নারীর অগ্রযাত্রায় ব্যাংক

প্রকাশিত: ৫:৪০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৭, ২০২০

নারীর অগ্রযাত্রায় ব্যাংক

মো. আব্দুল আলীম

বাধা পেরিয়ে এগোচ্ছেন নারী। এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত নারী। সরকারি-বেসরকারি চাকরিতেও তারা সমানতালে জায়গা করে নিচ্ছেন। নিজ উদ্যোগে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে অনেকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও করছেন। এসব উদ্যমী নারীর পাশে দাঁড়াতে, তাদের আরও এগিয়ে নিতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের একটি বড় অংশ নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি অনেক ব্যাংক এখন নারীদের জন্য বিশেষায়িত সেবা চালু করেছে। শুধু নারী কর্মীদের নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালু করা হয়েছে আলাদা শাখা। কয়েক বছর আগেও ব্যাংকে নারীর অংশগ্রহণ ছিল হাতেগোনা মাত্র। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কম সংখ্যক নারীকে যুক্ত করা হতো।

নারী উদ্যোক্তা ও ব্যাংকের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বিশেষ করে ব্যাংকগুলোর প্রতিটি শাখায় আবশ্যিকভাবে স্বতন্ত্র নারী উদ্যোক্তা, হেল্প ডেস্ক স্থাপন করা হচ্ছে। এ ডেস্কে একজন নারী কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব ডেস্কের কার্যক্রম তদারকির জন্য ব্যাংকগুলোর প্রধান ও আঞ্চলিক কার্যালয়ে একটি করে নারী উদ্যোক্তা ইউনিট করতে বলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে উদ্বুদ্ধ করতে আলাদা নারী শাখা খুলছে অনেক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবেও এসব শাখা খুলছে ব্যাংকগুলো।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নারী কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কম থাকলে ধীরে ধীরে দেশের সব ক্ষেত্রের মতোই নারী কর্মীদের সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৮ সালে ব্যাংকে নারী কর্মীর হার ছিল ১৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ। বর্তমানে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট কর্মীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮ শত ৭৫ জন। এর মধ্যে ২৫ হাজার ৭ শত ৭১ জন নারী। ব্যাংকে নারী কর্মীর অংশগ্রহণ ১৫ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লিঙ্গ সমতা বিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। দেশের ৫৮টি ব্যাংকের তথ্য নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে ১৪ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে পরিচালনা পর্ষদে নারীর অংশগ্রহণ ১৪ শতাংশ।

উদ্যোগী নারীদের উৎসাহ দিয়ে এগিয়ে নিতে ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতে তাদের সহায়তায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের আওতায় নারীরা মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন। পুরুষ উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সুদ দিতে হয় ৯ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর মোট এসএমই ঋণের একটি অংশ নারীদের জন্য বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের ক্ষতি পোষাতে ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলের ৫ শতাংশ নারীদের জন্য বরাদ্দ দিতে বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগের পর ব্যাংক ঋণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।

সাধারণ ব্যাংকিং কার্যক্রমে নারীদের অগ্রাধিকার ও বিশেষ সুবিধা দেওয়া এবং বিভিন্ন উদ্যোগে অর্থায়নে পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলো বিশেষায়িত বিভিন্ন সেবাও চালু করেছে নারীদের জন্য। ঋণসহ সব ধরনের আর্থিক সেবা দিতে ব্রাক ব্যাংক ‘তারা’ নামে একটি সেবা চালু রয়েছে। সিটি ব্যাংকের রয়েছে ‘সিটি আলো’। শুধু ঋণ দেওয়ার জন্য অগ্রণী ব্যাংকের ‘অগ্রণী এসএমই’, এবি ব্যাংকের ‘অপরাজিতা’, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ‘গুণবতী’, আইএফআইসি ব্যাংকের ‘প্রত্যাশা ও প্রান্ত’, ব্যাংক এশিয়ার ‘সুবর্ণ’, ইবিএলের ‘ইবিএল উইমেন’সহ বিভিন্ন ব্যাংকে বিশেষায়িত সেবা রয়েছে। বিশেষায়িত এসব সেবার আওতায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম সুদ এবং বিনা জামানতে নির্দিষ্ট একটি অঙ্ক পর্যন্ত ঋণ দিয়ে থাকে। দেওয়া হয় বিভিন্ন পরামর্শ। উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, সেমিনার, মোটিভেশনাল কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে আজকাল। সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেও নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকগুলো।

রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী, জনতা ও রূপালী, বেসরকারি খাতের সিটি, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সাউথইস্ট, এক্সিম, ন্যাশনাল, প্রিমিয়ার, এনআরবি কমার্শিয়াল, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্সসহ কয়েকটি ব্যাংক নারী শাখা খুলেছে। এসব শাখা থেকে নারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেবা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে জেনারেল ব্যাংকিংসহ পুরুষদেরও সেবা দেওয়া হয়। এসব শাখার বেশিরভাগ কর্মকর্তা নারী। ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও রয়েছে বিশেষায়িত সেবা। আর্থিকসহ সব ধরনের সহযোগিতা করতে শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইডিএলসির রয়েছে ‘পূর্ণতা’, আইপিডিসি চালু করেছে ‘জয়ী’, মাইডাস ফাইন্যান্সের রয়েছে ‘দীপ্ত’, বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ডের রয়েছে ‘শৈলী’, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স নারীদের জন্য চালু করেছে ‘মহিলা উদ্যোক্তা ঋণ’। এছাড়া নারীদের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন নামে ঋণের ব্যবস্থা করেছে।

ব্যক্তিমালিকানাধীন বা প্রোপাইটরি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী নারী হলে সেটি নারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত। অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বা নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে কমপক্ষে ৫১ শতাংশ মালিকানা নারীদের হলে সেটি নারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়। নারীদের উৎসাহ দিতে এ ধরনের উদ্যোগে কম সুদে ও জামানতের শিথিল শর্তে ঋণ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং উদ্যোক্তা হিসেবে উৎসাহ দিতে সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নানা উদ্যোগ রয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ, সভা-সেমিনার ও মেলার আয়োজনের মাধ্যমে নারীদের পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা ও পরামর্শে ব্যাংকগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও এসব কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) ঋণে নারীদের অংশ বাড়াতে নিয়মিত বিভিন্ন নির্দেশনা দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়নের আওতায় এসএমই খাতে বিতরণ করা ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারীদের মধ্যে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় নারী উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত গ্যারান্টিকে জামানত হিসেবে বিবেচনা করে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বর্তমানে চারটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চলমান রয়েছে। এর মধ্যে নারীদের অগ্রাধিকারভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার জন্য ‘স্মল এন্টারপ্রাইজ খাতে পুনঃঅর্থায়ন স্কিম’-এর আকার ৮৫০ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি করে দেড় হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। এ ছাড়া সারাদেশে ব্যাংকগুলোর প্রায় ১১ হাজার শাখা রয়েছে। প্রতিটি শাখা থেকে বছরে অন্তত তিনজন নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। যাদের মধ্য থেকে অন্তত একজনকে ঋণ দিতে হবে।

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্রঋণ ভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, যেটি মূলত সমবায় পদ্ধতিতে পরিচালিত। দারিদ্র্য বিমোচনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প (বতর্মান নাম আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প) গ্রহণ করা হয় ২০০৯ সালে। উক্ত প্রকল্পের কার্যক্রমকে প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার জন্য ২০১৪ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশের ৪৮৫টি উপজেলায় ব্যাংকটির ৪৮৫টি শাখা আছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের উদ্দেশ্য হলো দেশের গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করা, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিসহ নারীর ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা। এছাড়া গ্রামীণ নারীদের প্রশিক্ষণ, তহবিলের জোগান এবং ঋণদানের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে লক্ষ্য।

গ্রামীণ নারীদের বিশেষ করে আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের আওতায় সমিতির সদস্যদের আর্থিক সেবা প্রদানের জন্য ৪৮৫ টি উপজেলা সদরে ব্যাংকের নিজস্ব ভবনে শাখা স্থাপন করা হয়েছে এবং আরো ৫টি উপজেলা সদরে শাখা স্থাপন প্রক্রিয়াধীন আছে। ব্যাংকের নিজস্ব অনলাইন ব্যাংকিং সফটওয়্যারের মাধ্যমে সদস্যদের আর্থিক সেবা প্রদান করা হয়। আর্থিক সেবা সদস্যদের কাছে আরো সহজলভ্য করার জন্য চালু করা হয়েছে ব্যাংকের নিজস্ব ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘পল্লী লেনদেন’। এ সেবার মাধ্যমে সমিতির সদস্যগণের বিদেশে থাকা আতœীয় স্বজনদের প্রেরিত রেমিটেন্স ‘পল্লী লেনদেন’ এর মাধ্যমে উত্তোলণ করতে পারেন। তাছাড়া এ সেবার মাধ্যমে যাবতীয় বিল প্রদান ও সরকার কর্তৃক প্রদেয় বিভিন্ন ভাতাদি উত্তোলণ করা যায়। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য বিমোচনে সচেষ্ট রয়েছে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক।

ব্যাংকিং সেবা আরো নারীবান্ধব এবং দেশের প্রতিটি এলাকায় পৌঁছে দিতে সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়াস চালিয়ে যচ্ছে। এখন অনেক নারী ব্যাংকে ক্যারিয়ার গড়তে এগিয়ে আসছেন। ব্যাংক ঋণ নিয়ে নারীরা উদোক্তা হচ্ছেন অন্যের চাকুরির ব্যবস্থা করছেন। সরকার দেশের প্রতিটি মানুষের ব্যাংকিং নেটওয়র্কের আওতায় আনার চেষ্ট করছে। আমাদের উচিত সরকারের এ কাজে সহযোগিতা করা।