নানীর বসন ছিলো কার্পাসের মত সাদা

প্রকাশিত: ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ, জুন ৮, ২০২০

নানীর বসন ছিলো কার্পাসের মত সাদা

শামীম আজাদ

ভাবতেও পারি না, মাত্র ন বছর বয়সে পুতুল খেলার সময়ে আমার নানীর বিয়ে হয়েছিল! আর শাশুড়ীবিহীন বাড়িতে তিনি শ্বশুরের আদর ভালবাসায় শুধু পড়ালেখা নয় এমনকি শাড়ি পরাও শিখেছেন। হয়তো তাই পুরুষের মতই ছিল তার কন্ফিডেন্স ও প্রতিপত্তি। সৈয়দা কমরুন্নেছা খাতুন তাঁর সোনালী রিমের চশ্‌মার ভেতর থেকে যখন আমাদের তাকাতেন, বুঝতাম যাচন দারের হাতে পড়ে গেছি।তাঁর জামরুলের মত ফর্সা গায়ে রাঙা মুখে রাগ জমে উঠতো, আমরা তটস্থ হয়ে পড়তাম।

কনকপুরে সাগরের মত বিশাল পুকুর পাড়ের ভূতুরে তেতুল গাছের উপর থেকে তাকালে নির্ঘাত তাঁর বাড়িটি একটি বিশেষ বাড়ি মনে হবে এটা আমি জানতাম।আর গ্রামে যে তাঁর প্রতিপত্তি তা তাঁর কাছে আসা লোকজন দেখেই টের পেতাম। এ হেন ডাকসাঁইটে নারী বার্ধক্যে বাধ্য হয়ে পালাক্রমে সন্তানদের কাছে থাকতে শুরু করলে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে পাই আর আমি ঐ ছ’সাত বছরেই বুঝে যাই তিনি সবাইকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করলেও তিনি তারা না উপগ্রহ না তিনিই সূর্য।

আমার মামা, মা ও খালা মিলে আট ভাইবোন ছিলেন। ঐ আট সন্তানের আটাশটি সন্তান না হলেও আমরা কম ছিলাম না। তো তাঁর তিন কন্যার সব আওলাদ আমরা তাকে নানীভাই ডাকতাম। মামাতো ভাইবোনরা ডাকতো দাদুভাই। কেন এমন এক উভয় লিঙ্গীয় সম্বোধন তার উৎস জানতাম না।পুরুষের মত প্রতাপে এ ডাক মানিয়েও যেত। আমার ভাল লাগতো তার স্মার্টনেস।

নানা গোলাম ইয়াজদানী খান ব্রিটিশ আমলে মৌলভিবাজারের মিউনিসিপালটির চেয়ারম্যান থাকার সময় দেশ বিভাগের পর দেহত্যাগ করেন। নানীভাই ছিলেন মৌলভিবাজার মহিলা মুসলিম লীগের প্রেসিডেন্ট। নানার প্রয়াণের পর সুতাপাড় ধূতি শাড়ি ও ঢিলা হাতা সাদা ব্লাউস গায়ে তুলে সব ছেড়ে শুধু সংসার ও সাম্রাজ্য নিয়ে বেঁচে ছিলেন তারপরও দুই আরো দুই দশকের উপর।

তিনি কবিতা লিখতেন। আজাদ ও কোলকাতার কোন একটা কাগজে যেন আসামের লাইন প্রথা আন্দলনে যুক্ত থাকার সময় তাঁর লেখাও উঠেছিলো। ফেনীতে আমাদের মাস্টার পাড়ার গোফরান সাহেবের বাড়িতে ভাড়া থাকার কালে যখন এসেছিলেন তখন দেখতাম দুপুরে তাল পাখা হাতে সোনালী চশমা পরে দেহ এলিয়ে বড় অক্ষরে ছাপা গল্পের বই পড়ছেন। জীবনের শেষ বেলায় যখন আর বই হাতে ধরে পড়তে পারতেন না তখন আমরা পালা করে তাকে আজাদ পত্রিকা ও বঙ্কিম বা মীর মোশাররফ হোসেন পড়ে শোনাতাম।

মনে পড়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে তাঁর কেবিনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গার কথা। তিনি ভীষন অসুস্থ বলে কাউকে না কাউকে নানীভাইর কাছে থাকতে হতো। মেজমামার পু্ত্র বাবলু ভাই ও তাঁর মেজকন্যার কন্যা আমি মিলে পালাক্রমে তাঁর সন্তানদের হয়ে ডিউটি দিয়েছি ক’দিন। তখন সকাল বেলা ওষুধ পথ্যাদির পর আমরা তাঁরই নির্দেশে প্রায় কুস্তি করে বিছানা থেকে উঠিয়ে নদীমুখো করে চেয়ারে বসাতাম। তারপর সেদিনের পত্রিকা বা বেগম পড়তাম। তিনি বুড়িগঙ্গায় ভেসে যাওয়া পালের উপরটা দেখতে দেখতে ও পড়া শুনতে শুনতে নরম হয়ে ঘুমিয়ে পরতেন। মোহাম্মদ নজিবুর রহমান সাহিত্যরত্নের বই পছন্দ করতেন। সে কারণেই হয়তো আমার মা ও খালামনির নাম ছিলো আনোয়ারা ও মনোয়ারা।

নানীর বসন ছিলো কার্পাসের মত সাদা। সে বসন এত পরিষ্কার ও কোমল করে তিনি পরতেন যে তাকে আমার রানীমাতা মনে হত।বহুদিন আমার ধারণা ছিল চাঁদের বুড়ির চরকার সুতো আর আমা র নানীভাইর কাপড়ের সূতো হুবহু এক। তাঁকে জড়িয়ে ধরে নাক ডুবিয়ে যে ঘ্রাণ নিতাম সে ছিল চুলের জবা কুসুম তেল, মাথার ভরন , গোলা সাবানে সেদ্ধ করা শাড়ির ও মিষ্টি জর্দা দেয়া পানের সুগন্ধের এক ককটেল।

তাঁর উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়বেটিস ছিলো। উচ্চ রক্তচাপকে আমরা বলতাম, নানীভাইর প্রেসার অইছে। মনেহয় তাই তাঁর মাথা গরম হয়ে যেতো না হলে কেন আম্মা বাসার কাজের সহকারীদের দিয়ে নালার পাড় থেকে কাউয়ালুলীর নরম ও পিচ্ছিল পাতা আনিয়ে বেটে নানীভাইর মাথায় গোল ঢিবি করে ভরন দিয়ে দিতেন! আর ডায়োবেটিসের জন্য সবসময় কালিজিরা দেয়া বিশেষ এক নরম বিস্কুট খেতেন যা আমাদের কাছথেকে লুকিয়ে রাখা হত। কিন্তু ভোররাতে ঠিক চা খাবার সময়ই আমি তার পাশ থেকে উঠে গা ঘেষে বসে বাহুর নিচের লুতলুতা অংশে আদর করা শুরু করতাম। এমন যে নরম সে স্থান ছিলো তা আর কি বলবো! নানীভাই তখন তার চা’র কাপে নিয়মিত তলানীর চেয়ে একটু বেশী রেখে পিরিচে সে নোনতা বিস্কুটের ভগ্নাংশ দিয়ে বলতেন, খাই লা। হোমিওপাতির গুল্লির মত দেখতে বিলেতী স্যাকারিন দিয়ে তৈরী মিষ্টি সে ঘন সরপড়া চা’কে অমৃতের বাড়া মনে হতো। পালঙ্কে বসে পা দুলিয়ে দুলিয়ে বিস্কুট ডুবিয়ে ঐ অতটুকু চা আমার শেষ করতে ইচ্ছে হতো না। তিনি আরেকটি মজার জিনিস খেতেন। তা হল রুটি বানানোর বেলুন পিঁড়িতে পেষা ভাজা চীনা বাদাম। কেন তা খেতেন জানতাম না। আমি বসে থাকতাম বেলুন চাটার জন্য। তিনি সেখানেও আমার জন্য একটু রাখতেন। এর সবই হতো আম্মাকে লুকিয়ে। আমার এখনো পিনাট বাটার অত্যন্ত স্বাদের মনে হয়। তবে কি বিশেষ কারনে ঐ সুস্বাদু জিনিষটা বাসার আর কেউ খেতেন না জানি না।

শীতকালে তাঁর প্রিয় সন্তান মেজমামার পটিয়ার বাড়িতে পাটালী গুড় দিয়ে কি অদ্ভুত আকারের মুড়ির মোয়া করতেন। কোনটাকে বলতেন পাটা, কোনটাকে পুতা, কোনটা লাড্ডু, কোনটা বটলা ও কোনটা পেটলা। তখন সারা বাড়ি খেজুরগুড়ের সুগন্ধে ম ম করতো।

তিনি ছিলেন এক অসাধারন স্টোরিটেলার। নানীভাইর বলা কুমির মায়ের গল্প আমার মায়ের প্রিয় গল্প ছিলো। এখন বিলেতে স্টোরি টেলিংএ যখনি সেই সন্তানের জন্য ডিমপারা কুমির মায়ের গল্প বলি বিলেতী সাদা বাচ্চারাও তা থ হয়ে শোনে। বলে এ্যামেজিং!

উলের জামা, মাফলার, টুপি বুলতেন বাঁশ থেকে নিজের বানানো কাঠি দিয়ে। মামাদের হাতাছাড়া উলের জামায় তার করা হানিকম্ব, খেজুর পাতা প্যাটার্ণ এখনো এতো মনে আছে যে তার ‘তিলে চাউলে’ ডিজাইনের ছবি এঁকে ফেলতে পারবো। তাঁর কাছেই উলবোনা শেখা।

আমার নানী গুন গুন করে গান করতেন। সোনামামার আশুগঞ্জের দ্বীপবাংলাতে বিলেত প্রবাসী মায়ামামার বিয়ে লাগলে ওঁর তিন বোন সিলেটের আউশপাড়া, চন্দ্রচড়ি ও স্নান ঘাট থেকে এসেছিলেন। আমরা খালামনিরাতো গেছিই আরো সবাইও এসেছিলেন। দুপুরের আহারের পর নদীর নালন্দা হাওয়ায় সবাই বিশাল টানা বারান্দায় এসে বসতেন। সেখান থেকে দেখা যেতো পাল টানিয়ে পাট নিয়ে চলে যাচ্ছে বিশাল গয়না নৌকা। ভেঁপু বাজিয়ে লঞ্চ আর স্টিমার ।দূরে ভৈরবের ব্রীজ দিয়ে সরীসৃপের মত ট্রেন।

মায়ামামার হলুদের সময় যখন সাদা সাদা থানপরা চার নানী লাইন ধরে তাঁদের সুন্দর সোনালী পানের বাটা সামনে নিয়ে গান ধরেছিলেন, আমার তাদের সাদা সাদা পরী মনে হচ্ছিল। কোরাসে ইউসুফ- জুলেখার কাহিনী জমে উঠতেই সেদিন বাড়ীর সবাই মিলে ধামাইল নাচে নেমে এসেছিলো। আর আমি ফ্রকের ঘের দুলিয়ে পা মেলাতে মেলাতে অবাক হয়ে বড় মানুষদের নাচ দেখছিলাম। সেদিনের বারো বছরের কিশোরীর মনের ক্যাম্পকর্ডারে তা এমন গাঢ় করে ধরা পড়েছিল যে আজ সত্তুর সন্নিকটে এলেও তা সমান গতিতে নেচে যাচ্ছে ।

সে মহিলা জাঁদরেল হলেও কিন্তু ন্যায়বান ছিলেন।একবার মৌলভি বাজারের পূর্ণবয়ষ্ক সোনামামা তার শিশু পুত্রকে দুষ্টুমির জন্য চপেটাঘাত করাতে তিনি এত ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন যে তাৎক্ষণিক ভাবেই শীতল স্বরে মামাকে কাছে ডেকে প্রায় তার গালেই বসিয়ে দিচ্ছিলেন আরেকটি। আর তার নিজস্ব রুটিন হতে পারতো না একটুও নড়ন চড়ন। আমার ধারনা তাঁর ঐ পরিণত বয়সের সন্তানরা তাকে একটু ভয়ও করতেন। আমার ভয় লাগতো অন্য কারনে। পীরবংশের মেয়ে বলে, চন্ড্রচড়ির খ্যাতনামা ঈজহার আলীর কন্যা বলে, বাবার মত তিনিও মুখে মুখে চরন বাঁধতেন বলে পীরানি মনে হত।

নানীভাই তার পুরানো সাদা শাড়িগুলো দিয়ে আমাকে ও খালাতো বোন রাজীকে পুতুল বানিয়ে দিতেন। পুতুলের সাদা মুখমন্ডলে ঐ সুতো পাড় থেকে বের করা খয়েরী বা ঘন নীল সুতো দিয়ে ক্রিস ক্রস করে পেঁচ দিতেন। তাতেই আমাদের পুতুলের চোখমুখ ফুটে উঠতো। বৌ পুতুলের কাঠি হাতে সে সুতোতে হত চুড়ি। নারায়ণগঞ্জে চিলে কোঠায় জুতোর বাক্সে রেখে সেই পুতুল বর আর বৌ দিয়ে আমি আর রাজী খেলতাম। আমাদের কোলাহলে ছাদের রেলিঙে বসা পায়রা হঠাৎ উড়াল দিত।

আমার নানী দাবা খেলতেন। পড়ন্ত বিকেলে আমাদের দূরন্তপনাতে অস্থির হয়ে পড়লে স্থিত করতে ডেকে এনে খেলায় আটকে রাখতেন। আমি পাঁচ চালেই হারতাম। আমার কোন গ্লানিও হতো না।কিন্তু লেগে থাকতাম। আটকাতে পারতেন না আমার ছোটভাই শুবুকে। অত্যন্ত অল্প বয়সেই চশ্‌মাধারী ও বুদ্ধিমান ছিলো সেই কেবল নানীভাইকে আটকাতে পারতো। দৃশ্যটা এখনো পরিষ্কার মনে আছে। শোয়েব এক একটা চাল দিয়ে লনে ফুটবল খেলতো।দু একটা লাথি দিয়ে আবার গিয়ে দেখতো তার চাল দেবার সময় এসেছে কিনা। না হলে আরো খেলতো আর চিৎকার করে বলতো, নানীভাই অইছেনি! আমি দাবার নিয়মটা তাঁর কাছে থেকে শিখলেও জেতা শিখতে পারিনি। দাবায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখাটাই বড় কথা। তার জন্য সুদূর চিন্তা করতে হয়। কিন্তু আমি তিন চালের বেশি ভাবতেই সারা হয়ে যেতাম বিধায় দাবাতে জেতার ইতিহাস আমার নেই। আমি কাঁদতাম।

নানীভাইর তিন পুত্র বিলেতেই জীবিকা ও জীবন নির্মান করে গত হয়েছেন। এঁরা লন্ডন আসা শুরু করলে এদের বিদায়ের দিন আগে থেকেই বাড়িতে জল ভরা বালতি বদনা সাজিয়ে রাখা হতো। আমরা ছোট ছোট পানসী নৌকারা -বাবলু ভাই , বুলু, ভাইয়া সেদিন মেজমামার বাসায় ঘোরাঘুরি করতাম। অপেক্ষায় থাকতাম মামা চলে গেলেই উচ্চস্বরে ক্রন্দন করে কখন ফিট হবেন আর দৌড়ে গিয়ে বদনা ধরবো। এদিকে আবার যেদিন তাদের কেউ ফিরে আসতেন সেদিনও তাঁকে কদমবুসি করে উঠে দাঁড়ালে বুকে জড়িয়ে ধরে আবারো উচ্চস্বরে ক্রন্দন করতেন। এবারের শব্দ কম হতো। আর ফিট হতেন না। তবে এই আনন্দের কান্নাটার অর্থ বুঝতাম না।

এখন বুঝি। আমার ঈশিতা, সজীব বা আনাহিতাকে দীর্ঘ বিরতির পর দেখলে বুকে জড়িয়ে ধরার পর কেন চোখ ভিজে আসে। এই করোনার ক্রান্তিকাল যখন শেষে হবে, তখন প্রথম যখন আনাহিতাকে দেখবো তখন উচ্চস্বরে সই বলে তাকে বুকে জড়িয়ে আজকের এ নানীও আনন্দে কাঁদবে। এবং শব্দ করেই। সে আমি নিশ্চিত।।

লন্ডন

ছড়িয়ে দিন