নির্বাচনী ইশতেহার ও আদিবাসীদের অধিকার

প্রকাশিত: ৪:২৮ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২০, ২০১৭

নির্বাচনী ইশতেহার ও আদিবাসীদের অধিকার


রোবায়েত ফেরদৌস

নির্বাচনী ইশতেহার জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের পবিত্র ওয়াদা, যার মর্মার্থ এই যে, ক্ষমতায় গেলে তারা সেই ইশতেহার অনুযায়ী জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্র“তি পালন করবেন। এ লেখায় আমরা মিলিয়ে দেখবো, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আদিবাসী ইস্যুতে তাদের দেওয়া ওয়াদা তারা কতোটা পালন করেছেন বা করেন নি। নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মহাজোট ৬ জানুয়ারি ২০০৯ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আদিবাসী অধিকার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কতিপয় পদে নিয়োগদান করেন যেমন- পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দীপঙ্কর তালুকদারকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক পদে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরাীকে, প্রত্যাগত পাহাড়ী শরণার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত পুনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদে সাংসদ যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে সাংসদ বীর বাহাদুর উশৈসিংকে ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি খাদেমুল ইসলামকে; এর বাইরে একটি ব্রিগেডসহ ৩৫টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে কেবল ২৭ টি আদিবাসী জাতির নাম রয়েছে, বাকিরা বাদ পড়েছে; ফলে ভর্তি, চাকরির কোটা এবং অন্যান্য সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। তবে আদিবাসীরা তাদের জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শব্দের ব্যবহার মানতে নারাজ। এছাড়া বাজেটে পৃথকভাবে “গারো সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন” শিরোনামে সমতলের কয়েকটি উপজেলায় (মাত্র ৪টি জেলার ৬টি উপজেলা) আয়বর্ধক প্রকল্প নেয়া হয়েছে; তবে সব মিলিয়ে আদিবাসীদের অধিকার বাস্তবায়নের যে বিশাল ক্যানভাস সেখানে লক্ষযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে কিছুটা আশা সঞ্চার হয়েছে এই কারণে যে, আদিবাসী নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার সাথে উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভির বেশ কয়েকবারের বৈঠক এবং তারই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক এবং সর্বশেষ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির ৪র্থ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকার আদিবাসী অধিকারের বাস্তবায়ন সংক্রান্ত ইশতেহারে প্রদত্ত সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়িত না হলে সমাজ ও রাষ্ট্রে এর সুদূর প্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমরা মনে করছি। আদিবাসী অধিকার ও তাদের উন্নয়নে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্র“তি কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছি বা হয়নি এ লেখায় তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, অনুন্নত সম্প্রদায় ও অনগ্রসর অঞ্চল’ শিরোনামের ১৮ নং অনুচ্ছেদে আদিবাসী জন্য কিছু প্রতিশ্র“তি দেওয়া হয়েছিল; ক) উপঅনুচ্ছেদ ১৮.১-এ বলা হয়েছে: ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, আদিবাসী ও চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লংঘনের চির অবসান, তাদের জীবন, সম্পদ, সম্ভ্রম, মান-মর্যাদার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃ-জাতিগোষ্ঠী এবং দলিতদের প্রতি বৈষম্যমূলক সকল প্রকার আইন ও অন্যান্য ব্যবস্থার অবসান করা হবে। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। খ) উপঅনুচ্ছেদ ১৮.২-এ বলা হয়েছে: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। অনগ্রসর অঞ্চলসমূহের উন্নয়নে বর্ধিত উদ্যোগ, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, আদিবাসী ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও জীবনধারার স্বাতন্ত্র সংরক্ষণ ও তাদের সুষম উন্নয়নের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।’ (সূত্র: নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ)

এক. ‘উপজাতি’র মতো অবমাননাকর শব্দ: নির্বাচনী ইশতেহারে সম্মানের সঙ্গে খুব স্পষ্ট করে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে এবং কোথাও ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী বাস করেন এবং তাদের কাছে সবচেয়ে অবমাননাকর শব্দ হচ্ছে ‘উপজাতি’; আদিবাসীদের কাছে এটি ‘বাতিল’, ‘পশ্চাৎপদ’ ও ‘পরিত্যাজ্য’ একটি শব্দ। সংবিধানে উপজাতি হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে তাদেরেকে অপমান করা হয়েছে; উপরন্তু বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালী ছাড়াও অপরাপর জাতির পরিচয়কে তুলে ধরতে যেয়ে সংবিধানের ২৩ (ক) ধারায় একইসঙ্গে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী, সম্প্রদায় ইত্যাদি বিভিন্ন অভিধা ব্যবহার করা হয়েছে – যা নিতান্তই হাস্যকর এবং এগুলোর স্পষ্ট কোনো সংজ্ঞায়ন সংবিধানে নেই। এর মধ্য দিয়ে আদিবাসী পরিচয় নির্মানে পবিত্র (?) সংবিধানে এক ধরনের দ্বিধা আর তালগোল পাকানো হয়েছে।

দুই. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির úূর্ণ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন ছিল ইশতেহারের অঙ্গীকার। চুক্তি কতোটা বাস্তবায়িত হয়েছে এ নিয়ে প্রথম আলো ৯ নভেম্বর ২০১২ একটি রিপোর্ট করে; এতে বলা হয়: ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ইতিমধ্যে ৪৮টির পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে দাবি করেছেন সংসদ উপনেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারও একই দাবি করেছেন। সরকারের চারটি মন্ত্রণালয়ের অধীন কয়েকটি জেলা কার্যালয় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে ওই দাবি করেন তাঁরা। জাতীয় সংসদ ভবনের পশ্চিম ব্লকের কেবিনেট কক্ষে ৮ নভেম্বর ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সরকারের আরও কয়েকটি দপ্তর জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সাজেদা চৌধুরী বলেন, পার্বত্য চুক্তির ৭২টি ধারার অধিকাংশ ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি ধারা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে। অবশিষ্ট ধারাগুলো বাস্তবায়নে জরুরিভাবে কাজ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন, ৪৮টি ধারার বাস্তবায়ন চুক্তিটির পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন। তিনি এ ধরনের বিষয়ে ভারতসহ কয়েকটি দেশে সম্পাদিত কতিপয় চুক্তির উল্লেখ করে বলেন, ‘সেগুলোর তুলনায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নে আমরা এগিয়ে আছি। সরকারের ওই দাবি সম্পর্কে চুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন পক্ষ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁরা বলেন, চুক্তির যে তিন-চারটি মৌলিক বিষয় বাস্তবায়িত হলে সম্পূর্ণ চুক্তিটিই বাস্তবায়িত হয়েছে বলে সবার মনে হতো, তার একটিও এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিবিরোধ নিরসন এবং জুম্ম শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন। আঞ্চলিক পরিষদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কার্যকর করা। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে যথাযথ দায়িত্ব ও ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এখনও আঞ্চলিক পরিষদ বিধিমালা প্রণয়ন হয়নি। আঞ্চলিক ও জেলা পরিষদের নির্বাচন করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী তিন জেলার অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পও সরিয়ে নেওয়া হয়নি। ১৯৮৯ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ আইন এবং ১৯৯৭ সালের চুক্তি অনুযায়ী স্থানীয় পর্যায়ের প্রতি জেলায় ৩৩টি সরকারি দপ্তর জেলা পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায় হস্তান্তর করার কথা। এই প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত রাঙামাটি জেলা পরিষদের কাছে ২৩টি, খাগড়াছড়ির কাছে ২২ ও বান্দরবানের কাছে ২১টি দপ্তর হস্তান্তর করা হয়েছে; (প্রথম আলো, ৯ নভেম্বর, ২০১২) অন্যদিকে জনসংহতি সমিতির বক্তব্য হচ্ছে, বিগত বছরগুলোতে মৌলিক কোনো অগ্রগতি হয়নি। কয়েকটি কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন করেছে সরকার। কিন্তু ভূমি কমিশন কার্যকর করা থেকে শুরু করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি। অন্যদিকে, সেনানিবাস সম্প্রসারণ, ইকো-পার্ক ও পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন, অস্থানীয়দের নিকট জমি ইজারা প্রদান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা ইত্যাদির নামে জুমজমিসহ জুম্মদের রেকর্ডীয় ও ভোগদখলীয় জায়গা-জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে জুম্ম উচ্ছেদ প্রক্রিয়া জোরদার হয়েছে। পাহাড়ি আদিবাসীদের আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না নিয়ে তাদের মতামতের বিপরীতে ভূমি জরিপ ঘোষণা, সামাজিক বনায়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ইত্যাদি চুক্তিবিরোধী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে। (পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন প্রসঙ্গ, ২ ডিসেম্বর ২০১০, জনসংহতি সমিতি)। যদি পার্বত্য চুক্তি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে হয়, তবে পাহাড়ী অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থা প্রণয়ন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ শক্তিশালী ও কার্যকর করা, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ শক্তিশালী ও কার্যকর করা, ভূমি কমিশন কার্যকর করা (আইন সংশোধনসহ), অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার, প্রত্যাগত শরণার্থী পুনর্বাসন, আভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসনসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। সরকারের শেষ সময়ে এসে বলা যায়, এসবের কোনোটিই যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

তিন. ভূমি সমস্যার কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান: ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘আদিবাসীদের জমি, জলাধার এবং বন এলাকায় সনাতনি অধিকার সংরক্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণসহ ভূমি কমিশন গঠন করা হবে।’ পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার অন্যতম দিক হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সমস্যা সমাধানের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম বিধান হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত আইন, রীতি ও পদ্ধতি মোতাবেক অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির বিধান করা। উক্ত বিধান অনুসারে ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০০১ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন প্রণীত হলেও উক্ত আইনে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সাথে অনেক বিরোধাত্মক ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভূমি কমিশন আইনের উক্ত বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনের জন্য ৭ মে ২০০৯ পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের তরফ থেকে সরকারের নিকট সংশোধনী প্রস্তাব প্রেরণ করা হয়। উক্ত সংশোধনী প্রস্তাবের উপর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ে বিভিন্ন স্তরে কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১০ অক্টোবর ২০১০ রাঙ্গামাটিতে ভূমি মন্ত্রীর সভাপতিত্বে রাঙ্গামাটিতে অনুষ্ঠিত উচ্চ পর্যায়ের আন্ত:মন্ত্রণালয় এক সভায় সর্বসম্মাতিক্রমে মতৈক্য হয় যে, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ শুরু করার আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১-এর ২৩টি বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন করা হবে। এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ীই পার্বত্যাঞ্চলের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে বলে প্রধানমন্ত্রী দিক নির্দেশনাও প্রদান করেছিলেন (প্রথম আলো, ২২ অক্টোবর ২০১০)। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধিদলের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক আঞ্চলিক পরিষদের প্রস্তাবিত সংশোধনীসমূহ যাচাইবাছাই পূর্বক ১৩-দফা সম্বলিত সংশোধনী প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয় এবং এসব প্রস্তাবাবলী বিল আকারে প্রস্তুত করে মন্ত্রী সভা ও জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য ২০ জুন ২০১১ ভূমি মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। তারই আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উপরোক্ত প্রস্তাবিত ১৩-দফা সংশোধনী মোতাবেক জাতীয় সংসদে সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের উপরোক্ত সংশোধনী প্রস্তাবসমূহ জাতীয় সংসদে উত্থাপনের জন্য আজ অবধি সরকারের কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে চরম হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছে। একদিকে পার্বত্য জেলা পরিষদে ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা বিষয়টি হস্তান্তর না করা এবং অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন-২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারা সংশোধনের কাজ বছরের পর বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মোতাবেক ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনসহ ভূমি কমিশনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করার বিষয়টি এখনো চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বিরাজ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। এ সমস্যা সমাধানে যতই কালক্ষেপণ করা হবে ততই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা জটিল থেকে জটিলতর হবে। প্রসঙ্গত: উল্লেখ্য যে, পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের ভূমি সংক্রান্ত ৬৪ ধারা কার্যকর করার পরিবর্তে বাতিল করার জন্য তিন পার্বত্য জেলার জেলা প্রশাসক কর্তৃক জেলা প্রশাসকদের প্রত্যেক সম্মেলনে উত্থাপন করা হয়। আরো অধিকতর উদ্বেগের বিষয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির তৃতীয় সভায় (খাগড়াছড়িতে ২৬ ডিসেম্বর ২০১০ অনুষ্ঠিত) ভূমি কমিশনের বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত হলেও উক্ত সিদ্ধান্তকে লঙ্ঘন করে এবং সর্বোপরি পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারাসমূহ সংশোধনের পূর্বে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান কর্তৃক গত ২৮-২৯ ফেব্র“য়ারি ২০১২ একতরফা ও বিধি-বহির্ভূতভাবে ভূমি-বিরোধ নিষ্পত্তির মামলাগুলোর শুনানির চেষ্টা চালানো হয়। এতে করে পার্বত্য চট্টগ্রামে চরম প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ভূমি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারা সংশোধন না করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম শুরু করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার ক্ষেত্রে আরেক জটিলতা সৃষ্টি হতে বাধ্য। ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যানের এরূপ স্বেচ্ছাচারী কার্যক্রম বন্ধ করা সম্ভব না হলে এ নিয়ে আরেক সংকট তৈরি হবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এক্ষেত্রে ভূমি কমিশনের কাজ যথাযথভাবে সম্পাদনার্থে চেয়ারম্যান পদে, যা এখন শুন্য আছে, একজন উপযুক্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে চেয়ারম্যান পদে দ্রুত নিয়োগ প্রদান করা জরুরি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাবার চাষের ও অন্যান্য প্লান্টেশনের জন্য বরাদ্দকৃত যে সকল জমি সঠিকভাবে ব্যবহার করা হয়নি সে সকল জমির ইজারা বাতিল করা। ২০০৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মোতাবেক বান্দরবান জেলায় ৫৯৩টি প্লট বাতিল করার সিদ্ধান্ত হলেও পরবর্তীতে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে উক্ত বাতিলকৃত প্লটগুলো অধিকাংশই পুনর্বহাল করা হয় এবং নিয়ম লঙ্ঘন করে নতুন করে ইজারা প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ফলে জুম্ম অধিবাসীরা নিজ বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়ে পড়ছে এবং তাদের চিরায়ত জুম ভূমি হারিয়ে তাদের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। আর সমতলের জন্য আর সমতলের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন, যা সরকারের কাছে আদিবাসীদের আরেকটি বড় দাবি ছিল, সেখানেও কোনো অগ্রগতি হয়নি।

চার. বেসমারিকীকরণ: ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে; তো পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন মানে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিডিআর) ও স্থায়ী সেনানিবাস (তিন জেলা সদরে তিনটি এবং আলিকদম, রুমা ও দীঘিনালা) ব্যতীত সামরিক বাহিনী, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সকল অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পর্যায়ক্রমে স্থায়ী নিবাসে ফেরত নেওয়া; কিন্তু পাঁচ শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্পের মধ্যে কিছু ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়েছে; যদিও প্রত্যাহৃত ক্যাম্পের সংখ্যা নিয়ে সরকার এবং আদিবাসীদের মতভেদ রয়েছে। তবে চুক্তি অনুসারে বেসামরিকীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে চুক্তির বিধান অনুসারে অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যহারের ক্ষেত্রে সময়-সীমা নির্ধারণ করা নিয়ে। চুক্তি স্বাক্ষরের ১৪ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজ অবধি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যহারের সময়-সীমা নির্ধারিত হয়নি। ফলে অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি-উত্তর কালে ২০০১ সালে ‘অপারেশন দাবানল’-এর পরিবর্তে ‘অপারেশন উত্তরণ’ জারি করা। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করার লক্ষ্যে এই ‘অপারেশন উত্তরণ’ জারি করা হয়েছে বলে সরকারের তরফ থেকে বলা হলেও অপারেশন উত্তরণের বদৌলতে কার্যত: সেনাবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ প্রশাসনসহ সকল ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা পালন করে চলেছে বলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। তাই চুক্তি অনুসারে পার্বত্যাঞ্চলের বেসামরিকীকরণের ক্ষেত্রে অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে সময়-সীমা নির্ধারণ করা এবং জারিকৃত ‘অপারেশন উত্তরণ’ প্রত্যাহার করার বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করা জরুরি।

পাঁচ. নির্যাতন-নিপীড়ন: ইশতেহারে বলা হয়েছে, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর সন্ত্রাস, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসান এবং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকারের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে; কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন কি আছে আদিবাসীদের জীবনে? যে বাঙালিরা পাকিস্তানের ২৪ বছর জাতিগত, ভাষাগত পীড়ন ও সামিরক শাসনের শিকার হয়েছে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই বাঙালি শাসকগোষ্ঠীরাই আদিবাসীদের ওপর জাতিগত, ভাষাগত ও সাম্প্রদায়িক-ধর্মীয় নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক শসন বজায় রেখেছে। দশকের পর দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে আদিবাসীদের ওপর চলছে জাতিগত পীড়ন, ভূমি দখল আর নারী নির্যাতনের বর্ণনা আপনারা জানেন। রাঙ্গামটি শহরে ঠিক এই বছরের ২২-২৪ অক্টোবর আদিবাসী জনগণ জাতিগত নিপীড়ণের এক ভয়াবহ রূপ প্রত্যক্ষ করেছে। কলেজ বাসে সিটে বসার মতো তুচ্ছ ঘটনাকে পুঁজি করে পুরো রাঙামাটি শহর জুড়ে চলানো হয় ব্যাপক তাণ্ডব। একের পর এক পাহাড়ী মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ীতে ভাংচুর চালানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কার্যালয় এবং বিশ্রামাগারও ভাংচুর চালানো হয়। উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে ইউপি চেয়ারম্যানদের সম্মেলনে হামলা চালিয়ে বেশ কয়েকজন পাহাড়ী চেয়ারম্যানকে আহত করা হয়। রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. সুশোভন দেওয়ানকে খুঁচিয়ে খূঁেিচয়ে বর্বরভাবে আক্রমণ করা হয়। তার একটি চোখ উপড়ে ফেলা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় এই সকল সহিংস ঘটনাবলী সংঘঠিত হয় প্রকাশ্য দিবালোকে এবং জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রগুলোতে। যখন এই সহিংসতা সংঘঠিত হচ্ছিল তখন আইন-শৃংখলা বাহিনী ছিল ভয়ংকরভাবে নিশ্চুপ। আরও উদ্বেগের বিষয় সেনাবাহীনীর সদস্যরা পাহাড়ী জনগণের বাসায় বাসায় গিয়ে হামলা চালায়, পাহাড়ীদের দোকানপাটেরও ব্যাপক ক্ষতি করে। সেই দিন আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যানের সাথেও সেনাসদস্যরা উদ্ধত ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। প্রশাসন ২২ অক্টোবর ১৪৪ ধারা জারী করে। কিন্তু ১৪৪ ধারা মধ্যেও দাঙ্গাকারী বাঙালীরা মিছিল সহকারে পাহাড়ী গ্রামগুলোতে প্রবশের চেষ্টা করে। এই সময় প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গেও বিষযে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। এছাড়া উখিয়া, টেকনাফ, নওগাসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের বিভিন্ন জেলায় আদিবাসী জমি, মন্দির, খিয়াং দখল, নারী নির্যাতন, ধর্ষনসহ নানাবিধ নির্যাতন-নিপীড়ন অব্যহতভাবে চলছে।

ছয়. ইশতেহার, শিক্ষানীতি ও আদিবাসী: আওয়ামী লীগের ইশতেহারে বলা হয়েছিল একটি যুগোপযোগী নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হবে; (ইশতেহার, অনুচ্ছেদ ১০.১) শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে এবং তা এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতাও পেয়েছে। এতে আদিবাসীদের বিষয়টি ভালোভাবে অন্তর্ভূক্ত হয়েছে; শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অধ্যায়ের ২৩ অনচ্ছেদে আছে: ‘দেশের আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ ঘটানো।’ প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে আছে, ‘প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে আদিবাসীসহ সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জন্য স্ব স্ব মাতৃভাষায় শিক্ষার ব্যবস্থা করা।’ এ ছাড়াও আদিবাসী শিশু সংক্রান্ত ১৮ অনুচ্ছেদে আছে: ‘আদিবাসী শিশুরা যাতে নিজেদের ভাষা শিখতে পারে সেই লক্ষ্যে তাদের আদিবাসী শিক্ষক ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা হবে। এই কাজে, বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে, আদিবাসী সমাজকে সম্পৃত্ত করা হবে।’ ১৯-এ আছে ‘আদিবাসী প্রান্তিক শিশুদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’ ২০-এ আছে, ‘আদিবাসী অধ্যুষিত (পাহাড় কিংবা সমতল) যে সকল এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সে সকল এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করা হবে। যেহেতু কোনো কোনো এলাকায় আদিবাসীদের বসতি হালকা, তাই একটি বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আবাসিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হলে সেদিকেও নজর দেওয়া হবে।’ শিক্ষানীতির আরো বিভিন্ন অনুচ্ছেদেও আদিবাসীদের কথা আছে।

সাত. নারীনীতি, ইশতেহার ও আদিবাসী: আওয়ামী লীগের ইশতেহারে ছিল নারীনীতি পুনর্বহালের কথা বলা হয়েছিল। নারীনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে; নারীনীতিতে অনগ্রসর ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারীর জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণের কথা উর্লেখ করে অনুচ্ছেদ ৩৮ এ বলা হয়েছে: ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও অনগ্রসর নারীর উন্নয়ন ও বিকাশের সকল অধিকার নিশ্চিত করা; ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নারী যাতে তার নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অক্ষুন্ন রেখে বিকাশ লাভ করতে পারে সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করা’

আট. বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই(?!) বিতর্ক: ইশতেহারে যেমন আদিবাসী শব্দটি আছে তেমনি আদিবাসী দিবসে মাননীয় সরকারপ্রধান থাকাকালে শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া এবং ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের শুভেচ্ছাবার্তায় ‘আদিবাসী’ শব্দের উল্লেখ ছিল। এ ছাড়া সরকারী দলিল পিআরএসপিতে, সরকারি আইন স্মল এথনিং গ্র“পস কারচারাল ইনস্টিটিউশন অ্যাক্ট, ২০১০-এও তো আদিবাসী ধারণার স্বীকৃতি রয়েছে। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি উন্নয়ন-সহযোগী ও কুটনীতিকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে আদিবাসী নেই, বাঙালিরাই প্রকৃত আদিবাসী।’ দুঃখজনক যে, বিএনপি-জামায়াতের কোনো রাজীতিবিদও আদিবাসী ইস্যূতে এতোটা শক্ত ও বিরোধী অবস্থান নেননি যতোটা নিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী; জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসী ইস্যুতে তিনি এমন কট্টর অবস্থান নিয়েছেন যে এ নিয়ে কিছু কথা বলার প্রয়াস পেয়েছি; অনেকেই তাঁর ওই বক্তব্য যে সঠিক নয় এবং গ্রহণযোগ্যও নয় তা বিভিন্ন আলোচনা-লেখালেখিতে তুলে ধরেছেন। স্মরণাতীত কাল থেকে এদেশে আদিবাসীরা তাদের স্বকীয়তা, নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরিচয় নিয়ে বসবাস করছে। জাতিসংঘ কখনো কোনো সদস্য রাষ্ট্রকে তার দেশের আদিবাসীদের “আদিবাসী” বলা বা না বলার ক্ষেত্রে কোনো খবরদারি করে না। এটি অবশ্যই রাষ্ট্রের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু সরকার যখন জোর করে “আদিবাসীদের” “ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী” বা “উপজাতি” বলে আখ্যায়িত করে এবং সরকার নিজেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘকে বলে আদিবাসী বিষয়ে বা তার নাগরিকদের বিষয়ে কিছু বলার অধিকার বা এখতিয়ার তাদের নেই, তখন সে রাষ্ট্রে “আদিবাসীদের” প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ ও রাষ্ট্রীয় মনোভাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্পষ্ট হয়ে যায়। আর রাষ্ট্র তখন তার নাগরিক বা আদিবাসীদের সঙ্গে কতখানি নিষ্ঠুর ও অমানবিক আচরণ করে, তা নিজেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দেয়। সরকার জাতিসংঘ আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম এবং জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে (ইকোসক) যে ভূমিকা পালন করেছে, তাতে রাষ্ট্র নিজে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অপমানিত হয়েছে; ইকোসকে ৫৪টি সদস্য রাষ্ট্র আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের প্রতিবেদনকে গ্রহণ করেছে। কেননা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মহলে আদিবাসী বা ইনডিজিনাস বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার এজেন্ডা। আমরা মনে করি, আত্ম-পরিচয়ের অধিকার আদিবাসীদের রয়েছে। রাষ্ট্র কোনো জাতির পরিচয় চাপিয়ে দিতে পারে না। আইএলও কনভেনশনের উদ্ধৃতি দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদিবাসীদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন, যা সঠিক নয়। আইএলও কনভেনশনের মূল কথাই হলো আত্ম-পরিচয়ের নীতিকে শ্রদ্ধা করা। বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ প্রত্যয়টি নিয়ে সরকারসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক-সংশয় বিরাজমান। চাকমা রাজা ও জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের সদস্য ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় আদিবাসী প্রত্যয়টির ব্যাখ্যা করার প্রয়াশ পেয়েছেন: ‘অ-বাঙালিরা যে বাংলাদেশের স্থানীয় (ন্যাটিভ) জনগোষ্ঠী, অন্য জাতিগোষ্ঠীর আদিবাসী পরিচয় স্বীকার করার মাধ্যমে তা কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ বা অস্বীকৃত হয় না। আদিবাসী মানে ‘বসতকার’ (সেটেলারস) নয়, অন্ততপক্ষে বাংলাদেশ এবং এশিয়ার আরও কিছু দেশে তা নয়। পার্বত্য চট্রগ্রামের আদিবাসী জনগণের বেলায় ‘আদিবাসী’ পরিচয় প্রযোজ্য, কারণ তারা ১. প্রাক-ঔপনিবেশিক ও প্রাক-বিজিত সমাজের উওরসূরি এবং ২. অন্যান্য অনেক কিছুর সঙ্গে তারা প্রাক-ঔপনিবেশিক ও প্রাক-বিজিত পর্যায়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুগামী রীতি ও প্রথার অনুসারী। সরকার সম্ভত আদিবাসী প্রত্যয়টির গত শতকে গোড়ার দিকের অর্থের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে আছে। সে সময় এই শব্দের ব্যাঞ্জনা কেবল আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের অবস্থাকেই বোঝাত। কিন্তু জাতিসংঘে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পরিমণ্ডলে, উন্নয়নের ধারনায়, পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ায় এ বিষয়ে বোঝাপড়া অনেক দূর এগিয়েছে। আগে যাদের ‘উপজাতি’ বলে বিবেচনা করা হতো, তাদের এখন ‘আদিবাসী’ ধারণার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যে ভূল ধারণাবশত ‘উপজাতি’ ও ‘আদিবাসী’র মধ্যে বেঠিক ও কৃত্রিম পার্থক্য করা হয়, তা আজকের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চিন্তাধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশের যেসব নাগরিক নিজেদের ‘আদিবাসী’ বলে পরিচিত করে, তাদের ওপর ‘আদিবাসী’ ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় চাপিয়ে দিলে সেই কাজ আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবাদী প্রক্রিয়া ও পন্থার বাইরে চলে যাবে। বাংলার কোথাও আদিবাসীরা বাঙালিদের উচ্ছেদ করে বসতি গেড়েছে বলেও কোনো প্রমাণ নেই। আদিবাসীরা যেখানে যখনই বসতি স্থাপন করা শুরু করুক না কেন, তাদের বসতি স্থাপনের সময় সেসব অঞ্চল বাঙালি-অধ্যুষিত ছিল না। বাংলাদেশের অনুস্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) সনদের ১০৭ ধারা অনুযায়ী, কোনো জনগোষ্ঠীকে আদিবাসী বলে পরিগণিত হতে হলে তাদের সহস্র বছর ধরে কোথাও বসবাস করার প্রয়োজন নেইÑ যেমনটা প্রযোজ্য আমেরিকা বা অস্ট্রেলিয়ার বেলায়। আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী, ‘উপনিবেশায়ন বা দখলাধীন হওয়ার সময়’ (যেমন আঠারো বা উনিশ শতক) সেখানে তাদের বসতি থাকা এবং প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুগামী রীতি ও প্রথার অনুসারী হওয়াই ‘আদিবাসী’ বলে গণ্য হওয়ার আবশ্যকীয় শর্ত। বাংলাদেশের আদিবাসীদের অবস্থান সেই শর্তের সঙ্গে মানানসই। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তিতে, ব্রিটিশ আমলের কিছু আইনে এবং পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পরে আদিবাসী জনগণকে ‘ট্রাইবাল’ বা ‘উপজাতি’ বলে গণ্য করা হয়। তাহলেও, ‘ট্রাইবাল’, ‘ইনডিজিনাস’ (আদিবাসী) অথবা ‘অ্যাবরিজিনাল’ (প্রাচীন অধিবাসী) শব্দগুলো পরস্পরের বদলাবদলি সমার্থক ধারণা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার নজির রয়েছে। এমন কিছু নজিরের দিকে নজর দেওয়া যাক: যেমন ‘অ্যাবরিজিনাল’ শব্দটি ১৯৫০ সালের ইস্ট বেঙ্গল স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যাসি অ্যাক্ট- এ লিপিবদ্ধ আছে। ( আইনটি বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথম তফসিল দ্বারা সুরক্ষিত।) সিএইচটি রেগুলেশন, ১৯৯০; ফাইন্যান্স অ্যাক্টস অব ১৯৯৫ অ্যান্ড ২০১০; পভার্টি রিডাকশন স্ট্র্যাটেজি (পিআরএসপি-২০০৮,২০০৯-২০১০), সম্প্রতি চাকমা বনাম কাস্টমস কমিশনার ও অন্যদের মামলায় মহামান্য আদালতের রায়ে ( ৫ ইখঈ, অউ, ২৯ ) ‘ইনডিজিনাস’ শব্দটি আদিবাসী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আদিবাসী দিবসে মাননীয় সরকারপ্রধান থাকাকালে শেখ হাসিনা, বেগম খালেদা জিয়া এবং ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের শুভেচ্ছাবার্তায় ‘আদিবাসী’ শব্দের উল্লেখ ছিল। এ ছাড়া সরকারী দলিল পিআরএসপিতে, সরকারি আইন স্মল এথনিং গ্র“পস কারচারাল ইনস্টিটিউশন অ্যাক্ট, ২০১০-এও তো আদিবাসী ধারণার স্বীকৃতি রয়েছে। আদিবাসী প্রত্যয়ের এর সার্বজনীন কোনো সংজ্ঞা নেই; আদিবাসীরা মনে করেন, আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ও তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্য সার্বজনীন সংজ্ঞার দরকারও নেই; কারণ কোনো একটা সংজ্ঞা দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদিবাসীদের বৈচিত্র্যতাকে কোনোভাবেই সঠিকভাবে ধারণ করা যাবে না; ফলে কিছু আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী এ সংজ্ঞার মাধ্যমে বাদ যেতে পারে; তাছাড়া ‘আদিবাসী ধারণা’ এখনও বিকশিত হচ্ছে; এ ধারণার সাথে প্রতিনিয়ত আরও নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হচ্ছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রগুলোর পক্ষ হতে আদিবাসী কারা তা সংজ্ঞায়িত করার জন্য বলা হচ্ছে; আদিবাসীরা মনে করে, এভাবে সংজ্ঞায়িত করা নিয়ে চাপ দেওয়া বা সংজ্ঞায়িত করতে হবে বলা/করা এক ধরনের বৈষম্য, যা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। উল্লেখ্য, ‘আদিবাসী’ শব্দের মতো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও অনেক শব্দ আছে, যেমন ‘পিপলস্’’ ও ‘সংখ্যালঘু ’ ইত্যদি শব্দগুলিও রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন আইগুলোতে সংজ্ঞায়িত করা হয় নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের কাজের সুবিধার জন্য আদিবাসী কারা তা সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছেন। তবে এ সকল সংজ্ঞাগুলিকে আদিবাসীরা সার্বজনীন সংজ্ঞা হিসেবে মনে করে না। কিন্তু কাজের সুবিধার্থে এ সকল সংজ্ঞা হতে আদিবাসী কারা সে সর্ম্পকে মোটামুটি একটা ধারণা নেওয়া যায়: রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ঈঁন-ঈড়সসরংংরড়হ- এর ঝঢ়বপরধষ জধঢ়ঢ়ড়ৎঃবঁৎ গৎ. ঔড়ংব গধৎঃরহবু ঈড়নড়- এর আদিবাসী বিষয়ক সংজ্ঞা এরকম: ‘আদিবাসী বা ওহফরমবহড়ঁং ঈড়সসঁহরঃরবং, চবড়ঢ়ষবং ও ঘধঃরড়হং হল তারা, যাদের প্রাগ্-আগ্রাসন ও প্রাগ্-উপনিবেশিক সমাজগুলির সাথে একটা ঐতিহাসিক ধারাবাহিক সর্ম্পক আছে, এ সম্পর্ক তাদের ভ্খূণ্ডের উপর গড়ে উঠেছে এবং ওই ভূখণ্ডের মধ্যে বর্তমান সমাজের অন্যান্য অংশগুলো থেকে তাদেরকে স্বাতন্ত্র্য মনে করে; তারা বর্তমানে নিজেদের সমাজে নিজেদের মধ্যে অনাধিপত্যমূলক অংশ বা শাখা গঠন করে এবং তারা তাদের প্রাচীন ভূখণ্ডগুলির জাতিসমূহ হিসেবে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও আইনগত পদ্ধতিগুলির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ধারাবাহিক অস্তিত্ব রক্ষা করছে ও তাদের জাতিগত পরিচিতি সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে স্থানান্তর করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞি।’ [ঊ/ঈঘ.৪/ঝঁন.২/১৯৮৬/৭ (১৯৮৩)] বিশ্বব্যাংক তার ঙচ ৪১[১].১০ তে আদিবাসী বিষয়ক সজ্ঞায় বলেছে: ‘আদিবাসী’ শব্দটি সার্বিক অর্থে স্বতন্ত্র, ঝুঁকিগ্রস্ত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এক জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয় যাদের কিছু বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান যেমন, একটি স্বতন্ত্র আদিবাসী সংস্কৃতির অধিকারী জনগোষ্ঠী হিসেবে যারা নিজেদের মনে করে এবং অন্যরাও এই পরিচিতির স্বীকৃতি দেয়; ভৌগোলিকভাবে পৃথক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আবাসভূমি অথবা বংশানুক্রমিকভাবে ব্যবহৃত ভূখণ্ড এবং এতদঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদের সাথে যাদের যৌথ সম্পৃক্ততা রয়েছে; তাদের প্রথাগত সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের প্রধানতম সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা; এবং একটা আদিবাসী ভাষা রয়েছে যা সচরাচর দেশের সরকারি ভাষা বা উক্ত অঞ্চলোর প্রচলিত ভাষা থেকে পৃথক। বিশ্ব শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৬৯ (অনুচ্ছেদ-১, (খ)) এ নির্ধারিত সংঞ্জায় বলা হয়েছে: ‘যাদের উৎপত্তি একটি জনগোষ্ঠী থেকে, যারা একটা দেশের বা দেশের মধ্যে একটা ভৌগোলিক অঞ্চলের বাসিন্দা; যারা ওই অঞ্চল আবিষ্কারের সময় থেকে অথবা ঔপনিবেশিক অথবা বর্তমান রাষ্ট্রসীমা গঠিত হবার আগে থেকে বসবাস করে আসছে; এবং যাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু ক্ষেত্রে আইনগত অথবা পূর্ণাঙ্গ বৈধতা রয়েছে।’ উল্লিখিত সংজ্ঞাগুলো থেকে আদিবাসীদের কিছু অভিন্ন বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়: আদিবাসী তারা যারা নিজেদের আদিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে এবং ব্যক্তিগতভাবে যারা তাদের কমিউনিটির দ্বারা ওই কমিউনিটির সদস্য হিসেবে স্বীকৃত; যাদের উপনিবেশীকরণের পূর্বে একটা অঞ্চল বা অঞ্চলের একটা অংশের সাথে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বা সর্ম্পক রয়েছে; যারা তাদের ভূখণ্ডের ও চারপাশের প্রাকৃতিক সম্পদগুলোর সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত; যারা এখনও তাদের স্বতন্ত্র সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিছুটা হলেও বজায় রেখেছে; যারা স্বতন্ত্র জাতি বা সম্প্রদায় হিসেবে তাদের পরিচয় দেয়, যাদেও নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসে স্বাতন্ত্র্য রয়েছে ও যারা তাদের ভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ধরে রাখতে বা তার আরও বিকাশ ঘটাতে পেরেছে; যাদের মধ্যে যৌথ মালিকানার অধিকার, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের অধিকার, সাংস্কৃতিক সংহতি, ঐতিহ্যগত জ্ঞান পদ্ধতি, আতœনিয়ন্ত্রণ বা স্বশাসন, প্রথাগত আইন ইত্যাদি বিদ্যমান। বাংলাদেশের আদিবাসী জাতিসমূহকে উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলির আলোকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, আমাদের দেশে সমতল ও পার্বত্য এলাকা মিলে ৫০ টিরও অধিক আদিবাসী জাতি রয়েছে। যাদের সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষাধিক যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.৫%; এদের অধিকাংশ রয়েছে দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য অঞ্চলে। বাংলাদেশের আদিবাসীরা হলেন- আসাম, বম, বানাই, বেদিয়া, ভূমিজ,বাগদি, চাকমা, চাক, ডালু, গারো, গুর্খা, হাজং, খাসি, খারিয়া, খ্যাং, খুমি, কোচ, কোল, কর্মকার, ক্ষত্রিয় বর্মন, খন্ড, লুসাই, মারমা, ম্রো, মণিপুরী, মাহাতো, মুন্ডা, মালো, মাহালি, মুড়িয়ারম, মুসহর, ওরাঁও, পাংখোয়া, পাহাড়ীয়া, পাহান, পাত্র, রাখাইন, রাজুয়াড়, রাই,রাজবংশী, সাঁওতাল, সিং, তুরী, তঞ্চঙ্গা, ত্রিপুরা ইত্যাদি। পৃথিবীর অনেক দেশের সংবিধানে আদিবাসীদের পরিচয়, অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও অধিকারের স্বীকৃতি আছে। যেমন, আমেরিকা, কানাডা, বলিভিয়া, মেক্সিকো, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা প্রভৃতি দেশে আদিবাসী সাংবিধানিক স্বীকৃতি শুুধু নয়, আদিবাসী ভূমি অধিকার ও টেরিটরির মালিকানা পর্যন্ত স্বীকৃতি পেয়েছে। কোনো কোনো দেশে উচ্চতর আদালতের রায় ও নির্দেশনা আছে আদিবাসী অধিকার রক্ষার জন্য। অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে আদিবাসীদের আইনগত অধিকার ও চুক্তি রয়েছে রাষ্ট্র ও আদিবাসীদের মধ্যে। মালয়েশিয়ার আদিবাসী ‘ওরাং আসলি’দের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আইন হয়েছিল ১৯৫৪ সালে ‘অ্যাবরিজিনাল পিপলস্ এ্যাক্ট’ নামে। এমনকি মালয়েশিয়ার হাই কোর্ট আদিবাসীদের পূর্বসুরীদের অধিকৃত ভূমি রক্ষার জন্য রায় দিয়েছিল ২০০২ সালে। ফিলিপাইনে সাংবিধানিকভাবে আদিবাসীরা স্বীকৃত এবং ইনডিজিনাস পিপলস্ রাইটস অ্যাক্ট আছে তাদের। তাছাড়া আদিবাসী বিষয়ক জাতীয় কমিশন আছে ফিলিপাইনে। নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও রাশিয়াতে আদিবাসীদের নিজস্ব পার্লামেন্ট আছে। গ্রীনল্যান্ড ডেনমার্কের উপনিবেশ হলেও সেখানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি আছে। আফ্রিকার অনেক দেশে আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও বৈচিত্রের স্বীকৃতি আছে। কোথাও কোথাও বৈষম্যহীনতার কথা বলা আছে। এশিয়ার মধ্যে কম্বোডিয়া, ভারত, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, নেপাল, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, লাওস প্রভৃতি দেশে আদিবাসীরা হয় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত অথবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইন ও পলিসি দ্বারা স্বীকৃত। ইন্দোনেশিয়ায় তৃতীয় সংশোধনের সময় সাংবিধানিকভাবে আর্টিক্যাল ১৮ আদিবাসীদের অস্তিত্বকে সম্মান প্রদর্শন শুধু করেনি, তাদের প্রথাগত অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। (ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্র“প ফর ইন্ডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স, ২০১১)

নয়. একক জাতিয়তাবাদের প্রাবাল্য: আমরা মনে করেছিলাম, চল্লিশ বছরে ভূ-রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যেমন পাল্টেছে, জাতির আশা-আকাক্সক্ষা, মন-রুচিও অনেক অনেক পাল্টেছে, তাই এখন যে সংবিধান রচিত হবে তা কেবল ধর্মনিরেপেক্ষ হলেই চলবে না, একইসঙ্গে ভাষানিরেপেক্ষ, জাতিনিরেপেক্ষ ও লিঙ্গনিরপেক্ষ হতে হবে। ভুলে গেলে ভুল হবে যে, বাঙালির একক জাতিয়তাবাদের দেমাগ ইতোপূর্বে আদিবাসীদের জন্য রাষ্ট্রীয় শান্তির ক্ষেত্রে বহুবিধ সমস্যাই কেবল পয়দা করেছে, কোনো সমাধান বাতলাতে পারেনি। শাসক গোষ্ঠীর মধ্যে এরকম ধারণা কাজ করে যে একটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলতে না পারলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার হয় না। আমরা মনে করি একক জাতীয়তাবাদের প্রাবাল্য একটি ভুল প্রেমিজ; বরং একটি দেশের জনবিন্যাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও কৃষ্টির বহুমুখী বিচিত্র রূপই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে; এটিই বৈচিত্র্যের ঐকতান বা বহুত্ববাদÑ বিউটি অব ডেমোক্রেসি। একক জাতিসুলভ দাম্ভিকতা বাদ দিয়ে দ্রুত এই সত্য বুঝতে পারলে রাষ্ট্রের জন্য বরং ভালো যে, বাংলাদেশ কোনো এক জাতি এক ভাষা আর এক ধর্মের রাষ্ট্র নয়; এটি অবশ্যই একটি বহু জাতি, বহু ভাষা ও বহু ধর্মের রাষ্ট্র; সংবিধানেও এর ইঙ্গিত আছে কারণ সংবিধানে দেশের নাম পিপলস রিপাবলিক বলা হয়েছে, বেঙ্গলি রিপাবলিক বলা হয়নি; আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবি থেকে আমরা তাই এক চুলও সরে আসতে পারি না। খুবই প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন যে, বিচ্ছিন্নতবাদী আসলে কারা? যারা সংবিধানের ভেতর তাদের যথাযথ স্বীকৃতির জন্য লড়াই করছে তারা? নাকি যারা এই স্বীকৃতি না দিয়ে তাদেরকে দূরে ঠেলছে তারা?

আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার চেঙ্গি, শঙ্খ, কর্ণফুলি, ডলু, আত্রাই আর করতোয়া দিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে কিন্তু সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। আমরা মনে করি সংবিধান কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়, আমরা চাইলে আবারো একে সংশোধন করতে পারি, ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধানমন্ত্রীও তাই বলেছেন। সেই আত্মম্ভর আশায় আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিসমূহ আবারো তুলে ধরছি:
ক্স দ্বিধা দোলাচাল আর অস্পষ্টতার কুয়াশা সরিয়ে সংবিধানে স্পষ্ট করে বসবাসরত ৫০টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক। সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘বাংলাদেশ একটি বহু ভাষা, বহু জাতি ও বহু সংস্কৃতির এক বৈচিত্রপূর্ণ দেশ ’- এই বাক্যের সংযোজন করা হোক।
ক্স সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিধিসহ অপরাপর সাম্প্রদায়িক শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদসমূহ সংশোধন করে সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ক্স আইএলও-এর ১০৭ ও ১৬৯ নং কনভেনশন এবং ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘ আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র মোতাবেক আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমি অধিকারের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হোক।
ক্স সাংবিধানিকভাবে ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির স্বীকৃতি প্রদান করা হোক এবং ইশতেহারের ওয়াদা অনুযায়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হোক।
ক্স চুক্তিমোতাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি সমস্যার বিষয়টিকে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক এবং চুক্তি মোতাবেক সকল অন্থায়ী সেনাছাউনি প্রত্যাহার করা হোক। এ লক্ষে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হোক।
ক্স “পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল বিধায় উক্ত অঞ্চলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিরাপত্তার জন্য উক্ত অঞ্চল একটি বিশেষ শাসিত আদিবাসী অঞ্চলের মর্যাদা পাবে” – সংবিধানে এটি সংযোজন করা হোক।
ক্স সংসদীয় আসনসমূহসহ দেশের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জন্য জাতীয় সংসদের আসন ও স্থানীয় সরকার পরিষদে আসন সংরক্ষণ করা হোক।
ক্স বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে অতীতে সংঘটিত সকল জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক জুলুম-নির্যাতনের বিচার করা হোক এবং দোষী ও পরিকল্পনাকারীদের নজীরস্থাপনকারী শাস্তির আওতায় আনা হোক।

আমরা বাংলাদেশের অধিবাসীরা কেমন দেশ চাই, সেটি আমাদেরই ঠিক করতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্নে যে আপোষহীনতা জরুরি ছিলো তা না থাকা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের প্রশ্নে যে গা-সওয়া ভাব, তা শুধু একাত্তরের পরাজিত শিবিরকেই শক্তিশালী করছে এমন নয় বরং দিনে দিনে তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতামুখী অপরাপর রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই বলতে চাই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের এগিয়ে চলার জন্য এবং আদিবাসীদের সমস্যার স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির বিষয়টিকে আবারো নতুন করে ভাবুন। সংবিধানের ত্র“টিপূর্ণ সংশোধনের প্রতিক্রিয়া আদিবাসীরা দেখাতে শুরু করেছেন, গণমাধ্যমে আমরা তার প্রতিফলন দেখছি। ত্রিশ লাখ মানুষের মনে যে ক্ষোভ আর হতাশা সঞ্চারিত হচ্ছে, দ্রুত তা আমলে না নিলে এখান থেকে অতীতের মতো অনাকাক্সিক্ষত অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে, যা আমরা কেউই চাই না। আমারা মনে করি বাংলাদেশ একটি বহু জাতির সম্মানজনক অংশীদারিেেত্বর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত হওয়ার স্বপ্নকে ধারণ করতে সক্ষম আর তাই আমরা চাই দেশে বসবাসকারী সকল জাতির সমান মর্যাদার ভিত্তিতে নতুন করে রচিত হোক আগামীর সংবিধান।

তথ্যসূত্র:
ক্স নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, অনুচ্ছেদ ১৮.১ ও ১৮.২
ক্স মঙ্গল কুমার চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন ও সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার: অর্জন ও সম্ভাবনা, ৪ মার্চ, ২০১২, কাপেং ও এএলআরডি আয়োজিত সেমিনারে পঠিত
ক্স তথ্যপত্র: “আদিবাসী কারা?”, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটি ও আদিবাসী ফ্যাসিলিটেটরস্ গ্র“প কর্তৃক প্রকাশিত, ১৯ মার্চ ২০১১
ক্স রোবায়েত ফেরদৌস ২০১১, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী: আদিবাসীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া বাঙালী জাতিয়তাবাদ, সংহতি ২০১১, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, ঢাকা ০৯ আগস্ট ২০১১
ক্স রোবায়েত ফেরদৌস ২০০৯, আদিবাসীদের ভাষা ও একুশের তাৎপর্য, সংহতি ২০০৯, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, ঢাকা ০৯ আগস্ট ২০০৯
ক্স দেবাশীষ রায় ২০১১, স্বীকৃতি: ‘আদিবাসী’ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে, প্রথম আলো, ২৭ জুলাই ২০১১
ক্স ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্র“প ফর ইন্ডিজিনাস অ্যাফেয়ার্স-এর সূত্রে উদ্ধৃত, সংহতি ২০১১, পৃষ্ঠা ২৩
ক্স দৈনিক প্রথম আলো, ২২ অক্টোবর, ২০১০
ক্স দৈনিক প্রথম আলো, ০৯ নভেম্বর, ২০১২

রোবায়েত ফেরদৌস : সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।