নারী চা শ্রমিক  চা শিল্পের প্রাণ

প্রকাশিত: ৩:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ৩, ২০২১

নারী চা শ্রমিক  চা শিল্পের প্রাণ

ড. শিল্পী ভদ্র

আগামীকাল ৪ জুন দেশে প্রথম বারের মতো জাতীয় চা দিবস উদযাপিত হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় চা বোর্ডের উদ্যোগে এ উপলক্ষে করোনা ভাইরাস মহামারির প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। ১৯৫৭ সালের ৪ জুন প্রথম বাঙালি হিসেবে তৎকালীন চা বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালনকালে বঙ্গবন্ধু চা শিল্পের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় চা দিবস উপলক্ষে পিআইডি ফিচারটিতে নারী চা শ্রমিকদের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।
চা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প। জাতীয় অর্থনীতিতে এ শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চা উৎপাদনের সাথে যারা সরাসরি জড়িত তারাই চা-শ্রমিক নামে অভিহিত।
চা শিল্পের বর্তমান জনপ্রিয়তার পেছনে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীনের অনুকরণেই ভারতবর্ষে চা চাষ শুরু করে। ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানে চা চাষ শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
চা চাষের শুরুতে স্থানীয়ভাবে চা-শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। সেজন্য আসাম সরকারের সহায়তায় তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো চা-শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করে। বিহার, উড়িষ্যা, মাদ্রাজ (চেন্নাই), নাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ থেকে প্রচুর চা-শ্রমিক এদেশে নিয়ে আসা হয়। এজন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগও চালু হয়। এ সময় আসাম সরকার ‘ইমিগ্রেশন অব লেবার অ্যাক্ট’ কার্যকর করে। চা-বাগানের শ্রমিকদের ডাকা হতো ‘কুলি’ নামে।
চা-শ্রমিকের ব্যবস্থা হলেও চা-বাগানের বিভিন্ন পরিচালন ব্যবস্থায় তখনও যোগ্য জনশক্তির অভাব ছিল। ফলে কয়েক হাজার বাঙালি এসব পদে নিয়োগ পান। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বেঙ্গল-আসাম রেলপথ স্থাপিত হলে পূর্ববঙ্গের ঢাকা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, ত্রিপুরা, রংপুর প্রভৃতি জেলা থেকে লাখ লাখ বাঙালি কৃষিজীবীকে কলোনাইজেশন স্কিমের আওতায় এনে তৎকালীন আসামের বিভিন্ন স্থানে অনাবাদি জঙ্গলাকীর্ণ জমি চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়।
শুরু থেকেই এই শ্রমজীবী মানুষগুলো চরম অবহেলিত। চা-বাগানের আশেপাশে জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিগুলো ছিল প্রকট ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের উর্বর ক্ষেত্র। বিশাল পাহাড় পরিষ্কার করে চা বাগান করতে গিয়ে হিং¯্র পশুর কবলে পড়ে কত শ্রমিকের জীবন অকালে চলে গিয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই। এছাড়া ব্রিটিশদের অত্যাচার তো ছিলোই।
এভাবে চা শিল্পের যাত্রা শুরু হয় সিলেটে। দিনে দিনে সম্প্রসারিত হয় চা-চাষের এলাকা, বাড়তে থাকে শ্রমিকদের সংখ্যাও। চা শিল্পের সাথে নারী চা-শ্রমিকদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কারণ নারী শ্রমিকরাই চা গাছের ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ সংগ্রহ করে থাকেন। পুরুষ চা-শ্রমিকরা চা বাগানের আগাছা পরিষ্কার করা, চায়ের চারা রোপণ, নার্সারিতে চারা উৎপন্ন করা, ছায়াবৃক্ষ বা ‘শেড ট্রি’ রোপণ, বাগান পাহারা, ফ্যাক্টরিতে চা উৎপাদনে সহায়তা করাসহ বাগানের অনান্য কাজ করে থাকেন।
বাংলাদেশের চা বাগানে কর্মরতদের ৭৫% নারী। অনেক শ্রমিকই উপজাতি। এসব নারী শ্রমিকের মধ্যে আবার রয়েছে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরির শ্রমিক। তাদের দৈনিক হাজিরা (বেতন) ক্যাটাগরি ভিত্তিতে পরিশোধ করা হয়। আবাসস্থল, রেশনসহ অন্য সুবিধাও তারা পান। অল্প বেতনে চা-শ্রমিকদের সংসার চালানো অত্যন্ত কষ্টকর হলেও তারা নিজেদের সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চা-শিল্পের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় অবদান রেখে চলেছেন।
চা শিল্পে নিয়োজিত নারী চা-শ্রমিকরা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চা বাগানের বিভিন্ন সেকশনে কাজ করে থাকেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঝড়, বৃষ্টি সব উপেক্ষা করে তারা প্রতিদিন কাজ করেন। প্রায় ৭ ঘণ্টা চা পাতা সংগ্রহের মাঝে দুপুরে খাবারের জন্য ৩০ মিনিট ছুটি দেয়া হয়। চা বাগানের গাছের ছায়ায় বসে তারা দুপুরের নাশতা বা হালকা খাবার খান। তাদের দুপুরের খাবারের তালিকায় বেশির ভাগ সময় থাকে আটা দিয়ে তৈরি-করা শুকনো রুটি। এছাড়া কচি চা পাতা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, লবণ দিয়ে তৈরি এক ধরনের ভর্তা-জাতীয় খাবার তারা খেয়ে থাকেন। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত পাতা সংগ্রহের পর তারা চা পাতাগুলো মাপার জন্য সেকশনের পাতিঘরে নিয়ে যান। চা পাতা মাপা শেষ হলে নারী চা-শ্রমিকরা টিলা বাবুর কাছে হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে ঘরে ফেরেন। নারী চা-শ্রমিকরা চা সংগ্রহের সময় সাধারণত ব্লাউজ ও পেটিকোট পরিধান করে থাকেন। তবে অল্পবয়সী তরুণীরা সালোয়ার-কামিজ পরেন।
নারী চা-শ্রমিকদের প্রসঙ্গে ফিনলে টি কোম্পানির বুড়বুড়িয়া চা বাগানের নারী শ্রমিক শ্রীমতি হাজরা বলেন, পুরুষ চা-শ্রমিকদের তুলনায় নারী চা-শ্রমিকরা চারগুণ বেশি পরিশ্রম করেন। কিন্তু তাদের হাজিরা (বেতন) পুরুষ চা-শ্রমিকদের সমান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরুষদের থেকে কম হাজিরাও পেয়ে থাকেন। চা-বাগানের সবচেয়ে কষ্টকর কাজ কচি চা পাতা সংগ্রহ। আর এ কাজটি করে থাকেন নারী চা-শ্রমিকরাই। চা শিল্পের উন্নয়নে নারী চা-শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও তাদের পরিশ্রমের মূল্যায়ন হয়না বললেই চলে।
অবহেলিত ও অনগ্রসর এই জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, তাদের সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিতকরণ, পারিবারিক ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের আওতায় ‘চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম’ বাস্তবায়ন করেছে।
চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য রয়েছে। রয়েছে নীতিমালা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের কৌশল। প্রকৃত দুস্থ চা-শ্রমিকদের সনাক্ত করে সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও চা বাগান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রকৃত দুস্থ ও অসহায় চা শ্রমিকদের তালিকা প্রণয়নপূর্বক এ ‘চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম’ বাস্তবায়ন করা হয়। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ এবং পঞ্চগড় জেলার চা বাগানসমূহে কর্মরত চা শ্রমিকগণ এ কর্মসূচির আওতাভুক্ত। এ কার্যক্রমে খাদ্য সহায়তার পরিমাণও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি দুস্থ চা-শ্রমিক পরিবারকে সর্বমোট ৫,০০০ টাকার খাদ্য সামগ্রী প্যাকেটজাত অবস্থায় ৩ বারে বিতরণ করা হয় ।
চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমে উপকারভোগী নির্বাচনের মানদ- রয়েছে, যেখানে নারী শ্রমিককে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়ে থাকে। চা-শ্রমিকদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, বিপতœীক ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদেরকে ক্রমানুসারে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
যদিও উপমহাদেশে চা চাষের শুরু হয়েছিল ব্রিটিশদের হাতে। ‘সেই আধিপত্য এখন চলে এসেছে দেশি শিল্প গ্রুপের হাতে। বিগত দুই দশকে ব্রিটিশ কোম্পানি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন বাগান ইজারা নিয়ে বিনিয়োগ করেছে দেশীয় শিল্প গ্রুপগুলো। এই তালিকায় আছে ১৮টি শিল্প গ্রুপ। এসব মালিক বাগান সংস্কার ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়নে বিনিয়োগ করেছে। তাতে কয়েক বছরে চায়ের উৎপাদন প্রত্যাশা ছাড়িয়েছে।
চা-বোর্ডও দুই দশকে নতুন নতুন প্রকল্প নিয়েছে। চা চাষের আওতা বাড়াতে চা-বোর্ড তদারকি বাড়িয়েছে। ক্ষুদ্র চাষি ও নতুন উদ্যোক্তাদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করেছে। তাতে দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে চা উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু সিলেট-চট্টগ্রাম ছাড়িয়ে চা চাষের বিস্তার ঘটেছে উত্তরাঞ্চল ও পার্বত্য জেলায়।
বাংলাদেশ থেকে চা রপ্তানি করা হয় ১৯টি দেশে। চা উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য ক্রমেই বাড়ছে। গত বছরই দেশে চায়ের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ৬০ লাখ কেজিতে। এই সাফল্য এসেছে মূলত দেশীয় বড় গ্রুপের হাত ধরে।
চা শিল্পের সঙ্গে জড়িত অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ব্ল্যাক টি উৎপাদনে আটকে না থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ চা উৎপাদনে নজর দিতে হবে। একই সঙ্গে চা-শিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বাগান সংস্কার ও যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন জরুরি।
সরকার সিলেট বিভাগের চা বাগানের নারী শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহযোগিতায় দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে। এতে ব্যয় হবে ২০ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১৭ কোটি টাকা)। নারী চা শ্রমিকদের জীবনমানের উন্নয়ন এবং পরিবারের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে চা শ্রমিকরা যাতে ঘরবাড়ি পান সেজন্য গৃহায়ন তহবিল থেকে ২% সার্ভিস চার্জের মাধ্যমে চা বাগান মালিকদের ঋণ প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। চা শ্রমিকদের জন্য ১৫ হাজার স্বয়ংসম্পূর্ণ বাসস্থান নির্মাণ, ঘরে ঘরে সুপেয় পানি, গর্ভবতী মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, হাসপাতাল ও স্কুল প্রতিষ্ঠাসহ নানাবিধ পদক্ষেপ তাদের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।

ছড়িয়ে দিন