ঢাকা ১৭ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

নিউ ইয়র্কে শনিবারের আড্ডা

redtimes.com,bd
প্রকাশিত মে ১০, ২০২৪, ১১:২৫ পূর্বাহ্ণ
নিউ ইয়র্কে শনিবারের আড্ডা

হোসেন শহীদ সোহরোওয়ারদী ও বাঙালি মুসলমানের রাষ্ট্রসাধনা সহজ কাজ ছিলো না!

আবেদীন কাদের 

আমাকে চমকে দিয়ে এসপ্তাহে আড্ডায় সবার আগে এলেন কবি অভীক সোবহান ও কথাশিল্পী বদরুন নাহার। আমি রেকর্ডারে গান ছেড়ে দিয়ে টেবিলে বসে নিজের কাজ করছিলাম।

হঠাৎ সময়ের একটু আগেই কড়া নাড়ার শব্দে কিছুটা বিস্মিতই হলাম। দরোজা খুলে আরও বিস্মিত হলাম অভীক ও বদরুনকে দেখে। ওঁরা দুজন সাধারণত আটটার পরই আসেন, আজ বেশ একটু আগে। ওঁদের দুজনকে বসতে দিয়ে আমি কফির আয়োজন করতে থাকলাম। অভীক এলেই আমার কেন জানি না খুব ফরিদপুরের কথা জানতে ইচ্ছে করে। প্রায় সাড়ে চার দশকের কাছাকাছি সময় পেরিয়ে গেলো আমি শেষবার ফরিদপুর গিয়েছিলাম। কিন্তু এখনও আমার কিশোর বয়স থেকে দেখা ফরিদপুরের প্রতিটি রাস্তা ও ঘরবাড়ির ছবি আমার চোখের সামনে ভাসে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অভীককে অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন, অধ্যাপক আজিজুল হক যাকে আমরা ‘বলাই ভাই’ ডাকতাম, এদের সবার কথা জিজ্ঞেস করলাম। বলতে বলতে কেন জানি না আমার একজন কাজিনের কথা খুব করে মনে পড়লো, তাঁর শ্বশুর বাড়ি টেপাখোলা, তাঁর কথা জিজ্ঞেস করলাম, তাঁকে চেনেন কিনা জানতে চাইলাম। আমার মনে হয়েছিলো চেনার কোন কারণ নেই, কিন্তু দেখলাম অভীকের বড় বোনের সঙ্গেই পড়তো আমার সেই বোনের দ্বিতীয় মেয়েটি। অভীক জানালেন আমার সেই বোনের বড় মেয়ে যিনি বরিশাল মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন, সেই মেডিক্যাল কলেজেই পড়তেন অভীকের বড়বোন। তিনিই শম্পা, মানে আমার দ্বিতীয় ভাগ্নিটি অভীকের বড় বোনের সহপাঠী ফরিদপুরের স্কুল ও কলেজে। তাঁরা খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুও বটে। এসব কথা বলতে বলতে আমার মনটা চলে গেলো ষাট ও সত্তর দশকের দিনগুলোতে। সে-সময়ের ফরিদপুর খুব ছিমছাম শহর ছিলো, ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক জগৎও আমার ভালো লাগতো। তরুণ ছাত্ররা সাহিত্য বা নাটকের দিকে খুব মনযোগী ছিলো। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলো ফরিদপুর জেলা স্কুলের শিক্ষার মান। প্রতি বছর জেলা স্কুল থেকে বেশ কিছু ছাত্র বের হতো যারা সারা দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রেই পরবর্তীতে খুব খ্যাতিমান হতো। মনে পড়ে ‘৫৮ সালে ফরিদপুর জেলা স্কুলের বেশ কয়েকজন ছাত্র পরবর্তীতে সি এস পি হয়েছিলেন, ডাক্তার ও প্রকৌশলী হয়েছিলেন। এমনকি ওই ব্যাচের একজন ছিলেন আবুল কাশেম, যাকে আমরা তাঁর ডাকনাম ‘মধু ভাই’ বলে ডাকতাম, তিনি ছিলেন প্রকৌশলী, কিন্তু টেলিভিশন ও মঞ্চ অভিনেতা হিশেবে দেশের অভিনয় জগতে খ্যাতিমান ছিলেন। তরুণরা লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেখালেখিতে খুব উৎসাহী হতেন ফরিদপুর শহরের অনেকে। এমনকি আমার দেখার প্রায় দুই আড়াই দশক পরেও সেটি উজ্জ্বল ছিলো, এমনকি বদরুন ও অভীকের সময়ও। অভীকের বাবা অধ্যাপক সোবহান সাহেব নিজে লেখক, তিনিও সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। যেমনটা ছাত্রজীবনে অভীক নিজেও করতেন। কলেজের পড়াশুনাকে গৌণ করে সারাদিন দিন রাত পত্রিকা প্রকাশের পেছনে সময় ব্যয় করতেন। নিজের হাত-খরচের সব টাকাই ব্যয় করতেন পত্রিকা প্রকাশ ও বই কেনার পেছনে।

ফরিদপুরের বিভিন্ন সাহিত্য সাংস্কৃতিক জগত নিয়ে আমরা কথা বলতে বলতেই মাযহার ও আদনান এবং নসরত শাহ এসে আড্ডায় যোগ দিলেন। আমি নিজে বরিশাল শহরে কোনদিন বেশি একটা থাকিনি, কিন্তু নসরত ও অন্যান্য বন্ধুদের কাছ থেকে জেনেছি ষাটের ও সত্তর বা আশির দশকে বরিশাল ও ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল প্রায় একই রকম ছিলো। নসরত নিজে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন বলে জেলা শহরের রাজনীতি, সাংস্কৃতিক আবহাওয়া বিষয়ে তাঁর ধারনা পরিষ্কার ছিলো। এছাড়া যারা জেলা শহরগুলোর আদি বাসিন্দা থাকতেন সত্তর আশির দশকে, তাঁরা অধিকাংশই জেলার রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং জেলা শহরের আমলাদের দৌরাত্বের শিকার হতেন কোন না কোনভাবে। নসরতদের পারিবারিক মালিকানায় একটি দৈনিক পত্রিকা ও প্রেস থাকার কারণে জেলার আমলাতন্ত্র, রাজনীতি এসব বিষয়কে তাদের খুব কাছ থেকে দেখতে হয়েছে। নসরত রাজনীতি ও আমলাতন্ত্রের শিকার কীভাবে সাধারণ ব্যবসায়ী বা পত্রিকার মালিকগণ, বা ঠিকাদাররা হন তার একটা সত্যিকার চিত্র তুলে ধরেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে। বরিশাল জেলা শহর অন্যান্য জেলা শহরের মতোই কিছু সাধারণ সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। দৈনিক পত্রিকা নিজেদের পরিবারের মালিকানায় থাকার কারণে নসরতকে বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন বিল নিয়ে ভাবতে হতো। জেলা শহরগুলোর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন দাতা জেলা প্রশাসকের দপ্তর। সেখানে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিচিত্র উন্নয়নমূলক কাজের ফিরিস্তি, টেন্ডার ইত্যাদির বিজ্ঞাপনের দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের দপ্তরের। অথবা স্বাস্থ্য বা শিক্ষা বা অন্যান্য বিভাগের বিজ্ঞাপন হলেও জেলা প্রশাসকের দপ্তরের সে-সব বিভাগের ওপর বড় খবরদারি থাকে। জেলা সরকারি তহবিলের, রেভিনিউর অনেক কিছুই জেলা প্রশাসকের লম্বা হাতের খবরদারির আওতায় থাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে। সারা বছর ধরে যে সব বিজ্ঞাপন দৈনিক পত্রিকাগুলো ছাপে তার অধিকাংশ বিল হয়ে থাকে দুই ঈদের সময় অথবা অর্থ বছরের শেষ দিকে, মানে জুন মাসের দিকে। সারা বছর হাজারবার গেলেও জেলা প্রশাসকের দপ্তরের কেরানীবাবুরা, একাউনটে যারা কাজ করেন তারা পান চিবুতে ছিবুতে বা ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাওয়া বিদেশী সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করে আগুন ধরাতে ধরাতে বলেন, ‘আরে ভাই ঈদ বা আমাদের উৎসব আসছে, তখন আসুন বিল তো আপনারা পাবেনই, এতো চিন্তার কী আছে!’ আসলেই তো, তারা তো পাওনা টাকা অবশ্যই পাবেন, কিন্তু কেন এই কেরানীবাবুরা তাহলে সময় মতো টাকাটা না দিয়ে ঈদের সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন! এর একটা বড় কারণ হলো ঈদের সময়টায় ‘সেলামী’ চাইলে কেউ কিছু মনে করবেন না। বিষয়টা এমন যে কেউ কিছু মনে করলেই যেন এসব সরকারি দপ্তরের ক্ষমতাবান কেরানী বা অফিসারবৃন্দ কোন রকম ভিন্ন কিছু করবেন। ঈদ এলে এই সারা বছরের বিরাট পরিমাণ বইলের টানা তিরিশ শতাংশ ওই দপ্তরেই কেটে রেখে আসতে হয় নগদ, এরপর চেকটি হস্তান্তর করা হয়। কেরানীবাবুদের ভাষ্য অনুযায়ী এর প্রথম দশ শতাংশ জেলা প্রশাসকের জন্য রেখে বাকি কুড়ি শতাংশ টাকা সবার মধ্যে পদের গুরুত্ব অনুযায়ী ভাগ করা হয়। কেরানীদের এই দাবি কতোটা সত্য আমি জানি না। যদিও চাইলেই আমার সহকর্মী বন্ধু বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের মধ্যে যারা জেলা প্রশাসক ছিলেন তাদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারি, কিন্তু কেরানীরা যে এই দাবি করে বছরের পর বছর ধরে নসরতের মতো আমার অন্যান্য বন্ধুরা যারা জেলা শহরের ঠিকাদার ছিলেন, তাদের কাছ থেকে বিপুল টাকা নিয়েছেন সেটা সত্য। আমার বেশ কয়েকজন বন্ধু যারা জেলা প্রশাসক ছিলেন তাঁরা হাড্ডিতে মজ্জায় সৎ মানুষ ছিলেন, আছেন। সেকারণে তাঁদের জীবন যাপন একেবারেই সাধারণ মানুষের মতো। তাঁরা কেউ কেউ ঠিক মতো বাজার করতে পারতেন না মাসের শেষ দিকে, তাই সন্ধ্যার পর কাওরান বাজারে বা নিউ মার্কেট কাঁচা বাজারে নীরবে গিয়ে কম দামে পচা গুড়া মাছ ও একেবারে ফেলে দেয়ার মতো তরকারিগুলো কিনে এনে ভাবিদের বলতেন, ‘চচ্চড়ি’ করে ফেলো, তাহলে গন্ধ থাকবে না।’ এই দলে যে দুয়েকজন আমলা বন্ধু ছিলেন তাঁদের মধ্যে বিখ্যাত লেখক অনুবাদক আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া একজন। তাঁকে খুব কাছ থেকে জানি। এমনকি তিনি উপসচিব থাকা কালেও বাজার থেকে পচা মাছ সন্ধ্যায় কিনে আনতেন আর ভাবির গালি খেতেন। কিন্তু আমার অধিকাংশ আমলা বন্ধুরা এই গোত্রের নন, দুচারজন ডঃ শেখ আবদুর রশীদের মতো রয়েছেন, কিন্তু সেই সংখ্যাটা একেবারে নগণ্য। আমার আমলা বন্ধুদের অধিকাংশ ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়েছে, যাদের শুধু একজনের বিএ পাশ করতে চার বছরে বিদেশে যে টাকা ব্যয় হয়, তা আমার কোন আমলা বন্ধুর সারা জীবনে পাওয়া বেতন ভাতাদির পরিমাণের চেয়ে বেশি। সুতরাংস আমলাদের সততা নিয়ে যে যাই বলুক, সেগুলোর দিকে কান দিতে নেই, অধিকাংশ আমলাই অসৎ, অনৈতিক এবং নিজেদের সম্পত্তি বিষয়ে বাকোয়াজি মিথ্যাচারে সিদ্ধ!

এর সঙ্গে রয়েছে বরিশালসহ সব জেলা শহরগুলোর সরকারি রাজনৈতিক দলের পাণ্ডাদের অত্যাচার। নসরতের পরিবার অনেক আগে থেকেই বর্ধিষ্ণু, ওঁর পিতা কলকাতায় ছাত্রাবস্তায় আমাদের দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের কয়েকজনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহপাঠী, তাই এই দৈনিক পত্রিকা চালাতে গিয়ে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিবারটি জড়িত থাকার কারণে আমলা ও রাজনীতিকদের চরিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারনা নসরতের রয়েছে। কিন্তু মৃদুভাষী নসরত এদের অর্থে আমাদের সমাজের ‘প্রতাপী’ মানুষদের চরিত্র বর্ণনায় খুব বেশি একটা ক্ষারযুক্ত তেতো ভাষা ব্যবহার করেন নি। কিন্তু যে-চিত্র তিনি আড্ডায় দিলেন, তাতে আমাদের সমাজের ক্ষমতাবান শ্রেণীর চরিত্র বিষয়ে অনেকটাই জানা হয়ে যায়।

আড্ডায় বরিশালের রাজনীতি, সংস্কৃতি ইত্যাদি নিয়ে কথা উঠতেই সেখানকার বইয়ের দোকান বিষয়ে কেউ কেউ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন। অভীক সোবহানের বড় বোন বরিশাল মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র হওয়ার কারণে স্কুলের ছাত্র অবস্থা থেকেই অভীক অনেকবার বরিশাল গিয়েছেন। সেখানকার একটি বইয়ের দোকান ‘প্যাপিরাস’ সম্পর্কে নসরত এবং অভীক খুব উচ্চ প্রশংসা করেন। এই বইয়ের দোকানটি কোন এক অজ্ঞাত কারণে কলকাতার একেবারে সমকালীন উৎকৃষ্ট লেখকদের বইপত্র রাখতেন। এসব বই তারা আমদানি করতেন এবং এক ধরনের ভালো লেখা বা সাহিত্যমূল্যের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বই তারা চিনতেন। এধরনের বইয়ের দোকানী বাংলাদেশে কম, বিশেষ করে জেলা শহরগুলোতে তো একেবারেই কম। সত্তর ও আশির দশকে, আজিজ মার্কেট হওয়ার আগে একমাত্র স্টেডিয়ামে ‘ম্যারিয়েটা’ই ছিলো ঢাকায় এধরনের বইয়ের দোকান। শুধু বই নয়, দুষ্প্রাপ্য ও মূল্যবান সাহিত্য পত্রিকাও তারা আমদানি করতেন কলকাতা থেকে। কী করে খুঁজে খুঁজে এসব দোকানের মালিক আনতেন তার রহস্য আমি পরে উদঘাটন করেছিলাম। আমার বন্ধু কবি সৈয়দ শহীদ এই ‘ম্যারিয়েটা’র দুষ্প্রাপ্য বই ও সাহিত্য পত্রিকা তালিকা করে দেয়ার একজন বিশেষ পরামর্শদাতা। এই দোকানের মালিক খালেদ সাহেব বার দুয়েক শহীদকে নিয়ে কলকাতা ও দিল্লী বই মেলাতেও গিয়েছেন। তাঁরা দুজন খুব ঘনিষ্ঠও ছিলেন। । ‘ম্যারিয়েটা’ ছাড়া নিউ মার্কেটে দুয়েকটা দোকানে এমন বই পাওয়া যেত। কিন্তু আশির দশকের গোঁড়ার দিকে বা মাঝামাঝিতে আজিজ সুপার মার্কেটে অনেক সংখ্যক বইয়ের দোকান হওয়ার পর দুষ্প্রাপ্য বই পাওয়া যায়। বিশেষ করে আমাদের বন্ধু বিজু খুব ছোট পরিসরে ‘পাঠক সমাবেশ’ আজিজ মার্কেটে গড়ে তোলার পর ঢাকার তরুণ লেখক শিল্পীরা সমকালীন কলকাতার ভালো বই ও লিটল ম্যাগাজিনগুলো সহজেই পেতে থাকেন। সত্যিকার অর্থে একটি সমাজের তরুণ লেখক সমাজের মনন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বইয়ের দোকানী বা আমদানি কারকদের শিক্ষা অনেকটা প্রভাব ফেলে নিঃসন্দেহে! নিউ মার্কেটের ‘মহিউদ্দিন’, ‘মল্লিক ব্রাদার্স’, ‘সাপ্লাই হাউজ’ নামক বইয়ের দোকানগুলো এক সময়ে সত্যিই বিদেশী সাহিত্যের ভাল বই আমদানি করতো। আড্ডায় মাযহার, অভীক, বদরুন, নসরত, আদনান সৈয়দ, বইয়ের কথা উঠতেই তাঁদের বইপ্রেমের বিশদ বিবরণ দেন। ঢাকা, কলকাতা ও নিউ ইয়র্কের পুরনো বইয়ের দোকানগুলো এঁরা সবাই তন্ন তন্ন করে ঘেটেছেন। আড্ডায় এই বই নিয়ে তক্কাতক্কি সত্যিই খুব উপভোগ্য ছিলো।

এরপর হঠাৎ আড্ডায় কথা ওঠে বাঙালি মুসলমানদের রাষ্ট্রসাধনা নিয়ে। সম্প্রতি সাংবাদিক-লেখক আলতাফ পারভেজ লিখিত একটি বই বেরিয়েছে সোহরোওয়ারদীর রাষ্ট্রসাধনা বিষয়ে। হোসেন শহীদ সোহরোওয়ারদীর রাজনীতি নিয়ে বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় খুব বেশি লেখা হয়নি, তবে মোটামুটি ভালোই লেখা হয়েছে। এর মধ্যে সোহরোওয়ারদী সাহেবের নিজের লেখা স্মৃতিকথা রয়েছে, অন্যান্য ইতিহাসবিদ লিখিত জীবনীও রয়েছে। খোদ বঙ্গবন্ধু লিখিত এই নেতার মূল্যায়ন রয়েছে। যদিও অবিভক্ত বাংলার এই অন্যতম শীর্ষ নেতা সম্পর্কে যেমনটা গবেষণা হওয়া উচিৎ তা হয়নি। নিজের আত্মজীবনীতে ডঃ কামাল হোসেন সোহরোওয়ারদী সম্পর্কে খুব মূল্যবান মূল্যায়ন করেন। আলতাফ পারভেজের বইটি এখনও আমার হাতে আসেনি, আমি পড়িনি। অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিকদের মধ্যে যে দুচারজন আমার ভীষণ কৌতূহলের বিষয় সোহরোওয়ারদী তাঁদের একজন। এই মেধাবী রাজনীতিবিদের ভাগ্য ইতিহাস খুব সুপ্রসন্নতার সঙ্গে দেখেনি। ১৯৩৭ সালের বাংলার নির্বাচনে মুসলিম লীগকে সংগঠিত করে ভাল ফল করার পেছনে তাঁর ভূমিকা অনেক বড়। কিন্তু চল্লিশের গোঁড়ায় যুদ্ধকালীন সময়ে ইংরেজদের সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে যে অগণিত মানুষের মৃত্যু ঘটে তার জন্য তৎকালীন সাপ্লাই মিনিস্টার সোহরোওয়ারদী সাহেব বদনামের ভাগীদার হয়েছেন। কিন্তু কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে সেই কোয়ালিশন সরকারের পর ‘৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিপুল বিজয়ের পেছনে আবুল হাশিম এবং তাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি। আর কে না জানে, ‘৪৬ সালের সেই নির্বাচনে মুসলিম লীগের জয় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে পাকিস্তান সৃষ্টির পথ সুগম করে দেয়। কিন্তু এই বাঙালি নেতারা প্রতিদানে নির্যাতনই পেয়েছেন পাকিস্তানি শাসক শ্রেণীর কাছ থেকে। কিন্তু তিনি যে পারিবারিক ঐতিহ্য ও শিক্ষা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন তাতে তাঁর পক্ষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মোসাহেব হওয়া সম্ভব হয় নি। অন্যদিকে খাজা নাজিমউদ্দিন জিন্নাহ ও লিয়াকত আলী খানের সঙ্গে সঙ্গে অনেক বেশি বাংলার স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণে সায় দেন। কিন্তু নির্বাচনের পর তিনি যখন মুখ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন মুসলিম লীগ ও জিন্নাহর ডাকে যে ‘ডাইরেকট একশন ডে’ পালিত হয়,বা এর ফলে যে হিন্দু-মুসলিম সহিংসতা ঘটে তার দায়ও সোহরোওয়ারদীর কাঁধে এসে পড়ে। নিজে সারা কলকাতা চষে বেরিয়েছেন খোলা জীপে দাঙ্গা থামানোর জন্য, কিন্তু তবুও মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ডাকে যে সংঘাত হয় সেই বদনাম তাকে বইতে হয়। সম্প্রতি, বিশেষ করে গত দুই আড়াই দশকে ক্যামব্রিজ-ইতিহাসবিদ জয়া চট্টোপাধ্যায় লিখিত সব নথি এবং তার ব্যাখ্যাসহ বইতে দেখা যায় ‘৪৬ সালের দাঙ্গার জন্য বেশি দায়ী উচ্চ বর্ণ হিন্দু জমিদার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা।

‘৪৭ সালে দেশভাগের পর সব প্রদেশে যারা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তাঁরাই স্বাধীন দেশে সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিশেবে বহাল থাকেন। কিন্তু একমাত্র পূর্ব বাংলায় সোহরোওয়ারদীকে ক্ষমতাচ্যুত করে খাজা নাজিমউদ্দিনকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়। শুধু তাই নয়, তাকে পূর্ব বাংলায় ঢুকতেও বাধা দেয় সে সময়ের নাজিমউদ্দিন সরকার। জীবনের সকল গচ্ছিত পারিবারিক সম্পদ ভারতে রেখে প্রায় এক বস্রে তিনি পাকিস্তান এসেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর আইন পেশার সনদ পেতেও পাকিস্তানে বেশ বাধার সৃষ্টি করে রাষ্ট্র। কিন্তু তিনিই পাকিস্তানকে সামরিক ও বেসামরিক আমলা ও ভূস্বামীদের হাত থেকে নিয়ে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিশেবে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র নীতিমালায় মার্কিন ও ইউরোপীয় দোসরদের পরামর্শে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেন। সম্ভবত তাঁর সারাজীবনের রাজনৈতিক অবদানগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় অবদান পাকিস্তান ১৯৫৬ সালে প্রথম একটি শাসনতন্ত্র উপহার দেয়া। স্বাধীনতার পর থেকে এই রাষ্ট্রটি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলী বা অন্যান্যদের নেতৃত্বে ১৯৩৫ সালের ‘India Act’ আইন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিলো। একটি স্বাধীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পরিচালিত হয়েছে দীর্ঘ নয় বছর নিজেদের কোন শাসনতন্ত্র ছাড়া। সেই শাসনতন্ত্র বিষয়ে অনেক আইনবিদ ও শাসনতান্ত্রিক পণ্ডিত কিছু ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জি ডব্লিউ চৌধুরী। মার্কিন এক বিখ্যাত প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশিত পাকিস্তানের শাসন্তান্ত্রিক ইতিহাসের সেই গ্রন্থ এখনও গুরুত্বপূর্ণ। এই বইটিতেই সোহরোওয়ারদী প্রণীত শাসনতন্ত্রের মূল্যবান ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই শাসনতন্ত্র পাকিস্তান গণপরিষদে গৃহীত হওয়ার মাত্র বছর আড়াইয়ের মধ্যেই রাষ্ট্রক্ষমতা যেহেতু সেনাবাহিনী কেড়ে নেয়, তাই বোঝা কঠিন নয় যে এই শাসনতন্ত্রের মাঝেও ‘ভাইমার শাসনতন্ত্রের’ মতো বড় রকমের ত্রুটি ছিলো। যদিও ‘ভাইমার শাসনতন্ত্রের’ মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে এসেই হিটলার দানবে পরিণত হয়েছিলো, কিন্তু পাকিস্তানে সেনাবাহিনী মধ্যরাতে বন্দুক দিয়ে ক্ষমতা কেড়ে নেয় নির্বাচন ছাড়াই! আমি নিজে মাঝে মাঝে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অদৃষ্ট নিয়ে ভাবি, আমাদের পাহাড়-সমান নেতৃত্ব ছিল, জীবনের প্রায় সবটুকু দিয়ে তিনি একটি দেশ অর্জন ও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু ও তাঁর ম্যানটর নেতা হোসেন শহীদ সোহরোওয়ারদী দুজনেই দুটি দেশের শাসনতন্ত্র নির্মাতা, এর সকল আইন ও দর্শনগত কলা তাঁদের দুজনেরই জানা ছিলো, কেন তবুও কেন তাঁদের প্রণীত শাসনতন্ত্রকে কাগজের মতো উড়িয়ে দিয়ে কয়েকজন বন্দুকধারী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে পারলো, সেটাই আমাকে ভাবায়।

সোহরোওয়ারদী সাহেব আমার প্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, কিছুটা অনুশোচনাও আমার রয়েছে। নিউ স্কুলে আমার প্রিয় শিক্ষকদের একজন ছিলেন ফয়সল দেবজী। অধ্যাপক দেবজী ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত খোজা সম্প্রদায়ের মানুষ। জন্মেছিলেন কেনিয়াতে, কিন্তু খুব ছোটবেলায় বাবা মায়ের সঙ্গে ক্যানাডায় মাইগ্রেট করেন। সেখানেই স্কুল কলেজের লেখাপড়া। ভারতীয় ইতিহাস, বিশেষ করে অবিভক্ত বাংলার ইতিহাস বিষয়ে অসাধারণ পণ্ডিত। কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমাকে একটু অতিরিক্ত স্নেহ করতেন। নিজের রুমে ডেকে নিয়ে কফি ও কুকিজের সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দিতেন। তিনি ছিলেন আমার চেয়ে বছর দশেকের বড়। ২০০৩ সালে সব কোর্স ওয়ার্ক শেষ হয়ে যাওয়ার পর আমার অভিসন্দর্ভের বিষয় নির্বাচন করবো, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমার বিষয় অর্থনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, নাকি রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, নাকি খুব জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক সমাজবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করবো। তাঁকে জানালাম আমি Political Sociology নিয়েই কাজ করবো। তাঁর মুখখানা খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি আমাকে বললেন, ‘একেবারে সময় নষ্ট না করে সোজা কলকাতা চলে যাও, কৃষক-প্রজা পার্টির শাসনকাল ও নীতিমালা নিয়ে কাজ করো। এবিষয়টা জটিল, কারণ ফজলুল হককে দোধারী তলোয়ারের নীচে কাজ করতে হয়েছে। একদিকে বর্ণ হিন্দু ও কংগ্রেস, অন্যদিকে ইংরেজ।’ কিন্তু আমার ফজলুল হককে নিয়ে গবেষণা করতে একেবারেই মন সায় দেয়নি। তখন তিনি বললেন, ‘তোমার মাত্র বছর দেড়েক কলকাতায়, দিল্লীতে ও লন্ডনে মহাফেজখানায় ফাইলগুলো পড়ে দেখাতে হবে। দেড় থেকে দুই বছরে গবেষণা শেষ হয়ে যাবে, সঙ্গে কিছু নথি পাবে সোহরোওয়ারদীর মুখ্যমন্ত্রিত্ব কালেরও। সেগুলো সংগ্রহ করে দ্বিতীয় আরেকটি বই লিখে ফেলতে পারবে।’ কিন্তু আমার যে সামান্য টাকা গবেষণা গ্রান্ট, তা দিয়ে কলকাতা, দিল্লী ও লন্ডনে বছর দুয়েক কাটানো সম্ভব নয়। তাই আমি নিউ ইয়র্ক ও দেশের বাইরে আরও দুয়েকটি মহাফেজখানা ঘেঁটে অভিসন্দর্ভ দাঁড় করাতে সক্ষম হবো। আমার আর অধ্যাপক দেবজীর পরামর্শ অনুযায়ী গবেষণা করা হয়নি। কিন্তু তিরিশ ও চল্লিশের দশকের সাহিত্যের মতোই বাংলার রাজনীতিও আমাকে সত্যিই খুব টানে। অধ্যাপক ফয়সাল দেবজী এর কিছুদিনের মধ্যেই নিউ স্কুল ছেড়ে অক্সফোর্ডে চলে যান। যাওয়ার দুদিন আগে আমাকে ডেকেছিলেন, কিছু বইপত্র দিলেন, নিউ স্কুলে তাঁর অফিস কক্ষ পরিষ্কার করছিলেন। বললেন, বাংলাদেশে যাওয়ার পথে বিলেতে যেন তাঁর আতিথ্য নেই। কিন্তু কোনদিন যাওয়া হয়নি, ফোনে কথা বলেছি বার কয়েক। অবিভক্ত বাংলার রাজনীতি নিয়ে কোন বই পড়লে বা আড্ডায় কথা উঠলেই আমার অধ্যাপক ফয়সাল দেবজীর মুখখানা এখনও খুব মনে পড়ে!

আড্ডায় মাযহার ও আমার মধ্যে বাংলার রাজনীতি নিয়ে, বিশেষ করে ‘৪৬ সালের নির্বাচনের পর সোহরোওয়ারদীর অতিরিক্ত ‘ক্ষমতাপ্রেম’ সম্পর্কে আমি একটু তেতো মন্তব্য করি। মাযহার ও আমার মধ্যে সোহরোওয়ারদী ও তাঁর সহকর্মী বা কলিগদের প্রতি আচরণ নিয়ে তক্কাতক্কি হয়। আমার আবুল হাসিম সাহেবের In Restrospection ও জয়া চট্টোপাধ্যায়ের একাধিক বোই পড়ে মনে হয়েছে, তিনি হয়তো আরেকটু বেশি কালেকটিভ সিদ্ধান্তের অনুরাগী হলে বাংলার মুসলমানদের রাষ্ট্রব্যবস্থাটা অন্য রকম হতে পারতো। তিনি ‘অনৈতিক’ ছিলেন তা হয়তো নয়, ওই স্তরের বা ওই মেধার রাজনীতিক, তাছাড়া যে পরিবার থেকে এসেছেন, সেটার তাঁর প্রয়োজন হয়নি। কন্তু ইতিহাসে নিজের অবস্থান পাকা করতে রাজনীতিকগণ কখনও কখনও এমন সিদ্ধান্ত নেন যা কিছুটা অনুদারতারও পরিচয় দেয়। মাযহার আমাকে সোহরোওয়ারদী সম্পর্কে আমার মূল্যায়নকে প্রতিবাদ করে বলেন, ‘আপনাদের একাডেমিক মানুষদের পক্ষে সমাজবাস্তবতাকে চিন্তায় না রাখা ভুল। সোহরোওয়ারদী পাকিস্তানের জন্য, পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য এবং তাঁর অনুসারী পুত্রবৎ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সৃষ্টির চিন্তায় প্রায় একই রকম আকাশচুম্বী পাহাড় কেটে জনভূমি তৈরি করেছেন।’

মাযহারের এই কথার মধ্যে কিছু সত্যতা রয়েছে, রাজনীতিবিদ, বিশেষ করে মহৎ রাজনীতিবিদদের প্রায় সবাইকেই তাত্ত্বিক ও ছাপা বইয়ের নিয়মাবলির বাইরে অসংখ্য বিবেচনাকে মাথায় রাখতে হয়। সোহরোওয়ারদী ও বঙ্গবন্ধু হয়তো সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যে দিয়েই রাষ্ট্রসাধনা করে গেছেন।

এরপর আড্ডায় এসব আইন ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ভারি বিষয় ছেড়ে আমরা সাহিত্যের দিকে চলে যাই। আড্ডায় একেবারে শেষের দিকে বদরুন নাহার একটি সুন্দর নিজের লেখা কবিতা পড়ে শোনান। আমি জানতামই না যে বদরুন অভীকের মতোই কবিতাও লেখেন। এরপর কবিতা পড়েন রওশন হক। সবশেষে শামস আল মমীন তাঁর সাম্প্রতিক কালে লেখা একটি কবিতা পড়ে শোনান।
রাত গভীর হয়, মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে, শৈবাল, নসরত, আদনান, অভীক, বদরুন, এবিএম সালেহউদ্দিন, মাযহার, মমীন ভাই ও রওশন হক সবাই বাড়ির দিকে রওয়ানা দেন।
আমি নীরবে গিয়ে টেবিলে নিজের কাজ নিয়ে বসি!

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30