নুহাশ পল্লী : যে বাঁশি ভেঙে গেছে…

প্রকাশিত: ১২:৫০ অপরাহ্ণ, মে ১৭, ২০২২

নুহাশ পল্লী : যে বাঁশি ভেঙে গেছে…

 

আমিনুল ইসলাম

হুমায়ূন আহমেদের নাটকের গভীর অনুরাগী আমি বরাবরই ।

 

ছাত্রজীবনে সাদাকালো টিভি। এবং কেবল বিটিভি। তারপর রঙিন টিভি। হুমায়ূন আহমেদের নাটক। আর নাটক। শতাধিক নাটক। অতুলনীয় জনপ্রিয় ধারাবাহিকগুলো হচ্ছে: এইসব দিনরাত্রি (১৯৮৫), বহুব্রীহি (১৯৮৮), অয়োময় (১৯৯১), কোথাও কেউ নেই (১৯৯৩) , নক্ষত্রের রাত (১৯৯৫),আজ রবিবার (১৯৯৬), সবুজ ছায়া (১৯৯৭), সবুজ সাথী (১৯৯৮), উড়ে যায় বকপক্ষী (২০০৪), জোছনার ফুল (২০০৪) । আর একক নাটকগুলো: হামিদ মিয়ার ইজ্জত চোর, মফিজ মিয়ার চরিত্র ফুলের মত পবিত্র, মন্ত্রী, নক্ষত্রের রাত, কবি, সবাই গেছে বনে, জুতাবাবা,প্যাকেজ সংবাদ, কনে দেখা, যমুনার জল দেখতে কালো, এনায়েত আলীর ছাগল, ছেলেদেখা, নয় নম্বর বিপদ সংকেত, সমুদ্র বিলাস, সবাই গেছে বনে, ঘটনা সামান্য, প্রজেক্ট হিমালয়,ফুসকা বিলাস, জামাই রত্ন এবং আর কত নাটক! প্রতিটি নাটক জনপ্রিয়তার তুঙ্গে। তাঁর সব নাটক এখনও দেখা হয়নি। মাঝে মাঝে ইউটিউব থেকে বের করে তাঁর নাটক দেখি সপরিবার। এত আনন্দ পাই যার তুলনা নেই । নেত্রকোনা জেলায় ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণকারী হুমায়ূন আহমেদ মাত্র ৬৩ বছর বয়সে ২০১২ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন। বারবার মনে হয়, তিনি যদি রবীন্দ্রনাথের মতো দীর্ঘ আয়ু পেতেন তবে আরও কত নাটক কত উপন্যাস পেতাম আমরা তাঁর কাছ থেকে যেমনটি মনে হয় বিদ্রোহী কবির প্রসঙ্গে যে তিনি যদি ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত সুস্থভাবে বেঁচে থাকতেন , তাহলে বাংলা গান আজ কোথায় থাকতো বৈচিত্র্য ও বিস্তারের ব্যঞ্জনায়! কিন্তু তাঁরা যা দিয়েছেন, তারও তো তুলনা নেই। এটাই সান্ত্বনা আমাদের। হুমায়ূন আহমদ রচিত উপন্যাস ও অন্যান্য বইয়ের সংখ্যা মোট ২০০ এর অধিক। তাঁর বহু বই-ই বছরের পর বছর বেস্ট সেলার ছিল।

 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিলেন হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয় সাহিত্যব্যক্তিত্ব; তার অধিকাংশ বইয়ের নামকরণ রবীন্দ্রনাথের কোনো গান অধবা কবিতার কলি থেকে নেয়া। তিনি গাজীপুরের শালবনে প্রায় ৪০ বিঘা জমি কিনে বানিয়েছিলেন নুহাশ পল্লী। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ কুঠিবাড়ী আর শান্তিনিকেতন তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি ততদিনে নাটকের দিকে সমানভাবে ঝুঁকে পড়েছিলেন । ফলে শুটিং ছিল তাঁর প্রধান একটি কাজ। নুহাশ পল্লীকে তিনি শুটিং স্পট , শুটিং শেষে বিশ্রামগ্রহণ অথবা রাত্রিযাপন এবং সেখানে বসে উপন্যাস-নাটক লেখার উর্বর ভেন্যুতে পরিণত করেছিলেন। ফলে নুহাশ পল্লী শান্তিনিকেতনের পথে যাওয়ার কোনো অবকাশ ছিল না। “গাজীপুর জেলার চৌরাস্তা থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে এক হোতাপাড়া বাজরের পিরুজালী নামক গ্রামে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদ নুহাশ পল্লী গড়ে তোলেন। সেখানকার নানা স্থাপনা আর অসংখ্য ফলজ, বনজ গাছের পাশাপাশি তিনি ঔষধি গাছের বাগান বানিয়েছেন। ছেলের নামে রাখা নুহাশ পল্লীকে হুমায়ূন আহমেদ মনের মতো করে নিজস্ব স্বপ্নজগত করে তোলার প্রয়াস রেখেছেন। তাই নিজের তৈরি করা আড়াইশ প্রজাতির সবুজ গাছের উক্ত “নন্দন কাননে” তিনি বারবার ছুটে গেছেন। ঢাকার ধানমন্ডিতে তার বাসস্থান হলেও তিনি সুযোগ পেলেই নুহাশ পল্লীতে চলে আসতেন সময় কাটাতে। কখনো আসতেন সপরিবারে, কখনো আসতেন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে রাতভর আড্ডা দিতে। প্রতি বছর ১লা বৈশাখে নুহাশ পল্লীতে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হতো। নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদ স্যুটিং স্পট, দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো গড়ে তুলেছেন। একটিতে তিনি থাকতেন আর বাকি দুটিতে তিনি তার শৈল্পিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। শানবাঁধানো ঘাটের দিঘির দিকে মুখ করে বানানো বাংলোকে তিনি ‘ভূত বিলাস’ নাম দিয়েছিলেন। দুর্লভ সব ঔষধি গাছ নিয়ে যে বাগান তৈরি করা হয়েছে তার পেছনেই রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষসের ভাস্কর্য রয়েছে। আরো রয়েছে পদ্মপুকুর ও অর্গানিক শৈলীতে নকশা করা এবড়োথেবড়ো সুইমিং পুল। “ (উইকিপিডিয়া ) ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজী চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ১১/১২ কিলোমিটার দূরে হোতাপাড়া বাজার। হোতাপাড়া থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে পিরুজালী গ্রাম। গ্রাম মানে আসলে শালবন , মাঝে মাঝে কিছু ঘরবাড়ি। সেখানে প্রায় ৪০বিঘা জমিতে প্রতিষ্ঠিত হয় নুহাশ পল্লী। ছেলে নুহাশের নামে এই নামকরণ। পুরো অঞ্চলটি মাইলের পর মাইল সবুজের লীলানিকেতন আর অক্সিজেনের বাগান।

 

না এবং আমি বিগত ১৪ মে ২০২২ তারিখ ছুটির দিন নুহাশ পল্লী দেখতে গিয়েছিলাম।সেটাই অমাদের প্রথম নুহাশ পল্লী দর্শন। লীনা এবং আমি নুহাশ পল্লীতে কর্মরত হুমায়ূন আহমেদর প্রিয় বাবুর্চি আবুল বাশার এবং অন্যান্যদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা। সঙ্গে আরও ছিল হুমায়ন কবির এবং আবদুল করিম। এই ছিল আমার প্রথম নুহাশ পল্লী দর্শন। দেখামাত্রই আমার চোখ জুড়িয়েছিল। নুহাশ পল্লী আসলে জমিদারদের বাগানবাড়ীর আধুনিক সংস্করণ। তখন বিদ্যুৎ ছিল না; এখন সেটা আছে। এটা বাড়তি সুবিধা। ২৫০ প্রকারের ঔষধি বৃক্ষ। আর আম-জাম-কাঁঠাল-লিচু এসব গাছ তো আছেই। লীলাবতী ‍দিঘিটি সুন্দর। শানবাঁধানো ঘাট দু’পাড়েই। বিপরীত পাড়ের ঘাটে পুরাতন পাকুড়গাছ। সারিবদ্ধ ঝাউগাছ। তবে দিঘিতে নৌকাটি নেই । বাশার জানায় যে দর্শকরা এসে নৌকা নিয়ে ঝামেলা করে , কেউ ডুবে গেলে সমস্যা হবে, এই ভয়ে নৌকা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। এখন মুধুমাস। কাঁঠালগাছগুলিতে কাঁঠালের মেলা বসেছে; আম আছে আমগাছে,জাম এসেছে জামগাছে। মাঠে কয়েকটি বকনা ও বাছুর চরছিল। তাদের পিঠে আদর করতেই মাথা বাড়িয়ে স্বাগত জানায় আমাকে। আমি একসময় গরুল রাখাল ছিলাম, গরুদের নতুন প্রজন্মের সন্তানেরা আমাকে চিনতে ভুল করেনি। জামগাছের আড়ালে বসে পুরুষ কোকিল ডাকছিল–কুহু কুহু। থেকে থেকে পাপিয়াও। হয়তো প্রিয়দর্শিনী লীনাকে পছন্দ হয়েছিল তাদের। শুটিংয়ের জন্য মৎস্যকন্যা, টিলা, কুঁড়েঘর, সুইমিং পুল এবং আরও কত কি! ইটের প্রাচীর। কিন্তু চারপাশে সবুজ বনভূমি দৃশ্যমান। ওপরে খোলা আকাশ–কাজী নজরুল ইসলামের মনের মতো উদার ও অবারিত। আকাশ মেঘলা ছিল কিন্তু বৃষ্টি হয়নি। ছিল লীনার মেজাজের মতন ঠাণ্ডা বাতাস।

 

হুমায়ূন আহমেদ যে-ঘরটিতে বসে লিখতেন, রাতে শুয়ে ঘুমাতেন, যে-ঘরটিতে সাহিত্যের ও গানের আসর বসতো বাশার অমাদের প্রতিটি দেখিয়েছেন এবং ধারা বিবরণীর মতো করে সব বলেছেন। বাশার যখন কথা বলছিলেন, তার চোখেমুখে একইসঙ্গে অতীতের মুগ্ধতা ও বর্তমানের হতাশা ফুটে উঠছিল। তিনি তার ‘ হুমায়ূন স্যার’ এর জন্য আজও পাগল। হুমায়ূন আহমেদ তার রান্না পছন্দ করতেন, তাকেও ভালোবাসতেন, একথা বলতে তার মুখে যে আনন্দের আভাস ফুটে উঠছিল, সেকেন্ড হোমের মালিক অথবা বেগম পাড়াওয়ালারা সেই সুখানন্দের সন্ধান পায় না কোনোদিন; পাবেও না। বাশার যখন বলছিলেন , আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম, যেমনটি শুনতাম শৈশবকালে রূপকথা এবং কাহানী– বড়দের কাছে: দাতা হাতেম তাঈ, শুয়োরানি দুয়োরানি, জেলে ও মৎস্যকন্যা, আলাদীন ও চব্বিশ চোর, মধুমালা ও ডালিম কুমার এবং আরও কত!

 

 

লীনা এবং আমি যখন দিঘির পোড় দিয়ে হাঁটছিলাম, শানবাঁধানো ঘাটে বসছিলাম, ছবি তুলছিলাম, যখন ঝরা ফুল কুড়িয়ে লীনার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিচ্ছিলাম, বারবার মনে পড়ছিল হুমায়ূন আহমেদের কথা–এসব স্থানে কত শতবার পা পড়েছে তার! কতবার দিঘির জলে ছায়া পড়েছে তাঁর মুখের! কত চাঁদনীরাত মুখরিত হয়েছে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে তাঁর আড্ডার আসরে! তিনি কতবার ফুল কুড়িয়ে গুঁজে দিয়েছেন নিজ প্রেয়সীর খোঁপায়! চাঁদনীরাতে পুকুরঘাটে উচ্চারিত হয়েছে কত অন্তরঙ্গ কথা! আমার ফাটাবাঁশের গলায় ভর করেছিল রবীন্দ্রনাথ। আমার লজ্জাশরম একটু কম বলে লীনাকে শুনিয়ে গাইতেছিলাম বেসুরো গলাতেই:

 

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা,
মিটিয়ে দেব গো– মিটিয়ে দেব লেনা দেনা
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে–
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেযয়ে নাই বা আমায় ডাকলে।

 

 

 

 

যখন জমবে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়,
কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়, আহা,
ফুলের বাগান ঘন ঘাসের পরবে সজ্জা বনবাসের,
শ্যাওলা এসে ঘিরবে দিঘির ধারগুলায়–
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে।

 

আজ সত্যি সত্যি দিঘির শানবাঁধানো পাকুরঘাটে শেওলা জমেছে, আজ সত্যি সত্যি তানপুরাটার তারগুলোতে হাত পড়ে না কারো; আজ সত্যি সত্যি তাঁর পায়ের চিহ্ন আর পড়ে না এইসব বাটে-ঘাটে-গাছতলায়। এখানে গুলতেকিন আর রাত কাটাতে আসেন না; আসেন না মেহের আফরোজ শাওন। তবে চাঁদনীরাতে এই বাশারদের দল মনে করে তাদের ‘হুমায়ূন আহমেদ স্যার’কে। হয়তোবা স্মরণ করে বাগানের জাপানী বটগাছ, লীলাবতী দিঘির টলটলে পানি , মৎস্যকন্যা এবং ক্ষুধামুক্ত নিরীহ রাক্ষস মহোদয়। কিন্তু তাদের ভাষা বুঝবে কে!

 

ম্যানেজার বুলবুল ছিলেন না। গাইড হয়ে বাশার আমাদের বুঝিয়ে দিচ্ছিল সবকিছু। কিছু ছবিও তুলে দিয়েছিল। তাছাড়া কবির এবং করিম তো ছিলই। তবে লীনা এবং আমি ছবি তুলেছিলাম একজন আরেকজনের। দিঘির পাড়ে, গাছে নিচে, শান বাঁধানো ঘাটে, কাঁঠালগাছের গোড়ায়, হুমায়ূন আহমেদের কবরের পাশে, হুমায়ূন আহমেদের পড়ার ঘরে, গানের আসরের স্থানে একের পর এক ছবি তুলেছি লীনা; আমারও কিছু ছবি তুলেছে ও। আমি হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখক হতে পারবো না সাতবার জন্মগ্রহণ করলেও। কিন্তু লীনা আমার জীবনকে ভরে দিয়েছে যেভাবে চাঁদের আলোয় ভরে যায় রাতের খোলা প্রান্তর। আর ওকে আমি ভালোবাসি হয়তোবা শাওনপূর্ব সময়ে যতটা ভালোবাসতেন হুমায়ূন আহমেদ গুলতেকিনকে তারচেয়েও বেশি। তারচেয়ে বড়কথা, তার সরলতামাখা শক্তি খুবই প্রবল । সারল্য ও প্রাবল্যের এমন সহাবস্থান আমি দেখেছিলাম আমার কৈশোরেবেলা শ্রাবণের পাঙ্গাশমারীতে সাঁতারের সময়। তার জয় অটুট থাক্।

 

হুমায়ূন আহমেদ রবীন্দ্রনাথের গভীর ভক্ত ছিলেন ; তাঁর পথ ধরে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় নিয়োগ করেছিলেন সবটুকু শক্তি–শরীর ও প্রাণ। তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন তা আর কোনো উপন্যাসিক-নাট্যকার জীবদ্দশায় অর্জন করতে পারেননি। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন শেষ পর্যন্ত তাঁর পক্ষে থাকেনি যেমনটি ছিল রবীন্দ্রনাথের অথবা শাহরুখ খানের। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ভাবমূর্তি বা ইমেজ একটা ঝুঁকিপূর্ণ অস্তিত্ব। ভাবমূর্তিকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়; অতঃপর তাকে ধরে রাখতে হয় নিশ্ছিদ্র সচেতনতায়। সেজন্য যারা বিখ্যাত হোন , হয়ে ওঠেন সেলিব্রেটি, তাদেরকে চারপাশ থেকে আমন্ত্রণ জানাতে আসা অনেক কিছুকেই শক্তভাবে ‘ না’ করে দিতে হয়। আর আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশের সামাজিক মূল্যবোধের বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেওয়ার জো নেই। এখানে হুমায়ূন আহমেদ সাফল্য দেখাতে পারেননি। বাশারকে যতবার জিজ্ঞাসা করেছি, ও বলেছে যে তার হুমায়ূন স্যারের মতো আর কেউ কোনোদিনও জাগিয়ে তুলতে পারবে না নুহাশ পল্লীকে। হুমায়ূন আহমেদ মারা যাবার পর এটি এখন মৌরসি এজমালি সম্পত্তি । হুমায়ূন আহমেদ মারা যাবার অনেকদিন পর গুলতেকিন দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। বর্তমানে হুমায়ূন আহমেদের এক স্ত্রী, দু্ স্ত্রীর সন্তান, মায়ের পথ ধরে ভাইগণ সব মিলিয়ে ১৫/১৬ জন মালিক নুহাশ পল্লীর। টিকেট বিক্রয়ের টাকা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে কর্মচারীদের বেতনভাতাসহ অন্যান্য ব্যয় সংকুলান কোনো মাসে হয়, কোনো মাসে হয় না। শুটিং ভেন্যু হিসেবে আগে মাসে কয়েক লাখ টাকা আয় হতো। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু; অতঃপর মড়ারও পর খাড়ার ঘা করোনা অতিমারি। শুটিং নেই। আয় নেই। একজন ম্যানেজার আছেন বুলবুল। আপাতত মেহের আফরোজ শাওন সুপারভিশন করেন সবকিছু। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ যে উৎসাহ ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নুহাশ পল্লী, যেভাবে এর পূর্ণ ব্যবহার করে যাচ্ছিলেন এবং দিনদিন তা যেভাবে প্রাণচোঞ্চল্যে ভরা সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশ কেন্ত্র হয়ে উঠেছিল, সেই দিন সেই অবস্থা আর ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। হয়তো এই সম্পত্তি একদিন এলোমেলো করে ফেলবেন ডজনাধিক সংখ্যক ওয়ারিশগণ। হুমায়ূন  আহমেদ স্বপ্ন দেখেছিলেন , তাঁর মৃত্যুর পরও নুহাশ পল্লী জেগে থাকবে শান্তিনিকেতন অথবা শিলাইদহ রবীন্দ্র ‍কুঠিবাড়ীর মতন আপন মহিমায়। নুহাশ পল্লীর অবস্থা এখন ফারাক্কা বাঁধ কবলিত পদ্মার অনুরূপ। পদ্মা তবু বর্ষাকালে স্রোত ফিরে পায়, নুহাশ পল্লীর সারাটা বছর শীর্ণ মৌসুম। নুহাশ পল্লীতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র হুমায়ূন আহমেদ। তিনি শুনতে পান অথবা নাই পান, নুহাশ পল্লী ধারণ করে আছে অপিরমেয় আনন্দের উচ্ছ্বাস এবং অজস্র অনিরীক্ষিত বোবাকান্না। গুলতেকিন কিংবা  শাওন কারো সাথেই দেখা হয়নি সেদিন কিন্তু নুহাশ পল্লীতে আধবেলা কাটিয়ে কর্মচারীদের নিঃশ্বাসের শব্দে, মৎস্যকন্যার নীরব কণ্ঠস্বরে, রাক্ষস মহোদয়ের বোবাকান্নায়, লীলাবতী দিঘির জলে, গাছের পাতায়, হুমায়ূন আহমেদের কবর ছুঁয়ে আসা শালবনের হাওয়ায় শুনেছি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের করুণ সুরের গান:

 

যে বাঁশি ভেঙে গেছে তারে কেন গাইতে বলো?
কেন আর মিছেই তারে সুরের খেয়া বাইতে বলো?
আজ সোনার খাঁচায় বন্দী পাখির কন্ঠে যে নেই সুর,
আজ যেন সেই বনের ছায়া সে তো অনেক দূর,
তাকে হারিয়ে যাওয়া ফাগুনেরে ফিরে কেন চাইতে বলো?
একদা সুরে সুরে দিত যে হৃদয় ভরে
দেখো তার গানের বীণা ধূলায় পড়ে।
আজ সব হারানোর নীরব ব্যথায় কাঁদে গো যার প্রাণ,
বলো ওগো কেমন করে গাইবে সে তার গান,
মিছে ফাগুন বেলার হাসিতে তার সুরের ভুবন ছাইতে বলো।
[গীতিকার: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ]