নারীবাদ হলো নারীর  মানবাধিকার আদায়ের একমাত্র দর্শন

প্রকাশিত: ৯:১৬ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২১

নারীবাদ হলো নারীর  মানবাধিকার আদায়ের একমাত্র দর্শন

মীরা মেহেরুন

নারীবাদ হলো নারীর  মানবাধিকার আদায়ের একমাত্র দর্শন বা তত্ত্ব। নারীবাদ, পুরুষের মতো করে নারীর সামাজিক পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয়সহ যাবতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। নারী তুলনামূলক ভাবে পুরুষের মতোই সক্ষম এবং সমাজের সর্বস্তরে তার অবদান পুরুষের থেকে কম নয়–এটা নারীবাদের দাবি।
আমার মূল বক্তব্য নারীবাদ বিশ্লেষণ করা নয়। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা দাবি করছে এই কারণে যে নারীবাদ ছাড়া কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হয়নি বা সম্ভবও নয়। যে ব্যক্তি বা সামাজিক গোষ্ঠী নারীবাদ সম্পর্কে অপব্যাখ্যা ও অপপ্রচার করে তারা নারীর সামগ্ৰীক মানবাধিকারের চরম বিপক্ষে। ‘নারীবাদ’ শব্দটি নিয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের একটি অংশের এলার্জির শেষ নেই। আমি তখনই সবচেয়ে অসহায় বোধ করি যখন কোনো নারী নারীবাদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এমনকি সার্টিফিকেট ধারী অসংখ্য নারীদের নারীবাদের বিরুদ্ধে নাক সিঁটকাতে দেখেছি।
এখানে পুরুষতান্ত্রিকতার কিছু সূক্ষ্ম ও নীরব ফাঁদে আটকা পড়েছে নারীর বোধ। যুগ যুগ ধরে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি নারীকে মনস্তাত্ত্বিক মূল্যবোধের দাসত্ব করার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এবং সেগুলো দেখিয়ে পড়িয়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে নারী এক আকস্মিক সত্ত্বা, পুরুষের উদ্বৃত্ত অস্থি দ্বারা সৃষ্টি, অপ্রয়োজনীয়, আপেক্ষিক, জৈবিক সত্ত্বা, লৈঙ্গিক সত্ত্বা, বিমূর্ত, অপর ইত্যাদি। সুতরাং তার আবার অধিকার কিসের? চলচ্চিত্রে যে নারী গাইছে, ছায়া হয়ে তবু পাশে রইবো…… আমি কাঁদি শুনে হাসে বিশ্ব….. কাছে তুমি প্রিয় তবু আমি নিঃস্ব…..। আমাদের সংস্কৃতি নারীকে ছায়া কায়া নিঃস্ব নাককাঁদুনে, ছিঁচকাদুনে হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করে। বাস্তব জগতের নারীরা বিশেষত বুর্জোয়া সুবিধাভোগী নারী গোষ্ঠীর মগজে প্রতিস্থাপন করা হয় এসব সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনুগামী হওয়ার মূল্যবোধ। এসব মূল্যবোধ থেকে তারা শিখে নেয় কিভাবে একজন শ্বাশ্বত ও চিরন্তন নারী হয়ে ওঠা যায়–যাদের চাওয়া পাওয়া বলে কিছু থাকবে না তারা ছায়া হয়ে, কায়া হয়ে, নিঃস্ব হয়ে কেঁদে কেঁদে তাদের জীবন পার করে দেবে।
নারীবাদকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস রয়েছে।
একটু পেছনে ফিরে তাকানো যাক। ফরাসি দার্শনিক চার্লস ফুরিয়ে ১৮৩৭ সালে প্রথম নারীবাদ শব্দটি ব্যবহার করেন, যুক্তরাজ্যে ১৮৯০ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৪০ সালে। খুব বেশি দিনের নয় মাত্র কয়েক দশকের নারীবাদী আন্দোলনের ফসল তারা ঘরে তুলতে পেরেছে যার ফলস্বরূপ পশ্চিমা দেশগুলোর প্রায় ৮৫ শতাংশ নারী উত্তরাধিকার সূত্রে পিতা-মাতার সম্পদে সমানাধিকার ভোগ করে। একমাত্র নারীবাদের মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় ভোটাধিকার প্রয়োগ, স্ব-ইচ্ছায় বিবাহের অধিকার, সম্পদে সমানাধিকার সহ সর্বক্ষেত্রে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠাকল্পে সফল হয়েছে।
বাংলাদেশে নারীবাদের গোড়াপত্তন শুরু হয় ১৮৫০ এর পরবর্তীতে নবাব ফয়জুননেসার মাধ্যমে যিনি ছিলেন এই উপমহাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত। পরবর্তীতে বেগম রোকেয়া, তসলিমা নাসরিন, বেগম সুফিয়া কামাল সহ আরো অনেকে নারীবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে বিভিন্ন ইস্যুতে নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রয়াস খুঁজেছেন। নবাব ফয়জুননেসার পরবর্তী কাল সময় থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রায় ২০০বছরের কাছাকাছি সময়ে আমরা অবস্থান করছি। ভেবে দেখার বিষয় এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় নারীর অর্জন কি! তাবৎ আন্দোলনের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে, নারী এগিয়েছে কিন্তু উন্নত রাষ্ট্রগুলোর মতো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
আরো পেছনে ফেরা যাক যেখানে সভ্যতার আলো ছিলো না। তখন শ্রেণি বৈষম্য আর বর্ণ বৈষম্যেবাদের দুষ্টচক্রের শেকড় প্রোথিত হয়নি হোমোসেফিয়েন্সের সরল মনস্তত্ত্বে। সেই আরণ্য পর্ব থেকে কৃষি পর্বে উত্তরণ ঘটালো এই নারীই। নারী তুলে দিল মানুষের মুখে শষ্যদানা। গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলো কৃষি ও ভূমির। ভূমি অধিকার ও আধিপত্যবাদের লড়াই শুরু হলো আর তা রক্ষার তাগিদে গোত্রের সৃষ্টি হলো এবং গোত্রের অধিপতির হাতে চলে গেল ভূমির অধিকার। সম্পদ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারী হারালো তার ভূমির অধিকার। কায়িক শক্তির কারণে ভূমিতে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো পুরুষের।
ভূসম্পত্তি থেকে নারীর এই বিচ্ছিন্নতাকে এঙ্গেলস বলেছেন, এটা নারী জাতির এক ঐতিহাসিক পরাজয়, যে ভার এখনও বয়ে চলেছে নারী। ভূ-সম্পত্তির সাথে সাথে নারী হারিয়েছে তার যাবতীয় মানবাধিকার ও। যে কারণে বিশ্বজুড়ে নারী ভুগে চলেছে বহুমুখী চরম মানবাধিকার সংকটে।
গহনা, শাড়ি, প্রসাধনী বুর্জোয়া সুবিধাভোগী নারী গোষ্ঠীর অতি প্রিয় প্রাপ্তি যা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না। নারীর মস্তিষ্কে এই বোধটি জাগ্ৰত হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পিতা-মাতার সম্পদে একখামছি, স্বামীর সম্পদে একখামছি–অধিকাংশ নারী এসব খামছি খামছি সম্পদ হাতের মুঠোয় তুলে আনতে সক্ষম হয় না নানা কারণে। নারীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে পিতা-মাতার সম্পদে কন্যাসন্তানের সমানাধিকার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। যার সঙ্গে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ শত ভাগ নিশ্চিত হবে বলে আমি মনে করি।
আমার দাবি পিতা-মাতার কাছে, রাষ্ট্রের নিকট কিন্তু কোনো ব্যক্তির নিকট নয়। পিতা-মাতাই তার পুত্রসন্তানের সমান অংশ প্রদানের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারেন তার কন্যাসন্তানের জন্মগত অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং আর্থিক নিরাপত্তাসহ যাবতীয় নিরাপত্তা ।
জীবন ধারণের জন্য এক সন্তানকে ১০০ভাগ এবং অন্য সন্তানকে ৫০ ভাগ দিলে তার জীবন যাপন হয়ে ওঠে বিপন্ন, সংকটাপন্ন। একসন্তানকে সুবিধা দান এবং অন্য সন্তানের জীবনকে সংকটময় করে তোলার কোনো অধিকার কোনো পিতা মাতার নেই।
সুতরাং ঘর থেকেই প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে পিতা-মাতাকেই। সে ক্ষেত্রে ধর্ম বা রাষ্ট্রের দিক থেকে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না। আপনার সম্পদ আপনি কাকে কতটুকু দেবেন সে ইচ্ছা একান্তভাবেই আপনার নিজের। নীতিগতভাবেও আপনি আপনার কন্যাসন্তানকে অর্ধেক সম্পদ প্রদানের মাধ্যমে ঠকাতে পারেন না। পিতা-মাতার ঘর থেকে কন্যা ঠকতে ঠকতে বের হয় বলে সমাজের সর্বস্তরে সে ঠকতে থাকে আর হেয় প্রতিপন্ন হতে থাকে। তার জন্য অপেক্ষা করে কেবল উপেক্ষা, ভর্ৎসনা আর তাচ্ছিল্যময় জীবন যাপন। আর এসব নিয়ামক গুলিই পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের হাতে তুলে দেয় নারী নির্যাতনের চরম ও নিষ্ঠুর খড়গ।
এ দাবি জীবনের দাবি এবং তা আদায়ের এখনি সময়।

Calendar

March 2021
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031  

http://jugapath.com