ঢাকা ১৭ই জুন ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ ১৪৪৫ হিজরি

‘নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’র জার্নাল

redtimes.com,bd
প্রকাশিত মে ১৬, ২০২৪, ০১:৪৬ অপরাহ্ণ
‘নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা’র জার্নাল

আহমাদ মাযহার

প্রতিবছর ঢাকায় বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলায় যাই। বিচিত্র সামাজিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী মানুষের সঙ্গে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় কথা হয়। কয়েক বছর আগে বইমেলায় এক তরুণ প্রকাশকের সঙ্গে দেখা হলে বুঝলাম সে একদিকে ভীষণ ব্যস্ততা অন্যদিকে পেরেশানির মধ্যে আছে। জিজ্ঞাসা করলে সে অকপটে বলে দিল,
‘আর বইলেন না, আপনারে কইতে অসুবিধা নাই! আপনিও তো হেগো চিনেন! এক মুরগি লেখকের বই নিয়া ফাঁইসা আছি! না পারতেছি গিলতে না পারতেছি ছাড়তে!’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সমস্যা কী?’
‘এক লেখকের লগে আমার চুক্তি হইছে ৩০০ কপি এডভান্স কিন্না নিলে আমি গুছাইয়া গাছাইয়া বই বাইর কইরা দিমু। আমারও নয়া পাবলিকেশন। টাইটেল বাড়ানো দরকার! ভাবলাম, একটা টাইটেলও বাড়ব, আমার কিছু পুঞ্জিও যোগ হইব! মেলার সময় টেকার ফ্লো না হইলে কেমনে চালাই কন! টেকাটোকা লইয়া আর ব্যবসায় নামে কয়জন। এমনেই ত চলতাছে সব। লেখা আর ছাপার কামের এক্সপেরিয়েন্সই আমার পুঞ্জি। অহন এই মুরগি লেখক লইয়া গিট্টু পাকাইয়া গেছে সব। মাইনকার চিপায় পড়ছি!’
‘তোমার শর্তে রাজি না হইলে তো আর তুমি কাম লইতা না!’ আমি বললাম।
‘সমস্যা ত ঐখানেই! আমি কইছি পাণ্ডুলিপি ঠিক ঠাক মতো গুছাইয়া দিলে ১৫ দিনের মইধ্যে বাইর কইরা দিমু! কিন্তু পাণ্ডুলিপি গুছানো মানে যে কী তা তো আর এই মুরগি লেখক বুঝে না! এক পাণ্ডুলিপির লাভের লোভে আমার চাইরটা বই আটকাইয়া যাইতাছে!’
তার সঙ্গে আলাপ থেকে বুঝলাম, বই পাণ্ডুলিপি প্রেস ছাপা বাঁধাই ও সময়ের সমন্বয় করে উঠতে পারছে না! মুরগি লেখকের তো এই বোধ নেই যে, এলোমেলো একটা ওয়ার্ড ফাইল দেয়া মানেই পাণ্ডুলিপি দেয়া নয়; তিনি বোঝেন না একই পাণ্ডুলিপিতে একটি শব্দের বানান যে বিভিন্ন রকম হলে চলে না। পদে পদে বাক্য গঠনের অসঙ্গতি দূর না হলে যে বই পাঠযোগ্য হবে না তা বোঝেন না এই মুরগি লেখক। তদুপরি একটা বইয়ের কাজ যত সাদামাঠাই হোক না কেন অনেক জটিল বিষয় বইয়ের কাজে থাকে! ধারাবাহিকভাবে চর্চায় না থাকলে এসব ঠিক মতো বোঝাও যায় না!
তরুণ সেই প্রকাশকটি আরো বললেন, ‘ কী কমু ভাই, এই মুরগি লেখকদের দৌরাত্ম্যে রেগুলার লেখকেরাও আজকাল ঝামেলা করে!’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সেটা কী রকম?’
মুরগি লেখকরা অনেক সময় নানান সিস্টেমে বই বিক্রি কইরাও দেয়! আরে বিক্রি মানে গছাইয়া দেওন আর কি! কিন্তু আসল লেখকেরা ত বই লেইখ্যাই খালাস। বেচা হইল কি হইল না সেইটা তারা দেখতে চায় না! এইটা তাগো লেখক ইগো। কিন্তু ঐ মুরগি লেখকের ত সেইটা নাই! এগো প্রচারণার তোড়ে কম চলা বইয়ের সাধারণ লেখকেরা হীনম্মন্যতায় ভুইগা প্রকাশকদের উপ্রে নানান দাবি লইয়া চড়াও হয়।’
জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার সমস্যা কী?’
‘আমার সমস্যা হইল, এখন তার কাছে আমেরিকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা! কে আমেরিকায় যাইব তার কাছে লাগেজ পৌঁছাও। এখন কয় পৌঁছানোর খরচও আমার দিতে হইব। তার যুক্তি, ক্লায়েন্টের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পাবলিশারের দায়িত্ব। কন ত দেখি আমার লাভের গুড় পিঁপড়ায় খাইব না?’
বুঝলাম, আমেরিকায় থাকা মুরগি লেখকটি সেলফ পাবলিশিং টাইপের কাজ হিসেবে ধরে বসে আছেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় তো লেখকের টাকায় বই বের হওয়া মানে পুরোপুরি আমেরিকার সেলফ পাবলিশিং নয়!
আমি যে তরুণ প্রকাশকের সঙ্গে লেখক যশোপ্রার্থী মানে মুরগি লেখকের যে সমস্যার কথা শুনছি অন্য প্রকাশকের সঙ্গে হয়তো অন্য মুরগি লেখকের সমস্যার ধরন হবে আরেক রকম! কিন্তু সর্ব অর্থেই সাধারণ লেখকদের সংকটের কারণ হন তাঁরা। সাধারণ লেখকেরা সঙ্গত কারণেই মনে করেন বইয়ের প্রকাশনার সবগুলো স্তর ও লেখকের রয়্যালটি সবকিছুতেই প্রকাশকের দায়। লেখকের কাজ ঠিকঠাক মতো পাণ্ডুলিপিটা দিয়ে দেয়া। মুরগি লেখকের তো বই প্রকাশ হলেই চলে! তাঁর দরকার প্রকাশিত বইয়ের নামটা। তাঁর তো পাঠক না পেলেও চলে, কোনোরকমে পরিচিতজনের কাছে গছিয়ে টাকা ওঠানো গেলে আরো ভালো। জনান্তিকে কারো কারো কাছে শুনেছি এইসব লেখকের দৌরাত্ম্যের কবলে পড়ার ভয়ে তাঁরা নাকি বইমেলাতেই যান না!
যেসব দেশে পুস্তক প্রকাশনার বাজার পেশাদারিত্বে উন্নত তথা বাজারের দিক থেকে বড় সেসব দেশেও নানা ধরনের সেল্ফ পাবলিশিং হাউস আছে। লেখকেরও, মানে সেল্ফ পাবলিশড অথরেরও জানা থাকে যে সচরাচর তার বই খেলায় মূল অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে থাকলেও তার অংশগ্রহণ অনানুষ্ঠানিক; তথা দুধভাত। কিন্তু এই সব দেশে দুধভাতের ব্যবসার জন্যও জনগণের করের টাকা বরাদ্দ আছে। সে কারণে সেল্ফ পাবলিশিং কোম্পানির মতো আছে ভ্যানিটি পাবলিশার, আছে স্মল প্রেস। আছে বিভিন্ন ফিলানথ্রপির দ্বারা ফান্ডেড পাবলিশিং হাউস। কিন্তু সে ফান্ডের অর্থ বরাদ্দ পেতে হলে অনেক রকম পেশাদারি রাষ্ট্রাচারের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে হয়। এই পদ্ধতিতেও জনপ্রিয় তথা মূলধারার লেখক হওয়া যে একেবারে অসম্ভব তা নয়। কিন্তু তার দৃষ্টান্ত খুবই বিরল ব্যাপার! তার জন্যও কিছু পেশাদারি প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে সেলফ পাবলিশড অথর আর সাধারণ লেখকের যোগ্যতার পার্থক্য সাধারণত বোঝা যায় না!
বাংলাদেশের প্রকাশকদের অনেকেই নিউ ইয়র্কের বইমেলায় আসেন মুরগি বা মোরগা লেখক শিকারের জন্য! পরোক্ষে নিউ ইয়র্কের এই বইমেলা বাংলাদেশের প্রকাশনায় পুঁজির যোগান দিয়েও ভালো ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের পুস্তক প্রকাশনা খাত যেহেতু আনুষ্ঠানিক নয় সেহেতু এর বাজারের আকার জানা নেই। সুতরাং এই ভূমিকা গোটা বইয়ের বাজারের শতকরা কত অংশ তা জানা সম্ভব নয়! তবে যেসব প্রকাশক এখানে আসেন তাঁরা মুরগি বা মোরগা লেখকদের আতিথেয়তায় আমেরিকায় অবস্থানের কালটা নির্ব্যয়ের বা স্বল্প ব্যয়ের হয়ে থাকে! একই সঙ্গে মুরগি বা মোরগা লেখকদের এই ভূমিকা ইতি ও নেতি উভয়বাচক! কারণ বিপুল সংখ্যায় মুরগি বা মোরগা লেখক এই প্রক্রিয়ায় বই প্রকাশ করে নিজেদের প্রকৃত লেখকেরই ভূমিকাময় আচরণ করতে থাকেন। ক্ষুদ্র অভিবাসী জনসমাজে যেভাবে তাঁরা নিজের বই প্রকাশনাকে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন তার চেয়ে কম অর্থব্যয়ে একই ভাবে নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করে নিজেদের লেখক পরিচয়ও অর্জন করে নিতে পারেন।
এক সময় তরুণ তথা নবীন লেখকেরা নিজেদের বই নিজ অর্থে প্রকাশ করে রসিকদের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য অপেক্ষা করতেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা অপেক্ষা করতেন বিনীত হয়ে। আর এখন তাঁরাই দাপটের সঙ্গে এক দিকে পরিচিতদের কাছে জোর করে নিজেদের বই গছিয়ে দেন অন্যদিকে অর্থব্যয়ের মাধ্যমে নিজেদের মুরগি বা মোরগাত্ব প্রমাণকারী লেখক হিসেবে সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জন করেন! তবে এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ট্র্যাজেডি হলো, কোনো কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখক এই মুরগি বা মোরগা লেখকদের মেকি সামাজিক প্রতিষ্ঠা দেয়ার প্রক্রিয়ায় নিজেদের সময় ব্যয় করে থাকেন। তাঁদের শঙ্কা, তা না হলে সমাজে তাঁদেরকে অপরিচয়ের আড়ালে চলে যেতে হতে পারে। অনেকে আবার এই আড়ালবাসী হবার বেদনা হজম করতে না পেরে মুরগি বা মোরগা লেখকের সহযোগী হয়ে থাকেন। তাতে তা়ঁদের লাভ এই,–দুএকটা সংবর্ধনা বা সম্মাননা পেয়ে নিজেদের অস্তিত্ব অনুভব করা!
এবারের নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশকদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটতে চলেছে। ফলে অনেক ভালো লেখকের ভালো বইও এখানে পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। নিউ ইয়র্কবাসী তথা আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাঁরা বইমেলায় আসবেন তাঁরা কতটা এই মুরগি বা মোরগা লেখকদের অতিক্রম করে নিজের পছন্দনীয় প্রকৃত বইয়ের কাছে পৌঁছতে পারবেন সেটাই দেখবার বিষয়!

১৫ মে ২০২৪

সংবাদটি শেয়ার করুন

June 2024
S M T W T F S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
30