নারীমুক্তি আর বিপ্লবের অপর নাম লীলা নাগ

প্রকাশিত: ৯:১১ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১

নারীমুক্তি আর বিপ্লবের অপর নাম লীলা নাগ

 

যখন নারীরা ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার বাহিরে ঠিক সে সময়ে যারা নারী শিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন
তাদের মধ্যে লীলা নাগ অন্যতম।তাই তিনি নারী জাগরণীর অগ্রদূত হিসাবে আমাদের কাছে পরিচিত। এই মহীয়সী নারীর জন্ম: অক্টোবর২, ১৯০০- মৃত্যু: জুন ১১, ১৯৭০ ইংরেজি । বাংলাদেশের মানুষ কৃতজ্ঞতার সাথে তাঁকে স্মরণ করছে যুগে যুগে। আর আগামীতেও তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে সমাজসেবার কারণে। তৎকালীন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী হলেন এই লীলা নাগ । তাই এই নারী আমাদের কাছে নারী শিক্ষার প্রেরণার বাতিঘর হয়ে আছেন। যতদিন এই মানুষ গড়ার প্রতিষ্ঠান থাকবে ততদিন তার স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকবে। আজকে এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষক, ছাত্র, ভূমিদাতা, এইসব মহামানবদের আমরা ভুলতে বসেছি, কারণ খ্যাতির বাজারে আমারা খাদক বনে গেছি, তাই স্বীয়স্বার্থ চরিতার্থ করতে কৃপণতা করি মহামনবদের সম্মান জানানোর বিষয়েও। আজকে বিভিন্ন সড়ক, প্রতিষ্ঠান ,ব্রিজের নামকরণ হচ্ছে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে কিন্তু কেন এরকম মহতী কাজের স্বীকৃতিসরূপ আমারা আদায় করে নিতে পারি না । আমাদের অন্তরআত্মা ঘুমিয়ে আছে তাই। তাই আজ ক্ষমা না চেয়ে উপায় নেই। ইতিহাস আমাদের কোনদিন ক্ষমা করবে না। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্নিকন্যা ছিলেন এই লীলা নাগ।যখন ব্রিটিশ খেদাও আন্দলেনে রক্তে ভেসে যাচ্ছিল প্রিয় স্বদেশ তখন এই বিপ্লবী নারী ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শান্তি কমিটি। তিনি মেয়েদেরকে সে সময়ের পুরুষ শাসিত সমাজ থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে “দীপালি সংঘ” গঠন করেন। এখানে মেয়েরা সাহিত্য, রাজনীতি ও অর্থনীতির দীক্ষা নিতে শুরু করে। শুরু হয় মেয়েদের সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পালা। এই নারী প্রথমে কংগ্রেসের হয়ে কাজ করেন পরবর্তীতে নেতাজি সুভাসচন্দ্রের ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ সংগঠনের হয়েও কাজ করেন। এই কারণে কারাবরণ ও করতে হয় তাঁকে। তিনি নেতাজি সুভাসচন্দ্র বসুর সহকারীর দায়িত্ব ও পালন করেন। তাঁর বাবা গিরিশ চন্দ্র নাগ আসামের গোয়ালপাড়া মহকুমার প্রশাসক ছিলেন আর সেখানে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। কিন্তু তার পিতভূমি ছিল সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাও গ্রামে। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় তাঁর বাড়ির সব সদস্য তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে যান। বর্তমানে আইনি কিছু জটিলতার ভিতরে রয়েছে এই বাড়িটি।এখানে দীর্ঘ দিনের অযত্ন আর অবহেলার কারণে বাড়ির চিহ্ন প্রায় মুছে যেতে বসেছে। হয়তো কোনো এক সময় এই জায়গাতে যে তাঁর বাড়ি ছিল তা প্রমাণ করা দুষ্কর হয়ে যাবে। তাই তাঁর ভক্ত ও এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি এই বাড়িটি সরকারি হস্তক্ষেপের বিশেষ প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।সরকার এখানে শিল্প সংস্কৃতির যে কোনো প্রতিষ্ঠান বা একটি নান্দনিক পাঠাগার ও করতে পারেন। আশা করছি সরকার এ বিষয়ে এগিয়ে আসবেন গ্লানির কালিমা থেকে আমাদের নাম মুছে দিতে। লীলা নাগ এর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় কলকাতা ব্রাহ্ম স্কুলে, মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করেন ঢাকার ইডেন গার্লস স্কুলে, তারপর কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে বিএ (সম্মান)ইংরেজিতে উত্তীর্ণ হয়ে ১৯২১ সালে ঢাকাতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আর এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম ছাত্রীর মর্যাদা ও লাভ করেন। তিনি ১৯৩৯ সালে বৈবাহিক জীবন শুরু করেন বিপ্লবী দার্শনিক অনিল রায়ের সঙ্গে। তিনি ১৯৩৫ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নামে জাগরণের বাণী সমাজে ছড়িয়ে দিতে বের করেন ‘জয়শ্রী’ পত্রিকা এবং তাঁর বাবার জায়গাতে মা কুঞ্জলতা দেবী চৌধুরীর নামে প্রতিষ্ঠা করেন কুঞ্জলতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।এছাড়া ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘নারীশিক্ষা মন্দির’ নামে আরেকটি বিদ্যালয়। তিনি ছিলেন স্বপ্নের চেয়েও বড় চিন্তার মানুষ। তাইতো তিনি মেয়েদের উচ্চ স্বপ্ন দেখিয়েছেন, একটা শ্রেষ্ঠ জীবন উপহার দিয়ে মেয়েদেরকেরকে অতিমানব করে তুলতে পিছপা হননি। আর তিনি এই কাজে সফলতা পেয়েছেন বলেই আজকে উনাকে সম্মানের সাথে আমরা স্মরণ করছি। তিনি যে সময়ে এই সমাজের জন্য একজন নারী হিসাবে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা আজো আমাদেরকে গর্বিত করে, এই কারণে তাঁর মত একজন নারী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করা সে সময়ে কতটা সাহসের বিষয় হতে পারে কেবল তারাই জানেন সেই সময়ের লোকেরা। তাই শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে আমরা কখনো কৃপণতা করবার সাহস রাখিনা । একজন নারী হয়ে এই সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছেন লিঙ্গ কোন বিষয় নয়, কর্মই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে।

“কীর্তিমানের মৃত্যু নেই।”
প্রিয় লীলানাগ,
বাঙালি জাতি যতদিন বাঁচবেন ততদিন মানুষের হৃদয়ে স্মরণীয় বরণীয় হয়ে থাকবেন। তবুও আমাদেরকে অবশ্যই কিছু করতে হবে এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের জন্য। আর তা করতে হলে সরকারের সহযোগীতা ও আন্তরিকতা অনস্বীকার্য। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও একজন সাহিত্যের পৃষ্টপোষক ধারক বাহক।
তাই অন্তরাত্মার করজোড় দাবি নিয়ে বলছি, গুণীদের সবসময় যেন একটা সম্মান দেওয়ার ব্যবস্থা করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। এবং তা দেখে যেন তাদের বিদেহী আত্মা শান্তি লাভ হয়। তবেই হয়তো তাঁদের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ হবে আমাদের। আর এ থেকে অনুপ্রাণিত হবে আমাদের প্রজন্ম।

আজিজুল আম্বিয়া , লেখক ও কলামিস্ট ।

ছড়িয়ে দিন

Calendar

September 2021
S M T W T F S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930