ঢাকা ১৪ই জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ৮ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


নজরুলের ছড়ায় অলংকার ও সাহিত্য রস!

redtimes.com,bd
প্রকাশিত জুন ২৯, ২০১৯, ১২:২৮ অপরাহ্ণ
নজরুলের ছড়ায় অলংকার ও সাহিত্য রস!

শাহাদত বখ্ত শাহেদ

কবি নজরুল তার সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় শব্দের অলংকার,রসবোধ সংযোজিত করেছেন তার সৃজনশীল কর্মদক্ষতায়। তার ছড়ায়,কবিতায় গানে, তার সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে প্রস্ফুটিত হয়েছে সুরভি মিশ্রিত সৃষ্টিফুল।

নজরুল তার ছড়ায় যে শব্দের অলংকার পড়িয়েছেন তা সত্যিই ছড়ার অবয়বকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। । তার প্রতিটি ছড়ার শরীর জুড়ে মজাদার শব্দের অলংকার, মূল চরিত্রের সাথে বিশেষন প্রয়োগ যা পাঠকালে পাঠকের মনে অমৃত সুর তৈরী করে চিত্তে অানন্দের ঝংকার তোলে।

কবি ছড়াগল্পের প্রতিটি কাল্পনিক রূপকে শব্দের অলংকার দিয়ে তার ছড়া রচনাকে সার্থক করে তুলেছেন।

নজরুল তার ছড়ায় শব্দের অলংকার মিশ্রণে শিশুদের পাশাপাশি বড়দের কল্পনা শক্তিকে আনন্দ ও মনোরঞ্জন দিয়ে তার চিন্তা শক্তিকে দরদি,স্পর্শকাতর, সাহিত্যরস শ্রবণ করার মন সৃষ্টির প্রেরনা যুগিয়েছেন। যে কেউ তার ছড়া পাঠ করলে তৎক্ষনাৎ সেই সাহিত্যরস নিজে থেকে আস্বাদন গ্রহন করতে পারবে।

নজরুলের ছড়ার ভান্ডার থেকে কিছু ছড়ার উদ্ধৃতি দেওয়া গেলঃ

যেমনঃ চিরশিশু ছড়ায়ঃ
ওরে যাদু,ওরে মানিক পথিক আঁধার ঘরের রতন-মণি।
ক্ষুধিত ঘর ভরলি এনে ছোট্ট হাতের একটু ননী।

এখানে কবি শিশুকে আদরের সুবাস মাখিয়ে সম্মোধন করেছেন এবং অাধারের মধ্যে আলোর রশ্মির সাথে তুলনা করেছেন। কবি ইঙ্গিত দিয়েছেন এই শিশু যেন একদিন অন্ধকার তাড়িয়ে আলোকরশ্মি হয়ে সমাজে আলো ছড়ায়। প্রাপ্তির আনন্দকে ক্ষুধার সাথে মিলিয়েছেন যেন ক্ষিধে পেটে এক চিমটে ননী।

কবি ঝিঙে ফুল ছড়ায়ঃ
সবুজ পাতার দেশের ফিরেজিয়া ঝিঙে ফুল। একই ছড়ায় খুকুকে নিয়ে লিখেছেনঃ শ্যামলী মায়ের কোলে সোনামুখ খুকুরে/ আলুথালু ঘুমু যাও রোদে গলা দুকুরে।

কবি সবুজ পাতার রাজ্যে ফিরোজা রং মাখা সারি সারি ঝিঙেফুলের চিত্রপট সুন্দর ভাবে তোলে এনেছেন পাশাপাশি শিশুর সুন্দর মুখশ্রীর সাথে রোদে গলা শিশুকে নিথর ঘুমে যাওয়ার কথা বলেছেন। শিশুটি যেন রোদের কষ্ট থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়।

খুকু ও কাঠবেড়ালি ছড়ায় বলেছেনঃ
ডাইনি তুমি হোঁৎকা পেটুক,খাও একা পাও যেথায় যেটুক।
কাঠবেড়ালি! বাদরীমুখি! মারবো ছুড়ে কিল/ দেখবি তবে? রাঙাদাকে ডাকবো? দেবে ঢিল।

কবি কাঠবেড়ালির দস্যিপনাকে প্রতিবাদী শব্দ ঝংকারে তুলোধুনো করেছেন।
কাঠবেড়ালি গাছের সব পেয়ারা একাই সাবাড় করছে। পেটুক কাঠবেড়ালির এতই স্পর্ধা যে কাউকে ভয় করছে না কবি ক্ষেপে কাঠবিড়ালিকে যাচ্ছেতাই বকাঝকা দিয়েছেন ডাইনি,হোৎকা পেটুক,বাদরীমুখি, ঢিল,কিলের হুমকি দিয়েছেন। কবি রাঙাদার কথা বলেছেন যে রাঙা দাদাকে সবাই ভয় করে।

নজরুল পিলে-পটকা ছড়ায়ঃ
হাশিমকে সম্মোধন করেছেন এভাবে ” উটমুখো সে সুটকো হাশিম/পেট যেন ঠিক ভূটকো কাছিম। গাইতি – দেঁতো, উচকে কপাল /আঁৎকে ওঠেন পুঁচকে গোপাল।
রসিক কবি রসের সাথে গোপাল ও হাশিমকে চাবকানি দিয়েছেন মসৃন ভাবে
উটমুখো, সুটকো হাশিম,ভুটকো কাশিম অথবা দেঁতো, উচকে কপাল,পুঁচকে গোপাল বলে।

খোকার খুশি ছড়ায়ঃ
কি যে ধানাই-পানাই/সারাদিন বাজছে শানাই/ এদিকে কারুর গা নাই/
আজিনা মামার বিয়ে।
বিবাহ! বাস,কি মজা!/সারাদিন মণ্ডা গজা/গপাগপ খাও না সোজা/
দেয়ালে ঠেসান দিয়া।

কবি-এই ছড়ায় মামার বিয়েতে ভাগনে ভাগনির আনন্দ-উচ্ছাস আচার আচরন, মিষ্টিান্ন আপ্যয়নের রসালো বক্তব্যে সবার মনে উচ্ছাস তৈরি করেছেন এবং মামার বিয়ের আনন্দকে উপভোগ্য করে তুলেছেন।

খাঁদু-দাদু ছড়ায়ঃ
দাদুর নাকি ছিল না মা অমন বাদুড়-নাক,
ঘুম দিলে ঐ চেপ্টা নাকেই বাজ্তো সাতটা শাঁখ।
দিদিমা তাই থ্যাবড়া মেরে ধ্যাবড়া করেছেন!
অ-মা আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ড্যাং!

কবি এই ছড়ায় রসের পিঠা তৈরি করেছেন। যে পিঠা রসে ভরা স্বাদেও অসাধারন।রসের দাদুকে নিয়ে রসাত্নক পক্তিগুলো
শিশু মনে কি যে দোলা দেয় তা ছড়া পাঠ না করলে অনুমান করা যায় না। দাদু ঘুমালে নাক ডাকতো যেন সাতটি শাঁখের শব্দ হতো। দিদিমা থাপ্পর মেরে একদম। পঙক্তির শেষ অংশে -অ -মা আমি হেসে মরি, নাক ডেঙাডেং ড্যাং। কি রঙরসের যাদুকরি অলংকার।

প্রভাতি ছড়ায়ঃ
ভোর হলো /দোর খোলো/খুকুমণি ওঠ রে!
ঐ ডাকে /জুঁই শাখে/ফুল-খুকি ছোট রে! খুকুমণি ওঠরে!
খুলি হাল তুলি পাল /ঐ তরী চললো /এইবার এইবার/ খুকু চোখ খুললো।
আলসে নয় সে /ওঠে রোজ সকালে, /রোজ তাই চাঁদা ভাই টিপ দেয় কপালে।

ছোটবেলা পাঠ্য বইয়ে যে ছড়াটি পড়ে শিশুরা আনন্দ ও কল্পনার রাজ্য শাসন করতো। মন ও চিন্তায় চিত্তপ্রসাদ পেতো সেই অন্যরকম ছড়া প্রভাতি।
কবি ভোরের আলোয় শিশুদের ঘুম থেকে জাগানোর জন্য ছড়ায় ভোরের যে চিত্র নাট্য তৈরি করেছেন তা প্রভাতি ছড়াটি সকল শিশুদের জন্য নজরুলের শাশ্বত ও অমর সৃষ্টি। কবি ছড়ার সুরে খুকুমণিকে জাগানের চেষ্টা করছেন। ভোরের সময় প্রকৃতির যে রূপ তা ছড়ায় উপস্থাপন করে খুকুকে আহ্বান করছেন ঘুম থেকে জাগার জন্য। তিনি জুঁইফুল, নৌকো,পাল,চাঁদকে দিয়ে ছড়ার প্রকৃতি তৈরি করে শিশুদের মনেযোগ আকর্ষন করেছেন।

নজরুলের প্রতিটি ছড়ায় শব্দের অলংকার,রস ও নান্দনিক অাধিক্য এতই জুড়ালো যে ছড়ার গতি ও প্রকৃতিকে পাঠক সহজে গ্রহণ করতে পারে। অতীতের মত বর্তমান এবং ভবিষ্যতেও নজরুলের ছড়ার আবেদন চিরকালীন।

ছড়ার সূত্রঃ
নজরুলের শিশু-কিশোর সাহিত্য, প্রকাশক -নজরুল ইন্সটিটিউট,সংস্কৃতি বিষয়ক মন্রণালয়।

লেখক-ছড়াকার, সংগঠক।

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031