ঢাকা ২৪শে জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৭ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


নিউ ইয়র্কে শনিবারের আড্ডা

redtimes.com,bd
প্রকাশিত জুলাই ৬, ২০২৪, ০২:০৫ পূর্বাহ্ণ
নিউ ইয়র্কে শনিবারের আড্ডা

‘এখানে রান্নাঘরে আমার পাশে একটু সুস্থির হয়ে বহ তো বাবা!’

আবেদীন কাদের

বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসের একটি অনুষ্ঠান ছিলো শনিবার দিন বিকেলে। আমি এই শিল্পীর কণ্ঠের অনুরাগী শ্রোতা। এমনিতে নিউ ইয়র্কে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমি তাঁর গান শুনেছি। তবে ইউটিউবে তাঁর একটি সিডি রয়েছে ‘অশ্রুনদীর তীরে’ শিরোনামে। পুরনো দিনের ভক্তিরসসহ বিভিন্ন গান, যেটি আমার ভীষণ প্রিয়।

ইফফাত আরা দেওয়ানের ‘জীবন নদীর ওপারে’ শিরোনামে আরেকটি সিডি রয়েছে পুরনো দিনের গানের, সেটিও আমার খুব প্রিয়। যতদূর মনে পরে বছর পঁচিশ তিরিশ আগে সেটি ‘বেঙ্গল’ থেকে প্রকাশ করা হয়েছিলো। তবে শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসের কয়েকখানা বই আমি পড়েছি সঙ্গীতের ওপরে, এছাড়া সঙ্গীতের বিভিন্ন মনীষীদের নিয়ে লেখা। খুব সুন্দর সে-সব লেখা। আমাদের আড্ডায় আহমাদ মাযহার, আদনান সৈয়দ ও আরও দুয়েকজন শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসের বইগুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় কথা বলেছেন। তাঁর এখন বয়স হয়েছে, তাই আমি অনুষ্ঠানটি কোনমতেই মিস করতে চাইনি। তাই আমাদের আড্ডাটা সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে কিছুটা বিলম্বে শুরু হয়, যা পরে দীর্ঘ সময় চলতে থাকে। ইথাকা থেকে আমাদের বন্ধু ডঃ আহমেদ শামীম আসবেন আড্ডায় যোগ দিতে। তাই ওঁকে শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসের অনুষ্ঠানের ঠিকানাটা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। শামীম ও নসরত শাহ সেখানেই এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। অনুষ্ঠানে গিয়ে দেখা হলো শিল্পীর দুই কন্যা আমাদের বন্ধু কেতকী ফারহানা বিশ্বাস ও ডঃ বিশ্বাস করবী ফারহানা বিশ্বাসের সঙ্গে। কেতকী, যাকে বন্ধুরা কেয়া বলেই জানেন, তাঁর স্বামী আমাদের দীর্ঘ দিনের বন্ধু মামুনের সঙ্গে দেখা হলো। চা খেতে খেতে কেয়া, মামুন, মাযহার, আনিস, করবী ও শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসের সঙ্গে আড্ডাটা শুরু হলো। কেয়াকে দেখলে আমার সব সময় অনেকদিন আগের একটি স্মৃতির কথা মনে পড়ে, কিন্তু ওঁকে কোনদিন বলা হয়নি। সত্তর দশকের শেষদিকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধু কলারোয়ার সাইদুল হক বাবু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন। তাঁর সূর্যসেন হলের কক্ষে একটি ছোট ক্যাসেট রেকর্ডার ছিলো। এই সাইদুল হক ও আমার শ্রদ্ধেয় বন্ধু ডঃ মোরশেদ শফিউল হাসান কেয়ার দুই খালার সন্তান। অর্থাৎ কেয়া, বাবু ও মোরশেদ ভাই তিনজন খালাতো ভাইবোন। একদিন বাবুর কক্ষে আমি ক্যাসেটে রেকর্ড করা একজনের গাওয়া খালি গলায় একটি গান শুনেছিলাম, কাজী নজরুল ইসলামের গান, ‘মালা চন্দন দিয়ে থালা সাজাই, প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই’! ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম সেই কিশোরীর গাওয়া গানটি শুনে। সেটি ছিলো কেয়ার গাওয়া। কিন্তু আমি কেয়াকে তার আগে কোনদিন দেখিনি, শুধু বাবুর কাছে তাঁর গান শুনেছি।

করবী ও কেয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বার বার আমার সে-কথাই মনে পড়ছিললো। প্রায় সারে চার দশক আগে শোনা সেই কিশোরীর মিষ্টি কণ্ঠটি আজও কানে বাজে! কিন্তু ডঃ করবীর খালি গলায় গাওয়া কিছু গান শুনে মুগ্ধ হয়েছি। এই ক’দিন আগে শুনলাম অতুল প্রসাদের ‘পাগলা মনটাকে তুই বাঁধ’ গানটি। খুব সুন্দর গেয়েছেন করবী। এ গানটি আমার প্রিয় শিল্পী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায় দারুণ গেয়েছেন। কিন্তু করবী জানালেন কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ও নাকি সুন্দর গেয়েছেন।
কিছুক্ষণ পরই শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসকে দেয়া সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হলো। এরপর শিল্পী কিছু স্মৃতিচারণ করলেন ও সঙ্গীত বিষয়ে কিছু কথা বলে বলে পুরনো দিনের অনেকগুলো গানের কিছুটা শোনালেন। বয়সের কারণে পুরো গান আগের মতো গাইতে পারেন নি, কিন্তু এতো মিষ্টি ও স্মিগ্ধ কণ্ঠে দু’চার কলি করে শোনালেন, যা সত্যিই শ্রোতাদের মুগ্ধ করলো।

অনেক ইচ্ছা থাকার পরও শিল্পী মুত্তালিব বিশ্বাসের গানের পুরো অনুষ্ঠানটি আমরা কয়েকজন উপভোগ করতে পারি নি, ঘরে ফিরতে হয়েছে। কারণ আড্ডার বন্ধুরা কেউ কেউ আমার ঘরে এসে অপেক্ষা করবেন। আমি মামুন ও আনিসের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ঘরের দিকে রওয়ানা দিলাম। গাড়িতে উঠে আমি, কবি আহমেদ শামীম ও নসরত আড্ডা শুরু করলাম। কথা হচ্ছিলো শামীমের দেয়া একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস বিষয়ে। পশ্চিমে, বিশেষ করে মার্কিন একাডেমিয়ায় আন্তনিও গ্রামসির লেখা সম্পর্কে যে-ক্রিটিক করা হয়েছে, সে সম্পর্কে শামীম প্রশ্ন রেখেছিলেন যে কেন ঢাকার বুদ্ধিজীবী মহলে যারা আধুনিক সমাজতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা করেন তাঁরা গ্রামসির ‘হেগেমনি’ বা ‘অরগানিক
ইন্টেলেকচুয়াল’ তত্ত্ব বিষয়ে সীমাবদ্ধতা বা ক্রিটিকগুলো সম্পর্কে কথা বলেন না। অর্থাৎ সাম্প্রতিক কয়েক দশকে গ্রামসির লেখা সম্পর্কে যে-দুর্বলতার দিকগুলো পশ্চিমা গবেষকরা শনাক্ত করেছেন সেগুলো কি ঢাকায় পৌঁছয় নি! এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তেমন কেউ দেন নি, কিন্তু শামীমের দেয়ালে এই স্ট্যাটাসটি সম্পর্কে এমন কিছু মন্তব্য এসেছে বিভিন্ন লেখকদের কাছ থেকে যা সম্ভবত শামীমকে কিছুটা হতাশ করেছে। শামীম বিশেষ করে বলতে চেয়েছেন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদ প্যারী এনডারসনের লেখা সম্পর্কে। আমার ধারণা আশির দশকের গোড়ার দিকে বেনেডিকট এনডারসন ‘জাতীয়তাবাদ’ সম্পর্কে কালজয়ী বই লেখার ফলে এতোটাই খ্যাতিমান হন যে তাঁর সহোদর প্যারী এনডারসন ভীষণ মেধাবী হওয়ার পরও তাঁর লেখা অনেকটা আড়ালে থেকে যায়। প্যারী এন্ডারসনের লেখা মোহনদাশ গান্ধীর ধর্মচেতনা ও রাজনীতি নিয়ে যে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন এবং তাত্ত্বিক লেখা প্রকাশ করেন তাও তেমন কদর পায়নি ভারতীয় ইতিহাসবিদদের কাছে বা পশ্চিমা চিন্তাবিদদের কাছে। সব কালেই দেখা যায় গভীর চিন্তাশীল অনেক লেখকের মৌলিক লেখাই প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিৎ হয়। প্যারী এন্ডারসন ঠিক তেমন একজন চিন্তাশীল ইতিহাসবিদ।
গত কয়েক দশক ধরে আমাদের সমাজে গ্রামসি বিষয়ে দীর্ঘ লেখা লিখেছেন ও বক্তৃতা করেছেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহার ও আরও কেউ কেউ। মার্কসবাদী তাত্ত্বিকদের অনেকেই তাঁদের আগেও সামান্য কিছুটা লিখেছেন। কিন্তু আজকের তরুণ সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে গ্রামসি, জ্যাক লাকা, ফ্রাঞ্জ ফানো ও উত্তর আধুনিক তাত্ত্বিকদের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে বক্তৃতা, ওয়ার্কশপ ও লেখালেখি করে চলেছেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। আমাদের আড্ডায় শামীম যে-প্রশ্নটি করেছেন গ্রামসির লেখা সম্পর্কে বা আরও দুচারজন সমাজতাত্ত্বিকদের লেখার ক্রিটিক সম্পর্কে তার উত্তর দিতে গিয়ে শামীম মনে করেন যে আজকের সামান্য সংখ্যক তরুণ লেখক ছাড়া ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ খুব বেশি একটা মনোযোগ দিয়ে তাত্ত্বিকদের লেখা পড়ার চেষ্টা করেন না হয়তো। কিন্তু আমার মনে হয় শামীমের এই বক্তব্যের সঙ্গে আরেকটি বিষয় যোগ করা যায়, তাহলো উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশুনা করা তরুণ গবেষক বা লেখক যারা রয়েছেন শামীমের মতো, তাঁদেরকে সন্তুষ্ট করার মতো গবেষক লেখক, বিশেষ করে সমাজতত্ত্ব নিয়ে যারা কাজ করেন, তাঁদের মধ্যে কম রয়েছেন। এর অন্যতম কারণ হয়তো উত্তর আমেরিকার শিক্ষাব্যবস্থায় একজন গবেষক গ্রাজুয়েট ছাত্রকে অভিসন্দর্ভ লেখার আগে পাঁচ বা ছয় বছর কোর্স করার সময় যে অমানুষিক পরিশ্রমের ভেতর দিয়ে যেতে হয় পেপার লেখা, সেমিনার দেয়া, কোর্সের ক্লাসগুলোর দীর্ঘ সময়ে তক্কাতক্কির ভেতরে নিজেকে ধারালো করা, বিভিন্ন পরিশীলনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয় তা ভাবলেও শঙ্কিত হতে হয় পরে। এই দীর্ঘ কয়েকটি বছর ঘোর এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে কাটাতে হয় গ্রাজুয়েট ছাত্রদেরকে। এটাকে আমার এক অধ্যাপক এক সময় উল্লেখ করেছিলেন ‘Rigorous Drill’ হিশেবে। এই কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে কোন তরুণ গবেষক যখন যেতে বাধ্য হন, তখন সেই অভিজ্ঞতা ও চিন্তার কর্ষণই তাঁর মাঝে এক বড় নৈতিক ও পাণ্ডিত্যশক্তির জন্ম দেয়। তাই সেই তরুণ গবেষক যখন নিজে একাডেমিয়ায় যোগ দেন তখন তাঁর মাঝে এক তর্কাতিত নিশ্চিত সততার জন্ম দেয় জ্ঞানের ক্ষেত্রে। এই অভিজ্ঞতাটা বাংলাদেশের বৌদ্ধিক সমাজে প্রায়-অনুপস্থিত । শামীম নিজেও ডঃ সলিমুল্লাহ খানসহ যারাই উত্তর আমেরিকায় দীর্ঘদিন গবেষণার মধ্যে দিয়ে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানার্জন করেছেন, তাঁদের মতোই একজন। তাই চিন্তাশীল লেখা বা তাত্ত্বিকদের লেখার ক্রিটিক করতে গিয়ে শামীম বা ডঃ সলিমুল্লাহ খানের মতো কেউ কেউ রয়েছেন যারা ঢাকার লেখকদের লেখায় খুব একটা সারবস্তু খুঁজে পান না, বা তৃপ্ত হন না। কারণ তাঁদেরকে তৃপ্ত করা একটু সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে ঢাকার শিক্ষাজগতের মানুষদের পক্ষে। আহমেদ শামীমের অবস্থা অনেকটা তাই।

বাংলাদেশে শামীম পড়াশুনা ও অধ্যাপনা করেছেন ইংরেজি সাহিত্যে। যেহেতু নিজে কবিতা লেখেন তাই আধুনিক কবিতার বিভিন্ন বাঁকবদল নিয়ে তাঁর কৌতূহল রয়েছে তরুণ বয়স থেকে, যা তাঁকে জীবনানন্দের কবিতা বিষয়ে গবেষণা ও এম ফিল করার প্রয়াসের দিকে নিয়ে যায়। কিন্তু আমেরিকায় এসে তিনি গ্রাজুয়েট স্কুলে যান সমাজতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে গবেষণা ও পিএইচডি করতে। যেহেতু অভিসন্দর্ভ ডিফেনড করার আগেই তিনি টেক্সাস স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনায় যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক সমাজতত্ত্বের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উৎসাহী হয়ে পড়াশুনা করছেন। তাঁকে উত্তরাধুনিক ও উপনিবেশিকতা বিষয়ে তত্ত্বগুলো নিয়ে তক্কাতক্কি করে তৃপ্ত করা একটু কঠিন। তিনি যে খুব বেশি একটা মার্ক্সবাদবিরোধী মানুষ তা নয়, বরং মার্কসীয় তাত্ত্বিকদের লেখাগুলোকে খোলা চোখে দেখা ও ক্রিটিক করাই শ্রেয়তর মনে করেন আহমেদ শামীম।

আমাদের আড্ডার বিষয়টি যখন গ্রামসির লেখার ক্রিটিক, তখন প্যারী এন্ডারসনের লেখা নিয়েই কথা ওঠে। শামীম বলেন প্যারী অনেকদিন আগেই যে খুব জোরের সঙ্গে কিছু তাত্ত্বিক ক্রিটিক করেন গ্রামসির লেখা প্রসঙ্গে সেগুলো বাংলাদেশের তরুণ সমাজবিজ্ঞানীদের না জানার কথা নয়। তাছাড়া গত আড়াই দশক ধরে অবিরাম লিখে ও বক্তৃতা দিয়ে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান গ্রামসির লেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তবুও ঢাকার সমাজবিজ্ঞানে উৎসাহী লেখক পাঠকরা ক্রিটিকাল এসব লেখার কোন খোঁজ রাখেন না এটা ভাবতে একটু অবাক লাগে। শামীমের ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিভিন্ন মন্তব্য দেখে তেমনটাই ঠায়র হওয়া স্বাভাবিক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দশকগুলোতেই গ্রামসির লেখা প্রথম পশ্চিমা চিন্তাজগতে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কিন্তু ইতালীয় কম্যুনিস্ট পার্টি ও ইতালিয়ান বুদ্ধিজীবী সমাজে আরও আগে থেকেই গ্রামসিকে নিয়ে লেখা শুরু হয়ে যায়। বিশেষ করে বিখ্যাত ইতালিয়ান সমাজবিজ্ঞানী নিকোস পোলানজাস প্যারিসে নিজের এপার্টমেন্টের ওপর থেকে আত্মঘাতী হওয়ার আগেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা লিখেছেন গ্রামসি সম্পর্কে। কিন্তু ক্রিস্টিন বুসি-গ্লাক্সম্যান রচিত Gramsci and the State গ্রন্থটি বেশ সাড়া জাগায় একাডেমিক জগতে। এসব লেখার সঙ্গে সঙ্গে প্যারী এন্ডারসন ও আলথুসারের ইউরোকম্যুনিজম নিয়ে বিভিন্ন লেখায় গ্রামসি বিষয়ে তির্যক মন্তব্য লক্ষ করা যায়। এই লেখালেখি ও বিতর্ক যখন পশ্চিমা মননশীল সমাজবিজ্ঞানীদের মাঝে কিছুটা হিল্লোল তোলে সে সময় বিলেত থেকে প্রকাশিত ‘নিউ লেফট রিভিউ’ পত্রিকায় প্যারী এন্ডারসন লিখিত The Antimonies of Antonio Gramsci ভীষণ সাড়া জাগায়। ২০১৬ সালে ‘নিউ লেফট রিভিউ’ পত্রিকায় এন্ডারসনের বিখ্যাত লেখাটি প্রকাশের চল্লিশ বছর পূর্বতীর বছর। এর পরের বছর ২০১৭ সালে প্যারী এন্ডারসন Hegemony বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন যার শিরোনাম The H-Word, যাতে তিনি গ্রামসি বিষয়ে প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ লেখাই আলোচনা করেন। এর মধ্যে এন্ডারসন বিশেষ করে গুরুত্ব দেন সে-সব লেখার যেগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমস্যাবলী ও রাষ্ট্রবিষয়ক সমস্যাদি নিয়ে যারা গভীর বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা করেন। গ্রামসির ‘হেগেমনি’ তত্ত্বকে এন্ডারসন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখান। কিন্তু তাঁর লেখা The Antimonies of Antonio Gramsci নতুন সংস্করণ হিশেবে প্রকাশ করেন ২০১৭ সালে। এই আলোচনায় তিনি ‘হেগেমনি’ নিয়ে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কিছুটা নতুন আলো ফেলেন। গ্রন্থটিতে তিনি একটি নতুন মুখবন্ধ লেখেন ও একটি এপেনডিকস জুড়ে দেন যেখানে ইতালির জেলে অ্যাথোস লিসার সঙ্গে গ্রামসির কথোপকথনের বিখ্যাত প্রতিবেদনটিও রয়েছে। মুখবন্ধে এন্ডারসন এছাড়াও ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত Prison Notebooks এর সংস্করণ নিয়ে সম্পাদক ও সমালোচক ভ্যালেন্টিনো জেরেনটানার বিখ্যাত লেখাটি সম্পর্কে নিজের মন্তব্য জানিয়েছেন। আরও লিখেছেন গিয়ানি ফ্রান্সিওনি তাঁর লেখা গ্রন্থ L’officiana gramsciana-তে যে মন্তব্য ও সমালোচনা লিখেছেন, তারও জবাব দিয়েছেন।

সত্তর দশকের শুরুতে পশ্চিমা বিশ্বে গ্রামসির গ্রন্থের যে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়, এর বেশ কিছুদিন আগে আর্জেন্টিনাতে কম্যুনিস্ট পার্টির বুদ্ধিজীবীরা কারাগারের নোটবুক নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছিলেন, বা সমালোচনা করেছিলেন সে সম্পর্কে অধিকাংশ ইংরেজিভাষী বুদ্ধিজীবীরা কিছুই জানতেন না। আর্জেন্টিনার কম্যুনিস্ট পার্টির বুধিজীবীদের মধ্যে যারা গ্রামসির লেখার সমালোচনা লেখেন তাঁদের মধ্যে হোসে আরিকোকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয় ১৯৬৩ সালে Pasado Presente- এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর। মোদ্দা কথা, এন্ডারসন তাঁর লেখায় নিজের পূর্ববর্তী অবস্থানে অনড় থাকেন। তিনি ফ্রানসিয়ানোর লেখায় যে এক ধরনের সুর লক্ষ করা যায় যাকে অভিহিত করেন Marmoreal mode হিশেবে। কিন্তু এন্ডারসনের মূল লক্ষ ছিলো পিটার ডি টমাসসহ অন্যান্য বুদ্ধিজীবীদের গ্রামসির লেখার মন্তব্যকে খণ্ডন করা। তিনি ভ্যালেন্টিনো জেরেনটিনোর লেখার বিশ্লেষণও করেন। এছাড়া ১৯৭৭ সালে Marxism Today পত্রিকায় হবসবামের গ্রামসি বিষয়ে লেখারও উল্লেখ করেন। গ্রামসির লেখা ও সমালোচনা বিষয়ে, স্টেট ও হেগেমনি বা ‘অরাগানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ তত্ত্ব বিষয়ে নানা ধরনের সমালোচনা বিষয়ে আহমেদ শামীম আড্ডায় বিস্তারিত আলোচনা করছিলেন। আমি ও নসরত মাঝে মাঝে বিষয়টি ঢাকায়, বিশেষ করে ডঃ সলিমুল্লাহ খান ও ফরহাদ মজহার গত কয়েক দশক ধরে কী ধরনের ব্যাখ্যা করেন তা নিয়ে কথা বলছিলাম। ঢাকার তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে যারা উত্তর আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কয়েক বছর গবেষণা করেছেন বা তাঁদের অভিসন্দর্ভ লিখে ফিরে গেছেন তাঁদের সঙ্গে ঢাকার গবেষক বা সমাজবিজ্ঞানীদের একটা তফাৎ লক্ষ করা যায়। সেটি আহমেদ শামীমও শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, সম্ভবত যারা মার্কিন দেশে বা ইউরোপে গবেষণা করেছেন তাঁরা অনেকেই অসংখ্য পেপার লিখতে বাধ্য হয়েছেন, সেমিনার করেছেন, অধ্যাপকদের সঙ্গে বিতর্কে নিজেদের অবস্থান শানিত করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু ঢাকার তরুণ পাঠকদের সে-সুযোগ কম। এছাড়া তাঁরা অনেকেই মূল লেখা খুব ভালো করে পড়ার সুযোগ কম পান, পেপার লেখা বা নিজেদের চিন্তাকে শানিত করার বাধ্যবাধকতার ভেতর দিয়ে যান না। একারণে তাঁদের লেখা পড়লে কিছুটা অস্বচ্ছ মনে হয়। কিন্তু অধ্যাপক জগলুল আসাদ, অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, অধ্যাপক শিবলী আজাদের লেখা পড়লে সেই অস্বচ্ছতা কম চোখে পড়ে যদিও এঁদের মধ্যে অধ্যাপক শিবলী আজাদ নামকরা আইভি লীগ বিশ্ববিদ্যালয় কলাম্বিয়ার প্রাক্তনী, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুশীলন হয়েছে একেবারে শানিতভাবে।
আহমেদ শামীম রাষ্ট্র ও আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের এসব তত্ত্বাদি নিয়ে আড্ডায় আলোচনার সময় এসব ন্যূনতার কথাই বলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু আমি যেহেতু ঢাকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা মনোযোগ দিয়ে পড়ার চেষ্টা করছি, তাই আমাদের আজকের তরুণ সৃজনশীল লেখক ও সমাজবিজ্ঞানের চিন্তাশীল লেখকদের অনেকের মেধা বিষয়ে খুব আশাবাদী।

এরপর আড্ডায় আলোচনায় আসে ‘লালন’ বিষয়ে। গত তিন চার দশকে লালনের ভাবনা বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে ঢাকা ও বাইরে। কিন্তু আমি যেহেতু লালনের কিছু গান শোনা ছাড়া তেমন কিছুই জানি না, তাই আমি এসময় প্রায়-নীরব শ্রোতাই থেকেছি। আহমেদ শামীমও লালনের বিষয় নিয়ে আগে ফেসবুকে লিখেছেন। কিন্তু সম্ভবত অনেক বেশি লিখেছেন ফরহাদ মজহার। কেউ কেউ শুধু লিখেই ক্ষান্ত হননি, তরুণ চিত্রনির্মাতাদের মধ্যে অনেকে প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণেরও চেষ্টা করেছেন। আমি এগুলোর দুয়েকটি দেখেছি। কিন্তু কোনটিকেই আমার তেমন কিছু মনে হয়নি। যে তরুণ বুদ্ধিজীবীরা লালনের ‘দর্শন’কে ভীষণ গুরুত্ব দেন তাদের অনেকের লেখা পড়ে আমি খুব বেশি একটা কিছু বুঝতে পারি নি। এছাড়া এধরনের স্বশিক্ষিত ‘অরগানিক’ দার্শনিকদের লেখা বা তাঁদের ভাবনা নিয়ে অন্যদের লেখা বিষয়ে আমার উৎসাহ কম। সে-জন্য আমার বন্ধুদের মধ্যে যারা আরজ আলী মাতব্বরের ‘দর্শন’ বিষয়ে খুব উচ্চ ধারনা পোষণ করেন, তাঁদের লেখা পড়েও আমি তেমন বুঝতে পারি না। কেন এসব ‘দর্শন’ খুব গুরুত্বপূর্ণ সেই ব্যাখ্যায় তাদের লেখা আমার কিছুটা ধোঁয়াটেই মনে হয়। লালন প্রসঙ্গ আড্ডায় ওঠায় নতুন করে ফরহাদ মজহারের লেখা, তাঁর নিজের এই বিষয়ে ‘সাধনা’ এবং সাধন-সঙ্গী নিয়েও কিছু আলোচনা হয়।
সত্তর দশকের শেষদিকে ফরহাদ মজহার মার্কিন দেশ থেকে ঢাকায় ফিরে গিয়ে যে-রাজনীতি ভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক অনুশীলন শুরু করেন, বিভিন্ন সংবাদপত্রে স্তম্ভ লেখেন বা রাজনৈতিক তত্ত্ব-নির্ভর লেখা লিখতে শুরু করেন, আমি তা প্রায় সবই পড়ার চেষ্টা করেছি। তাঁর পড়াশুনা, বিশ্লেষণের ক্ষমতা ও মেধা সম্পর্কে আমার কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এই রাজনৈতিক মানুষটির যে-জিনিসটি সবচেয়ে বেশি অভাব রয়েছে সেটা সম্ভবত তাঁর মননশীলতার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা সৃষ্টির ক্ষমতা। একটা মোহাবিষ্টতার আবেশ তাঁর লেখায় রয়েছে, কিন্তু ‘ধর্ম’, বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের প্রতি গভীর আচ্ছন্নতাহীনতা থাকার পরও এই ধর্মের কিছু বৈশিষ্ট্যকে রাজনৈতিক টুল হিশেবে তাঁর ব্যবহারের ক্ষমতা রয়েছে। আর রয়েছে বুদ্ধি ও ‘ধূর্ততার’ মিশ্রণে তরুণ লেখক বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নিজের অনুরাগ সৃষ্টি করে তাঁর লেখার প্রতি আকৃষ্ট করার ক্ষমতা। গত প্রায় চার দশকে ফরহাদ মজহার একটি বিপুল সংখ্যক অনুসারী গোষ্ঠী তরুণ লেখক ও পাঠকদের মাঝে সৃষ্টি করেছেন। এই তরুণ সমাজ তাঁর লেখার পাঠক, কিন্তু তাঁর ‘রাজনীতিটা’ আসলে কী, তা সবার কাছে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ নয়, মনে হয়। আমাদের লেখক সমাজের মধ্যে একমাত্র আহমদ ছফা ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান ছাড়া এতো বেশি প্রভাব বিস্তারকারী চিন্তাশীল লেখক বোধ হয় আর কেউ নেই। তবে আমাদের চিন্তায় মননশীল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে সাধারণ শিক্ষিত মধ্যবিত্তের মধ্যে যে-গভীর শ্রদ্ধা থাকে তাঁদের নৈতিক সততা বিষয়ে, সেটা মনে হয় ফরহাদ মজহারের কিছুটা অভাব রয়েছে তাঁর ব্যক্তিজীবনের ধরণের জন্য। একমাত্র ডঃ সলিমুল্লাহ খান ছাড়া এই তিনজনের মধ্যে কাউকেই আমার নৈতিক বা জাগতিক বিষয়ে প্রশ্নাতীতভাবে সৎ মনে হয়নি। এটা একান্তই আমার নিজের ধারনা। আহমদ ছফার প্রায় সব নৈতিক গুণাবলীই রয়েছে, কিন্তু তা চির ধরে তাঁর জার্মান দূতাবাস ও লিবিয়ার দূতাবাসের সঙ্গে আর্থিক সম্পর্কের কারণে। ডঃ সলিমুল্লাহ খানের মেধা ও নৈতিক সততা, বিশেষ করে বুদ্ধিবৃত্তিক কারণে, আমার কাছে শ্রদ্ধেয় সবচেয়ে বেশি। এটা অবশ্যই আমার জ্ঞানে যতোটা বুঝেছি। ঢাকার লেখকদের অনেকের দেখেছি তাঁকে নিয়ে ‘আপত্তি’সূচক মন্তব্য রয়েছে, কিন্তু মানুষটির পাণ্ডিত্য ও নৈতিক অবস্থান বিষয়ে, বিশেষ করে জাগতিক লোভ বিষয়ে, শ্রদ্ধা টলে যাওয়ার মতো আমি কখনও কিছু পাই নি। আমার দেখা মেধাবী মানুষদের মধ্যে তিনি সত্যিই উজ্জ্বল। নিউইয়র্কের নিউ স্কুলের দুই প্রাক্তনীর মধ্যে ফরহাদ মজহারের মেধা থাকা সত্যেও তাঁর রাজনীতি ও ধর্ম বিষয়ে লেখাগুলো আমাকে সত্যিই কখনও টানে না। তাঁর ব্যক্তিজীবন, বিশেষ করে তাঁর পেশা কী, কোন আয় থেকে তিনি প্রতিদিনের ডাল-চাল কেনেন, বা সামাজিক ও পারিবারিক জীবন তাঁর কেমন, এসব বিষয়ের সঙ্গে তাঁর নৈতিক অবস্থানের সম্পর্ক কী, এগুলো আমাকে ভাবায়। আমি এসব চিন্তা করে গত সারে চার দশকে তাঁর প্রতি খুব বেশি একটা শ্রদ্ধাশীল হতে পারি নি। যদিও তাঁর লেখা আমি মনোযোগ দিয়ে পড়তে আগ্রহী। তিনি লালনের ভাবনা নিয়ে অনেক লিখেছেন, শুনেছি তাঁরও নাকি সাধনসঙ্গী রয়েছে, যদিও এসব চাউর হওয়া বিষয়ের সঙ্গে তাঁর লেখার গুণের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমি যেহেতু কিছুটা ‘রক্ষণশীল’ মানুষ , তাই আমি লেখকের বা চিন্তাশীল মানুষের ব্যক্তিজীবনকে বা ব্যক্তিজীবনের অনুশীলনকে তাঁর নৈতিক অবস্থানের অবিচ্ছেদ্য ছায়া হিশেবেই বিচার করি। আমাদের একটি বড় তরুণ পাঠক সমাজ ফরহাদ মজহারের লেখা দ্বারা প্রভাবিত, তারা যদি ফরহাদ মজহারের ব্যক্তিজীবন দ্বারা প্রভাবিত হন, তাহলে মননচর্চার জগতের জন্য সেটা সুসংবাদ নয় বলেই আমার মনে হয়!

কবি আহমেদ শামীমের সঙ্গে বছর পনেরো আগে নাট্যশিল্পী শাহীন খান ও কবি-গল্পকার মাহফুজা শীলুর নিউ ইয়র্কের বাড়িতে দীর্ঘদিন যে তুমুল আড্ডা হতো সাহিত্য ও চিন্তাশীল লেখা নিয়ে, অনেকদিন পর সেরকম আড্ডাই আবার হলো এদিন। কিন্তু তানভীর রব্বানী ও আহমেদ শামীম ঢাকার বর্তমান রাজনীতি ও সমাজের অবক্ষয় নিয়ে যে-দীর্ঘ আলোচনা করলেন সেটাও খুব মূল্যবান মনে হয়েছে আমার।

রাত গভীর হওয়ায় সবাই বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন, কিন্তু আমি আর কবি শামস আল মমীন কবিতা ও সলিমুল্লাহ খানের লেখা নিয়ে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক নিজেরা আলোচনা চালিয়ে গেলাম এরপর। এক সময় মমীন ভাইও বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন।

আমি নীরবে একাকী বসে রইলাম অন্ধকারে, আমার ভাবনায় এই আড্ডার একটি বিষয় খুব বিষণ্ণতা সৃষ্টি করছিলো। সেটি হলো, আমি আড্ডা চলার সময় বার বার রান্না ঘরে কফি মেশিনে জল চাপাতে যাচ্ছিলাম, হুইস্কির জন্য গ্লাস আনতে যাচ্ছিলাম, সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার সাজাচ্ছিলাম, কিন্তু আহমেদ শামীম বার বার আমাকে বলছিলেন, ‘আবেদীন ভাই, আপনি একটু সুস্থির হয়ে আড্ডায় বসেন তো, খাবার বা পানীয়র গ্লাস কিছুই লাগবে না, শুধু বসেন কাছটিতে!’ কেন জানি না, সে-মুহূর্তে আমার মনে পড়ছিলো, বছর পঞ্চাশেক আগে, ঢাকার স্কুল বা কলেজ হোস্টেল থেকে বাড়িতে গেলে আমি ছুটোছুটি করে বার বার মায়ের লাগানো গাছগাছালি দেখতে বাড়ির পেছনের দিকটায় যেতাম, মা আমাকে বার বার ডাকতেন, ‘এখানে রান্না ঘরে আমার পাশে একটু সুস্থির হয়ে বহ তো বাবা, এতোদিন পর আইলা তুমি!’ শামীমের কথাটা বার বার আমাকে মায়ের কণ্ঠস্বরটাই মনে করিয়ে দিচ্ছিলো, আর চোখটা ঝাপসা হয়ে আসছিলো। আমি আড্ডায় মনোযোগ দিতে পারছিলাম না! সবাই চলে যাবার পর প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে বলা মায়ের সেই কথাগুলোই বার বার আমার কানে বাজছিলো!

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031