নিউইয়র্ক বইমেলায় আমার প্রাণের বন্ধুরা

প্রকাশিত: ১০:২১ পূর্বাহ্ণ, জুন ২০, ২০১৮

নিউইয়র্ক বইমেলায় আমার প্রাণের বন্ধুরা

লুৎফর রহমান রিটন

মুক্তধারার বইমেলা এখন আক্ষরিক অর্থেই মিলনমেলা, বাঙলা ও বাঙালির। নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত এই বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর বাংলাদেশ, ভারত, ইল্যান্ড, কানাডাসহ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বই সম্পৃক্ত আলোকিত মানুষদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য আমি লক্ষ্য করি। বই লেখা, বই প্রকাশ করা এবং বই পাঠ করা মানুষদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে এইসময় নিউইয়র্ক থাকে সরগরম। বেশ কয়েক বছর ধরে আমিও উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি প্রাণবন্ত এই ‘বই উৎসবে’।

বইমেলাকে আমি কখনোই শুধুমাত্র বই কেনাবেচার মেলা বলে মনে করি না। বইমেলা আসলে বইকে কেন্দ্র করে একটা মেলা। আর মেলা মানেই বিপুল জনসমাগম। আর যেখানেই জনসমাগম সেখানেই নানান রঙের উপস্থিতি। নানান বিষয়ের উপস্থিতি। নানান অনুষঙ্গ যুক্ত হয় একটা মেলায়। যে কারণে নিউ ইয়র্কের বইমেলায় বইয়ের স্টলের পাশাপাশি থাকে শাড়ি-পোশাক-পিঠেপুলিসহ নানান রকম স্টল।

মুক্তধারার বইমেলায় কতো টাকার বই বিক্রি হয় তার ওপর এর সাফল্য নিরূপন করতে রাজি নই আমি। বইকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যে জাগরণ বা আলোড়ন সেটাও অমূল্য। প্রবাসের যান্ত্রিক জীবনে এই বইমেলা যেনো বা ভীষণ খরায় এক পশলা বৃষ্টির মতো।

আমি নিজেই তো নিউ ইয়র্ক বইমেলায় বই কিনতে ছুটে যাই না। বরং আমি যাই আমার আত্মার আত্মীয় বইয়ের মানুষদের সান্নিধ্যের আকর্ষণে। ঢাকা থেকে আমার লেখক বন্ধুরা আসেন। প্রকাশক বন্ধুরা আসেন। আসেন প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় লেখক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। ভারত থেকেও আসেন প্রিয় লেখকেরা। মূলত তাঁদের সঙ্গে জম্পেশ আড্ডার লোভই আমাকে সেখানে টেনে নিয়ে যায়।

গত কয়েক বছরে এরকম কতোজনের হীরকদ্যুতি সান্নিধ্যই না পেলাম! আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, শামসুজ্জামান খান, শহীদ কাদরী, সেলিনা হোসেন, রামেন্দু মজুমদার, ফরিদুর রেজা সাগর, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা কিংবা পবিত্র সরকার। নক্ষত্রপ্রতীম এই মানুষেরা নানাভাবে দীপাণ্বিত করেছেন আমার জীবনকে। এইসব প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা করতে প্রয়োজনে আমি সাত সমুদ্র পাড়ি দিতেও প্রস্তুত। তুলনায় অটোয়া থেকে নিউ ইয়র্ক তো বাড়ির কাছে আরশীনগর!

বাংলাদেশের মানচিত্রের উলটো পিঠে কানাডায় থাকি বলে এমনিতেই মন খারাপ থাকে। স্বদেশ স্বদেশ বলে এক ধরণের হাহাকার জাগরুক থাকে বুকের গহীনে। তখন বাংলাদেশ থেকে উড়ে আসা প্রিয় একজন মানুষই আমার কাছে হয়ে ওঠেন একটা বাংলাদেশের মতোন। তাঁদেরকে একটু ছুঁয়ে দিয়ে আমি আমার বাংলাদেশকেই ছুঁয়ে ফেলি যেনো। তাঁরা সেটা বুঝতেও পারেন না। গোপনে আমি মুগ্ধ হই। গোপনে আমি ঋদ্ধ হই। গোপনে আমি সংগ্রহ করি বিপুল ফুয়েল। প্রবাসের নিস্তরঙ্গ প্রাত্যহিক যাপিত জীবনে সেই ফুয়েল আমাকে সজীব সতেজ রাখে। আমি উজ্জ্বীবিত হই। আমি জীবিত থাকি। আমি প্রাণবন্ত থাকি।

মুক্তধারার বইমেলায় আসি বলেই তো আমার সঙ্গে আমেরিকায় বসবাসকারী প্রিয় বন্ধুদের সাক্ষাত ঘটে কতো অনায়াসে। ‘সাঁজোয়া তলে মুরগা’র লেখক হালের চলচ্চিত্র নির্মাতা আনোয়ার শাহাদাতের চৌকশ উপস্থিতি আমাকে প্রাণিত করে। তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়া মানে শত ব্যস্ততার ফাঁকেও হিমশীতল ভালুকের ফেনায়িত রসে সিক্ত হওয়া। কানেকটিকাট অঞ্চলের নরওয়াক সিটি থেকে ট্রেনে চেপে উপহার হাতে ছুটে আসে নসরত শাহ। সত্তুরের দশকে কী চমৎকার গল্প লিখতো ছোটদের জন্যে! এখলাসউদ্দিন আহমেদ ও লীলা মজুমদার সম্পাদিত দুই বাংলার ছোটদের সেরা গল্পের সংকলনে নসরত শাহের গল্প মুদ্রিত হয়েছিলো। এখন সে আর লেখে না। কেনো লেখে না কে জানে!

নিউইয়র্ক এলেই আমার শহীদ কাদরীর কথা মনে হয়। এই শহরে কবি শহীদ কাদরী থাকতেন। ২০১৬-র মে মাসের শেষ সপ্তাহে নিউইয়র্ক মুক্তধারার ২৫তম বইমেলায় গিয়ে দেখা হয়েছিলো কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে। এর আগেও আমি নিউইয়র্কের বইমেলায় গিয়েছি কানাডা থেকে, কিন্তু শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি একবারও। যদিও টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে কথা হতো নিয়মিত। কোনো কোনো দিন ঘন্টার পর ঘন্টা। অতীতের দেখা না হওয়ার ঘাটতি সেবার পুরণ হয়েছিলো একাধিক সাক্ষাৎ ও আড্ডায়। তাঁর বাড়িতে একদুপুরের মধ্যাহ্ন ভোজ এবং এক রাতের নৈশভোজসমেত বিপুল আড্ডার স্মৃতি এখনও সজীব আমার করোটির ভেতরে। ২০ মে দুপুরে শহীদ ভাইয়ের বাড়িতে ভোজের নিমন্ত্রণে যেতে হয়েছিলো তাঁর স্ত্রী নীরা কাদরীর আন্তরিক আমন্ত্রণে। টেলিফোনে শহীদ ভাই বলেছিলেন–‘আরে আসো তো! কতোদিন দেখি না তোমাকে।’
হ্যাঁ, বহুদিন, বহুকাল পর সেবার দেখা হলো কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে। এর আগে, সর্বশেষ তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিলো আশির দশকে, সম্ভবত ১৯৮৪ সালে, চৌত্রিশ বছর আগে, র্যাং কিন স্ট্রিটে, শহীদ ভাইয়ের বন্ধু মোশাররফ রসুল ও বিপ্লব দাশের নিবাসস্থলে। সেবার তিনি দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশে গিয়েছিলেন দিনকয়েকের জন্যে। মোশাররফ রসুলের বাড়িতে সন্ধ্যার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত আড্ডায় তিনিই ছিলেন মধ্যমণি। সোফায় কাৎ হয়ে শুয়ে আসর মাৎ করা শহীদ কাদরী মাঝে মধ্যেই হেসে উঠছিলেন ছাদ কাঁপিয়ে। এমন নির্মল অট্টহাসি সবাই হাসতে পারে না। এর জন্যে যে প্রাণশক্তি লাগে শহীদ কাদরীর মধ্যে সেটার যোগান ছিলো অফুরন্ত। ইমদাদুল হক মিলন এবং তাপস মজুমদারও ছিলেন সেই আড্ডায়। দুর্দান্ত স্মৃতিশক্তির অধিকারী শহীদ কাদরীকে র্যাং কিন স্ট্রিটের সেই রাতের আড্ডার কথা মনে করিয়ে দিতেই বেদনার্ত হয়ে উঠেছিলেন শহীদ ভাই। কারণ তাঁর বন্ধু মোশাররফ রসুল ও বিপ্লব দাশ প্রয়াত হয়েছেন আজ অনেক বছর। ঢাকার সাহিত্য জগতের দুই মহা ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার ছিলো এই দু’জন।

মুক্তধারার বইমেলায় মঞ্চে আটকে না থাকলে একটানা কোনো অনুষ্ঠানেই পুরোটা সময় জুড়ে থাকা হয়নি আমার। কারণ আমার ছটফটে স্বভাব। যে কোনো পর্বে খানিকটা সময় থেকে সটকে পড়েছি। শুধু একটি আয়োজনে পুরোটা সময় ছিলাম, দর্শক আসনে। এক মুহূর্তের জন্যেও উঠে যাইনি বা যেতে পারিনি। কারণ সেই পর্বে ছিলো কবি শহীদ কাদরীর সঞ্চালনায় তাঁরই কবিতার আবৃত্তি অনুষ্ঠান ‘কবিতাই আরাধ্য আমার’। তাঁর এক একটি বহুল পঠিত পাঠকপ্রিয় কবিতার জন্মবিত্তান্ত এবং সামাজিক প্রেক্ষাপট ইত্যাদি বিষয়ে বলছিলেন স্বয়ং কবি শহীদ কাদরী এবং আবৃত্তিশিল্পীরা আবৃত্তি করছিলেন সেই কবিতাগুলো। এক কথায় দারূণ একটি সেগমেন্ট। অডিটোরিয়াম পরিপূর্ণ ছিলো।
আহা রে! নিউইয়র্ক বইমেলায় আর দেখা পাবো না শহীদ কাদরীর!

নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগে কর্মরত তরুণ মোস্তাফিজ রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো শহীদ কাদরীর বাড়িতে। সঙ্গে ওর আরেক পড়ুয়া বন্ধু শৈবালও ছিলো। বইমেলায় মোস্তাফিজের সঙ্গেও আমার দারূণ সময় কাটে। পড়ুয়া মোস্তাফিজের ভাই বিখ্যাত টিভি প্রেজেন্টার খালেদ মুহিউদ্দিনও আমার বিশেষ প্রীতিভাজন।

বইমেলায় দেখা হয় শরীফ মাহবুবুল আলমের সঙ্গে। কিশোর বাংলায় গল্প লিখতেন। ‘হলদে বাড়ির রহস্য’ নামে বই বেরিয়েছিলো আশির দশকে। মাঝখানে দীর্ঘদিন লেখালেখি থেকে দূরে ছিলেন। কোন মন্ত্রে জানি না ফের উদ্দীপ্ত হয়েছেন, প্রচুর লিখছেন। বই বেরুচ্ছে ফি বছর।
নাসরীন চৌধুরীও নিয়মিত লিখতো ছোটদের পাতায়।

ফখরুল ইসলাম রচি এক সময় সরব ছিলেন কুমিল্লা ও ঢাকার শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে। কবিতা লিখতেন। নসাস প্রকাশিত ‘অগ্রন্থিত আবুল হাসান’ নামের সম্পাদিত বইটির কল্যাণে কবিতাপ্রেমী পাঠকের সমাদর পেয়েছিলেন। তাঁর হস্তাক্ষরও ছিলো চমৎকার। নিউইয়র্কে এসে সরব রচি নিরব হয়ে গেলেন। এখন আর লেখেন না। কিন্তু নিজের বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে লাল টমাটো কিংবা সবুজ মরিচ ফলিয়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড করেন। বইমেলায় মুফতে দেখা হয়ে যায় তাঁর সঙ্গেও।

দেখা হয় মাহবুব হাসানের সঙ্গে। আশির দশকে কবি হিশেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন সুদর্শন মাহবুব হাসান। তারপর একদিন চলে এলেন আমেরিকায়।
ছড়াকার আলমগীর বাবুল দীর্ঘদিন নিরব থাকার পর ফের সরব হয়েছেন। আমাকে দেখতে ছুটে এসেছিলেন বইমেলায়। অনেক কথা হয় তাঁর সঙ্গে। দাদাভাইকে নিয়ে। অনুশীলন সংঘ এবং শেখ তোফাজ্জল হোসেনকে নিয়ে। নতুন করে শুরু করেছেন আবার, লেখালেখি।

মানিক রহমান ওর কিশোর বেলায় চমৎকার ছড়া লিখতো। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে আমার সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত ছড়া’র একটি খণ্ডে মানিকের ছড়া আছে। সাপ্তাহিক ‘বিচিন্তা’য় কাজ করতো মিনার মাহমুদের সঙ্গে। এখন থাকে স্থায়ীভাবে, আমেরিকায়। আমার সঙ্গে দেখা করতে দূরের এক শহর নিউবার্গ, পুকেন্সি থেকে ছুটে আসে মানিক। ছড়া আর লেখে না সে। মুক্তধারার বইমেলায় না এলে মানিকের সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ হয়তো হতো না।

প্রীতিভাজন গোধুলি খান ছিলো ফটোসাংবাদিক। ঢাকায় ওকে আমি বিখ্যাত আলোকচিত্রি মোহাম্মদ আলমের সঙ্গে ফটোগ্রাফি করতে দেখেছি। নিউইয়র্কে এসে কিশোরী মেয়েটা হয়ে গেছে পুরোপুরি সংসারী, ফুটফুটে কয়েক সন্তানের মা। ওর স্বামী জুয়েলও বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক। প্রেসিডেন্ট ওবামার অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার হিশেবে কাজ করতো। বইমেলায় গোধুলীর পুরো পরিবারের সঙ্গে আমার সময় কাটে দুর্দান্ত। ওর ছোট্ট মেয়েটার সঙ্গে আমার খুনসুটি ভালোই জমে।

নিউইয়র্কের কবি বন্ধু শামস আল মমিন, তমিজ উদ্দিন লোদী, ফকির ইলিয়াস, আদনান সৈয়দ, অরপি আহমেদ, রোমেনা লেইস, কাজী জহিরুল ইসলাম, দর্পন কবিরদের সঙ্গে দেখা হলে আমি আনন্দিত হই। দেখা হয় বন্ধু আবৃত্তিশিল্পী কৃষ্টিনা রোজারিওর সঙ্গে। প্রীতিভাজন আবৃত্তিশিল্পী ও সাংস্কৃতিক যোদ্ধা মিথুন আহমেদের সংগে।বিখ্যাত অভিনয়শিল্পী লুৎফুন নাহার লতার সঙ্গে। দেখা হয় বস্টন থেকে আসা বদিউজ্জামান নাসিমের সঙ্গে। দেখা হয় অনেক দূরের একটি শহর থেকে আসা মেধাবী ছড়াকার-চিকিৎসক-অধ্যাপক সেজান মাহমুদের সঙ্গে।

সাংবাদিক আকবর হায়দার কিরণ ও নিহার সিদ্দিকী মানিকজোড় হয়ে ঘুরে বেড়ান বইমেলায়। ভয়েস অব আমেরিকায় কর্মরত প্রীতিভাজন ছড়াকার ফকির সেলিম কতো উচ্ছ্বাস নিয়ে ছুটে আসে আমার কাছে! ফেসবুকে প্রায়ই দেখি প্রখ্যাত সংবাদ পাঠক সরকার কবির উদ্দিন ছড়াবন্ধু ফকির সেলিমের ছড়া আবৃত্তি করছেন। কী যে ভালো লাগে দেখে!

বাংলাদেশ বেতার থেকে এক সময় ‘আজকের ঢাকা’ নামে খুবই জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠান প্রচারিত হতো কৌশিক আহমেদের গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায়। সেই বিখ্যাত কৌশিক এখন নিউ ইয়র্কের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘বাঙালি’র সম্পাদক। তাঁর সঙ্গে আড্ডায় কতো কতো প্রিয় অনুষঙ্গ ফিরে ফিরে আসে! বাংলাদেশ বেতারে কাজ করতেন কবি শামসুল ইসলাম। নিউইয়র্কে কেউ কবি শামসুল ইসলামের কথা বলেন না। কিন্তু কৌশিক বলেছিলেন।

ঢাকার দৈনিক খবরে একদা আমার সহকর্মী সাংবাদিক মোহাম্মদ ফজলুর রহমান এখন নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত পত্রিকা সাপ্তাহিক ‘ঠিকানা’র সম্পাদক। একবার হলেও তিনি আসবেন বইমেলায়, আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ জমিয়ে কথা বলতে। তাঁর অধ্যাপক স্ত্রীও সঙ্গে থাকেন। এটা প্রতিবারই ঘটে। ঢাকায় কথাসাহিত্যিক সাংবাদিক রাহাত খান একবার নিউ ইয়র্ক ভ্রমণ শেষে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন আমাকে, ফজলুর রহমানের প্রচণ্ড ‘হোমসিকনেস’-এর কথা। ফজলুর রহমানের কন্যা মুমু খুদে লিখিয়ে হিশেবে আমাদের খুব স্নেহের পাত্রী ছিলো, ঢাকায়। মুমু এখন অনেক বড় হয়েছে। আবৃত্তিশিল্পী হিশেবে খুব নামডাক ওর নিউ ইয়র্কে।

নিউইয়র্ক বইমেলায় কয়েকজন ছড়াবন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে খুবই প্রাণিত বোধ করি আমি। মনজুর কাদের, শাহ আলম দুলাল, শামস রুশো, খালেদ শরফুদ্দীন এবং সাজ্জাদ বিপ্লবের সঙ্গে দেখা হওয়া মানেই হৃদয়ের গহীনে ছড়ার ঝুমঝুমিটা বেজে ওঠা। এদের মধ্যে খালেদ শরফুদ্দীনের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একেবারেই আলাদা।দীর্ঘ একটা আলিঙ্গনে আমাকে সে বেঁধে ফেলে। আবেগে ওর চোখ ছলছল করে।ভীষণ ভালোবাসে সে আমাকে। ‘ছড়াটে’ নামে একটা স্টল থাকে ওদের। আমি কিছুক্ষণ সময় কাটাই ‘ছড়াটে’র স্টলে।

সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী আমার বহু পুরনো বন্ধু। ১৯৭৪ সাল থেকে পুরিচয়। থাকতো সিলেটে। ধোপা দীঘির পূর্ব পাড়ে। চাঁদের হাট করতো। বাংলাদেশের সমস্ত পত্রিকায় ওর ছড়া ছাপা হতো। পেশায় এডভোকেট। শিশুর মতো সরল একজন মানুষ। এতো বছর ধরে নিউইয়র্কে আছে কিন্তু একটুও পাল্টায়নি। প্রতিবার কাজ ফেলে ছুটে আসে আমার সঙ্গে গল্প করতে। ওকে দেখি আর অবাক হই। মানুষ কী করে এতোটা সারল্য নিয়ে টিকে থাকে!

খুব ভালো ছড়া লিখতো সালেম সুলেরী। নিউইয়র্কে থিতু হবার কারণে তার ছড়াচর্চায় আগের সেই গতি বোধ হয় নেই। সাংগঠনিক তৎপরতায় খুব পটু ছিলো সুলেরী।
একাত্তর টিভির সংবাদ বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে বিপুল পরিচিতি অর্জন করেছিলো তরুণ লেখক শামীম আল আমিন। শামীম এখন নিউইয়র্ক থাকে সপরিবারে। বইমেলায় শামীম অনেক আবেগ নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে।

আমাদের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কয়েকজন প্রীতিভাজন এখন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী নিবাস গেড়েছে। যেমন মনিজা রহমান, মৃদুল আহমেদ এবং দেবানন্দ সরকার। সাংবাদিকতা করতো মনিজা। মৃদুল করতো লেখালেখি আর টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা। কৃতি ছাত্র হিশেবে দেবানন্দের ছিলো আলাদা জৌলুষ। ওদের সঙ্গে অনেক আনন্দ ভাগাভাগি করি প্রতিবার, বইমেলায়। দেবানন্দ অনেক দূরের শহর থেকে পাঁচ/ছয় ঘন্টার বাস জার্নি করে নিউইয়র্ক আসে, আমাদের কয়েকজনকে ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে খাইয়ে দাইয়ে আড্ডা মেরে তারপর ফিরে যায় নিজের শহরে। ফেরার সময় নিঃসঙ্গ ক্লান্তিকর আরেকটা দীর্ঘ বাস জার্নি করতে হয় ওকে। খুব ভালো গল্প লেখে ক্যান্সার গবেষক হিশেবে খ্যাতি অর্জনকারী আমাদের দেবানন্দ। বইও বেরিয়েছে একাধিক।

ছড়াবন্ধু চিকিৎসক সজল আশফাক টিভিতে স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে বিখ্যাত হয়েছিলো। পরিবার নিয়ে এখন থাকে নিউইয়র্কে। প্রতিবার অন্তত এক বেলা নিউইয়র্কের কোনো বাঙালি রেস্তোরাঁয় আমাদের খাওয়া হয়। শেষবার আমাদের খাদ্যসঙ্গী হয়েছিলো প্রীতিভাজন রিপন শওকত রহমান। ঢাকায় থাকতে থিয়েটার মঞ্চ নিয়ে মেতে থাকতো রিপন। এক বিকেলে বইমেলায় এসে বললো, ‘ওস্তাদ শুধু আপ্নের লগে দেখা হইবো সেই কারণে আইলাম।’

প্রবীন সাংবাদিক আনোয়ারুল হকের পুত্র আরিফ আনোয়ার ওরফে বাবু আমাদের খুব ঘনিষ্ঠ একজন। বইমেলায় গেলে বাবু আমাদের সঙ্গ দেয়। ছেলেটা খুবই আমুদে স্বভাবের। ওর উপস্থিতি আমাদের আনন্দ দেয়। একবার খুব আগ্রহ নিয়ে সে আমাদের নিয়ে গিয়েছিলো ম্যানহাটনের ছোট্ট কিন্তু বনেদী একটা বার্গার শপে। অপূর্ব স্বাদের অথেন্টিক বার্গার খাইয়েছিলো বাবু।

দৈনিক বাংলার বিখ্যাত সাংবাদিক মনজুর আহমদ এখন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘আজকাল’-এর সম্পাদক। মনজুর ভাই সাংবাদিকতার পাশাপাশি গল্প/উপন্যাস লিখতেন। তাঁর লেখা ছোটদের একটা বই অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিলো। এবছর একুশের বইমেলায় মনজুর আহমদের উপন্যাস ‘অমৃতপথযাত্রী’ এবং স্মৃতিকথা ‘অন্য এক শেখ মুজিব’ নামের দু’টি নতুন বই বেরিয়েছে। প্রবীন এই সাংবাদিক এখনও সজীব ও প্রাণবন্ত। নিউইয়র্ক বইমেলায় মনজুর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হওয়াটাও আমার জন্যে একটা বিশেষ প্রাপ্তি।

সাংবাদিক হাসানুজ্জামান সাকী আমার আরেক প্রীতিভাজন। যুগান্তরে কাজ করেছে। কাজ করেছে বৈশাখী টিভিতেও। এখন নিউইয়র্ক থাকে। ওর সঙ্গে দেখা হয় বইমেলায়। মধুর উচ্ছ্বাসে ভাসি আমরা।

নিউইয়র্কার তাজুল ইমাম। অনেক গুণের সমাহার একজন ব্যক্তির মধ্যে। ছবি আঁকা গান গাওয়া ছড়া লেখা এরকম কতো গুণ তাঁর! কিছু বিখ্যাত গানের গীতিকারও তিনি। সদা হাস্যোজ্জ্বল তাজুলের উপস্থিতি মানেই হাসি আর আনন্দের দমকা হাওয়া। গান পাগল মুস্তাফা আরশাদ একজন অঙ্কন শিল্পী। হদাহাস্য মুস্তাফা আরশাদের কিছু ক্ষ্যাপামি আমার খুব ভালো লাগে। বিখ্যাত শিল্পী ক্লদ মনে এবং পল সেজান সম্ভবত খুব প্রিয় তাঁর। তিনি তার দুই সন্তানের নাম রেখেছেন যথাক্রমে ‘মনে’ এবং ‘সেজান’।

‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ লিখে দেশান্তরি হতে বাধ্য হওয়া কবি দাউদ হায়দারকে পেয়েছিলাম মুক্তধারার বইমেলায়। খুব ভালো লেগেছিলো তাঁকে। দারূণ ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। জমিয়ে গল্প বলতে পারেন। অবিশ্বাস্য একেকটা গল্প। কিন্তু শুনতে বেশ লাগে। আর কথা বলেন এমন আন্তরিক একটা কণ্ঠস্বরে মনে হবে দীর্ঘকালের চেনাজানা একজন। অনেকদিন পর দেখা হলো এই যা। দাউদ হায়দারকে দেখে খুব কষ্ট অনুভব করেছিলাম বুকের মধ্যে। একজন মানুষ সেই ১৯৭২ সালে দেশ ছাড়া হলেন। তারপর প্রায় পঞ্চাশটা বছর ধরে নির্বাসিত জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন! সাত বছর দেশে যেতে পারিনি তাতেই দম বন্ধ হয়ে মরে যাচ্ছিলাম। আর কবি দাউদ হায়দার দেশে ফিরতে পারেন না আজ ছেচল্লিশ বছর! এরচে কষ্টের আর কী হতে পারে একজন মানুষের জীবনে! কবির কাছ থেকে তাঁর দেশ কেড়ে নেয়া আধুনিক পৃথিবীর ঘৃণ্য এক অপরাধ।

স্মার্ট তরুণ সফল ব্যবসায়ী জাকারিয়া মাসুদ জিকোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন মিনার মাহমুদ। মোবাইল ফোনের ব্যবসা ছিলো তাঁর। সাপ্তাহিক আজকাল পত্রিকার কর্ণধার। পরিপাটি পোশাকে ঝকঝকে জিকোর চকচকে উপস্থিতি বইমেলাকে আরো বর্ণাঢ্য করে তোলে। জিকোর সঙ্গ আমি উপভোগ করি।

শাহবাগের বিখ্যাত ‘রেখায়ন’-এর নেপথ্য নায়ক রাগীব আহসানও এখন নিউইয়র্কে থাকছেন পাকাপাকি ভাবে। শুভ্র চুলের উচ্ছ্বাসে ভরপুর রাগীব ভাইকে পেয়ে যাই বইমেলায়।

আপাদমস্তক বিনম্র ভদ্রতায় ঠাঁসা এক ভদ্রলোক ফেরদৌস সাজেদিন। তাঁর ছোটবোন মাহফুজা শিলু আমার খুব কাছের বন্ধু, এটা জানার পরেও আমাকে আপনি থেকে তুমিতে আসতে প্রচুর সময় নিয়েছেন। মেধাবী এই মানুষটার সারল্য আমাকে মুগ্ধ করে। সম্প্রতি তাঁর একটা বই বেরিয়েছে, নাম ‘খরা’। ইশতিয়াক রূপু একজন গীতিকার। তাঁর লেখা গানের একটা সিডি উপহার দিয়েছিলেন বইমেলায়। সম্প্রতি ‘রূপান্তরের গল্প’ নামে তাঁরও একটা বই বেরিয়েছে। দু’টো বইয়েরই প্রকাশক আমাদের ঢালী। লেখক হুমায়ুন কবির ঢালী। আগে অন্যের সংস্থায় চাকরি করতো। এখন নিজেই ‘অন্বয়’ নামের একটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। লম্বা একটা সময় নিউইয়র্কে কাটিয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরে গেছে সে।

আমার খুব প্রিয় একজন মানুষ নাজমুন নেসা পিয়ারি। কবি শহীদ কাদরীর প্রথম স্ত্রী। জার্মানির বার্লিন থেকে প্রতিবার ছুটে আসেন নিউইয়র্কে। সদা পরিপাটি বর্ণিল শাড়ি অলংকার আর লাল টিপ শোভিত পিয়ারি আপাকে দেখলেই মনটা ভালো হয়ে যায়।
লণ্ডন থেকে মাসুদা ভাট্টিও এসেছিলেন একবার। বইমেলার একটা সেমিনারে অংশ নিতে। মুক্তধারার বইমেলায় খুব কম সময়ে কঠিন কঠিন সেমিনার হয়। সেমিনারে আলোচক থাকেন একাধিক। কথা বলার সুযোগ থাকে কম। এতো এতো কৃতি মানুষকে একোমোডেড করাটা কষ্টকরই বটে।
শহিদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনের পুত্র ফাহিম রেজা নূর বইমেলার নেপথ্যে থাকা আরেক যোদ্ধা। তিনি বইমেলার মূল মঞ্চে একটা অনুষ্ঠান করেন প্রকাশকদের নিয়ে। প্রকাশনা শিল্পের বিশাল বিশাল সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয় এই পর্বে।

কলকাতা থেকে এসেছিলেন অতিমাত্রায় কমার্শিয়াল লেখক রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে রগরগে চটিসাহিত্য নির্মাণে বিশেষ পারদর্শী এই লেখক পারলে শরীরে সিরিঞ্জ ঢুকিয়ে রবীন্দ্রনাথের সমস্ত রক্ত বের করে সস্তায় বিক্রি করে দিতেন। খুব মনোযোগ দিয়ে তাঁকে লক্ষ্য করেছি। একটিও উজ্জ্বল বাক্য শোনার সৌভাগ্য হয়নি আমার।
কলকাতা পাবলিশার্স গিল্ডের নেতা ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ও এসেছিলেন সেবার। সুদর্শন হাসিখুশি মানুষটাকে খুব ভালো লেগেছিলো আমার। তাঁর বাবা লেখক ঈষাণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকাটির মাধ্যমে আমার কৈশোরকে রাঙিয়ে দিয়েছিলেন। বাবার প্রকাশনা সংস্থা ‘পত্র ভারতী’ এখন পুত্র ত্রিদিবের হাতে পত্রপল্লব মেলছে।

কানাডা থেকেও লেখক-কণ্ঠশিল্পীরা মুক্তধারার বইমেলায় অংশ নিতে নিউইয়র্ক ছুটে যান। এই তালিকায় সবচে নিয়মিত লেখকের নাম জসিম মল্লিক। নিউইয়র্ক গিয়েও টের পাই, প্রচুর নারী পাঠক আছে জসিমের। মহিলারা খুব আগ্রহ নিয়ে কেনেন জসিমের বই।

বইমেলায় দেখা হওয়া আরেকজন উদ্যমী মানুষ এম এ রব। সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকাটির কর্ণধার। গেলো বছর বইমেলায় আমাকে পুলি পিঠা খাইয়েছিলেন। স্বামী সন্তানসহ বইমেলায় আসেন আবৃত্তিশিল্পী রিপা নূর। রিপা আর তাঁর পুত্র বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমার ছড়াও আবৃত্তি করেন।

মুক্তধারার এই বইমেলাতেই পঁচিশ বছর পর ছেলেবেলার বন্ধু মোতাহার আলীর দেখা পেয়েছিলাম। বন্ধু মোতাহার এখন হাসপাতালেই কাটায় বেশিরভাগ সময়। বইমেলার পোস্টারে আমার নাম ও ছবি দেখে মোতাহার অসুস্থ শরীর নিয়ে ছুটে এসেছিলো বইমেলায়।
দেশের বিখ্যাত ফটোসাংবাদিক পাভেল রহমানের তোলা বেশ কিছু স্মরণীয় আলোকচিত্র নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলো মুক্তধারা। সেবার বইমেলায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছিলো পাভেলের ছবির প্রদর্শনীটি।

নিউইয়র্কে বসবাস করেন শক্তিমান কথাশিল্পী কুলদা রায়। তাঁর গল্প আমার বিশেষ পছন্দের। জাদুবাস্তবতার এক ধরণের ঘোর লাগা বাক্য ও চিত্রকল্প নির্মাণে সিদ্ধহস্ত কুলদার সঙ্গে একবারই আমার আড্ডার সুযোগ হয়েছে। বইমেলার উল্টোদিকের স্টারবাক্স নামের একটা কফিশপে বসেছিলাম গেলোবার। কুলদা আমাকে ঢাকার নালন্দা প্রকাশিত তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জল’ এবং কলকাতা থেকে প্রকাশিত আনোয়ার শাহাদাতের ‘পেলেকার লুঙ্গি’ নামের চটি একটা গল্প সংকলন উপহার দিয়েছিলেন। দু’টি সংকলনই অসাধারণ। খুবই শাদামাটা ক্যাজুয়াল একটা ভঙ্গিতে চমকে দেবার মতো কথা বলেন কুলদা। দুনিয়ার সব মানুষের ওপরই বোধ হয় খানিকটা বিরক্ত মেধাবী এই মানুষটা।

বইমেলায় দেখা হয় বেলাল বেগের সঙ্গে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর নেতৃত্বেই ‘জাতীয় বিতর্ক প্রতযোগিতা’ নামের অনুষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো। অনুষ্ঠানটি ছিলো তাঁরই ব্রেন চাইল্ড। এই মানুষতাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। শ্রদ্ধা করি। বিনোদন টিভির পাশাপাশি শিক্ষণ টিভি হিশেবে বিটিভির আলাদা একটা সেল চালু করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিটিভি তাঁকে দায়িত্বও দিয়েছিলো। মেধাবী ও স্বপ্নবান এই মানুষটা ছিলেন চারণ সাংবাদিকও। কিন্তু কোথায় যেনো ছিঁড়ে গেলো তারটা। সমস্ত কাজ অর্ধ সমাপ্ত রেখে তিনি একদিন পাড়ি জমালেন মার্কিন মুলুকে। কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদ বাবার নামে যে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন গ্রামে, তার মূল দায়িত্ব তিনি অর্পণ করেছিলেন বেলাল বেগের হাতে। বেলাল ভাই দায়িত্বটা নিয়েওছিলেন। কিন্তু ওই যে কোথায় যেনো ছিঁড়ে গেলো তার। জীবনের মোহের কাছে শেষমেশ পরাজিতই হলেন দুর্দান্ত মেধাবী মানুষ বেলাল বেগ।

নাট্যজন জামালউদ্দিন হোসেন এবং তাঁর স্ত্রী নাট্যাভিনেত্রী রওশন আরা হোসেনও বাস করেন নিউইয়র্কে। বইমেলায় একবার তাঁর উপস্থাপনায় টেলিভিশন অনুষ্ঠান বিষয়ে একটি আলোচনায় আমিও অংশ নিয়েছিলাম। কথাশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী কথাশিল্পী পুরবী বসু যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন দীর্ঘদিন ধরে। একসময় নিউইয়র্ক বইমেলায় তাঁদের উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকতো। বইমেলা প্রাঙ্গণে আজকাল আর দেখি না তাঁদের।

ধর্মান্ধের চাপাতির কোপ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে লেখক-ব্লগার-অনলাইন এক্টিভিস্ট মাহবুব লীলেন স্ত্রী দীনা ফেরদৌস আর কন্যা প্রান্তীকে নিয়ে এখন বসবাস করছে নিউ ইয়র্কে। বইমেলায় এক বিকেলে ওরা ওদের ছোট্ট প্রজাপতির মতো মেয়েটাকে নিয়ে এসেছিলো। ‘সচলায়তন’ নামের অন লাইন লেখক ফোরামে খুবই সক্রিয় ছিলো লীলেন। বইও প্রকাশিত হয়েছে একাধিক। ওর অন্যতম প্রকাশক শুদ্ধস্বর-এর টুটুলকে ধর্মান্ধরা কুপিয়েছিলো রণদীপম বসু এবং তারেক রহিমের সঙ্গে।

ঊর্মি এবং লিপন নামের দুর্দান্ত এক তরুণ প্রেমিক জুটির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো বইমেলায়। ওরা লেখক নয় কিন্তু বই আর লেখকদের ব্যাপারে আগ্রহী। আমার সঙ্গে আলাপের কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা ওদের অপরূপ ভালোবাসার গল্প আমাকে শুনিয়েছিলো।

কামরুজ্জামান বাবুল নামের মগবাজারের এক তরুণের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিলো ছড়াকার আনওয়ারুল কবীর বুলুর মাধ্যমে। বাবুল পরে আমারও বন্ধু হয়ে উঠেছিলো। একটু ক্ষ্যাপাটে ধরণের। আমেরিকাকে বলে আম্রিকা। এখন নিউইয়র্কে থাকে। ট্যাক্সি চালায়। দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ ছিলো না আমার সঙ্গে। বইমেলায় গিয়ে আমাকে খুঁজে বের করেছে সে। নিউইয়র্ক গেলে ওর সঙ্গে আলাদা একটু আড্ডা হতেই হবে।

নিউইয়র্ক বইমেলায় আমার সঙ্গে দেখা হয় ছদ্মবেশী এক বিখ্যাত লেখকের সঙ্গে। ফেসবুকে তিনি অলক চৌধুরী নামে পরিচিত। সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানার পাঠাকরা তাঁকে চিনবেন। রওশন জামিল নামে অনেকগুলো জনপ্রিয় পেপারব্যাক লিখেছেন। তিনি আমার মহল্লা কা বড়া ভাই। থাকতেন ঢাকার ঠাটারি বাজার লাগোয়া বিসিসি রোডে। বিখ্যাত ‘কন্যাকুমারী’ উপন্যাসের লেখক আবদুর রাজ্জাক তাঁর বাবা। লেখক অনুবাদক রওশন জামিল বইমেলায় আসেন। খুব নিরবে আমাকে সঙ্গ দেন।

নিউইয়র্ক বইমেলায় আমার চোখ একজনকে খুঁজে ফেরে। তিনি সৌরভদা। ২০১৬-র আগস্টে টেক্সাসে মর্মান্তিক গাড়ি দুর্ঘটনায় স্ত্রীসহ মারা গেছেন। একমাত্র পুত্র শাদাব সৌরভও আহত হয়েছিলো মারাত্মক ভাবে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় অচেতন ছেলেটা হাসপাতালে দীর্ঘদিন লড়াই করেছে মৃত্যুর সঙ্গে। অবশেষে জয়ী হয়েছে ২৩/২৪ বছর বয়েসী শাদাব।

সৌরভদা’র মৃত্যুসংবাদ জেনেছিলাম নিউইয়র্ক প্রবাসী শরীফ মাহবুবুল আলমের কাছ থেকে। খুব অস্থির লাগছিলো। তাঁর মৃত্যুর পরদিন ঢাকায় কথা হচ্ছিলো ইমদাদুল হক মিলন ভাইয়ের সঙ্গে। এক পর্যায়ে দেখলাম আমি আর মিলন ভাই দুজনেই কাঁদছি সৌরভদার কথা বলতে বলতে! ২০০৯ সালে সাগর ভাই, মিলন ভাই, বন্যাদি আর আমাকে নিয়ে সৌরভদা ঘুরে বেড়িয়েছেন নিউইয়র্কের এখানে ওখানে। ইমদাদুল হক মিলন, আফজাল হোসেন, ফরিদুর রেজা সাগরদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল আমুদে মানুষটা। তাঁরা নিউইয়র্ক এলে কাজ থেকে টানা কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বসে থাকতেন। সেবার (২০০৯ সালে), মিলন ভাই আর আমাকে নিয়ে গেলেন তাঁর বাড়িতে, এক সন্ধ্যায়। ভারী মিষ্টি আর হাস্যোজ্জ্বল তাঁর বৌটাও। হাসি আর কথাবার্তায় এমন আন্তরিক যে মনে হবে পাশের বাড়ির ছোটবোনটা! আমাদের জন্যে কতো কী রান্না করেছেন! সৌরভদা সাগর ভাইদের বন্ধু হলেও আমাকে সম্বোধন করতেন–‘ওস্তাদ’ বলে। আমিও তাঁকে একই সম্বোধন করতাম। ফেসবুকে আমার অনেক পোস্টে তাঁর ছোট্ট কমেন্ট থাকতো–‘মাইরি বলচি ওস্তাদ, ফাটাফাটি…’। আমার আমার সঙ্গে কথা বলতেন ঢাকাইয়া ডায়ালেক্টে। সম্বোধনটা আপনি থেকে তুমিতে নামাতে পারিনি। চাপ সৃষ্টি করলে মাথা ঝাঁকিয়ে আপত্তি জানাতেন–‘না না না ওস্তাদ, আপ্নে মিলন-আফজাল-সাগরের ছোটভাই হইলে কী অইছে, কতো বিখ্যাত মানুষ আপ্নে! আপ্নেরে সোম্মান করি!’
আহারে সৌরভ দা! প্রিয় সৌরভ দা, এ কেমন চলে যাওয়া আপনাদের!! রেস্ট ইন পীস…

টুকরো টুকরো কতো স্মৃতি মুক্তধারার বইমেলাকে ঘিরে!

বাংলা গানের হিরণ্ময় কণ্ঠ আমার প্রিয় শিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদী। একবার বইমেলা মঞ্চে আমরা একে একে উঠে যাচ্ছি উদ্বোধনী পর্বের মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জ্বলন পর্বে শামিল হতে। একটি মেয়ে আমাদের নাম ঘোষণা করছিলো। সৈয়দ আবদুল হাদীর নাম ভুলভাবে উচ্চারণ করলো মেয়েটা। হাদী ভাই বসে রইলেন প্রথম সারির আসনেই। আমি ওঠার সময় হাত বাড়িয়ে তাঁকে আহবান করতেই তিনি বললেন–‘আমি তো সাইয়েদ আবদুল হাদী নই!’ হাদী ভাইয়ের এই রাগ বা অভিমানটা আমি পছন্দ করেছি। সৈয়দ আবদুল হাদীর মাপের একজন সঙ্গীতশিল্পীর নামটা সঠিক ভাবেই উচ্চারিত হতে হবে। সৈয়দকে কায়দা করে সাইয়েদ বলার কোনো দরকার নেই। উপস্থাপনা করতে গেলে এই দিকটায় সচেতন থাকাটা অন্যতম প্রাথমিক শর্ত।

সাংবাদিক নিনি আহমেদ বইমেলা উদযাপনের নেপথ্য এক কান্ডারি। সারাক্ষণ ছুটোছুটি করতে হয় তাঁকে। টেনশন তাঁর পিছু ছাড়ে না। হাসান ফেরদৌসের কথা আলাদা করে কিছু বললাম না। তিনি জ্ঞানী লোক। প্রচুর ধৈর্য আর সহিষ্ণু স্বভাবের কারণে কঠিন বিপর্যয়েও ঠোঁটে একটা অটোম্যাটিক হাসি ঝুলিয়ে রাখতে সক্ষম তিনি।

মুক্তিযোদ্ধা লেখক ডক্টর নূরুন নবী এবারের ২৭ তম বইমেলার আহবায়ক। তিনি একাত্তরের বিখ্যাত কাদেরিয়া বাহিনির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিলেন একাধিক বইয়ের লেখক নূরুন নবী। বিখ্যাত টুথপেস্ট কোলগেট গোল্ড-এর প্যাটেন্ট নির্মাতা হিশেবেও খ্যাতিমান, বিজ্ঞানী মহলে। সদালাপী বিনয়ী নূরুন নবী ভাই কমিউনিটিতে একজন সজ্জন ব্যক্তি হিশেবেও পরিচিত।

প্রাণের বন্ধু আহমাদ মাযহারও এখন পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট মার্কিন মুল্লুকে। কয়দিন পরেই নাগরিকত্ব পাবে। হয়ে উঠবে পুরোপুরি মার্কিন নাগরিক। মুক্তধারার বইমেলা পরিচালনা কমিটির সে-ও একজন সক্রিয় সদস্য। এই রচনাটা লিখছিও আমি মাযহারেরই তাগাদায়। প্রকাশিতব্য স্মরণিকার সব লেখা রেডি। আমিই কেবল লেট লতিফ!

মুক্তধারার বইমেলার নেপথ্যে একজন মানুষ আছেন, স্বভাবে যিনি ডিপফ্রিজ ধরণের। সারাক্ষণ ‘কুল কুল ঠান্ডা’ থাকেন। সর্বংসহা মানুষটার নাম আলাদা করে উল্লেখ না করলেই নয়। তিনি বিশ্বজিৎ সাহা। দেশের বিখ্যাত লেখক-প্রকাশক-শিল্পীদের মান-অভিমান-ইগো সামাল দিতে দিতে কাহিল হয়ে পড়ার জায়গায় সারাক্ষণ স্বাভাবিক থাকেন বিশ্বজিৎ। মুখে তাঁর সারাক্ষণ লেগে থাকে শিশুর সারল্যমাখা অদ্ভুত এক হাসি। এটা আমার কাছে একটা বিস্ময়। নিউইয়র্কে সাতাশ বছর ধরে বইমেলা নিয়মিত অনুষ্ঠিত হবার পেছনে এই মানুষটার স্বপ্ন-আকাঙ্খা আর অপরাজেয় উদ্যমই প্রধান নিয়ামক। ধন্যবাদ বিশ্বজিৎ সাহা। জয় হোক মুক্তধারার বইমেলার।

অটোয়া ১৯ জুন ২০১৮