নতুন পথের দিশারী

প্রকাশিত: ১১:৪০ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ১৯, ২০২১

নতুন পথের দিশারী

অরূপ তালুকদার

পৃথিবীতে কখনো কখনো এমন কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন যারা নিজ গুনে একসময় সবাইকে ছাড়িয়ে অনন্যসাধারণ হয়ে ওঠেন I তাদের আদর্শ,মানবিকতা, প্রজ্ঞা, জ্ঞান-গরিমা,মহৎগুণাবলী এবং নেতৃত্তের বিশালতা তাদেরকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে কোটি মানুষের ভাগ্য বিধাতারূপে পরিচিতি দেয় I যেমন ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,যিনি সারা জীবন বাঙালি জাতির মুক্তি সংগ্রামের অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন I এখন যেমন নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারই সুযোগ্য কন্যা আধুনিক তথা ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার এবং গণতন্ত্রের মানস কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা I
আজ আমাদের চোখের সামনে যে বাংলাদেশকে আমরা দেখি সে বাংলাদেশ যেন এক নতুন বাংলাদেশ I
এখন এই 2021 সালে একবার পেছনের দিকে ফিরে তাকালে আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, যে বাংলাদেশের একদিন জন্ম হয়েছিল ন’ মাসের এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সে দেশের অর্জন এখন একেবারে কম নয় I কোনক্রমেই তাকে আজ আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলা যাবে না I
পিছনে ফেলে আসা স্বাধীনতা পরবর্তী 50 বছরে বিশেষ করে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে আমাদের অর্জন এখন তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো I যে কারণে বহির্বিশ্বের কাছে বর্তমান বাংলাদেশের সাফল্য তাকে চিহ্নিত করেছে এক ‘উন্নয়নের বিস্ময়’বলে I
অর্ধশতাব্দী নয়,বরং তার চাইতেও কম সময়ে, গত 30 বছরে আমাদের দেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে অকল্পনীয় ভাবে প্রায় 10 গুণ অর্থাৎ 35 মিলিয়ন থেকে 350 মিলিয়ন ডলার I পাশাপাশি মাথাপিছু আয় বেড়েছে 300 থেকে 2230 ডলারে I 90 দশকে যেখানে দেশের 58 শতাংশ মানুষ বাস করতো দারিদ্র্যসীমার নিচে আজ তা নেমে এসেছে 22 শতাংশের নিচে I 1990 সালে আমাদের সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র 35 শতাংশ, আজ তা উন্নীত হয়েছে 75 শতাংশে I এক কথায় বলতে হয়, আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বর্তমান বাংলাদেশের অগ্রগতি রীতিমতো বিস্ময়কর I
নিঃসন্দেহে বলা যায়, এতসব অর্জন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নানাবিধ দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা এবং তার গৃহীত উন্নয়নের অগ্রগতির ধারা আজকের এই আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণে সবচাইতে বড় ভূমিকা রেখেছে I
বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে কলঙ্কজনক অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল 1975 সালের 15 আগস্টের কালরাতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হবার পর থেকে I যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে দেশব্যাপী দিনের পর দিন নানা ধরনের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এবং অস্থিরতা চলার মধ্য দিয়ে এসেছিল সামরিক শাসন I সেসময় বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া রাজনৈতিক দলটিতেও দেখা দিয়েছিল নানা ধরনের বিভ্রান্তিকর ওলটপালট পরিস্থিতি I সে সময়ের সেই অস্থির পরিস্থিতিতে একসময় আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলেন শেখ হাসিনা I
1981 সালের 17 মে মাসে ফিরে এলেন দেশে I তারপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সময় বয়ে যেতে থাকে I 80’র দশকের শেষদিকে শুরু হয় স্বৈরাচারী এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন I প্রবল গণ আন্দোলনের মুখে একসময় পতন হয় এরশাদের সামরিক সরকারের Iএই সব কিছুই এখন ইতিহাসের সামগ্রী I
1996 সালের 15 ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয় I বাদ সাধেন শেখ হাসিনা I শুরু করেন পুনরায় অসহযোগ আন্দোলন I তাঁর ফলশ্রুতিতে দেড় মাস যেতে না যেতেই বাতিল হয়ে যায় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ I পরে অনুষ্ঠিত হয় সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন I বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ I 21 বছর পরে I
তারপর থেকে এই পর্যন্ত এক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ নতুন ইতিহাস লেখা হতে থাকে I যে ইতিহাস অগ্রগতি,উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির Iনতুন করে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ উন্নয়নের অগ্রদূত বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে I একসময় বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে পরিচিতি লাভ করে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে I
পরবর্তীকালে একটার পর একটা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সম্মুখ পানে এগিয়ে যেতে থাকে দেশ I প্রযুক্তি ও দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের ফলে দেশে শিল্পের প্রসার ঘটতে থাকে I যার প্রভাবে রিতিমত বিপ্লব ঘটে যায় আমাদের কৃষি ক্ষেত্রেও I চাল উৎপাদনে দেশ হয়ে ওঠে স্বয়ংসম্পূর্ণ I পাশাপাশি প্রাণীজ আমিষ উৎপাদনেও এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ আমাদের দেশ i
অন্যদিকে,বর্তমান বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বিদেশি মুদ্রা অর্জনকারী পোশাক তৈরী খাতেও বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় ইতিমধ্যে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জিত হয়েছে আমাদের Iএকই সাথে আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের শ্রমবাজারে আমাদের দেশের কর্মরত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা, যা আমাদের জাতীয় অর্থনীতিকে বিকশিত করে ধীরে ধীরে পৌঁছে দিয়েছে সুদৃঢ় অবস্থানে I আমাদের এই চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনিবার্য ছায়া পড়েছে আমাদের সামাজিক জীবন যাপনের ক্ষেত্রেও, যার মধ্যে রয়েছে দেশের জনগণের গড় আয়ু বৃদ্ধি, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস,বিভিন্ন ধরনের টিকাদান কর্মসূচিতে বলার মত সাফল্য,স্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি,সুপেয় পানি সরবরাহ এবং জনগণের সার্বিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি I
নির্দ্বিধায় বলা যায়,বিগত প্রায় দেড় বছরের অধিক সময় ধরে বিশ্বব্যাপী ভয়ঙ্কর করোনা মহামারীর কবলে পড়ে বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষের মত আমরাও রিতিমত বিপর্যস্ত অবস্থায় পৌঁছে যাবার পরেও এখন পুনরায় আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি এবং তাতে ধীরে ধীরে সাফল্যও আসছে I
বলা বাহুল্য, এক্ষেত্রেও অর্থাৎ আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য সাহস এবং দূরদর্শিতার যে পরিচয় আমরা পেয়েছি, তা শুধু দেশে নয় বিদেশেও প্রশংসা অর্জন করেছে I
দেশ বিদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জনবহুল এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার করোনা মহামারী নিয়ন্ত্রণে যে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল, সেই চ্যালেঞ্জে তারা বিজয়ী হয়েছে, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা I
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আরেকটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ হচ্ছে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ I এই সেতু নির্মাণে অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের নানা রকম টালবাহানার কথা আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি I যে কারণে প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাস নিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন I যা এখন বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে I দৃশ্যমান হয়েছে আমাদের সবার চোখের সামনে ‘আমাদের স্বপ্নের সেতু’ I
এটাই শুধু নয়, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সর্বত্র বিভিন্ন সময়ে প্রশংসিত হয়েছেন নানা কারণে I কোন কোন ক্ষেত্রে তার দূরদর্শিতা, সাহসিকতা, মানবতা এবং মহানুভবতা বারবার মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে I
1978 সাল থেকে মায়ানমারের সামরিক বাহিনীর খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন এবংমূলত জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা যখন প্রাণের ভয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল তখন তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার বিরুদ্ধে অনেকের সাবধান বাণী উপেক্ষা করে শুধুমাত্র মানবিকতার খাতিরে তিনি তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজ দায়িত্বে I যে কারণে ব্রিটিশ মিডিয়া ‘চ্যানেল ফোর’ তাকে আখ্যায়িত করেছে ‘মাদার অফ হিউম্যানিটি’ বা ‘মানবতার জননী’ হিসেবে i
অন্যদিকে,কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের তিনজন অধ্যাপক যৌথভাবে শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্ব শান্তির দূত’ বলে বিশেষায়িত করেছেন i
স্মরণ করা যেতে পারে, 2017 সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রে শেখ হাসিনা এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছিলেন, রোহিঙ্গাদের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে তেমন কোনো প্রত্যাশা তিনি করেন না i’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথ পরিক্রমায় এমন এমন অনেক প্রশংসনীয় কাজ করেছেন যার জন্য বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে আজ তিনি অতীব শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন i
ইতিমধ্যে তিনি তার প্রশংসনীয় এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন পদক এবং সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে ’ চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা গ্লোবাল পিস, চ্যাম্পিয়ন অব দ্যা আর্থ, চ্যাম্পিয়ন অফ হিউম্যান রাইটস ইত্যাদি i
আমরা এখন সবাই জানি, পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় 3 শতাংশ মানুষ এখন বাংলা ভাষায় কথা বলেন i এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয় i আমাদের আরো গর্বের বিষয়, বিশ্বে বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি জাতিসংঘে প্রথম বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন i তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারে গত 24 সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের 76 তম অধিবেশনে আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা দিলেন i
এবারে প্রধানমন্ত্রী নিজ দেশের নানারকম উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য প্রচুর প্রশংসা লাভ করেন পাশাপাশি আখ্যায়িত হন ‘ক্রাউন জুয়েল’ বা ‘মুকুটমণি’ বিশেষনে i 2030 সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ( এসডিজি ) অর্জন নিয়ে নবম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে তাকে এই উপাধিতে ভূষিত করে আর্থ ইনস্টিটিউট, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, গ্লোবাল মাস্টার্স অফ ডেভলপমেন্ট প্রাক্টিস এবং ইউ এন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন নেটওয়ার্ক i সলিউশন নেটওয়ার্কের প্রেসিডেন্ট, বিখ্যাত উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জেফ্রী স্যাক্স বলেছেন,‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা আপনার কথা শুনতে চাই, কারণ 2015 সাল থেকে 2020 সাল পর্যন্ত পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বেশিরভাগ ক্ষেত্রের অগ্রগতিতে বিশ্বে প্রথম হয়েছে বাংলাদেশ, সেই অর্জনের জন্য আমরা আপনাকে অভিনন্দন জানাতে চাই i’
জননন্দিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন তৃতীয় বিশ্বের একজন প্রভাবশালী তথা উদার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং বিজ্ঞানমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন এবং সেইসঙ্গে মানবিক এবং উন্নয়ন মূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য অর্জন করেছেন নানাবিধ পুরস্কার ও সম্মাননা i আমরা বাঙালি হিসেবে সেজন্য গর্বিত I
এদিকে এই বছর অর্থাৎ 2021 সালে ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী’ এবং’ বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী’র সঙ্গে পালিত হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার 75 তম জন্মদিন I এই তিনটি বিষয়ই বাঙালি এবং বাংলাদেশের জন্য গৌরব ও অহংকারের I

শব্দ সৈনিক ও কথা সাহিত্যিক
aroop.talukdar@gmail.com

ছড়িয়ে দিন