নিজের কাছে সুখ সন্ধান

প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২০

নিজের কাছে সুখ সন্ধান

মীর আব্দুল আলীম :
সুখটা খুঁজে পেতে চুলকানী এলার্জি আছে কারো কারো। এখানে সুখ, ওখানে সুখ,
খুঁজে ফিরেন কেবল। সুখের দেখা মিলে না। সুখটা কি তা কি বোঝেন? সুখটাতো
নিজের কাছে। নিজের সুখ নিজেকেই পেতে হয়। ধরুন গুলিস্তানের ফুটপা্ত থেকে
দু’শ টাকায় কেনা জামায় আপনি বেশ সাচ্ছন্দ বোধ করছেন। মনে মনে ভাবছেন, বেশ
লাগছে আপনাকে। সবাই আপনাকে ফলো করছে। সুখটা পেয়ে গেলেন। আবার যদি মনে
করেন ফুটপা্তের জামা কি বিশ্রীইনা লাগছে আপনাকে। অ ন্দর্যের চুলকানী শুরু
হলো আপনার মনে। এমন জামায় সুখ নেই; এমন ভাবনা থেকে মনোঅসুস্থ্যতায় ভোগছেন
আপনি। এমন হলে সুখটা খুঁজে দিবে কে আপনাকে?
ধরুন আমি যখন পুরনো গাড়িটা চেপে কোথাও যাচ্ছি। সড়কে অসংখ্য দামি গাড়ি
দেখে আমার অ-সুখের চুলকানি শুরু হয়ে গেলো। অমন গাড়ি যদি একটা আমার থাকতো।
আবার আমি যদি ভাবি- ‘এই আমি আলীম গাড়ি চড়ছি! গাড়িতো আমার চড়া কথা নয়।
সৃষ্টিকর্তা আমায় একটা প্রাইভেট গাড়ি চড়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। এইতো বেশ।
অন্যের গাড়ি নাই, আমার আছে। আবার যদি ভাবেন, হেঁটে যাওয়া মানুষটা কতনা
কষ্টে হেঁটে পথ চলছে। রিক্সায় চড়া মানুষটারতো আমার মত প্রাইভেট নেই।
গণপরিবহনে হাজার হাজার মানুষ কতনা কষ্টে গন্তব্যে যাচ্ছেন। আমি প্রাইভেটে
চড়ছি এসির বাসাত গায়ে লাগিয়ে। আলহামদুলিল্লাহ। এমন ভাবনা থেকে আমিতো
সুখী; মহা সুখী মানুষ আমি। আমার চেয়ে এতো সুখ কার আছে? বলেছি না সুখটা
আমার কাছে। আমার সুখ আমার কাছে; আপনারটা আপনার।
আবার ধরুন রাজধানী ঢাকার রিক্সাওয়ালাটা ভাবছেন। আমি কতনা অসুখী। সকাল-রাত
রিক্সায় পেডেল মারি। যা পাই তাতে সংসার চলেনা। মাত্র দু’বেলা খাবার জোটে।
আমার চেয়ে অসুখী মানুষকি আর ক’টা আছে এই শহরে? এই রিক্সাওয়ালা ভাইটাই যদি
ভাবেন- ‘ঐ যে পথে গড়িয়ে গড়িয়ে লোকটা ভিক্ষা করছেন। তাঁর একটা হাত আছে,
দু’টা পা নেই। কত কষ্টেইনা আছেন বেচারা। আমার দু’টা হাতা আছে. দু’টা পা
আছে। আমি কামাই রোজগার করতে পারছি। ঢাকার মতো জায়গায় থাকি; হোকনা সেটা
রাস্তার ধার। আমি মহা সুখে আছি। ওদের চেয়েও আনেক সুখী। এমন ভাবনা থেকে ঐ
রিক্সাওয়ালার চেয়ে সুখী কে আর আছে বলেন?
সুখটা সত্যিই নিজের কাছে। সুখটা কেবল খুঁেজ, কুঁড়িয়ে নিতে পারলেই আপনি
মহা সুখী। অন্যটা করলেই অ-সুখের মহা চুলকানীতে সুখপাখিটা উড়াল মারে
আকাশে। আপনি কারো কাছে প্রত্যাশা করছেন। তাঁর কাছে প্রত্যাশা করার অধিকার
আছে আপনার। আপনি যেমন ভাবছেন, তেমনটাই করবেন আপনার প্রিয় মানুষটি তাইতো
ভাবছেন আপনি। এমনটি কিন্তু নাও হতে পারে। আপনাকে সে মানিয়ে নাও চলতে
পারে। তাহলে কি ঝগড়া করবেন? পাড়া সুদ্ধ উদ্ধার করবেন? লোক জড় করবেন,বিচার
চাইবেন? তাতে কি সুখ পাবেন আপনি? মিলবে অ-সুখ (সুখের উল্টোটা)। পাড়ার
লোকেরা কিন্ত বলবেন- ‘ঐ যে জোহরা ভাবি ওনার সংসারে না সুখ নাই। পোলার
বউটা কথা শোনে না। সংসারের দিকে তাকিয়েও চায় না।’ বউ মানুষতো বয়স আর কত?
নাই চাইতে পারে। বুঝ শত্কি কম হতে পারে। মুরব্বিটার কষ্ট হয়তো বুঝে না
সে। সবারতো আর সমান বুঝ দিয়ে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টি করেননি। আবার সবাই
শিখালে শিখেও না। সুখটা যেমন নিজের কাছে শিক্ষাটাও তেমন নিজের কাছেই
থাকে। সব কিছু শিখতে হয়, বুঝতে হয়। মুরব্বিদের (বয়জেষ্ঠদের) কথা মানতে
হয়। তাঁদের মানিয়ে চলতে হয়। ছোটদের কাছে বড়দের প্রত্যাশাতো অনেক থাকে।
এটা ক’জনইবা বোঝেন। যারা বোঝেন না, তাঁরা সুখ পাননা। তাঁরা অ-সুখী। আবার
মুরব্বিটা যদি প্রত্যাশায় আশাহত হয়ে হায়হুতাশ করে বেড়ান তাতে কি সুখ আসে?
আবারও বলছি সুখটাতো আপনার কাছে। কেবল খুঁজে খুঁজে সুখটা পেতে হয়। জোহরা
ভাবীর প্রত্যাশায় গুঁড়ে বালি হউক না তাতে কি? বউটা না হয় ভাবী মনের কথা
বুঝলইনা। তাই বলে কি অ-সুখের জ¦ালায় অসুস্থ্য হয়ে যাবেন ভাবী আমার।
মানিয়েই পথ চলতে হয়। আপোস করে, ঠকে চলতে শিখলে কেউ ঠকেনা। বুঝিয়ে, ধর্য্য
ধরে সংসারের সুখ রক্ষা করতে হয়। সুখের জন্য তা করতে হবেই। আমরাতো মানুষ।
পশুতো নই। পশুরাও কিন্তুা মানব ভক্ত হয়; পোষ মানে। তাহলে সৃষ্টির সেরা
মানুষ হবে না কেন? ভাল বেসেই সব জয় করতে হয়। ধমক দিয়ে নয়। বিচার সালিশ
সুখ আনতে পারে না। আনে স্থায়ী অ-সুখ। সুখ চাইলেও তখন সুখ পাখীর দেখা
মিলবে না।
অনেকের নাই-নাই; খাই-খাই ভাব আছে। ছাড়তে হবে এ স্বভাব। বলেনা অভাবে নাকি
স্বভাব নষ্ট হয়। কথাটা সত্য নয়। আমার বাসায় যিনি থাকেন খালারও বড় অভাবী
মানুষ। আমাদের কাছ থেকে যা পান; ওকে-তাকে দিয়েই তিনি সুখ পান। হাতে থাকে
না কিছুই। অভাব আর অভাব। স্বামী নাই, সন্তান নাই, বয়সও নাই, টাকা কড়িও
নাই। তবুও খালা মহাসুখী। খুব খুশি। চাওয়া পাওয়া নাই। কিছু কিনে দিলে
বলেন- ‘খালু সব সময় বিদেশ গেলে কিছু আনতে অইবো এমন কতা আছে? আমারতো সবই
আছে।’ এমন কথায় মন জুড়িয়ে যায়। তাঁর নাকি সব আছে। যিনি এমনটা ভাবেন
তিনিইতো সুখী। কেউ বাসায় এলে যদি পরিচয় করিয়ে দিই ওনি আমার খালা। খালা
আমার অনেক খুশি তাতে। অভাবে স্বভাব নষ্টের কথা বলছিলাম। অভাবি এই মানুষটা
৮ বছর ধরে আমাদের সাথে আছেন। এখনকার কুটো, সেখানেও নড়াননি তিনি। স্ত্রীকে
বলতে- “দেহেন খালা আপনের কিছু হারাইছেনি।” না তো কিছু হারায়নিতো? তখন
বলতেন- ‘গলায় হাত দিয়া দেহেন’। গলার স্বর্ণের চেনটা খুলে পড়ে গেছে কোথাও।
তখন চেইনটা হতে দিয়ে খালা বলতেন-‘এই লন, দামী জিনিস দেখইক্কা রাইক্কেন’।
অভাবী মানুষ খালা। স্বভাব কি তার অভাবে নষ্ট হয়েছে? না, অভাবে স্বভাব
নষ্ট হয়না কখনো।
আরেক জনকে চিনি জানি আমি। রাজধানী ঢাকার নিকটের মস্ত ব্যবসায়ী। রাজধানীতে
বড় ফ্লাটে থাকেন। লোক লস্কও অনেক। টাকা-কড়ি, গাড়ি-বাড়ির অভাব নেই। তবুও
তিনি অভাবি। এটা তার স্বভাব। সব জায়গায় হাত মারেন। ছাই-ছেতার ব্যবসাও
(ঝামেলার ব্যবসা) করতে বাদ দেন না। যা আসে আসুক না, যেভাবে আসে আসুক।
বেচারা এমন থিউরিতেই চলেন। সম্মানহানী হয় তাতে কি? টাকা বলেতো কথা? টাকার
জন্য বড্ড অভাবি মানুষ তিনি। টাকার জন্য মাহাশয় আপন-পর ভুলে যান। কারো
পেটে লাথি মারতেও দ্বিধা করেন না। ভাবেসাবে মনে হয় টাকা তাঁর ভগবান। টাকা
আছে অঢেল; তবুও লোকটা টাকা খোঁজেন যেনতেন জায়গায়। স্বভাবটা কি নষ্ট অভাবে
তার? অভাবে স্বভাব নষ্ট হয় না।
পরিশেষে বলবে, অস্বাভাবিক মানুষিকতাই মানুষের স্বভাব নষ্ট কওে, অভাব নয়।
আর সুখটা কেউ কাউকে দেয়না। দিতেও পারে না কেউ। সুখটা খুঁজে নিতে হয়। আমার
সুখটাতো থাকে আমার কাছে; আর আপনার সুখ আপনার কাছে। আসুন সবাই নিজের কাছেই
সুখ সন্ধান করি। সুখে থাকি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও গবেষক।

ছড়িয়ে দিন