ঢাকা ২৫শে জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ১১ই আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯শে জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

নিউ ইয়র্কে শনিবারের আড্ডা

redtimes.com,bd
প্রকাশিত মে ২৪, ২০২৪, ১০:২০ অপরাহ্ণ
নিউ ইয়র্কে শনিবারের আড্ডা

‘কবিরা চান আইকেরাসের মতো মানুষের হাতে গড়া ডানায় নীলিমা ভেদ করে মহাপ্রত্যক্ষের উদ্দেশ্যে যেতে !’

আবেদীন কাদের
এমাসের ৭ তারিখে একটা জটিল সার্জারির পর হাসপাতাল থেকে ঘরে ফিরে খুব শারীরিক কষ্টে ছিলাম দিন দুয়েক। ভাবছিলাম কষ্টটা বেশি হলেও কোনমতে সামলে উঠতে পারবো। এর মাঝে একদিন বিকেল আমি, আহমাদ মাযহার ও কবি শামস আল মমীন স্প্রিংফিল্ড এভেনিউর ম্যাকডোনালডে কিছুটা আড্ডাও দিলাম।

কিন্তু আড্ডা দিতে দিতে বসেই বুঝতে পারছিলাম আমার শরীর আমার নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। একটু তাড়াতাড়ি আড্ডা ভেঙ্গে ঘরে ফিরে বিছানায় এলিয়ে পড়লাম। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম সারারাত। উঠে বাথরুমে যাওয়ার অবস্থাও ছিলো না। প্রায় আঠারো ঘণ্টা কিছু খাওয়া হয়নি সামান্য পানি ছাড়া, কারণ ফ্রিজ পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে খাবার বের করে খেতে পারছিলাম না। জীবনে এই প্রথম কেন জানি না কিছুটা ভয় পেলাম। মমীন ভাই ফোন করেছিলেন, সামান্য দুয়েকটা কথা বলে রেখে দিলাম। কিন্তু দুপুরের পর নিজেই লোপা ভাবিকে ফোন করলাম বিছানা থেকে, পেলাম না। মমীন ভাইকে ফোন করে পেলাম, অবস্থাটা জানালাম, আর সিভিএস থেকে একটা ঔষধ এনে দিতে অনুরোধ করলাম। মমীন ভাই কিছুক্ষণ পর ভাবিকে বলে কিছু গরম খাবার ও ঔষধ নিয়ে এলেন, কিন্তু তাঁকে দরোজাটা খুলে দিতে যেতে কষ্ট হচ্ছিলো। ভীষণ নসিয়া, মাথা তুলতেই বমনেচ্ছা, তীব্র ব্যথা। সে এক নারকীয় কষ্ট, সঙ্গে গায়ে তাপ বাড়ছে। মমীন ভাই খাবারটা গরম খেতে বললেন। একটু চেষ্টা করলাম, জোর করে সামান্য খেলাম। পরের দিন অবস্থার অবনতি হলো, একেবারেই সহ্যের অতীত। যিনি আমার প্রাইমারী ফিজিসিয়ান, তিনি তরুণ এক বাঙালি, ডঃ জহিরুল ইসলাম, আমার ভাগ্নের বন্ধু। সম্পর্কটি আমার সঙ্গে একটু অন্যরকম। তিনি টেলিফোনে আমার কণ্ঠ শুনে ভয় পেয়ে গেলেন, বললেন দ্রুত ইমারজেন্সিতে যেতে। এর পর কী ভেবে যেন বললেন, আপনি থাকুন, আমি এসে আগে একটু দেখি। তিনি দেখে কিছু ঔষধ ও পরামর্শ দিলেন। আমি যেন একটা দিন দেখি। সম্ভবত ঔষধ কাজ করতে শুরু করলো। সেদিন শনিবার দুপুর, মমীন এলেন এবং আমার অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে বিকেলের আড্ডা স্থগিত করলেন। বললেন, তিনিই সবাইকে জানিয়ে দেবেন।

আমরা কোভিদের শুরুতে ‘২০ সালের আগস্ট/সেপ্টেম্বর থেকে কবি ফারুক ফয়সাল, আহমাদ মাযহার, কবি শামস আল মমীন, নসরত শাহ এবং তানভীর রব্বানী খোলা রেস্তোরাঁয় ‘শনিবারের আড্ডা’ শুরু করি। ‘২১ সালের জানুয়ারি থেকে আড্ডাটা আমার বাসায় স্থানান্তরিত হয়। এই প্রায় চার বছরের মাঝে প্রথম আমাদের ‘শনিবারের আড্ডা’ আমার শারীরিক বৈকল্যের জন্য বন্ধ রাখা হলো।

দিন চারেক ব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমি উঠে দাঁড়ালাম। একটু বাইরে যেতে পারলাম আমি মমীন ভাই ও মাযহার। দিন দুয়েক পর শনিবার, আমরা ভাবলাম এই শনিবার ঘরেই যথারীতি আড্ডাটা হোক। যদিও কবি এবিএম সালেহউদ্দীন, নসরত শাহ, শৈবালসহ অন্যান্য বন্ধুরা সব সময় টেলিফোন করে আমার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিচ্ছিলেন।
আমার বন্ধু ডঃ ওবায়দুল্লাহ মামুনের একুশে চেতনা পরিষদের উদ্যোগে একটি অনুষ্ঠান ছিলো শনিবার। শান্তিনিকেতনের একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক প্রহ্লাদ রায় এসেছেন আসামের বাংলা ভাষার শহীদদের নিয়ে একটি বক্তৃতা করবেন। সেই বক্তৃতা শুনতে গেলাম। সেখান থেকে ফিরলাম ঘরে যদি কেউ এসে অপেক্ষা করেন এই শঙ্কা নিয়ে। আমি আর মমীন ভাই আড্ডা শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাযহার এসে যোগ দিলেন। আমাদের তক্কাতক্কি শুরু হলো আসন্ন নিউ ইয়র্কে মুক্তধারা আয়োজিত বইমেলা নিয়ে। মাযহার প্রায় প্রতিদিন এই মেলা, বইয়ের প্রকাশনা শিল্প, লেখক, বিশেষ করে পেশাদার ও অপেশাদার লেখক-চারিত্র এবং কোন কোন প্রকাশকদের বাণিজ্য রীতি ইত্যাদি নিয়ে ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণসহ জর্নাল ফেসবুকে লিখে যাচ্ছেন। এসব লেখায় মাযহারের কিছু কিছু পর্যবেক্ষণ এতো তির্যক এবং নির্মোহ দৃষ্টিসম্পন্ন যা তেজারতি বা বেহুদা ফায়দা উত্তোলনকারী কোন কোন ‘লেখক’ বা প্রকাশককে একটু আহত করে। এর মধ্যে ‘বিদ্যাপ্রকাশ’- এর মজিবর রহমান খোকা ভাই মাযহারের বিভিন্ন প্রকাশনীর উল্লেখযোগ্য বইগুলো নিয়ে লেখার প্রশংসা করেন। ঢাকা থেকে কবি রাজু আলাউদ্দিন একটি লেখায় মাযহারের সঙ্গে সঙ্গে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত অন্যান্য লেখকদের আমন্ত্রণ জানান গুরুত্বপূর্ণ বই নিয়ে লিখতে। তিনি নিজেও লেখেন উল্লেখযোগ্য ভাল বই নিয়ে। এসব বিষয় নিয়েই দীর্ঘক্ষণ আমাদের আড্ডাটা চলতে থাকে।

কেন বাংলাদেশের বড় বইয়ের বাজার থাকা সত্ত্বেও প্রকাশনা শিল্প সত্যিকার শিল্প হয়ে ওঠেনি, এর প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। রাষ্ট্র বা সরকার কি এর জন্য দায়ী? কোন কোন প্রতাপী প্রকাশনা সংস্থা কি দলীয় সরকারের নৈকট্য ও আনুকূল্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম নিয়ে শত শত অপাঠ্য বই বের করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ক্ষতি করছে, বাজারের খোলা নীতির অন্তরায় হয়ে ভাল বই প্রকাশের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? নাকি বিপুল আবর্জনা সৃষ্টিকারী এই সব নির্দিষ্ট প্রকাশনা সংস্থাগুলো শুধু অর্থের লোভে এই শিল্পের বাজারকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করছে? কোন কোন অসৎ প্রকাশককে মাযহার ‘মুরগী’ লেখক প্রতিপন্ন করেছেন, এবং এসব মুরগী লেখক ধরার জন্য ঢাকার কোন কোন প্রকাশক কীভাবে নিজেদের জাল বিস্তার করে, সে বিষয়ে যে লিখেছেন, তা অনেকের গাত্রদাহের কারণ হয়েছে। তবে আমি মনে করি মাযহার যে গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর পরিচয় জানিয়ে, সেগুলো সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত রিভিউ লিখে একটি ভাল কাজ করছেন, তেমনি এই প্রকাশনা শিল্পের যারা ক্ষতি করছে তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা করছেন তা আখেরে বই এবং প্রকাশনা শিল্পের জন্য মঙ্গলই বয়ে আনবে।

আহমাদ মাযহার গত কয়েকদিন ধরে বইয়ের জগতের, বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক বইমেলার সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে প্রায় প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় জর্নাল লিখছেন। সেগুলো খুব মূল্যবান পর্যবেক্ষণ সন্দেহ নেই। কী ধরনের বই আমরা প্রকাশ করছি, কেমন করে করছি এবং এগুলোর সত্যিই কোন মূল্য আছে কিনা তা নিয়ে মাযহার তাঁর পর্যবেক্ষণ জানাচ্ছেন। এর মধ্যে দিয়ে মাযহারের বইয়ের প্রতি ভালোবাসা যেমন প্রকাশ পাচ্ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে বইয়ের প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে বাংলাদেশের বইয়ের জগতের একটা তুলনামূলক চিত্রও ফুটে উঠছে। বিশেষ করে ইউনিভারসিটি বুক, প্রকাশক, লেখকের নিজের উদ্যোগে ও আর্থিক আনুকূল্যে বই প্রকাশ ইত্যাদি নানা বিষয়ে তিনি লিখছেন। এর আগে আমাদের ঢাকার বইমেলাকে কেন্দ্র করে বইয়ের জগতের এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কেউ লিখেছেন কিনা আমি জানি না। বই প্রকাশ, পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা, বা এর অন্যান্য দিকগুলো, বিশেষ করে টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ে লিখেছেন বই প্রকাশনা বিশেষজ্ঞ বদিউদ্দীন নাজির। এছাড়া বইয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমি আর তেমন কোন লেখা পড়িনি। কিন্তু কপি এডিটিং থেকে শুরু করে বই প্রকাশের সকল দিক নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষজ্ঞের জ্ঞান সম্বলিত অনেক বই বাজারে রয়েছে। তবে মাযহার এসব বিষয় ছাড়াও বই নিয়ে ব্যক্তিগত জর্নালও লিখেছেন। আমাদের এদিনের আড্ডায় তেমন একটি লেখা তিনি পড়ে শোনান। সেটি ছিলো বই পড়ার উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা একটি জর্নাল। এই জর্নালে তিনি তাঁর নিজের ছেলেবেলার বই পড়ার স্মৃতি উল্লেখ করেন।

মাযহার লিখেছেন, ‘ছোটবেলাতেই পাঠ্যপুস্তকের পড়াকে আমার মনে হতো কুইনিন গেলার মতো। তবে পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে আমার কাছে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বাংলা বই। যে ক্লাসে পড়তাম তার ওপরের ক্লাসের বাংলা বই আমি আগেই পড়ে ফেলতাম। প্রসঙ্গত আমার ১৯৭১ সালের কথা মনে পড়ছে। ১৯৭১ সালে আমি ছিলাম চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। মার্চ মাসের পর থেকে তো স্কুলে লেখাপড়া হয়নি, যুদ্ধশেষে ১৯৭২ সালে যখন এস এস সি পরীক্ষার সময় এলো তখনও অটো প্রমোশন পাওয়া পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র আমি, গ্রামের বাড়িতেই থাকি। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের কয়েক দিন সেই যে তেজগাঁও টেলিকম সেন্টারে লুকিয়ে থেকে প্রথমে কাপাসিয়ার নানা বাড়ি তরগাও গ্রামে, পরে নরসিংদীর মনোহরদি থানার গণ্ডারদিয়ায় আমাদের গ্রামে চলে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে ঢাকায় ফেরা হয়েছিল ১৯৭২ সালের একেবারে এপ্রিল মাসে। ঢাকায় আসবার আগে কয়েকদিন ছিলাম তরগাও গ্রামে। চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র হয়েও সে সময় আমি আমার মামাতো ভাই এস এস সি পরীক্ষার্থী মিজান ভাইয়ের নবম-দশম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের সব রচনা পড়ে ফেলি। সবটা যে ভালোভাবে বুঝেছিলাম তা নয়, পড়ে যে অসীম আনন্দ হয়েছিল তা মনে আছে। তখন থেকেই নিজেকে একজন পাঠক ভাবতে শুরু করি! তখন থেকেই আমার মধ্যে পাঠক্ষুধা জাগতে শুরু করে।’

মাযহার লিখেছেন, ‘অনেকেই শুধু বই পড়েন। ঘটনা পরম্পরার অভিঘাত, নাটকীয় বিন্যাস কিংবা বক্তব্যের দার্শনিকতা নিয়ে মোটেই ভাবিত হন না, তাঁরা বই কেবল পড়ে যান, বিনোদিত হয়ে যান—নিজের জীবনোপলব্ধির সঙ্গে বইয়ের ভাষ্য মিলিয়ে দেখেন নাবা নিজে নিজে তর্ক করে দেখেন না। প্রায়ই এমন অবস্থায় আমিও পড়েছি। কোন কোন বই পড়তে গিয়েও পড়া হয়ে ওঠেনি এই অস্বস্তির সঙ্গে যুঝে উঠতে না পেরে। আবার বই পড়তে পড়তেই জানতে পেরেছি, কেন বই পড়লেই হবে না, বইকে ঠিকমতো হৃদয়াঙ্গমও করতে হবে। ক্রমশ আরও বুঝেছি সব বই আমি পড়ে ঠিকমতো হৃদয়াঙ্গমও করতে পারি না, কোন কোন বই হয়তো আংশিক পারি। কখনো কখনো এমনও বুঝেছি, যে বইটি ঠিকমতো বুঝে উঠতে না পারার জন্য আমার কোন কোন পূর্বধারণা দায়ী। যদি পূর্বধারণার প্রভাবমুক্ত হয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে পারি তাহলে অনেক বইই আরো বেশি তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে উঠতে পারে আমার জীবনে।’

তবে মাযহারের এই লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি হলো, ‘কখনো কখনো মনে হয়েছে কেবল বই পড়লেই হবে না, কোন বই পড়াকে আমার অগ্রাধিকার দিতে হবে সেটাও বুঝতে হবে। পৃথিবীর সব ভাল বইই তো এঁর আমার পক্ষে পড়ে ফেলা সম্ভব নয়! সুতরাং কী আমার না পড়লেই নয় তা আমাকে বুঝবার চেষ্টা করতে হবে। অনেক সময় মনে হয়েছে যে-বইটি আমি পড়েছি তা আমার হয়তো স্মৃতিতে থাকছে না বিষয়বস্তুর গভীরতার সঙ্গে নিজের উপলব্ধির সমন্বয় সাধন করতে না পারার কারণে। কিন্তু বইটা যে ধারণা আমার সত্তায় গড়ে দিয়েছে তা বাকী জীবন ধরে অনেকটা অজান্তেই আমাকে প্রভাবিত করে গেছে। মোটকথা বই পড়া যদি সামগ্রিক অর্থে কোনো ব্যক্তির জীবন-জিজ্ঞাসাকে সমন্বিত করে না চলে সে ব্যক্তির বই পড়া কেবল বিনোদিত করেই চলবে, নিজের জীবনকে প্রভাবিত করবে না। সে ব্যক্তি বই পড়া বিদ্বানও হয়তো হতে পারেন, কিন্তু বই-সংস্কৃত মানুষ হতে পারেন না।’

এরপর আড্ডায় কথা শুরু হয় বাংলা ভাষায় প্রকাশিত একটি সাহিত্য পত্রিকা ‘চতুরঙ্গ’ বিষয়ে। ডঃ ইসরাইল খান আমাদের সাহিত্যে একজন অক্লান্ত মেধাবী গবেষক শুধু নন। তাঁর অন্বেষণ সমাজের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মধ্য দিয়ে একটি জাতির বিভিন্ন সময়-পরিক্রমায় যে-রূপটি ফুটে ওঠে তা নির্ণয় করা। সংবাদপত্র, সাহিত্যপত্রিকা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পত্রিকা নিয়ে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন অবশ্যই বিনয় ঘোষ। অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে পরবর্তী দেড় দুই শতাব্দীর বাংলার ইতিহাস তিনি প্রায় খুঁড়ে খুঁড়ে উন্মোচন করেছেন সংবাদপত্র ও অন্যান্য লিপিকার ব্যাখ্যা করে। বিপুল সে-সব কাজ। যদিও বিনয় ঘোষের কাজ নিয়ে ব্যাখ্যা করা জরুরি, কিন্তু যেহেতু তাঁর গবেষণার পদ্ধতি ও ব্যাখ্যা ছিলো কিছুটা মার্কসবাদী ঘরানার, তাই আমাদের দেশে তো নয়ই এমন কি পশ্চিমবঙ্গেও তাঁর কাজ নিয়ে খুব একটা গবেষণা বা মূল্যায়ন হয়নি। সেদিক থেকে বিচার করলে ডঃ ইসরাইল খান অনেক বেশি নৈর্ব্যক্তিক এবং মার্কসবাদের কট্টর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত। কয়েক কিস্তিতে লেখা কবি হুমায়ুন কবির প্রতিষ্ঠিত এবং আতোয়ার রহমান সম্পাদিত ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকা বিষয়ে, বিশেষ করে এই পত্রিকার এক দশক কালের লেখা নিয়ে অসাধারণ এই লেখাটি লিখেছেন ইসরাইল খান। এধরনের কাজ আমাদের সাহিত্যে সত্যিই কম হয়েছে। শোনা যায় তিরিশের দশকে কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘পরিচয়’ পত্রিকা ছিলো বাংলা ভাষায় সবচেয়ে উঁচু মানের মননশীল পত্রিকা। সেই পত্রিকাটি দেখে হুমায়ুন কবির একটু উন্নত মানের মনন-নির্ভর সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করার প্রেরণা পান। তাই তিনি ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকাটি প্রতিষ্ঠা করেন। সঙ্গে সম্পাদক হিশেবে নেন তাঁর বিশিষ্ট বন্ধু আতোয়ার রহমানকে। কিছু কিছু মানুষ থাকেন একেবারেই নীরব, কিন্তু পর্দার আড়াল থেকে সকল কাজ করেন। এমন নিবেদিত মানুষ, শিল্পী বা সম্পাদক সব সমাজেই বিরল। রাজনীতি, অধ্যাপনা ও ভারতের স্বাধীনতার আগে থেকেই এর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যুক্ত হন হুমায়ুন কবির। প্রথমে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় গ্রান্টস কমিশনের চেয়ারম্যান ও পরে মাওলানা আজাদের শিক্ষা উপদেষ্টা ও পরামর্শদাতা হিশেবে সরকারী কাজে যোগ দেন। তাই ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকার জন্য তাঁকে সার্বক্ষণিকভাবে নির্ভর করতে হয়েছে আতোয়ার রহমানের ওপর। তিনি তাঁর দায়িত্ব কতোটা সুচারুরূপে পালন করেছেন তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়। ডঃ ইসরাইল খান তাঁর লেখা এই পত্রিকার দশ বছর সময় পরিধি নিয়ে যা লিখেছেন তাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে পত্রিকাটির ভূমিকা বিষয়ে অসাধারণ একটি চিত্র পাওয়া যায়। অনেকদিন ঢাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গের কোন পত্রিকা বিষয়ে এ ধরনের গবেষণা-নির্ভর লেখা হয়নি। অবশ্যই অধ্যাপক ভুঁইয়া ইকবাল অনেক কাজ করেছেন, বা বলা আরও দুচারজন গবেষক উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন, তবে ডঃ ইসরাইল খানের সাম্প্রতিক কয়েকটি পত্রিকা বিষয়ে গবেষণা সত্যিই ভীষণ মূল্যবান। ফজলে লোহানীর ‘অগত্যা’ পত্রিকা নিয়ে কাজটিও সত্যিই মূল্যবান।

আতোয়ার রহমান একজন বড় সম্পাদক, কিন্তু তাঁকে নিয়ে একমাত্র অশোক মিত্র মহাশয় ছাড়া তেমন কেউ লেখেন নি, বা আমার চোখে কোন লেখা পড়ে নি। হুমায়ুন কবির রাজনীতি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছেন। বর্তমান ভারতের বিজ্ঞান শিক্ষা, গবেষণা, আই আই টি, মহাফেজখানা ইত্যাদি মহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে তিনজন মানুষের অবদান অনস্বীকার্য, তাঁরাই ছিলেন এগুলোর স্থপতি। তাঁরা হলেন মাওলানা আজাদ, জওহরলাল নেহেরু ও হুমায়ুন কবির। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে এই বড় কাজগুলো করার বিনিময়ে বরং তিনি নিজেকেই অনেকটা বঞ্চিত করেছেন। নিজের দর্শনের লেখা, সাহিত্য, বিশেষ করে কবিতা বা উপন্যাস ও অন্যান্য মৌলিক চিন্তার কাজগুলো তেমন আলোচিত হয়নি। যদিও রাশিয়া ও আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন করে এই দুই দেশের সরকার পঞ্চাশের দশকে যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে, সেখানে দুটি দেশের সরকারই পরামর্শক হিশেবে আমন্ত্রণ করেন হুমায়ুন কবিরকে। এবং তিনি বেশ কিছু সময় ধরে সেই পরামর্শ দেনও। কিন্তু তাঁর জন্মভূমি বাংলাদেশ বা ‘৪৭ সালের পর যেদেশে তিনি রয়ে গেলেন সেই ভারতের বাঙালিরাও এই মানুষটির সত্যিকার মূল্যায়ন করেন নি। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান হুমায়ুন কবির সম্পর্কে কিছুটা লিখেছেন। তবে বেশ খানিকটা গবেষণা করে হুমায়ুন কবিরের কাজ নিয়ে মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন আহমাদ মাযহার। আমার ধারণা ডঃ ইসরাইল খান ‘চতুরঙ্গ’ নিয়ে লেখাটা সমাপ্ত করে যদি আতোয়ার রহমান ও হুমায়ুন কবিরকে নিয়ে লেখেন তাহলে কিছুটা হলেও আমাদের ভাষায় এই মানুষটি নিয়ে কিছুটা ভাল কাজ হবে। বাকী সবকিছু বাদ দিলেও একমাত্র ‘বাংলার কাব্য’ নিয়েই বড় একটি গ্রন্থ বা অভিসন্দর্ভ রচিত হতে পারে। বাঙালি মুসলমান সমাজে হুমায়ুন কবিরের মতো মৌলিক চিন্তার মেধাবী মানুষ কম জন্মেছেন। তাঁকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতিগদ্য যারা লিখেছেন তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক আবু রুশদ মতিনউদ্দীনের লেখাটা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

আমার অসুস্থতার জন্য একটি সপ্তাহে বসতে পারিনি বলে কিনা জানি না, এদিনের আড্ডায় কবি এবিএম সালেহউদ্দীন, আহমাদ মাযহার ও কবি শামস আল মমীন সবাই ছিলেন ভীষণ মুখর। সালেহউদ্দীন মধ্যরাতের দিকে চলে যান বাড়িতে, ঘরে একজন অসুস্থ সদস্য থাকার কারণে। এরপর আমি মাযহার ও মমীন ভাই জড়িয়ে পড়লাম কবিতার ভাষা ও বিভিন্ন বাঁকবদল নিয়ে। তুমুল তর্কে আমরা খেয়ালই করিনি রাত কতোটা। হঠাৎ মমীন ভাই নিজের ঘড়ি দেখালেন আমাদের দুজনকে। রাত প্রায় দুটোর কাছাকাছি।
আমরা আড্ডায় যতি টানলাম এই দিনের মতো, কিন্তু নিজেরা প্রতিশ্রুতি দিলাম যে পরবর্তী আড্ডার শুরুতে আজকের বাংলাদেশের কবিতার ভাষা ও বাঁক ভঙ্গি নিয়ে আমরা কথা শুরু করবো!
সবাই চলে গেলে আমি বাতি নিবিয়ে বহুক্ষণ নীরবে রেকর্ডারে ধ্রুপদী গান শুনছিলাম! আজকাল ঘুম প্রায় আসতেই চায় না!

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30