিয়ে গরীবের ঘরবাড়ি আর জমিজমার উপর গিয়ে হামলে পড়ে উন্নয়নের সড়ক। সে সড়ক দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে ইজি বাইক, গ্রামীণ জণগনের চলাচলের ইজি সমাধান, তাদের হাঁটাভ্যাস বদলে বসাভ্যাস, যা একটি বদভ্যাস না হলেও অলসাভ্যাস তো বটেই। হাঁটে বলেই গ্রামের লোকদের হার্টের অসুখ কম, আর রৌদ্রে হাঁটে বলে করোনা সুবিধা করতে পারে না।
সড়কের পাশেই এক খাল, সড়কের পাশে বড়ো বড়ো গাছ, দেখেই বোঝা যায় বহুবছর আগে লাগানো, এপাড় থেকে ওপাড়ে গেছে লোহার পিলারের উপর কাঠের স্প্যান বসানো মানুষ চলাচলের সেতু, তার কাছেই আমাদের গন্তব্য। ভেবেছিলাম স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নামটি হবে আহসানিয়া মিশন হাসপাতাল, পরিবর্তে দেখি এর নাম হেনা আহমেদ হাসপাতাল। পরে জানলাম লন্ডন প্রবাসী জনৈকা হেনা আহমেদ নিজের জমির উপরে চারতলা হাসপাতালটি বানিয়েছেন, এর পরিচালনার ভার অর্পণ করেছেন আহসানিয়া মিশনের উপর। গ্রামীণ পটভূমিতে উপরে নীলাকাশ আর নিচে সবুজ মাঠের মাঝে সাদারঙের আধুনিক হাসপাতালটি ভারি মনোময় লাগলো। এর স্থাপত্যশৈলী চমৎকার। আমরা মনে মনে সেই মহৎপ্রাণ মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করি। ভাবি হেনা আহমেদের মতো সমর্থবান মানবদরদী বাঙালিরা যদি এভাবে দেশে জনহিতকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেন ( মাদ্রাসা নয়, হাসপাতাল ও স্কুল), সোনার বাংলা ফিরে পেতে সময় লাগতো না।
মান্যবর রাষ্ট্রদূত আসবেন, ফুলের তোড়া নিয়ে অভ্যর্থনায় দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসপাতালের কর্মীরা। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গী হিসেবে আমরাও ফুল্ল অভ্যর্থনা পেলাম। ঢুকতেই একপাশে রিসেপসন কাউন্টার, তার সমুখে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষদের বসার হলুদ লাল প্লাস্টিকের চেয়ার। ডা. নায়লা আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালেন কুড়ি শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালটির বিভিন্ন বিভাগ। নিচতলার দক্ষিণপূর্ব কোণায় প্যাথলজি বিভাগ। সেখানে রক্ত পরীক্ষার একটি অত্যাধুনিক মেশিন (CBC) দেখিয়ে ডা. নায়লা জানালেন শহরের অনেক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে এই মেশিন নেই। রিসেপসন কাউন্টারের পেছনে একটি ফার্মেসি। লেখা মডেল ফার্মেসি। মডেল ফার্মেসি বলতে আসলে কী বোঝায়? ডা নায়লা বল্লেন, সরকারের কিছু শর্ত আছে, যেমন ঔষধের দোকানে একজন রেজিস্টার্ড ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে, জীবনরক্ষাকারী ঔষধ থাকতে হবে ইত্যাদি। এরপরেই যা চোখে পড়লো তা একটি গ্রামীণ হাসপাতালে আশা করা যায় না আর তা হলো র‍্যাম্প। র‍্যাম্প আছে বলেই এখানে হুইল চেয়ার কাজে লাগবে। দোতালায় আলট্রাসনোগ্রফি আর একতলায় এক্স রে রুম দেখলাম। এখানে চক্ষু রোগ শনাক্তের ঘরটিতে প্রয়োজনীয় মেশিনটি আছে, আর আছে সেই কাঠের বাক্সটি, যার ভেতরে বিভিন্ন পাওয়ারের লেন্সগুলো সাজানো। বালক কৌতূহলে রাষ্ট্রদূত তা দেখতে চাইলেন। আমরা দেয়ালে টাঙানো সেই চোখের পাওয়ার বোঝার জন্য বিভিন্ন সাইজের ইংরেজি অক্ষরগুলি দেখি আর স্বস্তি পাই দুটি কারণে, এক, ইংরেজি বর্ণগুলি এখনো চিনি, ভুলে যাইনি; দুই, এখনো সেসব বর্ণ চোখে দেখতে পাই। বয়স যখন ঊর্ধ্বমুখী, অক্ষর শণাক্তের ক্ষমতা তখন নিম্নমুখী।
সকালে সেই যে গরম তন্দুরি আর চা ফেলে চলে এসেছিলাম, এরপর পেটে আর কোনো দানাপানি পড়েনি। এককাপ চা খাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। সেসময়েই দেখি চারতলার আলোকিত ও লম্বাটে মিটিং রুমে আমাদের জন্য চা ও নাস্তার আয়োজন। ফালি করে কাটা আপেল, বিস্কিট, বাখরখানি ও সন্দেশ। দুধ চা নেই বলে হতাশ হই, সমাধান হলো চায়ে সন্দেশ ( আংশিক) গুলিয়ে রঙ চা-কে দুধ-চা বানানো আর বাখরখানি ভেঙে তা দিয়ে খাওয়া। জীবন বড়ো আনন্দময়!
খাওয়ার সময়ে ডা. নায়লা পারভীন ঢাকা আহসানিয়া মিশনের স্বাস্থ্য কর্মসূচি সম্পর্কে আমাদের ব্রিফ করলেন। এতক্ষণ মাস্কের আড়ালে ঢাকা অবয়বটি পূর্ণরূপে ধরা পড়লো চোখে আর অনুমিত ধারণার চেয়েও সুন্দর প্রমাণিত হলো। তিনি কথাও বলেন সুন্দর। মানুষের সেবা করতে পেরে তিনি সন্তুষ্ট এবং আহসানিয়া মিশনে কাজ করতে পেরে গভীর আনন্দিত। আমাদের জানালেন এই কর্মসূচিতে কাজ করেন ৮৩৪ জন কর্মী, এ বছর এর বাজেট হলো পঞ্চাশ কোটি টাকা। চারটি হাসপাতালই ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে, চারজন চিকিৎসক দিনের চব্বিশ ঘণ্টাকে চারভাগ করে চক্রাকারে থাকেন। আমরা নিচে দুজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, একজন চোখের, অন্যজন হৃদরোগের, তাদের নাম ও ডিগ্রি মুদ্রিত প্লাকার্ড দেখলাম। তারা ঢাকা থেকে সপ্তাহে দুদিন এখানে নিদির্ষ্ট সময়ে রোগী দেখেন।
এরপরে কিছুটা আনুষ্ঠানিকভাবে হুইল চেয়ারটি হস্তান্তর করা হলো ড. এস এম খলিলুর রহমান, ঢাকা আহসানিয়া মিশনের সাধারণ সম্পাদক, যিনি চা খাওয়ার সময় ঢাকা থেকে সস্ত্রীক এসে পৌঁছেছিলেন তার ও ডা. নায়লা পারভীনের হাতে। প্যাকেট থেকে বের করার আগে ভাঁজ করে রাখা হুইল চেয়ারটিকে মনে হচ্ছিল টেলিভিশনের বড়ো স্ক্রিন। মাহমুদ হাফিজ ‘সময় টিভি’র স্থানীয় সাংবাদিককে অগ্রিম জানিয়ে রেখেছিলেন। তিনি এসে ছবি তো তুললেনই, রাষ্ট্রদূতের একটি সাক্ষাৎকারও নিয়ে নিলেন।
আমাদের জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। এই হাসপাতালের পেছনে একটি গৃহস্থ ভিটা ছাড়িয়ে, পশ্চিমে খেলার মাঠ ও বাড়িঘর, উত্তর ও পুবে কাছে ধানক্ষেত, দূরে গ্রাম এই প্রাকৃতিক পরিবেশের ভিতর হেনা আহমেদের আরেকটি মহতী অনুদান একটি বৃদ্ধাশ্রম, ঝকঝকে নতুন যৌবনদীপ্ত এক দালান, এটিও চারতলা বোঝাই যায় দুটি ভবনই একই স্থপতির নকশায় তৈরি। পরিকল্পনা ছিল এটি বৃদ্ধাশ্রম হবে, কিন্তু একজন মাত্র বৃদ্ধা পাওয়ায়, পরিকল্পনা পাল্টানো হয়। এখন এটি হবে মানসিক রোগীদের হাসপাতাল। একেবারে নতুন হাসপাতালটি চালু হবে শীঘ্রই, পহেলা মার্চ।
হেনা আহমেদ হাসপাতালের সমুখে একটি বড়ো বৃক্ষ দেখে ওই গ্রামেরই এক কৃষককে জিজ্ঞেস করি, এটা কী গাছ? তার উত্তর, সরকারি গাছ। তাহলে তো সারাদেশে দুধরণের গাছ রয়েছে, সরকারি গাছ ও বেসরকারি গাছ। একজন ইজিবাইক নিয়ে ঝিমানো ড্রাইভার বলে, ওটা কড়ই গাছ। আমাদের সন্দেহ হয়, কাছেই এক দোকানদার, সে বলে ওটা হলো বাবলা গাছ। গ্রামের লোকই গাছ চেনে না, আমরা তো নগরের বাসিন্দা, যে নগর বৃক্ষহীন না হলেও, প্রায় বৃক্ষশূন্য, সেখানে সারি সারি সরকারি, বেসরকারি দালান বৃক্ষের সমাধিস্থলে স্মৃতিসৌধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পর্ব ৩
একসময় বিক্রমপুর ছিল বাংলার রাজধানী। এ পবিত্র ভূমিতে জন্মগ্রহণ করেছেন অতীশ দীপঙ্কর যিনি গৌতম বুদ্ধের শান্তিবাণী পৌঁছে দিয়েছিলেন চীনে। এখানে জন্মগ্রহণ করছেন স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, ড. হুমায়ুন আজাদ এবং আরও অনেক প্রতিভাবান মানুষ। তুরস্কে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মসয়ূদ মান্নানের সাথে এ মুহূর্তে আছি বিক্রমপুরের শ্রীনগরে। ঢাকা আহসানিয়া মিশন পরিচালিত হেনা আহমেদ হাসপাতালে চলতে অসমর্থ মানুষের বাহন হুইল চেয়ার প্রদানের মহতী উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাষ্ট্রদূত এখন বিক্রমপুরে। এ জায়গা থেকে খুব একটা দূরে নয় পদ্মা সেতু, সাম্প্রতিক বাংলার নতুন সেনসেশন, প্রমত্তা পদ্মার দুই পাড়কে জুড়ে দেওয়া ৯.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সেতুটি দেখতে লোকের ঢল নামছে প্রতিদিন। ওই বিদেশি চেহারার মসৃণ হাইওয়ে বিষয়টিকে করে তুলেছে সহজ। এই তো কদিন আগেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেখে গেছি পদ্মা সেতু। কাল সন্ধ্যায় যখন মসয়ূদ প্রস্তাব দিল শ্রীনগর যাওয়ার, সঙ্গে পদ্মা সেতু দেখার প্রলোভন, এ যেন লাঞ্চের দাওয়াতের সাথে সিনেমা দেখার প্রস্তাব, তখন বিউটি বোর্ডিংয়ে ব্রেকফাস্ট আড্ডাকে মনে হলো ফ্যাকাশে। আয়োজক মাহমুদ হাফিজকে রাজি করিয়ে, তাকেও সঙ্গী বানিয়ে চলে এসেছি শ্রীনগর। এখন আমাদের শকট চলছে সোজা পদ্মাসেতুমুখী।
আনিসুল কবির জাসির কথা বলতে ভালোবাসেন, আসলে সে ভালোবাসে দেশকে। আমরা যখন টেলিফোন নাম্বার বিনিময় করছিলাম তখন মসয়ূদ জাসিরকে এই বলে সতর্ক করলো যে, ‘কামরুল কিন্তু তেমার ব্রেইন ওয়াশ করে দিবে।’ উত্তরে আমি বলি, ‘সম্ভবত উল্টো ঘটনাটিই ঘটবে।’ জাসির যে আত্মপ্রত্যয়ের সাথে আমার সাথে একমত হলো তাতে বুঝলাম মানুষটির মগজ চুল্লিতে আইডিয়া টগবগ করে ফুটছে, তার ভাপে সেদ্ধ হবো আমি বা অন্যরা, জাসির নয়। এই যে চারিদিকে চরিত্র হারানো, দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে যাওয়া আর দেশের ক্ষতিসাধন করার স্রোত তার উজানে জাসিরের মতো দেশপ্রমিক মানুষেরা আাশা জাগায় প্রাণে। আরেক উদাহরণ ডা. নায়লা পারভীন, আহসানিয়া মিশনে কাজ করছেন ৯ বছর, কাজের সাথে সমাজসেবার আনন্দটুকু উপভোগ করছেন পূর্ণমাত্রায়। তার ইচ্ছে আজীবন মানবসেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে, আহসানিয়া মিশনের সাথে কাজ করে যেতে।
এরা দুজনেই ঢাকা আহসানিয়া মিশনের পরিচালক কাজী রফিকুল আলমের ভীষণ অনুরাগী। জাসির একটি ঘটনা বল্লেন, লন্ডনে একবার ফান্ড রেইজিংয়ের একটি উদ্যোগে রফিকুল আলকে একদল বিনিয়োগকারী বা সমাজদরদী প্রস্তাব দিয়েছিল তিনি যদি আহসানিয়া মিশন থেকে বেরিয়ে স্বতন্ত্রভাবে কোনো কিছু করতে চান তবে তাকে ফান্ড দেওয়া হবে। তিনি বিণীতভাবে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি এখানে এসেছি আহসানিয়া মিশনের প্রতিনিধি হয়ে, আপনারা আমাকে সেভাবেই চেনেন, যদি মহৎ কিছু করতে চান মিশনের মাধ্যমেই করতে হবে, আমি আলাদা কোনো সত্ত্বা নই।’ এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছিল আরও একটি অনুরূপ উদ্যোগে, ফলাফল ওই একই। জাসির বল্ল, এই যে আমাদের গার্মেন্ট মালিকেরা লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়ে শ্রীলংকা বা ভারত থেকে ম্যানেজার নিয়োগ দিচ্ছে অথচ আমাদের শিক্ষিত যুবকেরা বেকার, তাদের নিয়োগও দেওয়া যায় অপেক্ষাকৃত কম পারশ্রমিকে, এটা কেন? এর কারণ কি বিদেশিরা বেশি দক্ষ বা বেশি যোগ্যতা ধারণ করে? জাসিরের মত হলো কাজ না জানলে কাজ শিখিয়ে নেওয়া যায়, যা পাওয়া যায় না তাহলো সততা। যা ওই শ্রীলংকানদের আছে, আমাদের নেই। সে প্রথম আলোর এক চীফ টেকনিকাল অফিসারের উদাহরণ হিসেবে টানল, যে বহু লক্ষ টাকা বেতন পেয়েও আরও কিছু লক্ষ টাকার লোভে আরেকটি প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদপত্রের কাছে সংবাদ বেঁচে দিত। এই সূত্র ধরে জাসিরের ধারণা প্রচুর বিনিয়োগ বাংলাদেশে আসবে, এই বিনিয়োগকারীরা সৎ মানুষ, আপনাদের মতো মানুষ খুঁজবে। কারণ বহু বছরে পরীক্ষিত যে আপনারা সৎ।
ফেরিঘাটের কাছে সারি সারি ইলিশ হোটেলগুলোর সমুখে লোক ডাকাডাকি করছে হোটেলের লোকেরা। পদ্মাসেতু দেখতে আসা পর্যটকদের একটি আকর্ষণ পদ্মাপাড়ে বসে পদ্মার ইলিশের স্বাদগ্রহণ। মাহমুদ হাফিজ বল্লেন আশ্চর্যকথা। এগুলো নাকি পদ্মার ইলিশ নয়, এমনকি নয় চাঁদপুরে মেঘনার ইলিশ, এগুলো আসে চট্টগ্রাম থেকে। আমার তখন মনে পড়লো আমরা যখন সেবার তাজা ইলিশ ভেজে খাওয়ার বাসনায় দোকানের পেছনে গিয়ে ইলিশ কিনছিলাম তখন ইলিশ বের করা হয়েছিল বরফের বাক্সের ভেতর থেকে। বাক্সগুলো ছিল অনেকটা পুরনো দিনের বায়োস্কোপের সেলুলয়েডের ফিতে যেরূপ টিনের বাক্সে রাখা হতো সেরূপ, বরফের ভাঁজে ভাঁজে রাখা, ইলিশই, তবে গোয়ালন্দ ঘাটের, নাকি মাওয়াঘাটের, চাঁদপুরের নাকি চট্টগ্রামের ইলিশের গায়ে তো আর লেখা নেই । মাহমুদ হাফিজ সাংবাদিক, খবরের ভিতরের খবর জানেন, এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে নাকি বেরিয়ে এসেছিল এ ইলিশ পদ্মার নয়, বিক্রি হয় ওই নামে চড়াদামে, লোকেরা পদ্মার ইলিশ ভেবেই কেনে ও খায়।
ইলিশ খাওয়ার ওই উন্মাদনা পেরিয়ে গেলে যা থাকে তা হলো সেতু দেখা। ফেরিঘাট থেকে তাকে একটি অস্পষ্ট রেখার মতো দেখা যায়। কেবল কাছে গেলেই তার রূপ ফোটে। সেখানে নিয়ে যাওয়া জন্য উদগ্রীব মাঝিরা, তাদের হাঁকডাক ইলিশ হোটেলগুলোর চেয়ে কম নয়। আমি তো এক নৌকাঅলার সাথে দরদাম করে ঠিকই করে রেখেছিলাম জলে ভাসবো। মসয়ূদ যাবে না, কারণ তার হাতে সময় নেই, এপাড় ওপাড় করার প্রশ্নই আসে না, এমনকি ১৮ নম্বর স্প্যান পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ তাতে লাগবে এক ঘণ্টা, সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত রূপটি হলো এসব ইঞ্জিন লাগানো নৌকা আধা ঘণ্টায় সবচেয়ে নিকটের পিলারতক পৌঁছেই এবাউট টার্ন করে। মসয়ূদ তাতেও রাজী নয়। সে ঘড়ি ধরে চলে, আবেগের চেয়ে অনেকবেশি বাস্ততববাদী (High Mach Personality) । ফলে আমার জলে ভাসার ইচ্ছা জলেই ভেসে রইল। গেলবার যখন এসেছিলাম, সবচেয়ে আনন্দকর ছিল নৌকায় চড়ে সেতু দেখা। নেতা যখন অনঢ়, অনুসারীরা তখন গতিহীন। আমরা স্পষ্ট নদী আর নৌকা, অস্পষ্ট পদ্মাসেতুকে পেছনে রেখে কিছু ছবি ( তাও মাস্ক পরা) তুলি (সেখানে ছিলাম আমি) । বেতস পাতার মতো লম্বা নৌকাগুলো এরা বলে ট্রলার, ফেরি, জলে চলাচলরত কিছু নৌযান, নদীপাড়ে স্থাপনার ছবি তুলে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়ে ফিরে আসি।
এখানে আসার সময় একটি চমৎকার শুভ্র মসজিদ দেখেছিলাম, কাছেই একটি শিশুদের বিনোদন পার্ক বা খেলাধুলার জায়গা। তখন পারিনি, ফেরার পথে গাড়ি থামিয়ে স্থাপনা দুটোর ছবি তুলি। রাষ্ট্রদূত তার সমবয়সী বন্ধুটির বালকসুলভ চপলতা চাপা হাসির সাথে লক্ষ করে আর স্থির গাম্ভীর্যে অনুমোদন দেয়। বলে, ‘হলো তো? এবার চলো।’
এরপরে পশ্চিম হাঁসারা যাওয়ার জন্য মহাসড়ক থেকে আর কোনো পশ্চিমে নামার ফাঁক পাই না। এখানে অলিখিত নির্দেশ হলো, সিধা চলো। এমনি করতে করতে আমরা বুড়িগঙ্গা নদীর উপর পোস্তোগোলা সেতুর এতটা কাছাকাছি চলে আসি যে আমরা রাজধানীতেই ফিরে যাব কি না নাকি আমাদের অপেক্ষায় খাবার সাজিয়ে বসে থাকা হাঁসাড়া গ্রামের মিশন হাসপাতালে ফিরব সেই দ্বিধায় ভুগি। অপেক্ষায় থাকা মানুষদের মুখ বিষন্ন হবে ভেবে আমরা এবাউট টার্নের সিদ্ধান্ত নেই। সেই লেনিনীয় ‘এক পা এগুবার জন্য দুই পা পেছানো’ নীতি মেনে,অনেকটা পথ ঘুরে হাঁসাড়া পৌছাই। প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্তটিকে সময়োপযোগী বলব না, বলব খাদ্যোপযোগী। খাবারের আয়োজনকে বিপুল বললেও কম বলা হবে। পুটিমাছ ভাজা, পালং শাক, বেগুন ভাজা, সবজি, কাচকি মাছ, কই মাছ, মুরগী, ডাল ও সালাদ। আর বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত তো ছিলই। সারাদিনের অভুক্ত পেটে খাবার এলো হর্ষ জাগিয়ে। খাবার শেষে মসয়ূদ মান্নান ড. এস এম খলিলুর রহমানকে টার্কিশ ভাষায় অনূদিত বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ উপহার দিলেন। মসয়ূদ জানাল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ভাষায় অসমাপ্ত আত্মজীবনী অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হচ্ছে। টার্কিশ ভাষায় বইটির অনুবাদ করেছেন কামাল আতাতুর্ক আকাদেমি।
আমরা ফিরে আসার মুহূর্তে খবর আসে একটি শিশুর জন্ম হয়েছে একটু আগেই। আমি কবি বলে নবজাতকের নাম রাখার দায়িত্ব বর্তায়। মায়ের কোলে নিদ্রিত শিশুর নাম রাখি ‘মিথিলা’। আমরা সবাই ফিরি, ডা. নায়লা শুধু ফেরেন না, তার কাজ আছে। তিনি আমাদের সাথে পদ্মা নদী দেখতেও যাননি (সেতু উল্লেখ করলাম না, কেননা আমরা তো আসলে সেতুর কুয়াশাকবলিত রেখাটি দেখেছি, সেতু দেখিনি); কাজপাগল মানুষ তিনি, রাষ্ট্রদূত যেমন অনুষ্ঠানপাগল। আসলে অনুষ্ঠানগুলিই তাকে পাগল বানিয়ে রাখে। এই যে এসেছেন শাশুড়ির শোককৃত্য করতে হাজারটা দাওয়াত এসে হাজির হয়েছে।
আগেই বলেছি আজকের প্রধান বক্তা মসয়ূদ মান্নান নন, আনিসুল কবির জাসির। ব্রেন ওয়াশ নয়, ব্রেন হার্ডডিস্ক ভরে দিচ্ছে নতুন নতুন ডাটায়। তার কাছ থেকে জানলাম আমাজন সারা দুনিয়া থেকে মোট ৩০ লক্ষ সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নিবে। বাংলাদেশ যদি এর ত্রিশভাগের একভাগ নিতে পারে অর্থাৎ এক লক্ষ, তবে এই এক লক্ষ যা উপার্জন করবে তা হবে আনস্কিলড ত্রিশ লক্ষ শ্রমিকের সমান আয়। একডজন ট্রেনিং ও সার্টিফিকেশনের পর সরাসরি H1 ভিসা দিবে আমাজন আমেরিকা গিয়ে চাকরি করার। ভারত নাকি আগেভাগেই দশ লক্ষ সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে তৈরি। জাসির আশাবাদী মানুষ, সে বলে তার বিশ্বাস এক লক্ষ যাবে, মাহমুদ হাফিজ তত আশাবাদী নন, তিনি বললেন, দেখবেন শেষ পর্যন্ত পাঁচ হাজার যেতে পারবে। আমি ভাবি কোথায় এক লক্ষ আর কোথায় পাঁচ হাজার?
মাহমুদ হাফিজ তার নিয়মিত আড্ডাস্থল প্রেসক্লাবে নেমে যান, যেখানে প্রতি শনিবার তিনি তার সাংবাদিক বন্ধুদের কফি খাওয়ান। চায়ের বিল তারা দেয়, কফির বিল তিনি দেন। আমি ও জাসির চলে আসি মসয়ূদ মান্নানের গাউস নগরের বাসায়। এটি আসলে তার গিন্নির বাড়ি। সেখানে তেতলার ফ্লাটে ঢুকবার মুখে পরপর চারটি নাম মসয়ূদ, নুজহাত, মোর্শেদ ও মালিকা লেখা আর বড়ো করে লেখা মান্নান-যা এদের কমন সারনেম। নামগুলোর ভেতর ‘ম’ অক্ষরের প্রাধান্য লক্ষণীয়। আমরা হাতমুখ ধুই আর নুজহাত ভাবীর এনে দেওয়া মিষ্টি খাই। দেয়ালে বড়ো করে বাঁধানো একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে চীনের প্রধানমন্ত্রী জিয়াং জেমিনের সাথে করমর্দনরত মসয়ূদ মান্নান। এমন ছবি তার জীবনে অসংখ্য, কত বিখ্যাত লোকের সাথে যে করমর্দন করেছে তার ইয়ত্তা নেই। একজন রাষ্ট্রদূত বিদেশে তার রাষ্ট্রের প্রতিনিধি, তাই তো তার এত সম্মান!