ঢাকা ১৮ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৪ঠা আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১১ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

নতুন পৃথিবী গড়তে চায় রাশিয়া ও চীন

redtimes.com,bd
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২২, ০৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
নতুন পৃথিবী গড়তে চায় রাশিয়া ও চীন

নতুন পৃথিবী গড়তে চায় রাশিয়া ও চীন ।
বেইজিংয়ে শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাম না ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রপক্ষকে জোরালো বার্তা দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সংখ্যালঘু উইঘুর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চীন সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমের বেশির ভাগ দেশই যখন অলিম্পিকে তাদের প্রতিনিধি পাঠাননি, তখন ব্যতিক্রমী বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের বন্ধু মস্কো।

 

২০১৯ সালের পরে এই প্রথম মুখোমুখি আলোচনায় বসলেন শি ও পুতিন। বৈঠক শেষে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় ওয়াশিংটনের ভূমিকাকে নেতিবাচক উল্লেখ করে একটি কৌশলগত নথি প্রকাশ করা হয়।

সেখানে বলা হয়, প্রতিটি পক্ষ ন্যাটোর পরিসর বাড়ানোর বিরোধিতা করে এবং এই সংগঠনকে শীতল যুদ্ধকালীন আদর্শিক ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানায়। অন্যান্য দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও স্বার্থের সম্মান জানানোর আহ্বান করা হয় নথিটিতে।

যৌথ বিবৃতিতে চীন-রাশিয়ার একটি নতুন কৌশলগত বন্ধুত্ব ঘোষণা করা হয়েছে যার কোনো সীমা নেই এবং সহযোগিতার নিষিদ্ধ ক্ষেত্র নেই। যৌথ বিবৃতিতে এক দিকে যেমন ‘দুই দেশের বন্ধুত্ব ও কৌশলগত সম্পর্কের অগ্রগতির’ কথা বলা হয়েছে, তেমনি নাম না করে ‘কিছু দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ক্রমাগত হস্তক্ষেপ করে থাকে’ বলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বন্ধু দেশগুলির দিকে অভিযোগের আঙুল তোলা হয়েছে।

যৌথ বিবৃতিতে রাশিয়া স্পষ্ট জানিয়েছে, তাইওয়ান আসলে চীনা ভূখণ্ডেরই অংশ এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবি তারা কখনোই মানবে না। চীন ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নতির বার্তাও দেওয়া হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করেন পুতিন। বৈঠকে নেতারা যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী একটি কৌশলগত জোট উন্মোচন করেছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

আর্টিওম লুকিনের মতে, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন চীনের ১০ ভাগের এক ভাগ। ফলে চীনকে পেছনে ফেলার সুযোগ নেই। চীন সুপারপাওয়ার হলে হয়তো রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কে কিছুটা অবনতি হতে পারে। তবে চীন যথেষ্ট স্মার্ট যে আমেরিকার মতো ভুল করবে না।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের কাছ থেকে ক্রিমিয়া নিয়ে নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা দেশগুলো যখন রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখনো প্রেসিডেন্ট পুতিন চীনের দিকে তাকিয়েছিলেন এবং সাড়া পেয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বেইজিং শুধু তেল এবং গ্যাস কেনা নিয়েই মস্কোর সঙ্গে ৪০ হাজার কোটি ডলারের চুক্তি সই করে, যা সেই সময়ে রাশিয়াকে অর্থনৈতিক ভরাডুবি থেকে থেকে বাঁচিয়েছিল। অবশ্য অনেক পর্যবেক্ষক বলেন, রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখল নিয়ে চীন অস্বস্তিতে পড়লেও সস্তায় এবং সহজ শর্তে রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদ কেনার সুযোগ তারা তখন হাতছাড়া করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্হা ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইপিআরআই) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে ইউরেশিয়া প্রোগ্রামের পরিচালক ক্রিস মিলার লিখেছেন, প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের ইস্যুতে ২০১৪ সালের পর গত ৮ বছরে চীন ও রাশিয়া দিন দিন আরো ঘনিষ্ঠ হয়েছে। অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করার কৌশল হিসেবে ১৯৯৬ সাল থেকেই চীন ও রাশিয়া একটি অভিন্ন প্ল্যাটফরম তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করে। এর পেছনে দুই দেশের সমান স্বার্থ রয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর রাশিয়ার পক্ষ থেকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছাকাছি আসার চেষ্টা সত্ত্বেও যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র পূর্ব ইউরোপে ন্যাটোর সম্প্রসারণ করে গেছে, সেই ভীতি থেকে মস্কো চীনের দিকে ঝুঁকেছে। ১৯৯৬ থেকে পরের কয়েক বছরে চীন ও রাশিয়া তাদের সীমান্ত সমস্যাগুলো সমাধান করে। ২০০১ সালে তারা একটি মৈত্রী চুক্তি করে। নিজেদের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইসু্যতে, যেমন—ইরান, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া—দুই দেশ অভিন্ন সুরে কথা বলছে। যুক্তরাষ্ট্রের তোয়াক্কা না করে ইরানকে গত বছর এসসিওর পূর্ণ সদস্য করা হয়েছে। এমনকি সম্প্রতি কাজাখস্তানে রুশ সৈন্য মোতায়েনকে সমর্থন করেছে চীন।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এশিয়া ও ইউরোপে জোট তৈরির এবং তত্পরতা বাড়ানোর যত চেষ্টা আমেরিকা করবে চীন ও রাশিয়া ততই ঘনিষ্ঠ হবে। কারণ, বিশ্বব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য নিজেদের ঐক্যকে একটি অস্ত্র হিসাবে বিবেচনা করছে এই দুই দেশ। গত ডিসেম্বরে তাদের মধ্যে সর্বশেষ যে ভাচু‌র্য়াল বৈঠক হয়, সেখানে পুতিন এবং শি এমন একটি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ডলারের প্রাধান্য থাকবে না। এ ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন।

মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস গত বৃহস্পতিবারের সংস্করণে সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে জানায়, প্রেসিডেন্ট শি রাশিয়াকে কতটুকু সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দেন, তা নিয়ে বাইডেন প্রশাসন চিন্তিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নিষেধাজ্ঞা চীন গ্রাহ্য করবে, নাকি রাশিয়াকে সেই নিষেধাজ্ঞার পরিণতি থেকে রক্ষা করবে—তার ওপরই নির্ভর করবে ইউক্রেন ইসু্যতে রাশিয়াকে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিকভাবে একঘরে করার নীতি কতটা কাজ করবে|। স্ট্যালিন ও মাও জে দংয়ের পর দুই দেশের মধ্যে এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কখনোই হয়নি।

চীন এখন রাশিয়ার তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং আধুনিক অস্ত্রের বড় ক্রেতা। রাশিয়ার রফতানি আয়ের ২৫ শতাংশ আসে চীন থেকে। গত বছর দুই দেশের মধ্যে ব্যবসার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০১৫ সালে ছিল ৬৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ সাল থেকে পাইপলাইন দিয়ে চীনে রাশিয়ার গ্যাস যাচ্ছে। দ্বিতীয় আরেকটি পাইপলাইন বসানোর চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। দুই প্রেসিডেন্ট নিয়মিত নিজেদের মধ্যে কথা বলেন। ২০১৩ সাল থেকে তারা দুজন কখনো মুখোমুখি আবার কখনো ভিডিও কনফারেন্সে ৩৭ বার কথা বলেছেন। বেইজিংয়ে শুক্রবারের বৈঠকটি ছিল তাদের মধ্যে ৩৮তম আলাপ।

 

অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন, শুধু সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা বা রাশিয়ার চাওয়া নয় ইউক্রেন ইসসু্যতে পুতিনের পক্ষ নিয়ে আমেরিকাকে কোণঠাসা করার পেছনে চীনের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।

ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ক্রিস মিলার বলেন, ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আপসহীন অবস্থান দেখে চীন তাইওয়ান নিয়ে চিন্তিত। চীন মনে করছে তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগরের ইস্যুতেও যে তারা এমন কঠোর অবস্থান নেবে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন নিয়ে রেষারেষিতে সফল হোক, চীন তা চায় না। ইউক্রেনের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও বা সে দেশে রুশ সামরিক অভিযানে অস্বস্তি বোধ করলেও কোনো যুদ্ধ বাধলে চুপ করে থাকা চীনের জন্য এ দফায় শক্ত অবস্থান নিতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30