ঢাকা ২৪শে জুলাই ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, ৯ই শ্রাবণ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৭ই মহর্‌রম ১৪৪৬ হিজরি


নয়টি জাহাজ ডুবিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দেয় অপারেশন জ্যাকপট

redtimes.com,bd
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১১, ২০১৭, ০৩:২৫ পূর্বাহ্ণ
নয়টি জাহাজ ডুবিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে  দেয় অপারেশন জ্যাকপট

 

১৯৭১ সালের ১৫ অগাস্ট চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দরে একযোগে  অভিযান ছিল মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের নৌ কমান্ডোদের প্রথম অপারেশন।

মুক্তিযোদ্ধারা জানতেন, তাদের এই অভিযান সফল হলে বাঙালি জাতিকে তা এগিয়ে নেবে বিজয়ের বন্দরের পথে। আর ব্যর্থতার ফল হবে মৃত্যু। এ কারণে লিম্পেট মাইন নিয়ে মরণপন সেই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’।

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়ের ৪৬তম বার্ষিকী সামনে রেখে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুক্তিযুদ্ধে নৌ কমান্ডো গঠন এবং অপারেশন জ্যাকপটের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন অবসরপ্রাপ্ত কমোডর আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।

এ ডব্লিউ চৌধুরী নামে পরিচিত এ মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান নৌ বাহিনীর সাবমেরিনার হিসাবে ফ্রান্সে থাকা অবস্থায় পালিয়ে এসে যুদ্ধে যোগ দেন। অপারেশন জ্যাকপটে চট্টগ্রামের অপারেশনে নেতৃত্ব দেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একইসঙ্গে বীর উত্তম ও বীর বিক্রম খেতাব দেওয়া হয় তাকে।

সেই অভিযানের পরের ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নয়টি জাহাজ ডুবিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর অচল করে দেওয়ার পর পাকিস্তানিদের মনোবল ও মেরুদণ্ডও ভেঙে যায়। রসদ আসা বন্ধ হওয়ায় দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় তারা।

১৯৯৭ সালে কমোডর হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী অবসরে যাওয়া এ ডব্লিউ চৌধুরীর ভাষায়, অপারেশন জ্যাকপট ছিল মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট।

একাত্তরের মার্চে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হল, পাকিস্তানের সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরোর সঙ্গে ৪১ জন নৌসেনা তখন ফ্রান্সের তুলঁ সাবমেরিন ইয়ার্ডে প্রশিক্ষণে ছিলেন। তাদের মধ্যে ওয়াহেদ চৌধুরীসহ ১৩ জন ছিলেন বাঙালি।

যুদ্ধ শুরুর পাঁচ দিনের মাথায় ২৯ মার্চ সাবমেরিনার ওয়াহেদসহ আটজন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ওই ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যান। নানা রকম আইনি প্রক্রিয়া আর কয়েকটি দেশ ঘুরে ১০দিন পর দিল্লিতে পৌঁছাতে সক্ষম হন তারা। পরে তাদের নেতৃত্বেই ৩০০ জনের নৌ কমান্ডো দল গড়ে তোলা হয় ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতায়।

ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, “প্রথমে তারা চিন্তা করল আমাদের আটজনকে দিয়ে অপারেশন করাবে। কিন্তু আমাদের কেউ যদি মারা যায়, তাহলে নতুন করে খুঁজতে হবে। সে কারণে তারা চিন্তা করল, বড় আকারে একটা গ্রুপ কীভাবে করা যায়।”

মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে বাছাই করা তিনশ জনকে নিয়ে ২১ মে গঠন করা হয় নৌ কমান্ডো বাহিনী। জুনের শুরু থেকে তিন মাস চলে তাদের প্রশিক্ষণ।

পরিকল্পনা গুছিয়ে আনার পর অগাস্টের শুরুতে চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশনের জন্য ওয়াহেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৬০ জন নৌ-কমান্ডোর একটি দলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তার সঙ্গে ডেপুটি লিডার হিসাবে ছিলেন নৌ-কমান্ডো শাহ আলম, তিনিও পরে বীরউত্তম খেতাব পান।

কলকাতার দমদম বিমানবন্দর থেকে আকাশ পথে আগরতলায় পৌঁছায় নৌ কমান্ডোদের দলটি। সেখান থেকে ১১ অগাস্ট তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।

কখন হবে অপারেশন- তখনও তা জানানো হয়নি দলের কাউকে। টিম লিডারদের কেবল জানানো হয়েছে, অপারেশনের দিনক্ষণ জানাতে সংকেত হবে দুটি গান। আকাশবাণী রেডিওতে ওই গান বাজলেই বুঝতে হবে- সময় এসে গেছে।

ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, “বিমানে জেনারেল অরোরা আমার কানে কানে বললেন, ‘ডু ইউ নো ইওর ডি ডে?’ আমি বলিছাম, নো স্যার। তখন উনি আমাকে আভাস দিলেন- হয়ত ১৫ তারিখ হতে পারে।”

ঠিক হয়েছিল, অপারেশন শুরুর সংকেত হিসেবে ঠিক করা গান দুটি সম্প্রচার করা হবে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য কলকাতা আকাশবাণীর বিশেষ অনুষ্ঠানে, সকাল ৬টা থেকে সাড়ে ৬টা অথবা রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে। প্রচারের ফ্রিকোয়েন্সি আর গান দুটি কথা শুধু টিম লিডার ও ডেপুটি লিডারকেই বলা হয়েছিল।

এর মধ্যে পঙ্কজ মল্লিকের ‘আমি যে তোমাকে শুনিয়েছি কত গান’ বাজলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশনে যেতে হবে। আর সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি’ বাজার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শেষ করতে হবে অপারেশন।

অপারেশন ও চলাচলের সুবিধার জন্য ৬০ জনের দলকে তিন ভাগে ভাগ করে নেন কমান্ডো লিডার। ৬০টি লিম্পেট মাইন আর সাঁতারের সরঞ্জাম নিয়ে সীমান্ত থেকে তারা পায়ে হেঁটে রওনা হন চট্টগ্রামের পথে।

১৩ অগাস্ট সকাল ৬টায় আকাশবাণীতে বেজে ওঠে সংকেত। পঙ্কজ মল্লিক গেয়ে ওঠেন– ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যে গান’।

“আমার আর ডেপুটি লিডারের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেল। আমার জন্যই তো এ গান। তার মানে দুই দিনের মধ্যে আমাদের অপারেশন চালাতে হবে। ১৩ তারিখ সন্ধ্যা ৬টায় আবার শোনা গেল ‘আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যে গান’। তার মানে আমরা কনফার্ম হলাম, এটা আমাদেরই গান।

“মনে তখন চিন্তা, ১৪ তারিখ রাতেই জাহাজে মাইন লাগাতে হবে। সময় ঠিক রাখতে না পারলে চাঁদপুর, মংলা ও নারায়ণগঞ্জের অপারেশনের সময়ের সঙ্গে গরিমল হয়ে যাবে। তারা করে ফেলবে- আমি বাস মিস করব… সুযোগ হারাব।”

১৪ অগাস্ট সকালে বাজল ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুর বাড়ি’। সেই গান শুনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযান শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে রাত ১১টার আগেই কর্ণফুলী নদীর ওপারে পৌঁছায় ওয়াহেদ চৌধুরীর দলের দুই ভাগের ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা।

“আমরা ৩৩ জনকে রেডি করলাম। মানে ১১টা জাহাজে তিনজন করে অ্যাটাক করবে। প্রতিটিতে তিনটি করে মাইন ফিট করবে। পানির ছয় ফুট নিচের সামনে, পেছনে আর মাঝখানে। একেকটা টার্গেটে একেকটা জাহাজে তিনজন করে হিট করবে। আর সাতজন আমাদের শেল্টারে দাঁড়াবে।”

রাত ১২টা বাজার ৫ মিনিট আগে পানিতে নামেন কমান্ডোরা। জাহাজে মাইন বসিয়ে সোয়া ১২টার মধ্যে আবার একসঙ্গে হয়ে যান। ফেলে দেন অন্যান্য সরঞ্জাম।

সুইমিং কস্টিউম পরা ৪০ জনের ওই দল গিয়ে অবস্থান নেয় একটি বাড়ির গোয়াল ঘরে। এরপর বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনার অপেক্ষা।

১৫ অগাস্ট সকালে ছড়িয়ে পড়ল খবর। বলা হল, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে নয়টি জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা’।

সেদিনের কথা স্মরণ করে ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, “১১টার মধ্যে নয়টি জাহাজ আমরা ডুবিয়ে দিয়েছিলাম। মাইন ফাটার সময় ভয়ঙ্কর আওয়াজ হয়েছিল। পাকিস্তানিরা তখন সমস্ত ওয়ার্ল্ডে সিগন্যাল দিল- চিটাগাং পোর্ট ইজ নন-অপারেশনাল, চিটাগাং পোর্ট ড্যামেজড বাই দি টেররিস্ট।”

সেদিন ধ্বংস হওয়া নয় জাহাজের মধ্যে এমভি হরমুজে নয় হাজার ৯১০ টন এবং এমভি আল-আব্বাসে ১০ হাজার ৪১৮ টন সমর সরঞ্জাম ছিল।

ওয়াহেদ চৌধুরী বলেন, অবরুদ্ধ বাংলাদেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজ করছে বলে বহির্বিশ্বে প্রচার চালিয়ে আসছিল পাকিস্তান সরকার। নৌ-কমান্ডোদের সফল ওই অভিযানের মাধ্যমে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মুক্তিযোদ্ধাদের ওই অভিযানের খবর ফলাও করে প্রকাশ করে। অপারেশন জ্যাকপট ব্যাপক পরিচিতি পায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

July 2024
S M T W T F S
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
28293031